kalerkantho

রবিবার । ৯ কার্তিক ১৪২৭। ২৫ অক্টোবর ২০২০। ৭ রবিউল আউয়াল ১৪৪২

মন্ত্রীদের আশ্বাসের পরও আশুলিয়ায় শ্রমিক আন্দোলন অব্যাহত

নিজস্ব প্রতিবেদক, সাভার (ঢাকা)   

২০ ডিসেম্বর, ২০১৬ ১৯:০৮ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



মন্ত্রীদের আশ্বাসের পরও আশুলিয়ায় শ্রমিক আন্দোলন অব্যাহত

আশুলিয়া শিল্পাঞ্চলে পোশাক শ্রমিকদের আন্দোলন থামাতে শ্রমিক নেতাদের সঙ্গে মন্ত্রীদের দফায় দফায় বৈঠকের পর মন্ত্রীদের আশ্বাসের কথা জানানো হলেও আন্দোলনরত শ্রমিকদের পক্ষ থেকে সাড়া মিলছে না। ন্যূনতম মজুরি ১৬ হাজার টাকার দাবিতে শ্রমিকদের আন্দোলন অব্যাহত রয়েছে। মজুরি বৃদ্ধির দাবির এই আন্দোলনে যোগ দিচ্ছে নতুন নতুন পোশাক কারখানার শ্রমিকরা। আজ মঙ্গলবার কাজ বন্ধ রেখেছেন আশুলিয়া শিল্পাঞ্চলের প্রায় অর্ধশত কারখানার শ্রমিক। শ্রমিকরা কারখানা ছেড়ে মহাসড়কে এসে বিক্ষোভ করতে চেষ্টা করলে পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষ হয়েছে।

গতকাল সোমবার আশুলিয়ার বাইপাইলে একটি কমিউনিটি সেন্টারে আন্দোলনরত শ্রমিকদের সঙ্গে বৈঠক করেন বিভিন্ন শ্রমিক সংগঠনের নেতারা। রাতে শ্রমিকদের পক্ষ থেকে চলমান ধর্মঘট প্রত্যাহারের কথা জানান আশুলিয়া শিল্পাঞ্চলের শ্রমিক নেতা রফিকুল ইসলাম সুজন, আল কামরান ও তুহিন চৌধুরী। ওই বৈঠকে বিভিন্ন কারখানার আন্দোলনরত প্রায় ৪০০ শ্রমিক উপস্থিত ছিলেন। দাবি-দাওয়া নিয়ে শ্রমিক নেতারা তাঁদের সঙ্গে খোলামেলা কথা বলেন। এর আগের দিনও একই স্থানে ঢাকা জেলা পুলিশের আয়োজনে তিন মন্ত্রী শ্রমিক সংগঠনের নেতা ও স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তিদের উপস্থিতিতে একটি বৈঠক করেন।

এ ছাড়াও গতকাল রাতে ঢাকার মিন্টো রোডে অবস্থিত নৌমন্ত্রী শাজাহান খানের বাসায় সরকার-মালিক ও শ্রমিকের মধ্যে একটি ত্রিপক্ষীয় বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। বৈঠক শেষে শ্রমিক নেতারা আজ মঙ্গলবার থেকে আন্দোলনরত শ্রমিকরা কাজে যোগ দেবেন বলে জানান। একই সঙ্গে তাঁরা চলমান ধর্মঘট প্রত্যাহারের কথাও জানান। তারপরও মঙ্গলবার কেন আন্দোলন চলছে জানতে চাইলে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কয়েকজন শ্রমিক জানান, কোনো শ্রমিক সংগঠন আন্দোলনের ঘোষণা দেয়নি। কাজেই তারা কিভাবে আন্দোলন প্রত্যাহার করবে বলে পাল্টা প্রশ্ন করেন শ্রমিকরা। 

তারা আরো বলেন, নিজেদের পেটের তাড়নায় তারা আন্দোলন করছেন। ন্যূনতম মজুরি ১৬ হাজার টাকা প্রদানের ঘোষণা আসলেই তারা আন্দোলন বন্ধ করবেন। 

এ প্রসঙ্গে গামের্ন্টস শ্রমিক ট্রেড ইউনিয়ন কেন্দ্র, সাভার-আশুলিয়া শিল্পাঞ্চল কমিটির সাধারণ সম্পাদক খায়রুল মামুন মিন্টু এবং গামের্ন্টস অ্যান্ড শিল্প শ্রমিক ফেডারেশনের সভাপতি রফিকুল ইসলাম সুজন বলেন, মন্ত্রীদের আশ্বাসের কথা শ্রমিকদের জানানো হয়েছে, কিন্তু তারা বিষয়টি আমলে নিচ্ছেন না। বিভিন্ন কারখানার শ্রমিকরা নিজেরা সংগঠিত হয়ে কাজ বন্ধ রাখার পাশাপাশি বিক্ষোভ প্রদর্শন করে যাচ্ছেন।

থানা ও শিল্প পুলিশের সঙ্গে আলাপ করে জানা যায়, আজ মঙ্গলবার শিল্পাঞ্চলের বাইপাইল, ইউনিক, জামগড়া, বেরন, নরসিংহপুরসহ বাইপাইল-আব্দুল্লাহপুর মহাসড়কের দুই পাশের প্রায় অর্ধশত পোশাক কারখানার শ্রমিকরা সকালে যাথরীতি কারখানায় প্রবেশ করলেও কাজ করেননি। কারখানায় ঢুকে তাঁরা আবার বের হয়ে আসেন। এসব কারখানায় উৎপাদন বন্ধ রয়েছে। বার্ষিক ছুটির বিপরীতে এবং চাকরির বয়স পাঁচ বছর হলে বছরে একটি করে মূল বেতনের সমপরিমাণ অর্থ দাবি করছেন শ্রমিকেরা। তাঁদের ওই দাবির সঙ্গে নতুন করে যুক্ত হয়েছে ন্যূনতম মজুরি বাড়ানোর দাবি। এসব দাবির সঙ্গে শ্রমিকরা চান ছুটিকালীন সময়ে বেতন বহাল রাখতে হবে। কথায় কথায় শ্রমিক ছাঁটাই করা যাবে না। দাবি আদায় না হওয়া পর্যন্ত শ্রমিকরা আন্দোলন চালিয়ে যাবেন বলে জানিয়েছে আন্দোলনরত অনেক শ্রমিক।

এ ব্যাপারে আশুলিয়া থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) মহসিনুল কাদির জানান, মঙ্গলবার ভোর হতেই আশুলিয়া শিল্পাঞ্চলের বাইপাইল থেকে নরসিংহপুর পর্যন্ত অবস্থিত প্রায় অর্ধশত কারখানার শ্রমিকরা কারখানায় প্রবেশ করে বের হয়ে আসেন। পরে তারা বাইপাইল-আব্দুল্লাহপুর মহা সড়কে নেমে বিচ্ছিন্ন ও বিক্ষিপ্তভাবে বিভিন্ন স্থানে বিক্ষোভ শুরু করলে পুলিশের টিয়ারশেল ও রাবার বুলেটে ছত্রভঙ্গ হয়ে যায়। এ সময় সড়কটিতে প্রায় ১৫ মিনিটি যান চলাচল বন্ধ থাকে। পরে পুলিশের উপস্থিতিতে শ্রমিকরা বাড়ি ফিরে গেলে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হয়। তবে দুপুর পর্যন্ত আশুলিয়ার বিভিন্ন স্থানে শ্রমিকরা জটলা বেধে অবস্থান করেন। সড়কে ও গুরুত্বপূর্ণ স্থানে র‌্যাব ও পুলিশসহ আইনশৃঙ্খলাবাহিনীর অতিরিক্ত সদস্য মোতায়েন রয়েছে। 

এদিকে এক যৌথ বিবৃতিতে আশুলিয়ায় গত ৫ দিন ধরে চলা শ্রমিকদের মজুরি বৃদ্ধি ও ছাঁটাই-নির্যাতনের বিরুদ্ধে চলমান আন্দোলনে পুলিশি হামলার নিন্দা জানিয়েছেন বাংলাদেশ গার্মেন্ট শ্রমিক সংহতির কেন্দ্রীয় সভা প্রধান তাসলিমা আখতার এবং সাধারণ সম্পাদক জুলহাস নাইন বাবু। একই সাথে সাথে তাঁরা আন্দোলনের দাবি মেনে নেবার জন্য মালিকপক্ষ এবং সরকারকে নতুন মজুরি বোর্ড গঠন করে মোট মজুরি ১৬ হাজার টাকায় বৃদ্ধির উদ্যোগ এবং কথায় কথায় শ্রমিক ছাঁটাই-নির্যাতন বন্ধের উদ্যোগ নেবার আহ্বান জানান। 

নেতৃবৃন্দরা বলেন, গত পাঁচ দিনের ওপরে আশুলিয়ায় বেশ কয়েকটি কারখানায় আন্দোলন চলছে মজুরি বৃদ্ধিসহ শ্রমিক ছাঁটাই, নির্যাতন ও অন্যান্য দাবি দাওয়া নিয়ে। শ্রমিকদের বার্ষিক ছুটির টাকা ঠিক মতো পরিশোধ না করা, কথায় কথায় ছাঁটাই নির্যতান, টিফিন বিল- নাইট বিল ঠিকমতো না দেওয়াসহ অন্যান্য দাবিতে শ্রমিকরা আগে থেকেই বিক্ষুব্ধ ছিলো। তার সাথে যুক্ত হয় মজুরি বৃদ্ধির দাবি। গত দু'দিন থেকে আন্দোলন ছড়িয়ে পড়ে আশুলিয়ার বিভিন্ন কারখানায়। কিন্তু শ্রমিকদের দাবি দাওয়া পূরণে মালিকপক্ষ যথাযথ উদ্যোগ না নিয়ে উল্টো ভাড়াটে মাস্তান দিয়ে শ্রমিকদের ওপর কখনো চড়াও হয়েছে, কখনো চলেছে পুলিশি হামলা। এরই ধারাবাহিকতায় মঙ্গলবার শ্রমিকরা অসন্তোষ প্রকাশ করলে কারখানাগুলো ছুটি দিয়ে দেওয়া হয় এবং শ্রমিকদের ওপর পুলিশ রাবার বুলেট নিক্ষেপ করে, টিয়ার সেল ছোড়ে। ইতিমধ্যে ১০ জনের অধিক শ্রমিক আহত অবস্থায় আছেন। এই ঘটনার তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানান তারা।

তারা আরো বলেন, নৌ-পরিবহন মন্ত্রী, শ্রম প্রতিমন্ত্রী এবং বিজিএমইএ কর্তৃপক্ষ আগামী ৩ বছর আশুলিয়ায় বাসা ভাড়া বাড়বে না বললেও পরিষ্কার করেননি কি প্রক্রিয়ায় বাড়ি ভাড়া নিয়ন্ত্রণ করবেন। আশুলিয়া ছাড়া ঢাকা, নারায়নগঞ্জ, গাজীপুর, চট্টগ্রামসহ অন্যান্য শ্রমিকাঞ্চলে বাড়ি ভাড়া, গ্যাসের মূল্য কিভাবে নিয়ন্ত্রিত হবে। নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসের দাম শ্রমিকদের নাগালের বাইরে এ ধরনের পরিস্থিতিতে ন্যুনতম মজুরি বোর্ড গঠন জরুরি দাবি বলে মনে করেন নেতৃবৃন্দ। 

অবিলম্বে নতুন মজুরি বোর্ড গঠন করে মূল মজুরি ১০ হাজার টাকা এবং মোট মজুরি ১৬ হাজার টাকা করার আহ্বান মালিক ও সরকার পক্ষের কাছে জানান নেতৃবৃন্দরা ।

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা