kalerkantho

শুক্রবার । ২২ নভেম্বর ২০১৯। ৭ অগ্রহায়ণ ১৪২৬। ২৪ রবিউল আউয়াল ১৪৪১     

চট্টগ্রামে 'তেল বাণিজ্য' বাগাতে শিপিং অফিসে ছাত্রলীগের তাণ্ডব

নিজস্ব প্রতিবেদক, চট্টগ্রাম   

১৩ নভেম্বর, ২০১৪ ২৩:৩৬ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



চট্টগ্রামে 'তেল বাণিজ্য' বাগাতে শিপিং অফিসে ছাত্রলীগের তাণ্ডব

জাহাজ থেকে পরিত্যক্ত তেল সংগ্রহের কাজ বাগাতে আজ চট্টগ্রাম মহানগরীর আগ্রাবাদে একটি শিপিং প্রতিষ্ঠানের উদ্দেশে ছাত্রলীগ নেতা-কর্মীদের লাঠি মিছিল। ছবি : কালের কণ্ঠ

চট্টগ্রাম বন্দরে আসা দেশি-বিদেশি জাহাজের পরিত্যক্ত তেলের বাণিজ্য জোরপূর্বক বাগিয়ে নিতে মহানগরীর আগ্রাবাদে গে্লাব লিংক অ্যাসোসিয়েটস লিমিডেট নামের একটি শিপিং অফিসে ঢুকে তাণ্ডব চালিয়েছে ছাত্রলীগের এক দল নেতা-কর্মী। এ সময় দেশীয় অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে হুমকি-ধমকি দিয়ে জোরপূর্বক প্রতিষ্ঠানটির কাছ থেকে তেল সংগ্রহের অনুমতিপত্রে স্বাক্ষরও করিয়ে নেয় তারা। বৃহস্পতিবার দুপুর ১২টা থেকে ১টা পর্যন্ত এ ঘটনা চলে।
এ তাণ্ডবে অংশ নেয় ছাত্রলীগের কয়েক শ নেতা-কর্মী। এ সময় তাদের হাতে বন্দর রক্ষা আন্দোলনের সপক্ষের একটি ব্যানার ছিল। তাদের একাংশ ওই অফিসের নিচে সড়কে এ ব্যানার নিয়ে স্লোগান দেয়; অন্য অংশ অফিসে ঢুকে কর্মকর্তাদের জিম্মি করে অকথ্য ভাষায় গালাগাল ও মারধরের চেষ্টার পাশাপাশি জোরপূর্বক তেল সংগ্রহের অনুমতিপত্রে স্বাক্ষর আদায় করে। এ সময় ওই অফিস ও আশপাশের সরকারি-বেসরকারি অফিস, দোকানপাট, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানসহ পুরো এলাকায় আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। অনেকেই তাৎক্ষণিক দোকান বন্ধ করে দেয়। সীমিত হয়ে যায় যানবাহন চলাচলও।
ঘটনাস্থলে পুলিশ থাকলেও তাদের ভূমিকা ছিল কার্যত প্রত্যক্ষদর্শীর মতো। তাণ্ডব বন্ধে পুলিশ কার্যকর পদক্ষেপ নেয়নি। স্থানীয় লোকজন জানায়, তাণ্ডবকারীরা ক্ষমতাসীন দলের হওয়ায় পুলিশ আইনগত ব্যবস্থা না নিয়ে নীরব দর্শকের মতো চেয়ে চেয়ে ঘটনা দেখেছে।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে নগর পুলিশের বন্দর জোনের উপকমিশনার হারুন-উর রশীদ হাযারী কালের কণ্ঠকে বলেন, 'কিছু ছেলে উচ্ছৃঙ্খল আচরণ করেছে বলে আমি শুনেছি। তারা কারা এবং কী কারণে উচ্ছৃঙ্খলতা করেছে এবং পুলিশ আসলেই নিষ্ক্রিয় ছিল কি না, তা খতিয়ে দেখার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। এতে কারো দায় প্রমাণিত হলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।'
সরেজমিনে গিয়ে দেখা গেছে, বন্দর থানা ছাত্রলীগের ব্যানারে দুই শতাধিক যুবক সড়কে দাঁড়িয়ে 'জয় বাংলা' স্লোগান দিচ্ছিল। তাদের হাতে বাঁধা ছিল লাল কাপড়। অনেকের হাতে ছিল হকিস্টিক, ক্রিকেট খেলার স্টাম্প, লাঠি, রামদা ও কিরিচ।
তাণ্ডবের সময় ঘটনাস্থলের কিছুটা দূরে দাঁড়িয়ে থাকা একজন পুলিশ সদস্য পরিচয় প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, 'তারা (তাণ্ডবকারীরা) সরকারি দলের ছেলে, এই মুহূর্তে তাদের সরিয়ে দেওয়ার জন্য ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ নির্দেশনা দেয়নি। এই কারণে কিছু করা যাচ্ছে না।'
এ সময় কয়েকজন পুলিশ সদস্য বলেন, বন্দর থানা ছাত্রলীগ নেতা জাকারিয়া দস্তগীরের নেতৃত্বে এক দল নেতা-কর্মী হাউজ বিল্ডিং ফাইন্যান্স করপোরেশন ভবনের চারতলায় শিপিং অফিসে ঢুকে তাণ্ডব চালাচ্ছে। সেখানে গেলে পরিস্থিতি বুঝতে পারবেন।
পরে শিপিং অফিসে গিয়ে দেখা গেছে, দরজা দিয়ে চিৎকার-চেঁচামেচি করতে করতে বেরিয়ে যাচ্ছে জাকারিয়া দস্তগীরসহ প্রায় ৪০-৫০ জন যুবক। নেমে যাওয়ার সময়ও তারা 'জয় বাংলা' স্লোগান দিচ্ছিল। পরে সড়কে নেমে শুরু করে মিছিল। মিছিলটি শেখ মুজিব সড়ক হয়ে বারিক বিল্ডিংয়ের দিকে চলে যায়। গ্লোব লিংক শিপিং অফিসে প্রবেশ করে দেখা গেছে, ওই অফিসের কর্মীরা ভীতসন্ত্রস্ত। অফিসের ফাইলপত্র এলোমেলো। এ সময় অফিসের পরিস্থিতি বিষয়ে সাংবাদিকদের কোনো তথ্য দিতে রাজি হননি প্রতিষ্ঠানটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক ক্যাপ্টেন আ ফ ম রহমতুল বারি। ওই শিপিং অফিসের কর্মচারী, পুলিশ ও প্রত্যক্ষদর্শীরা জানিয়েছে, ছাত্রলীগ নেতা জাকারিয়া দস্তগীর নিজেকে জাহাজের পরিত্যক্ত তেল ও গার্বেজ সংগ্রহকারী প্রতিষ্ঠান মেসার্স সিদ্দিক এন্টারপ্রাইজের প্রতিনিধি হিসেবে পরিচয় দেন এবং পরিত্যক্ত তেল সংগ্রহের জন্য চাপ সৃষ্টি করেন। তারা জানায়, গে্লাব লিংক কিছুদিন আগে ছাত্রলীগের আরেক নেতা নওশাদ পিন্টুকে একটি জাহাজ থেকে পরিত্যক্ত তেল সংগ্রহের অর্ডার দিয়েছে। এ খবর জাকারিয়া জানার পরই ক্ষুব্ধ হয়ে তিনি সদলবলে গ্লোব লিংক কার্যালয়ে এসে তাণ্ডব চালান এবং ব্যবস্থাপনা পরিচালকের কাছ থেকে জোরপূর্বক একটি অর্ডার নিয়ে যান।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে গ্লোব লিংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক আ ফ ম রহমতুল বারি বলেন, 'জাহাজের পরিত্যক্ত তেল সংগ্রহের কার্যাদেশ দেওয়া আইনবহির্ভূত হবে। কারণ যে জাহাজ বন্দরের সীমানায় আসেনি সেই জাহাজের পরিত্যক্ত তেল সংগ্রহের আদেশ দেওয়া যায় না।'
প্রতিষ্ঠানের অন্য একজন কর্মী জানান, তাণ্ডবকারীরা ব্যবস্থাপনা পরিচালকের কাছ থেকে আগামী ১৭ নভেম্বর বন্দরের জেটিতে নোঙরের শিডিউলভুক্ত একটি চীনের পতাকাবাহী জাহাজের পরিত্যক্ত তেল সংগ্রহের জন্য স্বাক্ষর আদায় করে নিয়েছে। কর্মকর্তারা আরো জানান, তাণ্ডবকারীরা ব্যবস্থাপনা পরিচালকের কাছ থেকে স্বাক্ষর নিয়ে চলে যাওয়ার পর অফিসে আসে পুলিশের একটি দল।
সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে বন্দর থানার এসআই এনাম আহমেদ বলেন, জাহাজের তেল সংগ্রহ এবং বিভিন্ন কাজ নিয়ে ছাত্রলীগের মধ্যে দুটি পক্ষের সৃষ্টি হয়েছে। তাদের একটি গ্রুপ শোডাউন করেছে। এতে আইনশৃঙ্খলা বিঘ্নিত হয়নি।
নগর ছাত্রলীগের যুগ্ম সম্পাদক জাকারিয়া দস্তগীর বলেন, 'শিপিং অফিসে গিয়ে চাপ সৃষ্টির অভিযোগ মিথ্যা। আমরা ওই অফিসে গিয়ে আড্ডা দিই। সেখানে কাজের জন্য যাইনি। কেউ না কেউ আপনাকে মিথ্যা তথ্য দিয়েছে।' তিনি আরো বলেন, 'জোরপূর্বক অর্ডার নেওয়া হয়নি।'
দেশীয় অস্ত্রশস্ত্র এবং বন্দর রক্ষার ব্যানার নিয়ে মিছিল-স্লোগানের বিষয়ে তিনি বলেন, 'আমরা মহিউদ্দিন ভাইয়ের আহ্বানে সাইফ পাওয়ার টেকের বিরুদ্ধে মিছিল করেছিলাম। যেখান থেকে মিছিল বের করেছিলাম সেখানে সব শিবিরের মেস। তারা হামলা চালাতে পারে এ জন্য লাঠিসোঁটা নিয়েছিলাম।'
তাণ্ডবে নেতৃত্ব দেওয়া ছাত্রলীগ নেতা জাকারিয়া বহিষ্কার : এদিকে সংগঠনের শৃঙ্খলাবিরোধী কর্মকাণ্ডে জড়িত থাকার অভিযোগে চট্টগ্রাম মহানগর ছাত্রলীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক জাকারিয়া দস্তগীরকে সংগঠন থেকে বহিষ্কার করেছে কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগ। গতকাল সন্ধ্যায় ছাত্রলীগের দপ্তর সম্পাদক শেখ রাসেল স্বাক্ষরিত এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য জানানো হয়।
এতে বলা হয়, ছাত্রলীগ কেন্দ্রীয় নির্বাহী সংসদের এক জরুরি সিদ্ধান্তে জাকারিয়া দস্তগীরকে সংগঠন থেকে বহিষ্কার করা হয়েছে।

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা