kalerkantho

বুধবার । ২৪ সেপ্টেম্বর ২০২২ । ১৩ আশ্বিন ১৪২৯ ।  ১ রবিউল আউয়াল ১৪৪৪

লাখো পুণ্যার্থীর পদচারণায় মুখর লাঙ্গলবন্দ

দিলীপ কুমার মণ্ডল, লাঙ্গলবন্দ (নারায়ণগঞ্জ) থেকে   

৬ এপ্রিল, ২০১৪ ২১:২৯ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



লাখো পুণ্যার্থীর পদচারণায় মুখর লাঙ্গলবন্দ

ঘাটে ঘাটে 'হে মহাভাগ ব্রহ্মপুত্র, হে লৌহিত্য আমার পাপ হরণ কর' এই মন্ত্র উচ্চারণ। লাখো পুণ্যার্থীর ব্রহ্মপুত্রের পবিত্র জলে অবগাহন। তিন কিলোমিটার এলাকায় বাংলার লোকজ মেলায় সব ধর্মের মানুষের মিলনমেলা- এই ছিল আজকের লাঙ্গলবন্দের চিত্র। জগতের যাবতীয় সংকীর্ণতা ও পঙ্কিলতার আবর্তে ঘেরা জীবন থেকে পাপমুক্তির বাসনায় দেশ-বিদেশের লাখো তীর্থযাত্রীর পদচারণায় মুখর ছিল নারায়ণগঞ্জের লাঙ্গলবন্দ।

বিজ্ঞাপন

তিথি অনুসারে স্নানোৎসব রবিবার দিবাগত রাত ১টা ৫৫ মিনিট ১১ সেকেন্ড থেকে শুরু হয়ে শেষ হচ্ছে সোমবার দিবাগত রাত ৩টা ৪৭ মিনিট ২৭ সেকেন্ডে। স্নানোৎসব সুষ্ঠু ও নিরাপদ করতে সেখানে পুরো তিন কিলোমিটার এলাকায় নিরাপত্তা বলয় গড়ে তোলা হয়েছে।
পবিত্র নদ ব্রহ্মপুত্রে স্নানমন্ত্র পাঠপূর্বক নিজ নিজ ইচ্ছা অনুযায়ী ফুল, বেলপাতা, ধান, দুর্বা, হরতকী, ডাব, আম্রপল্লব ইত্যাদি দিয়ে পিতৃকূলের উদ্দেশ্যে তর্পণ করছে। মন্দিরগুলোতে অনুষ্ঠিত হচ্ছে বাসন্তী পূজা। এ ছাড়া সেবাশ্রমগুলোতে চলছে ভক্তিমূলক গান, সাধু সঙ্গ, দেশের মঙ্গল কামনায় বিশেষ প্রার্থনা ও ধর্মীয় আলোচনা। বন্দর উপজেলার মুছাপুর ইউনিয়নের লাঙ্গলবন্দ থেকে কলাগাছিয়া ইউনিয়নের সাবদি পর্যন্ত প্রায় তিন কিলোমিটারজুড়ে ব্রহ্মপুত্র নদের ১৬টি ঘাটে ঢল নামে নানা বয়সী মানুষের।
লাঙ্গলবন্দে স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী : বন্দরের লাঙ্গলবন্দ স্নানোৎসব পরিদর্শন করেছেন স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী আসাদুজ্জমান খান। আজ সন্ধ্যায় তিনি বিভিন্ন ঘাটে গিয়ে পুণ্যার্থীদের সাথে কথা বলেন ও নিরাপত্তা ব্যবস্থা পর্যবেক্ষণ করে সন্তোষ প্রকাশ করেন। পরে এক ধর্মীয় আলোচনা সভায় বক্তব্য দিতে গিয়ে বলেন, বিগত সময়ে দেশের অনেক জায়গায় সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা হলেও নারায়ণগঞ্জে তা হয়নি। কেন হয়নি তা এসে চোখে দেখে গেলাম। ঐতিহ্যবাহী জোহা পরিবারের কারণে সেটি ঘটতে পারেনি। নারায়ণগঞ্জে যে এখনো অসাম্প্রদায়িক চেতনা বিরাজ করছে- সেটা পরখ করে গেলাম। তিনি বলেন, এটা আমার কোনো শিডিউল কর্মসূচি ছিল না তবুও আপনাদের টানেই এখানে এসে ধর্মীয় উৎসব পর্যবেক্ষণ করলাম। সিকিউরিটি ব্যবস্থা সম্পর্কে সন্তোষ প্রকাশ করে বলেন, যদি প্রয়োজন হয় এখানে ঢাকা থেকে আরো ফোর্স দেওয়া হবে। ফায়ার আয়োজনে কোনো ত্রুটি নেই মন্তব্য করে বলেন, সিকিউরিটি ব্যবস্থা খুবই ভালো। স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী বলেন, বঙ্গবন্ধু হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙালি যিনি জন্ম না নিলে বাংলাদেশ হতো না। তিনি একটা কথাই বলে গেছেন তুমি কে আমি কে বাঙালি। আর বাঙালি কারা যারা হিন্দু, মুসলামন, বৌদ্ধ, খ্রিস্টান সব ধর্মের মানুষ।
স্নান উদযাপন পরিষদে সভাপতি পরিতোষ কান্তি সাহার সভাপতিত্বে বক্তব্য দেন শামীম ওসমান এমপি, পঙ্কজ দেবনাথ এমপি, জেলা প্রশাসক মনোজ কান্তি সরকার, পুলিশ সুপার সৈয়দ নুরুল ইসলাম, বন্দর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মিনারা নাজমিন, নারায়ণগঞ্জ মহানগর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট খোকন সাহা, একাত্তরের ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটির সভাপতি চন্দন শীল প্রমুখ।
সরেজমিনে লাঙ্গলবন্দ : সরেজমিনে ঘুরে দেখা গেছে, লাঙ্গলবন্দের বিভিন্ন মন্দিরগুলোতে চলছে ভক্তিমূলক গান। দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে বৈষ্ণব, সাধুরা প্রেমতলা ঘাট ও গান্ধীঘাটে অবস্থান নিয়ে ভক্তিমুলক গান করছেন। অষ্টমীর স্নান উপলক্ষে লাঙ্গলবন্দ এলাকাজুড়ে উৎসবমুখর পরিবেশ বিরাজ করছে। তিন কিলোমিটারজুড়ে বসেছে বারোয়ারী মেলা। মেলায় মেয়েদের চুড়ি, ফিতা, আলতা থেকে শুরু করে বাংলাদেশের ঐতিহ্যের শীতল পাটি, মাটির তৈরি বিভিন্ন তৈজষপত্র, খেলনা, একতারা, ঢোল বিক্রি হচ্ছে। এ ছাড়া আছে রকমারি খাবারের দোকান। সাথে নিমকী, পিটি, মিষ্টি, সন্দেশ তো আছেই।
কুষ্টিয়া থেকে এসেছেন কার্তিক বিশ্বাস (৬০) সাথে স্ত্রী শেফালী রানী (৫০)। কালের কণ্ঠকে জানান, কনিষ্ঠ মেয়েকে বিয়ে দিয়েছি মাস তিনেক হলো। ধর্মীয় রীতি অনুসারে কন্যা দায় থেকে মুক্তি পাওয়ায় লাঙ্গলবন্দে পুণ্যি স্নানে এসেছি। পঞ্চগড় জেলার সাধু বৈষ্ণব হরিশ্চন্দ্র (৬৫) জানান, তিনি প্রতিবছরই লাঙ্গলবন্দে এসে প্রেমতলায় আসর বসান। সাধু সঙ্গ করে কীর্তন করেন।
লাঙ্গলবন্দ স্নান উদযাপন পরিষদের সভাপতি পরিতোষ কান্তি সাহা জানান, এবছর নদের প্রবাহ ভাল। জল স্বচ্ছ থাকায় ভালভাবেই পুণ্যার্থীরা স্নান কর্ম সারতে পারছে। তবে নদীজুড়ে কচুরিপানা রয়ে গেছে।
নারায়ণগঞ্জ জেলা সিভিল সার্জন ডা. দুলাল চন্দ্র চৌধুরী জানান, তাঁদের তিনটি মেডিক্যাল টিম পুণার্থীদের মাঝে ফ্রি চিকিৎসা প্রদান করছে।
সরকারিভাবে গঠিত স্নানোৎসব ব্যবস্থাপনা কমিটির আহ্বায়ক জেলা পরিষদের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা কাজী মেরাজ হোসেন কালের কণ্ঠকে জানান, এ বছর লাঙ্গলবন্দে দুই দিনব্যাপী স্নানোৎসবে প্রায় ২৫ লাখ মানুষের সমাগম ঘটবে। তিনি বলেন, লাখ লাখ পুণ্যার্থীর আগমনের বিষয়টি মাথায় রেখেই আমরা সেবাবেই যাবতীয় প্রস্তুতি নিয়ে রেখেছি।
জেলা প্রশাসক মনোজ কান্তি বড়াল জানান, এ বছর লাঙ্গলবন্দে নতুন পরিবেশে পুণ্যার্থীরা স্নান করবে। পর্যটন বোর্ড কর্তৃক বরাদ্দকৃত প্রায় দেড় কোটি টাকা ব্যয়ে ১৬টি স্নান ঘাটে টাইলস বসানো হয়েছে। এ ছাড়া মহিলাদের জন্য চেঞ্জিং রুম, নতুন পানির পাইপ বসানোসহ বিভিন্ন উন্নয়নমূলক কাজ করা হয়েছে।
লাঙ্গলবন্দের ৩ কিলোমিটার সিসি ক্যামেরার আওতায় : নারায়ণগঞ্জ জেলা পুলিশ সুপার সৈয়দ নুরুল ইসলাম জানিয়েছেন, স্নান উপলক্ষে কঠোর নিরাপত্তা বলয় তৈরি করা হয়েছে। তিনি বলেন গত বারের অভিজ্ঞতার আলোকে লাঙ্গলবন্দের তিন কিলোমিটার এলাকাজুড়ে সিসি ক্যামেরা বসানো হয়েছে। পুরো লাঙ্গলবন্দে কম্পোজিট ইউনিট কাজ করছে জানিয়ে বলেন, সেখানে নিরাপত্তা বাহিনী ৮০০ সদস্য অবিরাম কাজ করছেন। এ ছাড়া রয়েছে ছয়টি ওয়াচ টাওয়ার, তিনটি কন্ট্রোল রুম, নদীতে টহল ব্যবস্থা। গোয়েন্দা পুলিশের কয়েকটি টিম অনেক আগে থেকেই কাজ শুরু করেছে উল্লেখ করে এসপি বলেন, এত লোকের একসঙ্গে সমাগমের চাপ সামলানো কঠিন হলেও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী তা নির্বিঘ্নে পালন করা শুরু করেছে।
এদিকে স্নানে আগত ভক্তরা অভিযোগ করেন যাতায়াত পথের নবীগঞ্জ, টার্মিনাল ঘাটসহ বিভিন্ন ঘাটে ঘাটে যাত্রীদের কাছ থেকে অতিরিক্ত টোল আদায় করা হচ্ছে। এ ছাড়া বিভিন্ন পরিবহনেও অতিরিক্ত ভাড়া আদায়ের অভিযোগ পাওয়া গেছে।


সাতদিনের সেরা