kalerkantho

সোমবার । ৯ কার্তিক ১৪২৮। ২৫ অক্টোবর ২০২১। ১৭ রবিউল আউয়াল ১৪৪৩

ডিজিটাল অ্যাপে হিসাব রাখছেন একডালা গ্রামের আব্দুল মজিদ

অনলাইন ডেস্ক   

২২ সেপ্টেম্বর, ২০২১ ১৬:০৪ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



ডিজিটাল অ্যাপে হিসাব রাখছেন একডালা গ্রামের আব্দুল মজিদ

সিরাজগঞ্জ জেলার সদর থানার একডালা গ্রামের আব্দুল মজিদের মনোহরি দোকান 'মিথিলা ষ্টোর'। ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী আব্দুল মজিদ তার মেয়ের নামে দোকানের নাম রেখেছেন। সিরাজগঞ্জ শহর থেকে ২০ কিলোমিটার দূরে হলেও মোটামুটি প্রত্যন্ত গ্রাম বলা চলে। চার ভাইবোনের মধ্যে আব্দুল মজিদ তৃতীয়। পরিবারে আর্থিক স্বচ্ছলতা ছিল না বললেই চলে। ইচ্ছা ছিল নিজেই কিছু করবেন। ব্যবসা করবেন, নিজের পায়ে দাঁড়াবেন। আর্থিক সচ্ছলতা নিশ্চিত করবেন।

২০১০ সালে মোবাইল রিচার্জ ব্যবসা দিয়ে শুরু করেন।। এরপর মনোহরি পণ্যের ব্যবসা যোগ করেন। একা মানুষ দুই হাতে সব কিছু সামাল দিতে হয়। তাই নিয়মিতই দিনশেষে আয়-ব্যয়ের হিসাব মিলে না।

মনোহরি দোকানে অনেক বাকি'র কাস্টমার থাকে। কাগজের লম্বা খাতায় তাঁদের হিসাব রাখতেন। শত পৃষ্ঠার খাতার কোন পৃষ্ঠায় কোন কাস্টমারের নাম মনে রাখাও কঠিন‌। প্রায়ই দিনের সব বাকি লিখে রাখা সম্ভব হতো না। পরে লিখবেন বলে ভুলে যেতেন। আবার কাস্টমাররাও বাকি নিয়ে ভুলে যেতেন। এই নিয়ে কাস্টমারদের সাথে ঝগড়া পর্যন্ত হত। আব্দুল মজিদ পড়লেন মহাসংকটে। একজন সাহায্যকারী রাখবেন; সেটাও খরচের বিষয়। একদিকে বাকির হিসাবের ভুলে ব্যবসায় লস হচ্ছে। অন্যদিকে কাস্টমার ব্যবসার লক্ষী; ঝগড়া করলে চলবে না। এর সমাধান খুঁজতে আব্দুল মজিদের চোখে ঘুম নেই।

ইতিমধ্যে ডিজিটাল বাংলাদেশের ঢেউ একডালা গ্রামেও পৌঁছায়। আব্দুল মজিদ স্মার্টফোন ব্যবহার করতেন। একদিন সেই স্মার্টফোন থেকে খোঁজা শুরু করলেন এই সমস্যার সমাধান। সামনে পেলেন টালিখাতা অ্যাপ। যেহেতু হিসাব রাখার খাতাকে টালিখাতা বলে। তাই তিনি কিছুটা আগ্রহ নিয়েই টালিখাতা অ্যাপটি ডাউনলোড করলেন।

দেখলেন অ্যাপটিতে বাকির কাস্টমারের লিস্ট রাখা যায়,‌ বাকির হিসাব লেখা যায়। ক্যাশ বেচা-কেনার হিসাবও রাখা যায়। সবচেয়ে বড় ব্যাপার হল বাকির হিসাব লিখলে কাস্টমাররা এসএমএসের মাধ্যমে সেই হিসাব জানতে পারে। আব্দুল মজিদ এখন বাকি, ক্যাশ সব হিসাব টালিখাতা অ্যাপে রাখা শুরু করলেন। দূর হল কাস্টমারের সাথে বাকি নিয়ে ভুল বুঝাবুঝি। এমনকি কাস্টমারও এখন এসএমএস না পেলে দোকানে এসে টালিখাতা অ্যাপে বাকি লিখিয়ে নিশ্চিত করে যায়। দিন শেষে হিসাবও মিলিয়ে নেয়। কোন বাড়তি খরচও নেই। ব্যবহার করতে ইন্টারনেটও লাগে না। এক অকৃত্রিম বন্ধু টালিখাতা অ্যাপ।

হিসাবের সমস্যার সমাধানতো হল, কিন্তু তাঁর স্বপ্ন বড় ব্যবসায়ী হওয়ার। বর্তমান ব্যবসাকে বড় করতে পারলেই তা সম্ভব হবে। তাঁর দোকানের পাশেই আরেকটা দোকান আছে যা তিনি ব্যবসা বড় করার কাজে নিতে পারেন। কিন্তু দোকানের অগ্রিম, দোকান সাজানো,‌ মালামাল কেনার ইত্যাদি বাবদ লাখখানেক টাকা দরকার। কে দিবে এই পুঁজি? এমন সময় টালিখাতা অ্যাপ এর অফিস থেকে ফোন আসে। তিনি জানতে পারেন যে , নিয়মিত ব্যবহারকারী হিসেবে ব্যবসা বাড়ানোর জন্য তাঁর ঋণ পাওয়ার সুযোগ আছে । আব্দুল মজিদ চিন্তায় পড়ে যান। শুনেছেন ঋণ পেতে নানান ধরনের কাগজপত্র লাগে, ব্যাংক অ্যাকাউন্ট লাগে। তার  তো কোন ব্যাংক অ্যাকাউন্ট নেই। এছাড়াও দোকান ফেলে ব্যাংকে যাওয়া আসা করাও সময়-ঝক্কির ব্যাপার। এমন অনেক দুঃশ্চিন্তা মাথায় ঘুরছে। এদিকে ঋণটা পেলে ব্যবসাও বড় করা যায়।

টালিখাতা অ্যাপই এইসবের সমাধান করে দিল। মূলত টালিখাতা অ্যাপে রাখা হিসাবের উপর ভিত্তি করেই ঋণ দেওয়া হয়। সাথে ট্রেড লাইসেন্স, জাতীয় পরিচয় পত্রের ছবি তুলে অ্যাপের মাধ্যমে পাঠাতে হয়। কোথাও যেতে হয় না। আব্দুল মজিদ জানলেন যে, দোকানে বসেই সব হবে। এমনকি ঋণের টাকাও সে পাবে তাঁর মোবাইল ব্যাংকিং একাউন্টে। টালিখাতা অ্যাপ যেন ব্যবসার সকল সমস্যার সমাধান!

আব্দুল মজিদ অল্প সময়ের মধ্যেই টালিখাতা অ্যাপ এর মাধ্যমে লোন আবেদন করে ব্রাক ব্যাংক থেকে এক লাখ টাকার ঋণ পেলেন। পাশের দোকানটি নিয়ে নতুন ব্যবসা শুরু করলেন। মোবাইল রিচার্জ, মনোহরির পাশে তাঁর কসমেটিকস, গয়না ইত্যাদির ব্যবসা শুরু করলেন। নতুন ব্যবসা থেকে তিনি এখন মাসে ৫ থেকে ৬ হাজার টাকা বাড়তি উপার্জন করছেন।

সুদৃঢ় প্রতিজ্ঞা আর সুন্দর পরিকল্পনার মাধ্যমে আব্দুল মজিদ ধীরে ধীরে তাঁর ব্যবসা বাড়িয়ে নিয়েছেন। শিক্ষিত মানুষ হিসেবে তিনি পরিকল্পনা করে কাজ করতে পছন্দ করেন। প্রতিদিন ব্যবসার আয় থেকে ৫০০ টাকা আলাদা করে রাখেন যাতে করে ঋণের কিস্তি, মাসের দোকান ভাড়া এবং বিল পরিশোধে কোন অসুবিধা না হয়।

আধুনিক মনা মানুষ আব্দুল মাজিদ। বিয়ের পর স্ত্রীকে পড়ালেখার ব্যাপারে উৎসাহিত করেছেন। তাঁর স্ত্রী এসএসসি থেকে এখন ডিগ্রী পাশ। গর্বের সাথে জানান যে তিনি এবং তাঁর স্ত্রী দুজনে লেখাপড়ায় সমান - ডিগ্রী পাস। এভাবে একজন আরেকজনকে সহযোগিতা করে তারা উপযুক্ত সহযোগী হয়ে উঠতে পেরেছেন। জেনারেল স্টোর,কসমেটিক ব্যবসার পাশাপাশি আব্দুল মজিদ বাড়িতে একটি গরুর খামার করেছেন। তাঁর মা এবং স্ত্রী এই খামার দেখাশুনা করেন। সন্তানের ভবিষ্যতের কথা চিন্তা করে এখন থেকেই কিছু টাকা সঞ্চয় করার পরিকল্পনা করছেন।

আব্দুল মজিদ ডিজিটাল বাংলাদেশে প্রযুক্তির ছোঁয়া পেয়েছেন। প্রযুক্তি প্রতিনিয়তই তাঁকে নতুন সম্ভাবনার কথা জানাচ্ছে। নিজের স্মার্টফোনের মাধ্যমে তিনি ব্যবসা কিভাবে বাড়ানো যায়, কোথায় কি পাওয়া যায়, কোথায় কি বাজার আছে - সে খবর রাখছেন। স্মার্টফোনে ব্যবহার করে ব্যবসা পরিচালনা করছেন এবং ব্যবসার প্রসার ঘটাচ্ছেন।

তিনি আশেপাশের মানুষের জন্য স্বল্প পরিসরে হলেও কর্মসংস্থান তৈরি করতে পেরেছেন। তিনি ডিজিটাল অ্যাপ টালিখাতা ব্যবহার করে শুধু নিজেই এগিয়ে যাচ্ছেন না বরং সমাজকে এগিয়ে নিতেও ভূমিকা রাখছেন। তিনি তাঁর আশেপাশের অন্য ব্যবসায়ী এবং তরুণদেরকে তাঁর স্বপ্নের কথা বলেন। কিভাবে তিনি ব্যবসা দাঁড় করিয়েছেন, কিভাবে ডিজিটাল প্লাটফর্ম টালিখাতা তাঁকে সহযোগিতা করেছে সে গল্প বলেন।

এভাবেই ডিজিটালাইজেশনের এর সুবিধা নিয়ে এগিয়ে যাচ্ছে দেশের ছোট ছোট ব্যবসায়ীরা। নতুন নতুন কর্মসংস্থান হচ্ছে। দেশের মোট উৎপাদন বাড়ছে। সেবায় আসছে ইতিবাচক পরিবর্তন। এগিয়ে যাচ্ছে ডিজিটাল বাংলাদেশ। সংবাদ বিজ্ঞপ্তি।



সাতদিনের সেরা