kalerkantho

শুক্রবার । ৯ আশ্বিন ১৪২৮। ২৪ সেপ্টেম্বর ২০২১। ১৬ সফর ১৪৪৩

‘স্টেট অব গভর্ন্যান্স ইন বাংলাদেশ ২০২০-২০২১: ম্যানেজিং দ্য কোভিড-১৯ প্যানডেমিক’ সেমিনারে তথ্য

করোনাউদ্ভূত জীবন-জীবিকার টানাপড়েন কঠিন হয়ে উঠেছে

অনলাইন ডেস্ক   

৩০ জুলাই, ২০২১ ১৫:৫৬ | পড়া যাবে ৮ মিনিটে



করোনাউদ্ভূত জীবন-জীবিকার টানাপড়েন কঠিন হয়ে উঠেছে

বিশ্বের বিভিন্ন দেশের শাসনব্যবস্থা (governance) ঠিক কতখানি চাপ নিতে পারে করোনা মহামারী এসে সেই পরীক্ষাটিই নিচ্ছে। বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশে স্বাস্থ্য এবং সামাজিক সুরক্ষার মত গুরুত্বপূর্ণ খাতগুলোর অবস্থা আগে থেকেই নড়বড়ে। ফলে এসব দেশে করোনাউদ্ভূত “জীবন বনাম জীবিকা”র টানাপড়েন গোড়াথেকেই কঠিন হয়ে উঠেছে। ব্র্যাক ইন্সটিটিউট অব গভর্ন্যান্স অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট (বিআইজিডি) এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের আমেরিকান ইউনিভার্সিটির অ্যাকাউন্টিং রিসার্চ সেন্টার বাংলাদেশের করোনাকালীন শাসনব্যবস্থা নিয়ে একটি গবেষণা করেছে, যার ফলাফল ২৯ জুলাই, বৃহস্পতিবার একটি ওয়েবিনারে তুলে ধরা হয়। এই গবেষণা ও গবেষণার ফলাফল বিআইজিডির ফ্ল্যাগশিপ রিপোর্ট “স্টেট অব গভর্ন্যান্স ইন বাংলাদেশ ২০২০-২০২১”-এ স্থান পেয়েছে।

বাংলাদেশে করোনা ব্যবস্থাপনাসংক্রান্ত শাসন ব্যবস্থা, এর দুর্বলতা, এবং এ ধরনের দুর্যোগ কিংবা মহামারী পরিস্থিতিতে ভবিষ্যতে কিভাবে আরো কার্যকর হওয়া যায়, এসব বিষয়ে গবেষকরা তাঁদের বিশ্লেষণ তুলে ধরেছেন। গবেষকরা একটি “প্রতি-ভঙ্গুর” (antifragile) শাসনব্যবস্থার ধারণার কথা বলেছেন। এটি হল এমন একটি ব্যবস্থা যা দুর্যোগ মোকাবিলা করতে করতে ক্রমশ আরো শক্তিশালী হয়ে উঠে। দুর্যোগ পরিস্থিতিতে সবধরণের সম্ভাব্য সমাধান বিবেচনায় এনে, এর সাথে সহযোগিতা, এবং উদ্ভাবনের সমন্বয় ঘটিয়ে, দুর্যোগ মুকাবিলার পথ বের করে, এবং এই অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগিয়ে শাসনব্যবস্থাকে আরও শক্তিশালী করে তোলা যায়, গবেষকরা বলছেন।

বন্যা এবং ঘূর্ণিঝড়ের মতো প্রাকৃতিক দূর্যোগ মোকাবেলায় বাংলাদেশের ক্ষমতা (resilience) আন্তর্জাতিক অঙ্গনে সুপরিচিত৷ তবে একবিংশ শতাব্দীতে বিশ্বায়ন এবং জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বাংলাদেশ ঘনঘন করোনার মত ভয়াবহ জাতীয় দুর্যোগে পড়তে পারে। তখন শুধু দুর্যোগ সামলানোর ক্ষমতাই যথেষ্ট হবে না। তাতে উন্নয়নের ধারা ব্যহত হবে। বাংলাদেশে উন্নয়নের ধারা বজায় রাখতে গেলে এমন একটি শাসনব্যবস্থা প্রয়োজন, যা দুঃসময়ের অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে আরও কার্যকর হয়ে উঠতে পারে, অন্যভাবে বলতে গেলে আমাদের একটি “প্রতি-ভঙ্গুর” (antifragile) শাসনব্যবস্থা প্রয়োজন।

বিআইজিডির প্রতিবেদনে মহামারীকালীন নীতিনির্ধারণ এবং এর প্রয়োগ, স্বাস্থ্য ও সাধারণ মানুষের রুটিরুজির ওপর এই নীতির প্রভাব নিয়ে আলোকপাত করা হয়েছে। একইসাথে সরকারের করোনা ব্যবস্থাপনা সম্পর্কে জনগণের অভিমতের ওপরের জাতীয় পর্যায়ে একটি জরিপ চালানো হয়েছে। সার্বিক ব্যবস্থাপনা নিয়ে সন্তুষ্টি থাকলেও সরকারের লকডাউন ব্যবস্থাপনা, করোনা পরীক্ষা, এবং ত্রাণ কার্যক্রমের কার্যকারিতা নিয়ে জনগণের অসন্তুষ্টি প্রকাশ পেয়েছে এই জরিপে।

ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগ এই মুহুর্তে তেমন বড় কোনো বিরোধিতা আশংকা করছেনা। ফলে দেশকে সবদিকে থেকে উন্নত করতে, বিশেষত অর্থনৈতিকভাবে এগিয়ে নিতে, এ সরকার বদ্ধপরিকর। লকডাউন অর্থনীতি ও মানুষের জীবনে কি ধরনের নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে, তা অনুধাবণ করেই ২০২০ সালে লকডাউন প্রয়োগে সরকারের দ্বিধাগ্রস্থ ছিল। ধারণার চেয়ে আক্রান্তের হার কম হওয়ায় গতবছর এই ঢিলেঢালা লকডাউনের কৌশল উৎরে গিয়েছিলো। কিন্তু তারপরও আর্থিকভাবে দুর্বল, স্বল্প-সঞ্চয়ী মানুষ, এবং অসময়ে সাহায্য করার মতো যাদের কেউ নেই, তাদের জীবন ও জীবিকা লকডাউন আর সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখতে গিয়ে হুমকির মুখে পড়েছে।

অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি নিশ্চিত করা সরকারের একটি সুস্পষ্ট ও দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়নকৌশল। এই প্রবৃদ্ধি সুরক্ষিত রাখার প্রচেষ্টা ঘোষিত প্রণোদনায় স্পষ্টভাবে ফুটে উঠেছে। বৃহৎ, মাঝারি এবং রপ্তানিমুখী শিল্পের জন্য জিডিপির তিন শতাংশ পর্যন্ত বরাদ্দ ছিলো। সেই তুলনায় আর্থিকভাবে দুর্বল জনগোষ্ঠী, তাঁদের খাদ্য ও কর্ম নিরাপত্তার জন্য বরাদ্দ ছিলো এক শতাংশেরো কম। তৈরি পোশাকশিল্পের মালিক ও তাদের সংগঠনগুলো তাদের প্রভাব খাটিয়ে প্রণোদনার মাধ্যমে নিজেদের ক্ষতি পুষিয়ে নিতে সরব ছিলো। অন্যদিকে তুলনামূলকভাবে দূর্বল শ্রমিক ইউনিয়ন, তৃণমূল জনগণ ও তাদের সংগঠনগুলো সেভাবে সরব হতে পারে নি। এই ব্যাপারটিও প্রণোদনা নীতি তৈরিতে ভূমিকা রেখেছে।

এর ফলে ত্রাণ বা সামাজিক সুরক্ষা সহায়তা প্রয়োজনের তুলনায় কম ছিলো। তার ওপরে প্রশাসনিক দুর্বলতা ও স্বচ্ছতা এবং জবাবদিহিতার অভাবে ত্রাণ কার্যক্রম ব্যহত হয়েছে। ত্রাণ যাদের সবচেয়ে প্রয়োজন ছিলো, তাদের কাছে তথ্য ঠিকমত পৌঁছেনি। জরিপে অংশগ্রহণকারী অধিকাংশই বিশ্বাস করেন যে ত্রাণ ব্যবস্থাপনায় কিছু না কিছু দুর্নীতি অবশ্যই হয়েছে। অর্থনৈতিকভাবে ক্ষতিগ্রস্থ মানুষ উপযুক্ত না পেয়ে বাধ্য হয়েছে সামাজিক দূরত্ব না মেনে কর্মক্ষেত্রে ফিরতে, যা তাদের সংক্রমণের ঝুঁকি আরও বাড়িয়েছে৷

এই পরিস্থিতিতে স্বাস্থব্যবস্থার দুর্বলতা হয়েছে মড়ার উপর খাড়ার ঘা। জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনা মহামারীকালীন বাস্তবতার সঙ্গে মানিয়ে নিতে মোটামুটি ব্যর্থ হয়েছে। মহামারীর দুইমাস পার হয়ে যাওয়ার পরও প্রতিটি উপজেলায় গড়ে মাত্র পাঁচটি করে অক্সিজেন সিলিন্ডার ছিলো। সাড়ে ষোলো কোটি মানুষের জন্য ভেন্টিলেটরের সংখ্যা ছিল মাত্র ২,২৬৭ টি। ব্যক্তিগত নিরাপত্তার উপকরণ (পিপিই) এবং অন্যান্য প্রয়োজনীয় উপরকণের সরবরাহ প্রয়োজনের তুলনায় ছিলো খুবই কম এবং এসব উপকরণ ক্রয়েও ছিল ঢিলেমি। করোনা মোকাবিলার কোনো নীতি, কৌশল, বা প্রাক-প্রস্তুতি বাংলাদেশের ছিল না। ২০১১ সালের পর থেকে “জাতীয় বায়ুবাহিত এবং ইনফ্লয়েঞ্জা মহামারী প্রস্তুতি ও সাড়াদান পরিকল্পনা” হালনাগাদ করা হয়নি। ২০২০ সালের মার্চ থেকে জুলাইয়ের মধ্যে আক্রান্তের হার যখন খুব বেশি ছিলো, সেসময়ে করোনা মোকাবেলার সর্বোচ্চ কমিটি মাত্র তিনবার সভা আয়োজন করেছে। করোনা মুকাবেলায় বাংলাদেশের স্বাস্থব্যবস্থার দুর্বলতা ফুটে উঠেছে আমাদের পরীক্ষাসংক্রান্ত উপাত্তে; এখানে করোনা পরীক্ষার হার দক্ষিণ এশিয়ার বেশিরভাগ দেশের চেয়ে অনেক কম।

চলমান ডেল্টা ভ্যারিয়েন্ট মোকাবেলায় বিগত বছরের অভিজ্ঞতা কতটা কাজে লেগেছে? আপাতদৃষ্টিতে কিছুটা অভিজ্ঞতা কাজে লেগেছে বলে মনে হচ্ছে। যেমন, লকডাউন কঠোরভাবে পালিত হয়েছে এবং এই সংক্রান্ত নির্দেশনা এবার আগের চেয়ে স্পষ্ট। স্বাস্থ্যখাতেও সমন্বয় আগের চেয়ে বেড়েছে। যেমন, প্রস্তুতির অংশ হিসেবে স্বাস্থ্যসেবা মহাপরিচালকের কার্যালয়ের সাথে সমন্বিতভাবে সরকারি হাসপাতালগুলো এখন কাজ করছে।

তবে আর কতদিন এমন কঠোর লকডাউন বহাল থাকবে কিংবা কত দ্রুত স্বাভাবিক অবস্থায় ফেরত যাওয়া যাবে তা স্বাস্থ্যসেবা এবং সামাজিক সুরক্ষা – এই দুইটি খাতের উপর নির্ভর করবে। সরকারের উচিৎ দ্রুত স্বাস্থ্য খাতে বিনিয়োগ বাড়ানো এবং এখাতে ব্যবস্থাপনার উন্নয়ন করা। একইসাথে জিডিপি প্রবৃদ্ধির পরিবর্তে জনসুরক্ষা কেন্দ্রিক অর্থনৈতিক নীতিমালা তৈরি করতে হবে।

এজন্য সরকারের উচিৎ আমাদের শক্তিশালী দিকগুলোকে কাজে লাগানো। বাংলাদেশের সামাজিক সুরক্ষা খাত গত এক দশকে ব্যপক বিস্তার লাভ করেছে। একে আরো শক্তিশালী করে তোলা দরকার, যাতে এধরণের বিপর্যয়ে জনসুরক্ষা নিশ্চিত করা যায়। এই খাতে স্বচ্ছতা এবং জবাবদিহিতা বাড়াতে প্রয়োজন নিরপেক্ষ ও স্বাধীন প্রর্যবেক্ষণের ব্যবস্থা করা, নীতিনির্ধারণে এসব পর্যবেক্ষণে প্রতিফলন নিশ্চিত করা, এবং জনগণের দাবী ও অভিযোগ জানা ও সেগুলো মেটানোর কার্যকর ব্যবস্থা করা। এদেশে রাষ্ট্র ও সামাজিক প্রতিষ্ঠানগুলোর (যেমন এনজিও) মধ্যে সফল অংশীদারীত্বের প্রচুর উদাহরণ আছে। এধরণের অংশিদারিত্বগুলোকে ভালোভাবে কাজে লাগাতে হবে। এর জন্য প্রয়োজন সামাজিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে কাজ করার সুযোগ, স্বাধীনতা, এবং মুক্তচিন্তার যায়গা নিশ্চিত করা। উদাহরনস্বরুপ বলা যায়, লকডাউন কার্যকর করতে প্রয়োজন জনসাধারণের পূর্ণ সহযোগিতা এবং আস্থা। এক্ষেত্রে জনসাধারণের মধ্যে লকডাউন এবং সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখার ব্যাপারে সচেতনতা বৃদ্ধি করতে সামাজিক এবং যুব সংগঠনসমূহ, বেসরকারি প্রতিষ্ঠান ইত্যাদি সাহায্য করতে পারে।

“প্রতি-ভঙ্গুর” (antifragile) প্রতিষ্ঠান গড়ার লক্ষ্যে সরকারের উচিৎ একবিংশ শতাব্দীর রাষ্ট্র পরিচালনা-নীতি অনুশীলন করা, যার মূলনীতি হল উন্মুক্ত ও অন্তর্ভুক্তিমূলক শাসনব্যবস্থা। নীতিনির্ধারণ, পর্যবেক্ষণ এবং মতামত প্রদানে নাগরিকদের সক্রিয় অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে সরকারের কার্যকরী পদক্ষেপ নেয়া উচিত। বিশেষজ্ঞ ও জনগণের সমালোচনা যে কার্যকর জনমুখী শাসনব্যবস্থার জন্য কতটা গুরুত্বপূর্ণ, সেটা সরকারের অনুধাবণ করা উচিত।

আমাদের পরীক্ষিত দুর্যোগ মোকাবেলা কৌশলগুলোকে আরও শক্তিশালী ও বিস্তৃত করা প্রয়োজন, যেন আমরা বন্যা, ঝড় ছাড়াও যেকোনো অনাকাঙ্ক্ষিত সমস্যাকেও মোকাবেলা করতে পারি। দুর্যোগ মোকাবেলার কোন কৌশলগুলো সফল হয়েছে, কেন ও কিভাবে সফল হলো, সেগুলো নিয়ে ভাবা, ও এই জ্ঞানকে আগামীতে সমস্যা সমাধানে কাজলে লাগালে দুর্যোগ মোকাবিলার দক্ষতা বাড়বে।

পরিশেষে, স্থানীয় সরকার, সংগঠন এবং মন্ত্রণালয়সমূহকে শক্তিশালী হতে হবে। স্থানীয় প্রয়োজন এবং অবস্থার ভিত্তিতে নিজেদের স্বাধীনভাবে পরিচালনার সক্ষমতা থাকতে হবে এসব প্রতিষ্ঠানের। সকল ক্ষেত্রে এক নীতি- এমন মনোভাব থেকে সরকারকে সরে আসতে হবে। সক্ষম প্রশাসন এবং বিকেন্দ্রীভূত কর্তৃপক্ষ স্থানীয় প্রয়োজন মেটাতে বেশি কার্যকর হতে পারে। করোনার মত বিপর্যয় মোকাবিলায় প্রয়োজন শক্তিশালী জনপ্রশাসন, দায়িত্বশীল ও বিচক্ষণ রাজনীতিবিদ, মতামত গ্রহণের একটি কার্যকর প্রক্রিয়া, অভিজ্ঞতা থেকে শেখা ও সেই জ্ঞানকে সত্যিকারে কাজে লাগানোর ক্ষমতা।



সাতদিনের সেরা