kalerkantho

সোমবার । ১৮ শ্রাবণ ১৪২৮। ২ আগস্ট ২০২১। ২২ জিলহজ ১৪৪২

বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের ওপর করারোপ: বর্তমান বাস্তবতা শীর্ষক ওয়েবিনার অনুষ্ঠিত

অনলাইন ডেস্ক   

৩০ জুন, ২০২১ ১৭:০৩ | পড়া যাবে ৭ মিনিটে



বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের ওপর করারোপ: বর্তমান বাস্তবতা শীর্ষক ওয়েবিনার অনুষ্ঠিত

সম্প্রতি প্রাইভেট ইউনিভার্সিটি পাবলিক রিলেশন্স অফিসার’স অ্যাসোসিয়েশন্সের (পুপরোয়া) উদ্যোগে 'বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে করারোপ: বর্তমান বাস্তবতা’ শীর্ষক অনলাইন আলোচনা অনুষ্ঠিত হয়েছে। অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়  সমিতির সভাপতি ও ফারইস্ট ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি বোর্ড অব ট্রাস্টিজের চেয়ারম্যান শেখ কবির হোসেন। 

ওয়েবিনারে সম্মানিত অতিথি ছিলেন ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি অব বিজনেস এগ্রিকালচার এন্ড টেকনোলজির (আইইউবিএটি) উপাচার্য অধ্যাপক ড. আবদুর রব, ইউনাইটেড ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির (ইউআইইউ) উপাচার্য অধ্যাপক ড. চৌধুরী মোফিজুর রহমান, সাউথইস্ট ইউনিভার্সিটির উপাচার্য অধ্যাপক ড. এএফএম মফিজুল ইসলাম এবং কানাডিয়ান ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশ এর সিনিয়র উপদেষ্টা ও  ইউল্যাবের  সাবেক উপাচার্য অধ্যাপক ড.এইচ এম জহিরুল হক। 

এর আগে অনুষ্ঠানের শুরুতে স্বাগত বক্তব্য রাখেন, পুপরোয়ার  সিনিয়র সহ-সভাপতি মুহাম্মদ ইমতিয়াজ। সংগঠনের উপদেষ্টা হিসেবে বক্তব্য রাখেন, ড. এ কে এম শামসুল আরেফিন, পরিচালক, জনসংযোগ ও তথ্য অধিকার বিভাগ, বাংলাদেশ বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরী কমিশন।

অনুষ্ঠান সঞ্চালনায় দায়িত্বে ছিলেন, আবু সাদাত, সাধারণ সম্পাদক, পুপরোয়া। অনুষ্ঠানের সভাপতিত্ব করেন, মনিরুল ইসলাম রিন্টু, সভাপতি, পুপরোয়া। অনুষ্ঠানে আরো যুক্ত ছিলেন বাংলাদেশ বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় সমিতির পরিচালক (জনসংযোগ) ও পুপরোয়ার উপদেষ্টা বেলাল আহমেদসহ বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের পুপরোয়া’র সদস্যগণ। 

অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি শেখ কবির বলেন, ২০২১-২২ র্অথবছররে প্রস্তাবতি বাজটের বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের উদ্ভূত আয়ের ওপর ১৫ শতাংশ হারে আয়কর আরোপের প্রস্তাব করা হয়েছে। যা দেশের উচ্চশিক্ষা প্রসারের অন্যতম অংশীদার ‘বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়’এর সাথে সংশ্লিষ্ট সকল মহল এবং শিক্ষার্থী, অভিভাবকদের মধ্যে ব্যাপক উদ্বেগ-উৎকণ্ঠার সৃষ্টি করেছে। বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় আইন ২০১০ অনুযায়ী ট্রাস্ট্রের অধীনে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়সমূহ অলাভজনক প্রতিষ্ঠান হিসেবে পরিচালিত।  ট্রাস্ট আইন ১৮৮২ অনুযায়ী ট্রাস্ট্রের অধীনে পরিচালিত হওয়ার অলাভজনক প্রতিষ্ঠান করযোগ্য নয়। প্রসঙ্গত, কম্পানি আইন ১৯৯৪ এর আওতায় লাভজনক প্রতিষ্ঠান হিসেবে পরিচালিত মেডিক্যাল কলেজ ও ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজের সাথে ট্রাস্ট আইনে অলাভজনক হিসেবে পরিচালিত বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের উপর একই আওতায় সমভাবে আয়কর আরোপের প্রস্তাবনা আইনের পরিপন্থী এবং কোনভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।

প্রাইভেট ইউনিভার্সিটির ওপর ট্যাক্স বসানো ট্রাস্ট আইনের সাথে কতটুকু সংগতিপূর্ণ?

ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি অব বিজনেস এগ্রিকালচার এন্ড টেকনোলজির (আইইউবিএটি) উপাচার্য অধ্যাপক ড. আবদুর রব:
বিষয়টি ৯ বা ১৫ শতাংশের নয়। বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় নন প্রফিট সংস্থা। যেখানে প্রফিট নেই, সেখানে কেন ট্যাক্স থাকবে? এই বিষয় নিষ্পত্তির জন্য আদালতে মামলা চলছে। মনে রাখতে হবে শিক্ষার্থীদের টাকায় চলে প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়। শিক্ষক-কর্মকর্তা কর্মচারীদের বেতন ভাতা ছাড়াও ক্যাম্পাস উন্নয়ন ও ল্যাব সুবিধা নিশ্চিত করতে হয়। বর্তমানে অনেক বিশ্ববিদ্যালয়ই নিয়মিত ব্যয় মেটাতে হিমশিম খাচ্ছে। উচ্চশিক্ষার মান ঠিক রাখতে হলে শিক্ষকদের ঠিকমত বেতন ভাতা দেওয়া প্রয়োজন। আউটকাম বেজড শিক্ষার জন্য শিক্ষকদের ওপর ক্লাস লোড কমাতে হয়। ল্যাব যন্ত্রপাতি কেনার ক্ষেত্রে ভ্যাট ও ট্যাক্স মওকুফ করা দরকার। প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ে মধ্যবিত্ত ও দরিদ্র পরিবার থেকে আসা শিক্ষার্থীর সংখ্যা কত তা জানতে সরকারের জরিপ করা প্রয়োজন।

বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে করারোপ কতটা যুক্তিসংগত?

ইউনাইটেড ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির (ইউআইইউ) উপাচার্য অধ্যাপক ড. চৌধুরী মোফিজুর রহমান:
উচ্চশিক্ষা নাগরিকদের মৌলিক অধিকার। সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর অধিক শিক্ষার্থীকে উচ্চশিক্ষা প্রদানের সক্ষমতা নেই বলেই প্রাইভেট ইউনিভার্সিটিগুলো করা হয়েছে। এর আগে বিদেশে পড়তে গেছে শিক্ষার্থীরা যে জন্য দেশের অনেক বৈদেশিক মুদ্রা খরচ হয়েছে। সরকারের দৃষ্টিভঙ্গি এমন হওয়া উচিত যে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের বিকল্প প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়। তাই এখানে সরকারের প্রণোদনা দেওয়া উচিত। আমার মত হচ্ছে, এই শিক্ষার্থীদের সুদবিহীন লোনের সুবিধা দেওয়া উচিত যাতে গরীব ঘরের ছেলেরা বিশ্ববিদ্যালয়ে নিশ্চিন্তে পড়তে পারে। প্রাইভেটে বেশি টিউশন ফি নেওয়া হয় এমন ধারণা ঠিক নয়। পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় বরং জনগণের অর্থ বেশি খরচ করে থাকে। কোভিড-১৯ মহামারীর এই কঠিন সময়ে শিক্ষক-কর্মকর্তাদের ঠিকমত বেতন-ভাতা দিতে পারছি না আমরা। এই সময়ে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে করারোপ ঠিক নয়। ভার্সিটিগুলো দৈনন্দিন ব্যবহার্য জিনিসপত্র ও যন্ত্রপাতি ক্রয় করে থাকে এসব ক্রয়ের ওপর ভ্যাট ও প্রত্যক্ষ ট্যাক্স দিয়ে থাকে। এখন নতুন কর মড়ার ওপর খাড়ার ঘা। বর্তমানে শিক্ষার মান ও র‍্যানকিনের দিক থেকে অনেক পাবললিক বিশ্ববিদ্যালয়কে ছাড়িয়ে গেছে প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়। মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর নিকট বিনীত অনুরোধ তিনি যেন এটি পুনর্বিবেচনা করেন। 

করোনা ক্রান্তিকালে বিশ্ববিদ্যালয়ের আয়ের ওপর করারোপ সংকট ঘনীভূত করতে কোন প্রভাব ফেলবে কিনা?

সাউথইস্ট ইউনিভার্সিটির উপাচার্য অধ্যাপক ড. এএফএম মফিজুল ইসলাম :
আমি বিষয়টিকে একটু ভিন্ন আঙ্গিকে বিশ্লেষণ করতে চাচ্ছি। বঙ্গবন্ধু ও তার কন্যা শেখ হাসিনার শিক্ষাদর্শন অনুসারে ১৫% করারোপ বাস্তবসম্মত নয় এবং উচ্চিশিক্ষার সম্প্রসারণের ধারণার সাথে সাংঘর্ষিক। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ১৯৭২ সালে শাসনভার গ্রহণ করে মাত্র ১ বছরের মাথায় একটি আধুনিক শাসনতন্ত্র দিয়েছিলেন। যেখানে শিক্ষাকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছিল। শিক্ষাখাতে ১ম বাজেটে তিনি ২২ শতাংশ বরাদ্দ দেন। তিনি মনে করেছিলেন জাতি শিক্ষিত না হলে উন্নতি ও প্রগতির লক্ষ্য অর্জিত হবে না।  তাঁর কণ্য শেখ হাসিনা সার্বজনীন অবৈতনিক প্রাথমিক শিক্ষা চালু করেন। মাদ্রাসা শিক্ষা ও কারিগরি শিক্ষার উন্নয়ন করেন। পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়কে আধুনিকায়ন করেন ও প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয় সম্প্রসারণে মাধ্যমে উচ্চশিক্ষাকে এগিয়ে নিয়ে গেছেন। বর্তমানে দেশে ৫৬টি পাবলিক ও ১০৮টি প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয় রয়েছে। এগুলোর অনুমোদন তিনি দিয়েছেন। তিনি ঘোষণা দিয়েছেন প্রতি জেলায় অন্তত ১টি করে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপন করবেন। এমন উদাহরণ পৃথিবীতে বিরল। কিন্তু এবার আমরা কি দেখলাম, এই উন্নত দর্শনের সাথে সাংঘর্ষিক হলো বাজেট। ১৫% কর আরোপ করে দেওয়া হয়েছে। মনে করা হয় প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ে ধনীর দুলালরাই অধ্যয়ন করে। আসলে ধনীর ছেলেমেয়েরা বিদেশে পড়তে যায়, দেশে নয়। দেশের সাধারণ ছাত্রছাত্রীরা পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে ভর্তির সুযোগ না পেলে প্রাইভেটে আসে। তারা বেশি ফি দিতে পারে না। দুঃখজনক হেলেও সত্য, অনেকে টাকার অভাবে ঝরেও পড়ে। আমরা বিপুল পরিমাণ কর (পরোক্ষ) দেই কর্মচারী-কর্মকর্তাদের বেতন-ভাতা থেকে। যা উৎস থেকে কর্তন করা হয়। ল্যাব যন্ত্রপাতি ও শিক্ষা উপকরণ ক্রয় থেকেও সরকার কর নেয়। প্রায় ৫ লাখ শিক্ষার্থী রয়েছে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে। বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে সরকারি বরাদ্দ নেই তাই ব্যয় মেটাতে টিউশন ফির ওপর নির্ভর করতে হয়। চাপটা দিনশেষে শিক্ষার্থীদের ও তাদের অভিভাবকদের ওপর পড়ে। নতুন কর তাদেরকেই বিপদে ফেলবে। বিপর্যয় সৃষ্টি করবে উচ্চশিক্ষায়। উচ্চশিক্ষা সংকুচিত হবে। 

ইতোমধ্যে অনেক বিশ্ববিদ্যালয় চরম সংকটে পড়েছে। কোনটি কর্মকর্তা-কর্মচারী ও শিক্ষকদের বেতন অর্ধেক করেছে, অনেকের চাকুরি গেছে, অনেক ট্রাস্ট বিশ্ববিদ্যালয় বিক্রি করে দিতে চাচ্ছে। করোনায় বিশ্ববিদ্যালয় পুরোপুরি খোলার ইঙ্গিত নেই। এই অবস্থায় কবাড়তি কর আরোপের সিদ্ধান্ত সময়োপযোগী নয়, এটি যৌক্তিক হয় নি এবং বাস্তব সম্মত নয়। যদি বাজেট দ্রুত সংশোধন করা নাও যায়, একটি সম্পূরক বাজেটের মাধ্যমে বেসরকারী বিশ্ববিদ্যালয়ে আরোপিত আয়কর বাতিল ও সংশোধন করা হোক।

২০২১-২০২২ অর্থবছরে প্রস্তাবিত বাজেটে করারোপ শিক্ষার্থীদের ওপর কতটুকু প্রভাব পড়বে বলে মনে করেন?

কানাডিয়ান ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশ এর সিনিয়র উপদেষ্টা ও  ইউল্যাবের  সাবেক উপাচার্য অধ্যাপক ড. এইচ এম জহিরুল হক:
আমরা তো আয় করি না। বিশ্ববিদ্যালয় জ্ঞান চর্চার জায়গা। এমন সময়ে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে ১৫ শতাংশ বর্ধিত করারোপ শিক্ষায় দারুন প্রভাব পড়বে। করোনার জন্য আমরা কঠিন সময়ের মধ্য দিয়ে যাচ্ছি। ট্রাস্টগুলো নিজেদের অর্জিত টাকা দিয়ে শিক্ষকদের বেতন বোনাস দিচ্ছে। শিক্ষা উপকরণ কিনতেও ব্যয় হচ্ছে। শিক্ষার্থীদের দেওয়া সামান্য টাকায় বিশ্ববিদ্যালয় চলে না । ১৫% করের টাকা শিক্ষার্থীদের থেকে নিতে হলে শিক্ষার্থীদের ওপর বাড়তি চাপ পড়বে। তারা তো বিদ্যমান অংকের ফিসই ঠিকমত দিতে পারে না। সেজন্য আমরা করোনাকালে অর্ধেক ফিস নিচ্ছি হচ্ছে। কিন্তু আমাদের খরচ কমে নি। নিয়োগ, গবেষণা কিছুই বন্ধ নেই। এই সংকটকালে করারোপের ফলে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার মান ঠিক থাকবে না। দেশের মেধাবীরা শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা বিদেশে চলে যাবেন। আমরা মনে করি সরকারের উন্নয়নের জন্য অবশ্যই কর সংগ্রহ করা প্রয়োজন। কিন্তু করের উৎস যেন শিক্ষার্থীরা না হয়। নতুন কর আরোপ নয় বরং সরকারের সহযোগিতা চাই আমরা। 



সাতদিনের সেরা