kalerkantho

মঙ্গলবার । ১২ মাঘ ১৪২৭। ২৬ জানুয়ারি ২০২১। ১২ জমাদিউস সানি ১৪৪২

পর্যটন শিক্ষার প্রয়োজনীয়তা, প্রসার এবং প্রভাব

মো. ইউসুফ হোসেন খান   

২২ নভেম্বর, ২০২০ ২০:৫১ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



পর্যটন শিক্ষার প্রয়োজনীয়তা, প্রসার এবং প্রভাব

পর্যটন হচ্ছে এটি এমন একটি শিল্প যা মানুষের ভ্রমণের সুযোগকে কাজে লাগিয়ে বিভিন্ন ধরনের ব্যবসায়িক দ্বার উন্মোচন করে চলছে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে দেশি এবং আন্তর্জাতিক অঙ্গনে। হোটেল এবং রেস্তোরাঁ ব্যবসা থেকে শুরু করে ট্র্যাভেল সংস্থাসহ আরও অনেক কিছুই এখন এই শিল্পের সাথে জড়িত। পর্যটনকে বলা হয় একটি বিস্তীর্ণ, প্রাণবন্ত, গতিশীল এবং বৃদ্ধি ভিত্তিক শিল্প। একবিংশ শতাব্দীতে, বহু-মাত্রিক কারণগুলি থেকে পর্যটনের ওপর জোর দেওয়া হয়েছে। এটি সরকারি এবং বেসরকারিভাবে বিনিয়োগের মাধ্যমে পর্যটন উন্নত এবং উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য বিশেষ সুফল বয়ে নিয়ে আসছে যার মাধ্যমে একটি দেশ খুব ভালোভাবেই অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি অর্জন করছে।

২০১৯ সালের প্রকাশিত ওয়ার্ল্ড ট্র্যাভেল অ্যান্ড ট্যুরিজম কাউন্সিলের প্রতিবেদন অনুসারে, বৈশ্বিক জিডিপিতে ভ্রমণ ও পর্যটনের প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ অবদান ছিল ৮.৯ ট্রিলিয়ন মার্কিন ডলার (যা ছিলো গ্লোবাল জিডিপির ১০.৩%)। পাশাপাশি, কর্মসংস্থান সৃষ্টি করেছিল ৩৩০ মিলিয়ন, যা কিনা ছিলো প্রত্যেক ১০টি নতুন কর্মসংস্থানের মধ্যে একটি।

গবেষণায় উঠে এসেছে ২০২৯ সালের মধ্যে নতুন করে ২.১% হারে ১৫,৪০,৬০,০০০ নতুন কাজের সৃষ্টি করবে পর্যটন। প্রতিবেদনটিতে বাংলাদেশ সম্পর্কে বলা হয়েছে, দেশে এ মুহূর্তে ১১ লাখ ৩৮ হাজার ৫০০ মানুষ প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে পর্যটন খাতের সঙ্গে সম্পৃক্ত। ২০২৬ সালে বাংলাদেশে শুধু এ খাতে প্রত্যক্ষভাবেই ১২ লাখ ৫৭ হাজার লোক কাজ করবে। এ লক্ষ্যে পর্যটনশিল্পের অপার সম্ভাবনাকে কাজে লাগাতে নানামুখী উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। ২০২০-২১ অর্থবছরের বাজেটে বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ের জন্য বরাদ্দ রাখা হয়েছে ৩ হাজার ৬৩৪ কোটি টাকা। ২০২৫ সালের মধ্যে পর্যটনশিল্পের সর্বোচ্চ বিকাশে স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা নিয়েছে সরকার। যার অংশ হিসেবে পুরো দেশকে আটটি পর্যটন জোনে ভাগ করে প্রতিটি স্তরে এ পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা হবে।

এখানে এগুলো উল্লেখ করার একটিই কারণ আর তা হলো এইসকল প্রকল্পে কাজ করার জন্য কত নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি হচ্ছে পর্যটন নিয়ে পড়াশুনা করা শিক্ষার্থীদের জন্য। অতএব, পর্যটন নিয়ে পড়াশুনা হতে পারে শিক্ষার্থীদের জন্য একটি আশীর্বাদ। দেখুন আমি যখন ২০০৬ সালে প্রথম দেশের বাহিরে যাই পর্যটন নিয়ে পড়াশুনা করার জন্য তখন আমাদের দেশে হাতে গোনা চার থেকে পাঁচটি ভালো মানের হোটেল ছিলো। কিন্তু মাত্র ১৫ বছরেই দেশে এখন অভূতপূর্বভাবে উন্নয়নের সাথে সাথে বেশিরভাগ আন্তর্জাতিক চেইন হোটেল গ্রুপ এখন বাংলাদেশে। এখন দেশে রয়েছে ম্যারিয়ট, আইএইচজি, প্যান প্যাসিফিক, কার্লসন, অনিক্স, বেস্ট ওয়েস্টার্ন, লুভর এর মত আন্তর্জাতিক হোটেল গ্রুপের পাশাপাশি দেশীয় ইউনিক, শেলটেক এর মতো গ্রুপের অগণিত ৪/৫ তারকা মানের হোটেল। যেগুলোর সংখ্যা কম করে হলেও ৫০ এর মত হবে। এখানে ২/৩ তারকা হোটেলের সংখ্যা উল্লেখ নাইবা করা হলো। এগুলোর পাশাপাশি পর্যটন নিয়ে পড়াশুনায় আগ্রহীদের জন্য আরেকটি ভালো খবর হলো, বাংলাদেশে এখন ম্যারিয়ট গ্রুপের একটি ৭ তারকা হোটেল, বিশ্বখ্যাত হায়াত গ্রুপ, হিলটন এবং নভোটেল তাদের হোটেল ওপেনিংয়ের কাজ করে যাচ্ছে। এখন প্রশ্নটি হচ্ছে এই যে হাজার হাজার কর্মসংস্থান সৃষ্টি হচ্ছে এই পর্যটনকে ঘিরে, এগুলো করার জন্য আমাদের দক্ষ জনবল আজও আছে কিনা? আমি সন্দীহান যে, সারা দেশে এখন পর্যন্ত সব বিশ্ববিদ্যালয় মিলিয়ে যারা কিনা পর্যটনে স্নাতক ডিগ্রি প্রদান করে সেগুলো থেকে আজ পর্যন্ত ২-৩ হাজার পর্যটনে স্নাতক সম্পূর্ণ করে বের হয়েছেন কিনা!

ব্যাপারটা দুঃখজনক হলেও অনেকাংশে সত্যি। আমাদের দেশের জনগোষ্টির বিশাল একটি অংশ এখনো ট্যুরিজম এবং হসপিটালিটি ম্যানেজমেন্টে শিক্ষাগ্রহণের ভবিষ্যৎ মনে করে থাকেন রেস্তোরাঁয় খাবার পরিবেশনকারী কিংবা ছোটো খাটো কিছু একটা। আমি বলবো এটা এই ইন্ডাস্ট্রি এবং পর্যটন নিয়ে আমাদের ভালো জানার অজ্ঞতা। আমি উল্লেখ করতে পারি, ট্যুরিজম এবং হসপিটালিটি ম্যানেজমেন্ট পড়াশুনার এমন একটি ক্ষেত্র যা কিনা বহুমাত্রিক কাজের জন্য দক্ষ জনবল তৈরি করে। শিক্ষা, হোটেল, মোটেল, রিসোর্ট, রেস্তোঁরা, ট্যুর এজেন্সি, প্রমোদতরী, বিমান ব্যবস্থাপনা, ক্যাসিনো, ইভেন্ট ম্যানেজমেন্ট, ক্যাটারিং, ক্লাব পরিচালনা, ব্যাংকিং ও বীমা, হাসপাতাল সহ বিভিন্ন দিকে এই বিষয়ে স্নাতক অর্জনকারীদের জন্য কাজ করার দরজা উন্মুক্ত থাকে। এই বিষয়ে স্নাতক অর্জনকারীরা  শিক্ষক, হোটেল ম্যানেজার, ক্যাটারিং ম্যানেজার, শেফ, কনফারেন্স সেন্টার ম্যানেজার, ইভেন্ট ম্যানেজার, ফাস্ট ফুড রেস্তোঁরা ম্যানেজার, পাবলিক হাউজ ম্যানেজার, রেস্তোঁরা পরিচালক, এয়ার কেবিন ক্রু, গ্রাহক সেবা ব্যবস্থাপক, মানবসম্পদ কর্মকর্তা, বিপণন নির্বাহী , ট্যুর ম্যানেজার, ট্যুরিজম অফিসার এবং আরও অনেক ভূমিকায় সহজেই অগ্রাধিকার ভিত্তিতে কাজ পেতে পারে। ট্যুরিজম এবং হসপিটালিটি ম্যানেজমেন্টে শিক্ষাগ্রহণের ব্যাপারটি বেছে নেওয়ার আরেকটি ভালো কারণ হতে পারে, এই বিষয়ের স্নাতকদের জন্য একটি সহজ উন্মুক্ত বিশ্ব অপেক্ষা করে। এটি শিক্ষার্থীদের যে কোনও স্তরে ব্যতিক্রমী অভিজ্ঞতা তৈরি করতে এবং ব্যবসা পরিচালনার দক্ষতার সাথে দেশে এবং বিদেশে যে কোনও জায়গায় তাদের আগ্রহগুলি অনুসরণ করার সুযোগ দেয়।

এখন আসি পর্যটনে স্নাতকে পড়াশোনা নিয়ে। বর্তমানে বাংলাদেশেই হাতেগোনা কিছু সরকারি এবং বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় পর্যটনে স্নাতক ডিগ্রী কার্যক্রম পরিচালনা করে যাচ্ছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের পাশাপাশি বেসরকারিভাবে কিছু বিশ্ববিদ্যালয় ছাড়াও রয়েছে ঢাকার উত্তরায় অবস্থিত ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি অব বিজনেস এগ্রিকালচার অ্যান্ড টেকনোলজি (আইইউবিএটি)। আইইউবিএটি হচ্ছে বাংলাদেশে প্রথম বিশ্ববিদ্যালয় যারা কিনা পর্যটনে স্নাতক ডিগ্রি প্রদান করা সবার আগে শুরু করেছিল ২০০১ সালে। আইইউবিএটির প্রতিষ্ঠাতা এবং প্রথম উপাচার্য মরহুম প্রফেসর ডক্টর এম আলীমুল্লাহ মিয়ান ছিলেন একজন বুদ্ধিদীপ্ত, বিচক্ষণ শিক্ষাবিদ- যার চিন্তাভাবনা ছিল ভবিষ্যৎকেন্দ্রীক।

লেখক- সহকারী অধ্যাপক, ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি অব বিজনেস এগ্রিকালচার অ্যান্ড টেকনোলজি (আইইউবিএটি)

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা