kalerkantho

সোমবার । ১০ কার্তিক ১৪২৭। ২৬ অক্টোবর ২০২০। ৮ রবিউল আউয়াল ১৪৪২

বাংলাদেশে ক্লাউড সেবা : সম্ভাবনা ও চ্যালেঞ্জ

এস এম নাজমুল হাসান   

৪ সেপ্টেম্বর, ২০২০ ২০:৩৫ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



বাংলাদেশে ক্লাউড সেবা : সম্ভাবনা ও চ্যালেঞ্জ

ক্লাউড কম্পিউটিং আগামী এক দশকে তথ্যপ্রযুক্তিখাতে অভূতপূর্ব পরিবর্তন নিয়ে আসবে। বর্তমানে কম্পিউটারের মাধ্যমে যে কাজগুলো করা হচ্ছে তার সবই স্বল্প খরচে ক্লাউড কম্পিউটিংয়ের মাধ্যমে সম্পন্ন করা যাবে। ফলে ক্লাউড কম্পিউটিং প্রতিষ্ঠানের পরিচালন দক্ষতা বৃদ্ধি, গ্রাহক এবং ভোক্তা পর্যায়ের সেবার মানোন্নয়নসহ অর্থনীতির বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।

ক্লাউড মূলত চার ধরনের। পাবলিক, প্রাইভেট, কমিউনিটি এবং হাইব্রিড ক্লাউড। প্রাইভেট ও কমিউনিটি ক্লাউডের কার্যক্রম একটি প্রতিষ্ঠান বা নির্দিস্ট কিছু সমমনা প্রতিষ্ঠানের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে। আমাদের আজকের আলোচনা তাই পাবলিক এবং হাইব্রিড ক্লাউডের দিকেই আলোকপাত করবে। পাবলিক ক্লাউড সবার জন্য উন্মুক্ত। প্রতিষ্ঠান কিংবা ব্যক্তিগত প্রয়োজনে যে কেউ পাবলিক ক্লাউড সেবা ব্যবহার করতে পারে। এক্ষেত্রে, ক্লাউড রিসোর্স থার্ড পার্টি ক্লাউড সেবাদাতার অধীনে থাকবে। হাইব্রিড ক্লাউডে, নাম থেকেই প্রতিয়মান– পাবলিক এবং প্রাইভেট দুটোরই সন্নিবেশন থাকে। সেক্ষেত্রে, সেবা ও অন্যান্য অবকাঠামো সুবিধা প্রাইভেট নেটওয়ার্কে রক্ষণাবেক্ষণ করা হয় এবং এই প্রাইভেট ক্লাউডের হার্ডওয়্যার ও সফটওয়্যার শুধু ওই প্রতিষ্ঠানই ব্যবহার করে।

হাইব্রিড ক্লাউড ব্যবহারকারী প্রতিষ্ঠান বা সংস্থা তাদের প্রয়োজন অনুযায়ী পাবলিক ক্লাউড রিসোর্স কাস্টোমাইজ করে নিতে পারে। এখানে, বলে রাখা ভালো, অনেকে হয়তো “মাল্টি ক্লাউড” কেও এই চারের সাথে তুলে আনতে চাইবেন, কিন্তু – সেটাকে আমরা হাইব্রিড ক্লাউডেরই একটা সাব-সেট ভাবতে পারি। পাঠক, আপনিও ভেবে দেখুন।

প্রযুক্তিখাতের বিদ্যমান চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় ক্লাউড কম্পিউটিং উদ্ভাবনী সমাধান দিতে পারে। ইন্টারনেট অব থিংস (আইওটি), এ-আই,ডিপ লার্নিং ও কগনিটিভ কম্পিউটিংয়ের জন্য ব্যাপক প্রাযুক্তিক অবকাঠামো দরকার। ক্লাউড কম্পিউটিংয়ের মাধ্যমে ‘অন-ডিমান্ড’ সেবা প্রদানের বিষয়টি একটি যুগান্তকারী সম্ভাবনা। ক্লাউড কম্পিউটিং আইওটি, এ-আই প্রযুক্তির জন্য ভিত্তিস্বরূপ এবং এর মাধ্যমে প্রযুক্তি অবকাঠামোতে সৃজনশীল সমাধান পাওয়া যাবে।

বাংলাদেশে ক্লাউড প্রযুক্তি ব্যবহারের ক্ষেত্রে সম্ভাবনা অপরিসীম। বিশেষ করে, বাংলাদেশের তরুণ উদ্যোক্তাদের জন্য ব্যবসা পরিচালনার জন্য এটি কার্যকরী এক প্রযুক্তি। প্রযুক্তিনির্ভর কিছু করতে গেলে নানারকম হার্ডওয়্যার ডিভাইস কিনতে হয়। ভৌত অবকাঠামো, বিদ্যুৎ বিল, রক্ষণাবেক্ষণে খরচ, সফটওয়্যার, এন্টিভাইরাস সহ প্রভৃতি বিষয়ে অনেক রকম চিন্তাভাবনা করতে হয়।  কিন্তু তথ্যপ্রযুক্তির উৎকর্ষতার কারণেই কিছু দিন পরে এসব  ডিভাইস অবসোলিট বা সেকেলে হয়ে যায়। প্রতিযোগিতামূলক বাজারে টিকে থাকতে এবং নতুন সেবার চমক নিয়ে আসতে অনেক ক্ষেত্রেই আবার ডিভাইস আপগ্রেড করতে হয়। ক্লাউড সেবা এ প্রক্রিয়াকে অনেক সহজ করে দেবে। ফলে, ব্যক্তিগত কিংবা স্বল্প পুঁজির স্টার্টআপ অথবা  দেশজুড়ে থাকা ছোট-বড় সব প্রতিষ্ঠানের জন্যই ক্লাউড হবে অত্যন্ত সহায়ক। স্বাস্থ্যখাত, শিক্ষাখাত, ই-কমার্স সেবা, ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলোর পরিচালন ব্যবস্থা (ইআরপি, সিআরএম, প্রভৃতি) ক্লাউড প্রযুক্তি ব্যবহারের মাধ্যমে নিজেদের পরবর্তী স্তরে নিয়ে যেতে পারে।

এক্ষেত্রে, টোটাল কস্ট অব ওনারশিপ (টিসিও) অনেকাংশে কমে আসবে, বাড়বে সময়ের সাথে নিজেদের ব্যবসায়িক কার্যক্রমকে সবসময় মানিয়ে নেয়ার সক্ষমতা। সর্বোপরি, প্রযুক্তিমনা তরুণ, যারা দেশের শক্তির এক বিরাট উৎস তারা ফ্রিল্যান্সিং ও ক্লাউড প্রযুক্তির সুবিধা ব্যবহারের মাধ্যমে দেশের জন্য আরও কাজ করার সুযোগ পাবে।

ক্লাউড প্রযুক্তি ব্যয়সাশ্রয়ী ও এখানে বিপুল পরিমাণ তথ্য প্রযুক্তি সংক্রান্ত রিসোর্স সহজেই সংরক্ষিত করা যায়। বাংলাদেশে ক্লাউড প্রযুক্তি এখনো ব্যাপক প্রসার ঘটেনি; তা সত্ত্বেও ক্লাউড নিয়ে কাজ করে এমন আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠান এদেশে বিভিন্ন অংশীদারদের সাথে ক্লাউড প্রযুক্তি নিয়ে কাজ করছে। উদাহরণস্বরূপ বলা যায় হুয়াওয়ের কথা। আমরা ২০১৯ সাল থেকেই বাংলাদেশে  ক্লাউড সেবা নিয়ে তৈরি হয়ে আছি। যদিও, ২০১১ সাল থেকেই বাংলাদেশের টেলিকম অপারেটরদের প্রায় সবাই হুয়াওয়ের ক্লাউড প্রযুক্তি ব্যবহার করে আসছে তাদের প্রাইভেট নেটওয়ার্কে এবং পরবর্তীতে সরকারি-বেসরকারি বেশ কিছু উল্ল্যেখযোগ্য প্রতিষ্ঠানও ক্লাউডের সেবা ব্যাবহার করছে। 

ক্লাউড প্রযুক্তি ব্যবহারের মাধ্যমে যেকোনো প্রতিষ্ঠানই নিজেদের কর্মদক্ষতা বাড়াতে এবং সেই সঙ্গে টাইম টু মার্কেট (টিটিএম) কমিয়ে আনতে পারবে এবং খরচও কমে আসবে অনেকাংশেই।  গ্লোবাল ক্লাউড কম্পিউটিংয়ের বাজারের আকার চলতি বছর দাঁড়িয়েছে ৩৭১.৪ বিলিয়ন মার্কিন ডলারে এবং ২০২৫ সালে এর আকার দাঁড়াবে ৮৩২.১ বিলিয়ন মার্কিন ডলারে, যা পূর্বাভাসকৃত সময়কালে মোট বার্ষিক প্রবৃদ্ধি দাঁড়াবে ১৭.৫ শতাংশ। কভিড-১৯ বৈশ্বিক মহামারির কারণে ডিজিটাল ব্যবসা আরো চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন হয়েছে এবং এর প্রয়োজনীয়তাও আরো বেশি পরিমাণে লক্ষণীয় হয়েছে। এ পরিস্থিতিতে বৈশ্বিক প্রতিষ্ঠানগুলো গ্রাহকদের বিভিন্ন ক্ষেত্রে ডিজিটাল সমাধান প্রদান করেছে। এ প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে হুয়াওয়ে অন্যতম।

বৈশ্বিক মহামারির সময় হুয়াওয়ে এশিয়া ও আফ্রিকার বেশ কিছু দেশে  ক্লাউড এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক সমাধান  দিচ্ছে। এটি দেশগুলোর স্বাস্থ্যসেবায় সংশ্লিষ্টদের কাজে এবং নিরাপত্তায় উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রাখছে। একইভাবে সামগ্রিক উপায়ে চিকিৎসাখাতে সাশ্রয়ী উপায়ে প্রযুক্তির সমন্বয় ঘটানোর মাধ্যমে এ খাতের উন্নয়নে ক্লাউড প্রযুক্তি কার্যকরী ভূমিকা রাখতে পারে। পাশাপাশি, ক্লাউড কম্পিউটিংয়ের মাধ্যমে উদ্ভাবনী উপায়ে শিক্ষাব্যবস্থায় আধুনিক প্রযুক্তির সমন্বয় ঘটানো সম্ভব। কভিড-১৯ এর বিস্তারের কারণে ই-লার্নিং এর প্রয়োজনীয়তার বিষয়টি সামনে চলে এসেছে। কিন্তু এখন ভাবতে হবে সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে একসাথে অত্যাধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার অনেক ব্যয়সাপেক্ষ এবং দীর্ঘ সময়ের ব্যাপার। ক্লাউড প্রযুক্তির মাধ্যমে কিন্তু এর সহজ এবং কার্যকরী সমাধান সম্ভব। ক্লাউডের মাধ্যমে সমন্বয়মূলক শেখার পরিবেশ তৈরি করা যাবে। এছাড়াও শিল্পখাতের উন্নয়নে, বিশেষ করে, পোশাক খাতে ক্লাউড সেবা ব্যবহার করা যেতে পারে। ক্লাউডের মাধ্যমে অটোমেশন প্রক্রিয়া অনেক সহজলভ্য হবে। এতে বর্তমানের সঙ্কটকাল ও ভবিষ্যতে  এ খাতকে সামনে এগিয়ে নিয়ে যেতে সহায়ক ভূমিকা পালন করবে।

হুয়াওয়ে বিগত ৩০ বছরের এন্টারপ্রাইজ অভিজ্ঞতা নিয়ে গ্রাহকদের ক্লাউড সেবা দিচ্ছে। হুয়াওয়ের ক্লাউড ডাটা সেন্টারের ভৌত অবকাঠামো, চিপসেট, সার্ভার, মিডলওয়্যার, সফটওয়্যার ও অ্যাপ্লিকেশনের পুরো সিস্টেমটাই হুয়াওয়ে তৈরি করছে। এ ধরনের এন্ড-টু-অ্যান্ড সক্ষমতা অন্য আর কোনো ক্লাউডে নেই। বরং তাদের অনেকেই হুয়াওয়ের উন্নত সার্ভার, হাই-অ্যান্ড রাউটার কিংবা এ-আই ক্লাস্টারের একনিষ্ঠ ব্যবহারকারী। হুয়াওয়ে সম্পূর্ণভাবে গবেষণানির্ভর প্রতিষ্ঠান এবং এর ব্যবসায়িক সফলতা গ্রাহকের ব্যক্তিগত তথ্যনির্ভর নয়। হুয়াওযের আরো একটা বড় সুবিধা হচ্ছে ‘ইকোনোমি অব স্কেল’। বিভিন্ন ক্ষেত্রে হুয়াওয়ে নিজেরাই চিপসেট ও প্রযুক্তি তৈরি করছে এবং সেগুলো বিভিন্ন ক্ষেত্রে বিস্তৃত ব্যবহারের পাশাপাশি ক্রমাগত উন্নতি সাধন করা হচ্ছে, যার ফলে প্রতিষ্ঠানটি অনেক সাশ্রয়ী দামে এ সেবা দিতে পারছে। পৃথিবীর প্রায় ১৪০টি দেশে হুয়াওয়ে ক্লাউড সেবা দিচ্ছে। বাংলাদেশেও হুয়াওয়ে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে ক্লাউড সুবিধা প্রদান করছে। গত ২১ বছরেরও বেশি সময় ধরে বাংলাদেশে হুয়াওয়ে তাদের অংশীদারদের সাথে ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করছে। এ দেশের দ্রুতবর্ধনশীল ডিজিটাল রূপান্তরের জন্য বিভিন্ন খাতে কাজ করছে হুয়াওয়ে। 

বিভিন্ন খাতের প্রতিষ্ঠানের পরিচালন ব্যয় ব্যবস্থাপনা এবং আইসিটি সমাধানের মাধ্যমে বাজারে অবস্থান নিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে ক্লাউড সেবা। তবে, এক্ষেত্রে ক্লাউড সেবা সবার জন্য সহজলভ্য হওয়া উচিত। যদি, এদেশে ক্লাউডকে ব্যয়সাশ্রয়ী করা যায় তাহলে বাংলাদেশের ডিজিটাল অর্থনীতির বিকাশেও ক্লাউড কম্পিউটিং সহায়ক ভূমিকা পালন করবে।

লেখক হুয়াওয়ে টেকনোলজিস (বাংলাদেশ) লিমিটেডের মার্কেটিং ডিরেক্টর

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা