kalerkantho

বুধবার । ২৬ জুন ২০১৯। ১২ আষাঢ় ১৪২৬। ২৩ শাওয়াল ১৪৪০

ইরানে কী চায় যুক্তরাষ্ট্র

তামান্না মিনহাজ   

১৫ মে, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



ইরানে কী চায় যুক্তরাষ্ট্র

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ক্ষমতায় আসার পর থেকেই অস্থির হয়ে উঠেছে মধ্যপ্রাচ্য। লড়াই-সহিংসতা যেমন বেড়েছে, তেমনি উদ্বেগ-অস্থিরতার পারদও ঊর্ধ্বমুখী হয়েছে।

গোড়া থেকেই ট্রাম্প ইরানবিদ্বেষী। লুকোছাপা না করেই তিনি সেই বিদ্বেষকে প্রকাশ করেছেন বারবার; এমনকি যুদ্ধ বাধিয়ে দেওয়ার হুমকি দিতেও দ্বিধা করেননি। সেই হুমকিকে সত্য প্রমাণ করতে মধ্যপ্রাচ্য এলাকায় রণতরিও পাঠিয়ে দিয়েছেন। যদিও গত সিকি শতাব্দীর ইতিহাস বলে, জোর থাকলেও জেতার তাগদ নেই যুক্তরাষ্ট্রের। অন্তত ইরাক ও আফগানিস্তানে তাদের যে পরিণতি হয়েছে তা সেই কথার পক্ষেই রায় দেয়।

গত কয়েক মাসে শান্ত পরিস্থিতিকে ঘোলাটে করার কাজটি যুক্তরাষ্ট্রই শুরু করে।

গত বছর ট্রাম্প ঘোষণা দেন, জয়েন্ট কমপ্রিহেনসিভ প্ল্যান অব অ্যাকশন (জেসিপিওএ, যা ইরান পরমাণু চুক্তি হিসেবেই বেশি পরিচিত) থেকে সরে যাচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র। ২০১৫ সালে যুক্তরাষ্ট্রেরই সাবেক প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামার মধ্যস্থতায় স্বাক্ষর হয় এই চুক্তি। এর অন্য পক্ষগুলো হচ্ছে—রাশিয়া, জার্মানি, ফ্রান্স, যুক্তরাজ্য ও চীন। চুক্তিতে বলা হয়, ইরানের ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়ার বিনিময়ে দেশটি ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ প্রক্রিয়া বন্ধ করে দেবে। নিষেধাজ্ঞা উঠে যাওয়ায় বাণিজ্য করার অবাধ স্বাধীনতা পেয়ে যায় ইরান।

তবে ট্রাম্প প্রশাসনের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়, ইরান চুক্তির শর্ত ভঙ্গ করছে। যদিও এর কোনো প্রমাণ দেখাতে পারেনি তারা; বরং জাতিসংঘ ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের নজরদারি প্রতিষ্ঠানগুলো দাবি করেছে, তেহরান জেসিপিওর কোনো শর্ত লঙ্ঘন করেনি। অনেকটা গোঁয়ার্তুমি করেই ইরানের পরমাণু চুক্তি থেকে বের হয়ে যায় যুক্তরাষ্ট্র।

শুধু তা-ই নয়, এর পর থেকে দফায় দফায় ইরানের ওপর নিষেধাজ্ঞাও আরোপ করতে থাকে তারা।

ইরানের সঙ্গে বাণিজ্য শুরু করা দেশগুলোর ওপরও নিষেধাজ্ঞার হুমকি দেয় যুক্তরাষ্ট্র। তাদের ছয় মাসের সময় বেঁধে দেওয়া হয়। বলা হয়, এর মধ্যে বাণিজ্যের জন্য নতুন দেশ খুঁজে নিতে না পারলে নিষেধাজ্ঞার আওতায় পড়বে তারাও। এর মধ্যে রয়েছে—ভারত, চীন, তুরস্ক ও ফ্রান্সের মতো আটটি দেশ। ইরান তাদের তেল বিক্রির জন্য এই দেশগুলোর ওপর নির্ভরশীল। ট্রাম্পের বেঁধে দেওয়া ওই ছয় মাসের সময় এ মাসেই শেষ হচ্ছে।

এরই মধ্যে ইরানের ওপর মার্কিন নিষেধাজ্ঞার আঁচ পড়তে শুরু করেছে। বাড়ছে মুদ্রাস্ফীতি, বেকারত্ব ও নিত্যপণ্যের মূল্য। দেশের ভেতরেও অসন্তোষ বাড়ছে। পরিস্থিতি সামাল দিতে অনেকটা বেপরোয়া হয়ে উঠেছে ইরান। আগেই তারা হুমকি দিয়েছিল মার্কিন নিষেধাজ্ঞা আরোপ হলে হরমুজ প্রণালী বন্ধ করে দেবে। বৈশ্বিক তেল বেচাকেনার অন্তত ২০ শতাংশ এই পথেই সম্পন্ন হয়।

পাশাপাশি জেসিপিওএর কিছু প্রতিশ্রুতি স্থগিত করার ঘোষণা দিয়েছে তেহরান। তারা পরমাণু জ্বালানির ইউরেনিয়াম মজুদ বৃদ্ধি এবং অন্যান্য দেশে বিক্রির ঘোষণা দেয়। একই সঙ্গে তারা জানায়, যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞা অগ্রাহ্য করতে চুক্তি স্বাক্ষরকারী অন্য দেশগুলো ৬০ দিনের মধ্যে পদক্ষেপ না নিলে তেহরান আরো উচ্চমাত্রায় ইউরেনিয়াম উৎপাদন শুরু করবে।

এ ঘোষণার প্রতিক্রিয়ায় যুক্তরাষ্ট্র বলেছে, ইরান যদি চুক্তি থেকে পিছু হটে, তাহলে তাকে এর ফল ভোগ করতে হবে। এর পরদিনই ইরানের ইস্পাতশিল্পের ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়।

ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু ইরানের ঘোষণার পর বলেন, তারা পরমাণু শক্তিধর ইরানকে মেনে নেবে না। তবে ইরানের নতুন ঘোষণা মেনে নেয়নি ইউরোপীয় ইউনিয়নও। তারা মনে করে, এ ক্ষেত্রে ইরানের আরো ধৈর্য ধরা উচিত।

এদিকে ইরানের সঙ্গে উত্তেজনা বাড়ার পরিপ্রেক্ষিতে মধ্যপ্রাচ্য এলাকায় রণতরি পাঠিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। একই সঙ্গে কাতারের মার্কিন ঘাঁটিতেও বিমানবহরে নতুন বিমান যুক্ত করা হয়েছে। পাঠানো হচ্ছে প্যাট্রিয়ট আকাশ প্রতিরক্ষা ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবস্থাপনা। ওই এলাকায় বড় ধরনের তোড়জোর শুরু করেছে যুক্তরাষ্ট্র। এর মধ্যেই কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার পক্ষে দূতিয়ালি শুরু করেছে ইসরায়েল ও সৌদি আরব। দুটি দেশই আঞ্চলিক প্রভাব বিস্তারের ক্ষেত্রে ইরানকে তাদের প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী বলে মনে করে।

যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ইরানের মতবিরোধ অবশ্য নতুন কিছু নয়। এর সূচনা গত শতাব্দীর আটের দশকের গোড়ার দিকে। সে সময় ইরানে ক্ষমতাসীন ছিলেন রাজা মোহাম্মদ রেজা পাহলভি। গণ-অভ্যুত্থানের মাধ্যমে তিনি ক্ষমতাচ্যুত হন। পালিয়ে যান ফ্রান্সে। এই রাজার সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের ঘনিষ্ঠতা ছিল। পরবর্তী সময়ে ইরানের ইসলামপন্থী প্রশাসনের সঙ্গে কখনোই যুক্তরাষ্ট্রের সখ্য তৈরি হয়নি। এবং গোড়া থেকেই ইরানের ক্ষমতাসীনদের ক্ষমতাচ্যুত করার চেষ্টা চালিয়ে আসছে যুক্তরাষ্ট্র। সফল হয়নি। সাবেক প্রেসিডেন্ট ওবামা আসার পর ইরাক ও আফগান পরিস্থিতি বিবেচনায় নিয়ে আপসের চেষ্টা করেন। তার ফলে পাওয়া যায় জেসিপিওএ।

সচরাচর প্রত্যেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট তাঁর পূর্বসূরির নেওয়া সিদ্ধান্ত মেনে চলেন। এটাই প্রথা; কিন্তু ট্রাম্প ওবামা নন।

ইরান প্রশ্নে অত্যন্ত কঠোর অবস্থান নিয়েছেন তিনি। একই অবস্থান তাঁর ভেনিজুয়েলার ক্ষেত্রেও। যদিও লাতিন আমেরিকার এই দেশটিকে তিনি বাগে আনতে পারেননি।

ইরানের ক্ষেত্রে শেষ পর্যন্ত ট্রাম্প কাদায় পা ডোবাবেন কি না তা নিয়ে যথেষ্ট সন্দেহ আছে। ইরান বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রের প্রধান লক্ষ্য ছিল সরকারের পতন ঘটানো। সে লক্ষ্য নিয়ে প্রকাশ্যেই ঘোষণা এসেছে ট্রাম্প প্রশাসনের তরফ থেকে।

কিন্তু যুদ্ধে জড়িয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত বিশেষ করে ওই অঞ্চলের প্রেক্ষাপটে খুব সহজ কিছু না।

ইরাক ও আফগানিস্তানের অভিজ্ঞতা যুক্তরাষ্ট্রের জন্য সুখকর হয়নি। ইরাকে যুক্তরাষ্ট্র হামলা চালানোর আগে দেশটির ১৩ বছর তারা নিষেধাজ্ঞা দিয়ে রাখে। তার পরও সাফল্য মেলেনি। এরও আগে ভিয়েতনাম থেকেও বের হয়ে আসতে বাধ্য হয় তারা। সেই তিক্ত অভিজ্ঞতার বিবেচনায় চট করে যুদ্ধের সিদ্ধান্ত হয়তো নেবে না যুক্তরাষ্ট্র—এমন অভিমত বোদ্ধাদের। তবে ট্রাম্প সম্পর্কে কিছুই আগাম ধারণা করা সম্ভব নয়। অঘটনপটীয়সী ট্রাম্প কী করতে যাচ্ছেন তা সময়ই বলে দেবে।  

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা