kalerkantho

রবিবার। ১৬ জুন ২০১৯। ২ আষাঢ় ১৪২৬। ১২ শাওয়াল ১৪৪০

উত্তাল ভেনিজুয়েলা

কার ভাগ্যে কী আছে

তামান্না মিনহাজ   

৮ মে, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



কার ভাগ্যে কী আছে

লাতিন আমেরিকার দেশ ভেনিজুয়েলাকে নিয়ে বিশ্বরাজনীতিতে উত্তেজনা চলছে বেশ কিছুদিন ধরেই। তীব্র রাজনৈতিক সংকটে জর্জরিত দেশটিকে নিয়ে আক্ষরিক অর্থেই আন্তর্জাতিক রাজনীতি দ্বিধাবিভক্ত হয়ে পড়েছে। একদিকে দেশটির বামপন্থী সরকারপ্রধান নিকোলাস মাদুরো। তাঁর দিকে সমর্থন হেলে রয়েছে রাশিয়া ও চীনের মতো শক্তি। আর তাদের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে আছেন বিরোধীদলীয় নেতা ও স্বঘোষিত অন্তর্বর্তীকালীন প্রেসিডেন্ট হুয়ান গুয়াইদো। তাঁর পক্ষে রয়েছে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সমর্থন। শুধু তা-ই নয়, মার্কিন দূতিয়ালিতে অর্ধশতাধিক দেশের স্বীকৃতিও পেয়েছেন তিনি। প্রশ্ন আসতে পারে, সাবেক স্প্যানিশ উপনিবেশ নিয়ে কেন আগ্রহ বিশ্ব সম্প্রদায়ের? এর জবাবটি হচ্ছে, ভেনিজুয়েলার মাটির নিচে মজুদ বিপুল তেলসম্পদ। আর এই সম্পদ কবজা রাখতেই এত আয়োজন।

তবে এত সব রাজনৈতিক টানাপড়েনের চাপে সবচেয়ে বেশি পিষ্ট হচ্ছে ভেনিজুয়েলার জনগণ।

২০১৪ সাল থেকেই দেশটিতে চরম অর্থনৈতিক মন্দা চলছে। তেলসমৃদ্ধ একটি দেশ অব্যবস্থাপনা ও আন্তর্জাতিক রাজনীতির কারণে কতটা নাজুক অবস্থার মধ্যে পড়তে পারে, তার প্রকৃষ্ট উদাহরণ ভেনিজুয়েলা।

দেশটিতে ধনী-দরিদ্রের মধ্যে চরম বৈষম্য আগে থেকে ছিল। তবে সম্প্রতি সেই সংকটের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে মুদ্রাস্ফীতি, খাদ্যসংকট—সব কিছু মিলিয়ে দেশটির সাধারণ মানুষ চরম সংকটে পড়েছে। ভেনিজুয়েলার পরিস্থিতি এমন অবস্থায় পৌঁছেছে যে দেশটির হাজার হাজার নাগরিক পাশের দেশগুলোতে গিয়ে আশ্রয় নিচ্ছে। লাতিন আমেরিকার ইতিহাসে এত মানুষের নিজের দেশ ছেড়ে যাওয়ার ঘটনা আগে কখনো ঘটেনি।

ভেনিজুয়েলার তেলের ওপর যুক্তরাষ্ট্রের নজর অবশ্য দু-চার বছরের নয়।

২০০২ সাল থেকেই দেশটির প্রতি মনোযোগী যুক্তরাষ্ট্র। তখন ক্ষমতায় ছিলেন সমাজপন্থী প্রেসিডেন্ট হুগো শাভেজ। শাভেজের সঙ্গে চীন, রাশিয়া ও কিউবার ঘনিষ্ঠ মিত্রতা আরো আগে থেকেই। যুক্তরাষ্ট্রের উদ্যোগে অভ্যুত্থান চেষ্টা বা বিরোধীদের দিয়ে বিক্ষোভ বিদ্রোহ করার চেষ্টা চলেছে বহুবার। কারাকাসের ওপর ওয়াশিংটন দফায় দফায় অর্থনৈতিক অবরোধ আরোপ করে। সন্ত্রাসবিরোধী যুদ্ধে সহায়তা না করা এবং মাদক চোরাচালানের অভিযোগ এনে ভেনিজুয়েলাকে যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় নিরাপত্তার স্বার্থের জন্য হুমকি হিসেবেও চিহ্নিত করা হয়।

মজার ব্যাপার হচ্ছে, এ ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রের সব দলের অবস্থান একই। রিপাবলিকান জর্জ বুশের নেওয়া সিদ্ধান্ত ডেমোক্র্যাট বারাক ওবামা বজায় রাখেন। আর ট্রাম্প আসার পর পরিস্থিতি যুদ্ধংদেহি হয়ে ওঠে।

যদিও এত সব উদ্যোগের পরও শাভেজকে পরাস্ত করতে পারেনি যুক্তরাষ্ট্র।

শাভেজ তেল বেচা অর্থ দিয়ে বড় ধরনের গণসন্তুষ্টি সৃষ্টিতে সক্ষম হয়েছিলেন। বিপুল জনসমর্থন ছিল তাঁর।

ক্যান্সারে আক্রান্ত হয়ে মারা যাওয়ার পর তাঁর জনপ্রিয়তার রেশ ধরেই ক্ষমতায় আসেন বর্তমান প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরো। তবে শাভেজের মতো কারিশমা তাঁর নেই। সুবক্তা হলেও অর্থনীতি নিয়ন্ত্রণের ক্ষমতা তাঁর নেই। তাঁর আমলেই চরম অর্থনৈতিক সংকট শুরু হয় ভেনিজুয়েলায়। একই সঙ্গে সামাজিক অব্যবস্থার কারণে গত বছর থেকেই মাদুরোবিরোধী আন্দোলন শুরু হয় ভেনিজুয়েলায়।

তীব্র আন্দোলনের মধ্যেই আগাম নির্বাচনের ডাক দেন মাদুরো।

বিতর্কিত ওই নির্বাচনে তিনি ৬৪ শতাংশ ভোট পেয়েছেন বলে দাবি করলেও আবারও নির্বাচনের দাবিতে মাঠে নামে বিরোধীরা। তারা এই নির্বাচন মেনে নিতে অস্বীকৃতি জানায়। ওই গণ-আন্দোলনের মধ্যেই জানুয়ারিতে আকস্মিকভাবে পরিস্থিতির মোড় ঘুরে যায়। নিজেকে অন্তর্বর্তীকালীন প্রেসিডেন্ট হিসেবে দাবি করেন গুয়াইদো।

আর এই ঘোষণার কয়েক মিনিটের মাথায় গুয়াইদোকে স্বীকৃতি দেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প।

কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রের এ ধরনের হঠকারী সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে সমালোচনায় সরব হয় রাশিয়া ও চীন। তাদের দৃষ্টিতে এই সিদ্ধান্ত অবৈধ।

পাশাপাশি বন্ধু দেশ রাশিয়া শুধু ভেনিজুয়েলার বর্তমান প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে সমর্থনই দেয়নি, এরই মধ্যে দেশটির সমর্থনে অসংখ্য ভাড়াটে সেনা ও পরমাণু অস্ত্র বহনে সক্ষম দুটি বোমারু বিমানও পাঠিয়ে দিয়েছে। এ অবস্থায় বিশ্লেষকরা প্রশ্ন তুলেছেন, নব্বইয়ের দশকে বিদায় নেওয়া স্নায়ুযুদ্ধ কি ফের ভেনিজুয়েলার মাধ্যমেই ফিরে আসছে?

ঠিক এ মুহূর্তে যুক্তরাষ্ট্র যদি ভেনিজুয়েলায় সামরিক হস্তক্ষেপ করে, তাহলে সেটা বিরাট ধ্বংসযজ্ঞ ডেকে আনতে পারে। এমনিতেই বিরোধীদলীয় নেতাকে প্রেসিডেন্ট হিসেবে স্বীকৃতি দিয়ে যুক্তরাষ্ট্র ভেনিজুয়েলার ওপর যে চাপ সৃষ্টির কথা ভাবছিল, তা পুরোপুরি কার্যকর হয়নি; কিন্তু আন্তর্জাতিকভাবে একটা মেরুকরণের সৃষ্টি করেছে। ফলে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর কিউবাকে কেন্দ্র করে যুক্তরাষ্ট্র ও রাশিয়ার মধ্যে যে স্নায়ুযুদ্ধের সূচনা হয়েছিল, সেটা এবার ভেনিজুয়েলাকে কেন্দ্র করেই হতে পারে বলে মনে করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা।

এত বিরোধিতার মধ্যেও মাদুরো দাঁড়িয়ে আছেন, এর প্রধান কারণ তাঁর সেনাবাহিনী। এ অংশটির পূর্ণ সমর্থন পাচ্ছেন তিনি।

ফলে পথে-ঘাটে যে বিক্ষোভ বা বিরোধিতা, তা তাঁকে কাবু করতে পারছে না। পাশাপাশি শাভেজের তৈরি করে যাওয়া সমর্থকঘাঁটিও এখনো তাঁকে ছেড়ে যায়নি।

মাদুরোকে হটাতে অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা আরোপ করাসহ নানা চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র; এমনকি সামরিক হস্তক্ষেপের ইঙ্গিতও একাধিকবার দিয়েছেন ট্রাম্প। ওয়াশিংটন জোর দিয়ে বলছে, মাদুরোর দিন শেষ হয়ে এসেছে।

কিন্তু বিশেষজ্ঞরা বলছেন, মাদুরোকে ক্ষমতাচ্যুত করতে ওয়াশিংটনের সামনে খুব বেশি পথ খোলা নেই। এ ছাড়া ভেনিজুয়েলার মানুষের মধ্যে গুয়াইদোর রাজনৈতিক প্রভাব নিয়ে ভুল ধারণা ছিল যুক্তরাষ্ট্রের।

ট্রাম্প প্রশাসন গুয়াইদোকে যতটা প্রভাবশালী নেতা ভেবেছিল, তিনি আসলে ততটা প্রভাবশালী নন।

কিছু মানুষের সমর্থন পেলেও তিনি এখনো সামরিক বাহিনীর সমর্থন আদায় করতে পারেননি, যেটা মাদুরোকে ক্ষমতাচ্যুত করার ক্ষেত্রে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা