kalerkantho

মঙ্গলবার । ২৫ জুন ২০১৯। ১১ আষাঢ় ১৪২৬। ২২ শাওয়াল ১৪৪০

আক্রান্ত শ্রীলঙ্কা

অভ্যন্তরীণ সমস্যা নাকি বৈশ্বিক হুমকি

তামান্না মিনহাজ

১ মে, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



অভ্যন্তরীণ সমস্যা নাকি বৈশ্বিক হুমকি

ইস্টার সানডে শ্রীলঙ্কায় ভয়াবহ সিরিজ বোমা হামলা পুরো বিশ্বকে স্তম্ভিত করে দিয়েছে। এক দশক আগে দেশটিতে গৃহযুদ্ধের সমাপ্তি ঘটার পর আর সেভাবে সহিংসতার খবর পাওয়া যায়নি।

উপমহাদেশের অন্য অনেক দেশের তুলনায় নির্বিরোধী, শান্ত এবং পর্যটনের দিক থেকে দুর্দান্ত সম্ভাবনাময় শ্রীলঙ্কায় এই লাগাতার হামলা তাই অনেককেই বিস্মিত করেছে। ঠিক যেন হিসাব মিলছে না।

গত ২১ এপ্রিল শ্রীলঙ্কার তিনটি গির্জা এবং তিনটি বিলাসবহুল হোটেলে একযোগে আত্মঘাতী বোমা হামলায় নিহত হয় ২৫৩ জন। আহত পাঁচ শতাধিক।

নিহতদের মধ্যে যুক্তরাজ্য, ভারত, বাংলাদেশসহ ৩৮টি দেশের নাগরিক রয়েছে। নিহতদের মধ্যে শিশু রয়েছে ৪৫ জন।

হামলার পরপরই শ্রীলঙ্কা জানায়, স্বল্প পরিচিত ছোট একটি গোষ্ঠী ন্যাশনাল তাওহিদ জামাত (এনটিজে) এই হামলা চালিয়েছে। এই গোষ্ঠীর সঙ্গে মধ্যপ্রাচ্যে সক্রিয় ইসলামিক স্টেটের (আইএস) যোগসূত্র রয়েছে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করে লঙ্কান সরকার।

পরে আইএস দায় স্বীকার করে ভিডিও বার্তা প্রকাশ করে।

শ্রীলঙ্কায় এই জঙ্গি হামলা নানা প্রশ্ন তৈরি করেছে। কী বার্তা দিয়ে গেল এই হামলা? কেন শ্রীলঙ্কাকেই টার্গেট করা হলো? সমাজব্যবস্থায় মুসলমানরা কি নিগৃহীত, নাকি অনেক বেশি শক্তিশালী? শ্রীলঙ্কার চলমান রাজনৈতিক সংকটের সুযোগে হামলাটি চালানো হলো না তো?

এর বেশির ভাগ প্রশ্নের জবাবই আমরা পেয়ে যাব শ্রীলঙ্কার ইতিহাস থেকে। তবে কিছু প্রশ্ন থেকেই যাবে। যার জবাবের জন্য আমাদের হয়তো আরো কয়েক মাস অপেক্ষা করতে হবে। ব্রিটেনের কাছ থেকে শ্রীলঙ্কা স্বাধীনতা লাভ করে ১৯৪৮ সালে। অঞ্চলটি বৌদ্ধপ্রধান। তারা দেশে নিজেদের একক কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠায় আগ্রহী ছিল শুরু থেকেই। তবে শ্রীলঙ্কায় সিংহলি বৌদ্ধরা সংখ্যাগরিষ্ঠ হলেও আঞ্চলিকভাবে তারা সংখ্যালঘু।

প্রতিবেশী ভারতের তামিলনাড়ু রাজ্যে তামিলদের সংখ্যা অনেক বেশি। ফলে সংখ্যাগুরু হওয়ার পরও সিংহলিদের ভেতর এক ধরনের ভীতি রয়েছে। আর সংখ্যার দিক থেকে সিংহলি (৭৫ শতাংশ) ও তামিল (১৫ শতাংশ) জাতি-গোষ্ঠীর এ দেশটিতে বৌদ্ধ ৭০.২ শতাংশ, হিন্দু ১২.৬ শতাংশ,  মুসলিম ৯.৭ শতাংশ ও খ্রিস্টান ৭.৪ শতাংশ করে।

তামিল জাতি-গোষ্ঠীর লোকজন একটি পৃথক আবাসভূমির দাবিতে লিবারেশন টাইগার অব তামিল ইলাম (এলটিটিই) প্রতিষ্ঠা করে গত শতাব্দীর আশির দশকে। মনে রাখা প্রয়োজন, এলটিটিইতে মূল যোদ্ধা ছিল হিন্দুরা। এদের মধ্যে খ্রিস্টানরা অন্তর্ভুক্ত ছিল না। তারা কখনোই সন্দেহের তালিকায়ও ছিল না। তিন দশক ধরে লড়াই চলার পর ২০০৯ সালে এলটিটিইকে পুরোপুরি দমনে সক্ষম হয় শ্রীলঙ্কা সরকার।

এখানে আরেকটি বিষয়ও লক্ষণীয়, এলটিটিইর সঙ্গে মুসলমানদের সম্পর্ক কখনোই ভালো ছিল না। নানা সময় লঙ্কান মুসলমানরা এলটিটিইর নির্যাতনের শিকার হয়েছে।

শ্রীলঙ্কার সমাজব্যবস্থায় জাতিগত দ্বন্দ্ব রয়েছে। তবে ধর্মীয় বিভেদ নিয়ে বাড়াবাড়ি পর্যায়ের কিছু দেশটিতে নেই। বিশেষ করে খ্রিস্টানদের সঙ্গে মুসলমানদের কোনো দ্বন্দ্ব নেই। যেসব এলাকায় খ্রিস্টান ও মুসলমানদের সহাবস্থান রয়েছে, সেসব এলাকায় দুই পক্ষের মধ্যে সম্প্রীতিটাই চোখে পড়ে। সেই বিবেচনায় বরং বৌদ্ধরাই মুসলমানদের প্রতি নাখোশ।

গত কয়েক বছরে মুসলমানদের ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে আগুন ধরিয়ে দেওয়ার মতো বিচ্ছিন্ন ঘটনাও রয়েছে।

তবে এ বিষয়টি বিবেচনা করলে এবারের হামলায় আক্রান্ত হওয়া উচিত ছিল বৌদ্ধদের। তা কিন্তু হয়নি। বরং হামলা চালানোর জন্য নির্বিরোধী খ্রিস্টানদের বেছে নেওয়া হয়েছে। হামলার গতি-প্রকৃতিই বলে দেয়, আকস্মিকভাবে বা সাময়িক উত্তেজনার বশবর্তী হয়ে বিষয়টি ঘটে গেছে এমন নয়। বরং সময় নিয়ে, পরিকল্পনা করে, লোকবল নিয়ে হামলাগুলো চালানো হয়েছে।

এখন আসা যাক এনটিজে প্রসঙ্গে। একেবারেই ক্ষুদ্র একটি গোষ্ঠী। এদের গত কয়েক বছরের তত্পরতা বিবেচনা করলে দেখা যাবে, দুটি বা তিনটি বৌদ্ধ মূর্তি ভাঙচুর। এই গোষ্ঠী এতটা পরাক্রমশালী হয়ে উঠল কী করে? নাকি এই গোষ্ঠীটি একটা মুখোশ মাত্র? পর্দার পেছনে আছে অন্য কেউ। এমনটা হওয়ার আশঙ্কাই বেশি। কারণ শ্রীলঙ্কার মতো একটি দেশে খ্রিস্টানরা হামলার জন্য সহজ লক্ষ্যবস্তু। এরা কোনো বিরোধে নেই।

সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তাহীনতা এদের মধ্যে পূর্ণমাত্রায় বর্তমান। যে তিনটি গির্জা আক্রান্ত হয়েছে, তাতে কোনো নিরাপত্তা ছিল না। নিরাপত্তা রাখার কথা কারো মনেই হয়নি। হোটেল তিনটিতেও নিরাপত্তাব্যবস্থা ছিল নামমাত্র। কোনো জায়গা থেকেই হামলাকারীরা প্রতিরোধের সম্মুখীন হয়নি।

তবে শ্রীলঙ্কায় খ্রিস্টানদের পরিস্থিতি আর বিশ্বজুড়ে তাদের অবস্থান এক নয়। বৈশ্বিক পরিস্থিতি বিবেচনায় খ্রিস্টানদের ওপর এই হামলা বিশেষ তাত্পর্য বহন করে। এবং হামলাটিও পরিচালিত হয় ইস্টার সানডের মতো খ্রিস্টানদের অন্যতম বড় ধর্মীয় উত্সবের দিন। এই হামলা প্রকৃতপক্ষে শ্রীলঙ্কাকে বিশেষ কোনো বার্তা দেওয়ার জন্য চালানো হয়নি। হয়েছে বিশ্বকে বার্তা দেওয়ার জন্য।

ইরাক ও সিরিয়ায় পরাজিত হওয়ার পরও আইএস যে এখনো ফুরিয়ে যায়নি, সেটাই হয়তো এত মানুষের প্রাণের বিনিময়ে জানান দিতে চাইল তারা।

আরেকটি বিষয় এখানে বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য—শ্রীলঙ্কার রাজনৈতিক সংকট। বর্তমান প্রেসিডেন্ট মাইত্রিপালা সিরিসেনা ও প্রধানমন্ত্রী রনিল বিক্রমাসিংহের দ্বন্দ্বের কারণেই কি এ হামলা ঠেকানো যায়নি—সেই প্রশ্ন এখন গুরুত্বপূর্ণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

ভারতীয় গোয়েন্দা সংস্থার কাছ থেকে গত ১১ এপ্রিল শ্রীলঙ্কার পুলিশপ্রধান এ ধরনের হামলা হতে পারে বলে তথ্য পায়।

এই তথ্য প্রথমে প্রধানমন্ত্রী ও পরে প্রেসিডেন্ট—কেউই পাননি বলে দাবি করেন।

দেশটির প্রেসিডেন্ট-প্রধানমন্ত্রীর মধ্যে দ্বন্দ্ব নতুন নয়।

গত বছরের শেষ দিকে প্রধানমন্ত্রীকে বরখাস্ত করে সেখানে সাবেক প্রেসিডেন্ট মাহিন্দা রাজাপক্ষেকে বসান সিরিসেনা। পরে সুপ্রিম কোর্টের হস্তক্ষেপে রনিল আবার স্বপদে বহাল হন।

তার পর থেকেই নিরাপত্তাসংক্রান্ত কোনো বৈঠকে রনিলকে ডাকা হয়নি। পুলিশপ্রধান রনিলের ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত।

ফলে দেশটির রাজনৈতিক পরিস্থিতিও অত্যন্ত ঘোলাটে। প্রশাসনের এই দ্বন্দ্বের সুযোগও জঙ্গিরা গ্রহণ করে থাকতে পারে।

 

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা