kalerkantho

বুধবার । ২২ মে ২০১৯। ৮ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৬। ১৬ রমজান ১৪৪০

নেতানিয়াহুর জয় ট্রাম্পের সুবিধা

তামান্না মিনহাজ

১৭ এপ্রিল, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



নেতানিয়াহুর জয় 

ট্রাম্পের

সুবিধা

পঞ্চম মেয়াদে ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী হতে যাচ্ছেন বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু। আগামী জুলাই মাসে এ মেয়াদের দায়িত্ব নেওয়ার পর তিনিই হবেন দেশটির ইতিহাসের সবচেয়ে দীর্ঘ সময়ের প্রধানমন্ত্রী। এ দফায় দায়িত্ব নিলে ইসরায়েলের প্রতিষ্ঠাতা জনক ডেভিড বেন গুরিয়নকেও ছাড়িয়ে যাবেন নেতানিয়াহু। এ পর্যন্ত ১৩ বছর তিনি ক্ষমতায় ছিলেন। এই সময়ের মধ্যে ইসরায়েলের রাজনীতি কট্টর নীতির দিকে ঝুঁকেছেন; অন্যদিকে ফিলিস্তিনিরা আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি কোণঠাসা হয়েছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে পাশে নিয়ে নেতানিয়াহু মধ্যপ্রাচ্য শান্তি প্রক্রিয়ার যে ছক ধরে এগোচ্ছেন তাতে ফিলিস্তিনের জন্য পৃথক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার সম্ভাবনা ক্রমেই ক্ষীণ হয়ে আসছে।

গত ৯ এপ্রিল ইসরায়েলের পার্লামেন্ট নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। নির্বাচনে নেতানিয়াহুর লিকুদ পার্টি নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী বেনি গেনজের ব্লু অ্যান্ড হোয়াইট পার্টি থেকে সামান্য ব্যবধানে এগিয়ে; কিন্তু এরই মধ্যে ছোট ছোট দল নেতানিয়াহুকে সমর্থন দেবে বলে খবরে আসছে। অর্থাত্ লিকুদ পার্টি সমমনা দলগুলোকে নিয়েই সরকার গঠন করতে যাচ্ছে।

নির্বাচনের সপ্তাহখানেক আগে দেওয়া এক সাক্ষাত্কারে নেতানিয়াহু বলেন, ‘ইসরায়েলের পরিবর্তন আমি এনেছি। একে বিশ্বমানে উন্নীত করেছি। বামপন্থী নেতাদের মতো সমঝোতার পথে কখনো এগোইনি। এগিয়েছি ক্ষমতা, অহংকার আর প্রত্যয় নিয়ে।’ সাবেক এই কমান্ডো ইসরায়েল-ফিলিস্তিন আলোচনার ব্যাপারে বরাবরই কঠোর মনোভাব নিয়ে অগ্রসর হয়েছেন। তাঁর আমলেই শান্তি প্রক্রিয়া সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জের মুখে পড়ে এবং একসময় পুরোপুরি স্থবির হয়ে যায়। বিষয়টি গত শতাব্দীর শেষ ভাগেই অনুমান করতে পেরেছিল যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাবশালী দৈনিক নিউ ইয়র্ক টাইমস। ১৯৯৬ সালে নেতানিয়াহু প্রথম ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে ক্ষমতা গ্রহণ করেন। সে সময়ই পত্রিকাটি আশঙ্কা প্রকাশ করে, ‘ভবিষ্যত্ শান্তি আলোচনা বড় ধরনের ঝুঁকির মুখে পড়ল।’ তাদের সেই আশঙ্কাই সত্যে পরিণত হয়। নেতানিয়াহু তাঁর প্রচারের সময়ই একটি বিষয় স্পষ্ট করে দেন, ‘ফিলিস্তিনের সঙ্গে শান্তি ইসরায়েলের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পারবে না।’ নব্বইয়ের দশকে শান্তি আলোচনার যে উদ্যোগ বা প্রচেষ্টা ছিল এখন আর তার লেশমাত্র দেখা যায় না। উল্টো নেতানিয়াহুর আমলে পশ্চিম তীরের বসতি আরো সম্প্রসারিত হয়েছে। তাঁর এবারের জয় এই ইঙ্গিত বহন করে, এই প্রক্রিয়া অদূর ভবিষ্যতে থামার কোনো সম্ভাবনা নেই।

ফলে নেতানিয়াহুর এই শাসনামলের গুরুভার সবচেয়ে বেশি অনুভব করেছে ফিলিস্তিনিরা। দুর্ভাগ্যজনকভাবে ইসরায়েলিদের কাছে ফিলিস্তিন ইস্যু গুরুত্ব হারিয়েছে। তার সবচেয়ে বড় প্রমাণ পাওয়া যায়, এবারের নির্বাচনে অংশ নেওয়া প্রার্থীদের ইশতেহার থেকে। বেশির ভাগ প্রার্থীই তাঁদের ইশতেহারে ফিলিস্তিন প্রসঙ্গটি উল্লেখই করেননি। আর এই পুরো বিষয়টির একক কৃতিত্ব দেওয়া যেতে পারে নেতানিয়াহুকে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে সঙ্গী হিসেবে পাওয়ার পর তিনি ফিলিস্তিন প্রসঙ্গটিকে ছুড়ে ফেলে দিতে দ্রুত এগিয়েছেন। তাঁর কৌশলী রাজনীতি সফলও হয়েছে। যেমন ফিলিস্তিন ইস্যুতে, তেমনি ইসরায়েলের অভ্যন্তরীণ বিষয়গুলোতেও। এবারের নির্বাচনে জয়ই তার সবচেয়ে বড় প্রমাণ। দুর্নীতির বহু অভিযোগ থাকার পরও ইসরায়েলিরা নেতানিয়াহুর বিকল্প খুঁজতে আগ্রহী হয়নি। 

আমেরিকান উচ্চারণে অনর্গল ইংরেজি বলা নেতানিয়াহু ট্রাম্প প্রশাসনের কাছে খুবই গুরুত্বপূর্ণ। পুরো রিপাবলিকান পার্টিই এখন এই ইহুদি নেতার সমর্থক। ট্রাম্প অবশ্য নেতানিয়াহুকে পছন্দ করেন স্বার্থের কারণে। সুবিধাও কম দেননি তিনি এই ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রীকে। নেতানিয়াহুর এবারের জয়ের পেছনে ট্রাম্পের গুরুত্বপূর্ণ অবদান রয়েছে। নেতানিয়াহুর প্রায় সব আবদার বিনা বাক্যে মেনে নিয়েছেন ট্রাম্প। ফিলিস্তিনিদের সহায়তা এখন প্রায় বন্ধের পর্যায়ে। গোলান মালভূমির একাংশকে স্বীকৃতি দিয়েছেন ইসরায়েলের ভূমি হিসেবে। গোলানের একটি অংশ ১৯৬৭ সালে মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধের সময় দখল করে নেয় ইসরায়েল। তাদের ওই দখলদারির ওপর আন্তর্জাতিক সিলমোহর কখনোই পড়েনি। যুক্তরাষ্ট্রই প্রথম দেশ, যারা গোলানকে স্বীকৃতি দিল। তবে ইসরায়েলের বেআইনি দখলদারির স্বীকৃতি ট্রাম্প প্রশাসন যে এই প্রথম দিল এমন নয়; এর আগেও তারা জেরুজালেমকে ইসরায়েলের রাজধানী হিসেবে স্বীকৃতি দিয়ে মার্কিন দূতাবাস সেখানে সরিয়ে নিয়ে গেছে। এ কাজে বাধ্য করেছে যুক্তরাষ্ট্রের সহায়তার বোঝায় মাথা নিচু করে রাখা আরো কয়েকটি রাষ্ট্রকেও।

নানা কারণেই কট্টরপন্থী নেতানিয়াহুর সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের ডেমোক্রেটিক পার্টির খুব একটি বনে না। নেতানিয়াহু দ্বিদলীয় বিভাজনই এর অন্যতম কারণ। এই বিভাজন ধরে রাখার স্বার্থেও নেতানিয়াহুকে হাতে রাখতে চান ট্রাম্প। এ ছাড়া ২০২০ সালে প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে আবারও লড়তে গেলে যুক্তরাষ্ট্রের শক্তিশালী ইহুদি লবি হাতে রাখতে হবে। সে কাজটি সহজ করার জন্যও ট্রাম্পের নেতানিয়াহুকে প্রয়োজন।

এবারের ইসরায়েলি নির্বাচনে নেতানিয়াহুর কৌশল ছিল বহুমুখী। তিনি শুধু ফিলিস্তিনি ইস্যুকেই ব্যবহার করেছেন এমনটি নয়, ভোটের মাত্র দুই মাস আগে তিনি ঘোষণা দেন, ‘ইসরায়েল হচ্ছে শুধু ইহুদি রাষ্ট্র।’ তাঁর এই ঘোষণার মধ্য দিয়ে ইসরায়েলি আরবদের চরম উদ্বেগের মধ্যে ঠেলে দেওয়া হয়। যদিও ইসরায়েলের মোট জনসংখ্যার এক-পঞ্চমাংশ আরব।

এ ছাড়া নেতানিয়াহু দাবি করেন, তাঁর আমলেই ইসরায়েল সবচেয়ে বেশি নিরাপদ, সমৃদ্ধ ও শক্তিশালী হয়েছে। তাঁর কট্টর ডানপন্থী মনোভাব, ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডে দখলদারি ইত্যাদি এতই স্পষ্ট ও জনসমর্থিত যে তাঁর প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী সাবেক সেনাপ্রধান বেনি গেনজও সরাসরি তাঁর সমালোচনা করার সাহস পান না।

নিজ মেয়াদে গাজায় দুই দফা লড়াই করেছেন নেতানিয়াহু। ২০১৪ সালের লড়াইয়ে দুই হাজার ২০০ ফিলিস্তিনি প্রাণ হারায়। বেশির ভাগই বেসামরিক মানুষ। অন্যদিকে ইসরায়েলি নিহত হয়েছে ৭৩, এর প্রায় সবই সেনা সদস্য। ১৯৬৭ সালের মধ্যপ্রাচ্য লড়াইয়ের পর এটিই সবচেয়ে ভয়াবহ লড়াই।

নেতানিয়াহুর দৃষ্টি এখন অবশ্য আর শুধু ফিলিস্তিনের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই। মধ্যপ্রাচ্যে যে স্নায়ু যুদ্ধ চলছে তার অন্যতম প্রধান খেলোয়াড় এখন ইসরায়েল। সৌদি আরবকে পাশে নিয়ে ইরানের সঙ্গে সংঘাতে জড়িয়ে গেছে ইসরায়েল। সিরিয়ার ইরানি ঘাঁটিতে তারা নিয়মিত বোমা ফেলে। ইরানকে নিয়ে দুশ্চিন্তা অবশ্য ট্রাম্পেরও রয়েছে। এ ক্ষেত্রে ট্রাম্প-নেতানিয়াহুর স্বার্থ অভিন্ন।

ইসরায়েলের এবারের নির্বাচন যত প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ হোক না কেন, এর থেকে দুই ব্যক্তি স্পষ্ট জয় পেয়েছেন—একজন নেতানিয়াহু আর অন্যজন হোয়াইট হাউস এখন যার দখলে। যার নীতি ও পরিকল্পনাই নেতানিয়াহুকে আবারও ইসরায়েলে গদিনশিন করল।

 

মন্তব্য