kalerkantho

সোমবার । ২০ মে ২০১৯। ৬ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৬। ১৪ রমজান ১৪৪০

উত্তাল আলজেরিয়া

দ্বিতীয় বসন্তের সূচনা!

তারেক হাবিব

১০ এপ্রিল, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৩ মিনিটে



দ্বিতীয়

বসন্তের

সূচনা!

টানা বিক্ষোভের মুখে ২ এপ্রিল পদত্যাগ করেন আলজেরিয়ার প্রেসিডেন্ট আবদেল আজিজ বুতেফলিকা। ২০ বছর ধরে তিনি দেশটির প্রেসিডেন্ট ছিলেন। আসন্ন নির্বাচনে পঞ্চমবারের মতো প্রার্থিতা ঘোষণার পর পর শুরু হয় বিক্ষোভ। তাঁর পদত্যাগ ও প্রার্থিতা প্রত্যাহারের পাশাপাশি রাজনৈতিক সংস্কারের দাবিতে টানা দেড় মাস ধরে চলে আন্দোলন-বিক্ষোভ।

আবদেল আজিজের পদত্যাগে আলজেরীয়রা উল্লাস প্রকাশ করেছে, তবে রাজপথ ছাড়েনি। তাদের নতুন দাবি, প্রশাসনে আবদেল আজিজের ঘনিষ্ঠ সবাইকে সরে যেতে হবে।

ঘনিষ্ঠদের মধ্যে আছেন—প্রধানমন্ত্রী নুরুদ্দিন বেদুই, সিনেটের স্পিকার আবদেল আকদির বিন সালাহ, সাংবিধানিক পরিষদপ্রধান তায়েব বেলায়েজ।

আলজেরিয়ার গৃহযুদ্ধের (১৯৯১-২০০২) শেষ দিকে ১৯৯৯ সালে সেনাবাহিনীর সমর্থন নিয়ে প্রেসিডেন্ট হন আবদেল আজিজ বুতেফলিকা। এর পর থেকে তিনি ক্ষমতায়। এই ২০ বছরে তাঁর রাজনৈতিক দল ন্যাশনাল লিবারেশন ফ্রন্ট (এনএলএফ) বা এফএলএন চারবার নির্বাচনে অংশ নেয়।

নির্বাচন লোকদেখানো হলেও বাস্তবে সেনাবাহিনী ও তাদের সমর্থনপুষ্টরাই ঠিক করেন কারা ক্ষমতায় থাকবেন। এ নিয়ে আলজেরীয়দের মধ্যে যে ক্ষোভ ছিল, আবদেল আজিজের প্রার্থিতা ঘোষণার পর তা ব্যাপকভাবে প্রকাশ পায়। জনগণের বিরোধিতার মুখে আবদেল আজিজের অবর্তমানে তাঁর দলের কেউ যদি নির্বাচনে সুবিধা করতে না পারে, তাহলে উদ্ভূত পরিস্থিতি নিয়ে দেশটিতে ত্রিমুখী সংঘর্ষের অবস্থা তৈরি হবে।

এনএলএফের ওপর জনগণের যে অনাস্থা সে সুযোগকে সেনাবাহিনী কাজে লাগাতে পারে নিজেরাই ক্ষমতা কুক্ষিগত করার মাধ্যমে। অস্থিতিশীল পরিস্থিতির মুখে আবদেল আজিজের পদত্যাগে সেনাবাহিনীরও চাপ ছিল বলে খবরে বলা হচ্ছে।

এদিকে সুষ্ঠু নির্বাচন হলে সেনাবাহিনী বা এনএলএফের গণ্ডির বাইরের কেউ যদি নির্বাচিত হয়, তাহলে স্বাভাবিকভাবেই এ রায় প্রত্যাখ্যান করবে সেনাবাহিনী ও এনএলএফ; যেমনটি তারা নব্বইয়ের দশকে গৃহযুদ্ধের সময় করেছিল। ১৯৯১ সালে নির্বাচনের ভোট গণনা চলার সময় যখন দেখা গেল ইসলামপন্থীরা অর্ধেকের বেশি ভোটে জয়ী হয়ে ক্ষমতাসীন হতে চলেছে, সেই মুহূর্তে সেনাবাহিনী ও প্রতিদ্বন্দ্বী দলগুলো নির্বাচন বয়কট করে। তখন ইসলামপন্থীরা সেনাবাহিনী ও তাদের মিত্রদের বিরুদ্ধে সশস্ত্র লড়াইয়ে জড়িয়ে পড়ে।

গৃহযুদ্ধের সময় অন্তর্বর্তীকালীন সরকারপ্রধান হিসেবে আর্মি জেনারেল লিয়ামিন জেরোয়েল ক্ষমতায় বসেন। ১৯৯৯ সাল পর্যন্ত তিনি টানা ক্ষমতায় ছিলেন।

গৃহযুদ্ধের একপর্যায়ে ইসলামপন্থীদের একটি অংশ সরকারের সঙ্গে আপস করে, আরেকটি অংশ বিদ্রোহ চালিয়ে যাওয়ার ঘোষণা দেয়। এই বিদ্রোহী অংশটি এখনো সক্রিয়; প্রায়ই সেনাবাহিনী, সরকারি স্থাপনা ও তেল ক্ষেত্রে হামলা করছে।

নব্বই দশক থেকে এখন পর্যন্ত সেনাবাহিনী আর এনএলএফ একে অপরের মিত্র। তবে নীতিনির্ধারকের ভূমিকায় সেনাবাহিনীই সবার ওপরে। সেনাবাহিনীকে পাশ কাটিয়ে কেউই ক্ষমতায় যেতে পারবে না!

আগের ইতিহাস আর আসন্ন নির্বাচনকে সামনে রাখলে সবার আগে দুটি প্রশ্ন আসে—সেনাবাহিনী বা তাদের ঘনিষ্ঠ কেউ নির্বাচনে দাঁড়াবে, নাকি জনগণের প্রতিনিধির জেতা রুখতে সেনাবাহিনীই ক্ষমতা নেবে!

বসন্তের সূচনা?

উত্তর-পশ্চিম আফ্রিকার দেশ আলজেরিয়া এবং উত্তর-পূর্ব আফ্রিকার দেশ সুদানে সাম্প্রতিক সময়ের সরকারবিরোধী বিক্ষোভকে আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমগুলোয় ‘নতুন আরব বসন্তের সূচনা’ হিসেবে উল্লেখ করা হচ্ছে। আলজেরিয়ায় বিক্ষোভের মুখে প্রেসিডেন্টের পদত্যাগ, এর পরও রাজপথে জনগণের অবস্থান; অন্যদিকে সুদানে কয়েক সপ্তাহ ধরে চলা বিক্ষোভের মুখে প্রায় দেড় যুগ ধরে ক্ষমতায় থাকা ওমর আল-বশিরের দেশজুড়ে জরুরি অবস্থা ঘোষণা—এসব ঘটনাকে এক করলে আরব বসন্তের মতো নতুন বসন্তই বলা চলে! তবে জনগণ রাজনৈতিক স্বচ্ছতার জন্য যে আন্দোলন করছে, তার ফল পাবে কি না সে আশঙ্কা থেকেই যায়!

 

মন্তব্য