kalerkantho

গোলান নিয়ে ট্রাম্পের ঘোষণা কি মধ্যপ্রাচ্যকে অস্থিতিশীল করবে?

তারেক হাবিব   

৩ এপ্রিল, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



গোলান নিয়ে ট্রাম্পের ঘোষণা কি মধ্যপ্রাচ্যকে অস্থিতিশীল করবে?

গত ২৬ মার্চ যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ঘোষণা দেন, ‘গোলান মালভূমি ইসরায়েলের ভূখণ্ড।’

১৯৬৭ সালের আরব-ইসরায়েল যুদ্ধের সময় সিরিয়ার গোলান মালভূমি দখলে নেয় ইসরায়েল। ১৯৮১ সালে ইসরায়েল গোলান মালভূমিকে আনুষ্ঠানিকভাবে নিজেদের ভূখণ্ড বলে ঘোষণা দিলেও আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় তা প্রত্যাখ্যান করে।

সেই ধারাবাহিকতায় এবারও বিভিন্ন দেশ ট্রাম্পের এ স্বীকৃতিকে প্রত্যাখ্যান করেছে।

 

কেন এ ঘোষণা?

গোলান মালভূমিকে ইসরায়েলি ভূখণ্ড হিসেবে ট্রাম্প স্বীকৃতি দিলেও মূলত কূটনৈতিকভাবে এ জয়ের কৃতিত্ব ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহুর। তাঁকে পাশে রেখেই ট্রাম্প এ ঘোষণা দেন। এদিকে সামনে ইসরায়েলের নির্বাচন। বিভিন্ন ইস্যুতে অভ্যন্তরীণ চাপে পড়া ক্ষমতাসীন লিকুদ পার্টিকে এ স্বীকৃতি নির্বাচনে অনেকটাই এগিয়ে রাখবে।

ইসরায়েলের প্রভাবশালী পত্রিকা হারেজে এ ঘোষণাকে ‘নেতানিয়াহুর জন্য আশীর্বাদ’ বলে উল্লেখ করা হয়।

 

গোলান কেন গুরুত্বপূর্ণ

সিরিয়ার রাজধানী দামেস্ক থেকে মাত্র ৬০ কিলোমিটার দূরে গোলান মালভূমি।

এক হাজার ৮০০ বর্গকিলোমিটারের এ এলাকার এক হাজার ২০০ বর্গকিলোমিটারই ইসরায়েলের দখলে। কৌশলগতভাবে গোলান মালভূমি দুই পক্ষের কাছেই গুরুত্বপূর্ণ। গোলান থেকে সহজেই দামেস্কের ওপর নজরদারি করা যায়। ইসরায়েলে মিঠাপানির তিন ভাগের এক ভাগের জোগান আসে গোলান থেকে। প্রতিবেশী দেশগুলোর সামরিক হুমকি মোকাবেলায়ও গোলান কৌশলগত দিক থেকে গুরুত্বপূর্ণ। দখলের পর এখানে ইহুদি বসতি ও ব্যাবসায়িক স্থাপনা বসিয়েছে ইসরায়েল।

 

কার কী প্রতিক্রিয়া

স্বীকৃতির বিরুদ্ধে সিরিয়াসহ কয়েকটি দেশে বিক্ষোভ হয়েছে। উপসাগরীয় দেশ সৌদি আরব, বাহরাইন, কাতার, কুয়েত, ইরান এ স্বীকৃতিকে প্রত্যাখ্যান করেছে। ইউরোপীয় ইউনিয়নও ট্রাম্পের স্বীকৃতিকে প্রত্যাখ্যান করেছে।

জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের সদস্য ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের সদস্য ফ্রান্স, যুক্তরাজ্য, জার্মানি, পোল্যান্ড ও বেলজিয়ামের রাষ্ট্রদূত এক যৌথ বিবৃতিতে জানিয়েছেন, গোলান মালভূমিতে ইসয়ায়েলের সার্বভৌমত্বকে তারা অস্বীকার করে। চীন, রাশিয়া, কানাডা, লেবাননের পক্ষ থেকেও একই কথা বলা হয়েছে। স্বীকৃতির বিরুদ্ধে তুরস্কের প্রেসিডেন্ট এরদোয়ানও কড়া ভাষায় কথা বলেছেন।

বাস্তবতা হচ্ছে, আরব বসন্ত-পরবর্তী মধ্যপ্রাচ্যের অবস্থা আরব-ইসরায়েল যুদ্ধের সময়ের চেয়েও নাজুক। ষাটের দশকে বেশির ভাগ আরব দেশের ইসরায়েলবিরোধী অবস্থান বেশ জোরালো ছিল। ইসরায়েলের বিরুদ্ধে তারা ঐক্যবদ্ধ ছিল। আর বর্তমানে তাদের অবস্থান হচ্ছে—নিজেদের ক্ষমতা টিকিয়ে রাখতে কোনোভাবেই যুক্তরাষ্ট্র ও তাদের ঘনিষ্ঠ মিত্র ইসরায়েলের স্বার্থে আঘাত করা যাবে না। বড়জোর আনুষ্ঠানিক প্রতিবাদ পর্যন্তই তাদের দায়িত্ব শেষ।

কোনো কোনো আরব দেশ আনুষ্ঠানিক প্রতিবাদটুকুও করছে না; বরং আগ বাড়িয়ে ইসরায়েলের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়নের ব্যাপারে জোড় দিচ্ছে।

২৮ মার্চ আরব আমিরাতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আনোয়ার গারগাস ইসরায়েলের সঙ্গে সুসম্পর্ক তৈরির ব্যাপারে আরব দেশগুলোর প্রতি আহ্বান জানান। ইসরায়েলকে বয়কট করাকে ‘ঐতিহাসিক ভুল’ বলেও মত দেন তিনি। মিসর খোলামেলাভাবেই ইসরায়েলের স্বার্থ রক্ষা করে যাচ্ছে। সৌদি আরবও এ মতের পক্ষে ঝুঁকছে।

এদিকে ইরানের সঙ্গে সিরিয়ার ঘনিষ্ঠতাকে ভালোভাবে দেখছে না বেশির ভাগ আরব দেশ। এ অবস্থায় গোলানকে নিজেদের ইস্যু ভেবে কঠোর অবস্থান নেবে, নাকি শুধুই ‘সিরিয়ার ইস্যু’ ধরে হাত গুটিয়ে রাখবে, তা নিয়ে জল্পনার শেষ নেই। 

পরিস্থিতি অস্থিতিশীল করবে?

গত কয়েক বছরে সিরিয়ার অভ্যন্তরে সিরীয় ও ইরানি সেনা স্থাপনা লক্ষ্য করে বেশ কয়েকবার বিমান হামলা চালিয়েছে ইসরায়েল।

সিরিয়ায় আসাদবাহিনী যখন গুটিয়ে যেতে বসেছিল, ঠিক সেই মুহূর্তে রাশিয়া তার পক্ষ নিয়ে গোটা যুদ্ধের মোড় ঘুরিয়ে দেয়। বিদ্রোহীদের ওপর টানা বিমান হামলা চালিয়ে কোনো কোনো জায়গা থেকে উত্খাত করে, কোথাও কোথাও চুক্তি করতে বাধ্য করে। আদতে সিরীয় বাহিনী ও তার মিত্র এবং বিদ্রোহী সংগঠন—কেউ-ই ইসরায়েলের স্বার্থের পক্ষে না। তবে বিপরীত অবস্থানে থাকা দুই পক্ষের মধ্যে সিরিয়া, ইরান ও এ অঞ্চলে তাদের মিত্ররাই ইসরায়েলের প্রথম ও প্রধান লক্ষ্য। কারণ ইরান লেবাননের হিজবুল্লাহ ও ফিলিস্তিনের হামাসকে অস্ত্র দিয়ে সাহায্য করছে। এরাই মাঝেমধ্যে ইসরায়েলের অভ্যন্তরে হামলা চালায়। নিজ দেশে যুদ্ধ নিয়ে চাপে থাকা সিরিয়া গোলান ইস্যুতে আপাতত ইসরায়েলকে সামরিক প্রতিক্রিয়া দেখাবে না। তবে আরব বিশ্বে সাধারণ জনগণের মধ্যে ইসরায়েল, যুক্তরাষ্ট্র ও স্থানীয় সরকারের ওপর যে ক্ষোভ দিন দিন বাড়বে, তা অনায়াসেই বলা যায়।

এর ধারাবাহিকতায় মার্কিনপন্থী সরকারের বিরুদ্ধে সশস্ত্র সহিংসতার আশঙ্কাও উড়িয়ে দেওয়া যায় না।

 

 

মন্তব্য