kalerkantho

মঙ্গলবার । ২৫ জুন ২০১৯। ১১ আষাঢ় ১৪২৬। ২২ শাওয়াল ১৪৪০

চৌকস

অনেক গুণের জেবা

যশোরের ঝিকরগাছা বি এম হাই স্কুলের অষ্টম শ্রেণির ছাত্রী জেবা ফারিহা চিত্রাঙ্কন, সংগীত, আবৃত্তি ও বক্তৃতায় চৌকস। ইংরেজিতে উপস্থাপনায়ও তার জুড়ি মেলা ভার। ক্লাসে রোল নম্বর ১। তাকে নিয়ে লিখেছেন এম আর মাসুদ

২২ মে, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



অনেক গুণের জেবা

ম্যাটের ওপর যুদ্ধ চলছে নেপালি ও ভারতীয় দুই নারী খেলোয়াড়ের মধ্যে। কেউ কাউকে ছাড় দিতে নারাজ। পাল্টাপাল্টি আক্রমণে উপস্থিত শত শত দর্শকের পলক পড়ছে না। এ সময় মঞ্চ থেকে উপস্থাপিকার সুরেলা কণ্ঠ শোনা গেল। ইংরেজিতে প্রতিযোগীদের সম্পর্কে এবং উপস্থিত দর্শকদের সম্বোধন করে কিছু বলছে সে। বিদেশিসহ দর্শক সারিতে থাকা বেশ কিছু লোকের নজরে পড়ল এটি। এই বয়সে এত সুন্দর উপস্থাপনা মুগ্ধ করেছিল আমাকেও। যশোরের ঝিকরগাছা উপজেলা চত্বরে ১৬ মার্চ দ্বিতীয় ওয়ালটন আন্তর্জাতিক কারাতে চ্যাম্পিয়নশিপের ফাইনাল রাউন্ডের খেলা হয়। দুই দিনের ওই আন্তর্জাতিক কারাতে চ্যাম্পিয়নশিপের উপস্থাপিকা ছিল জেবা।

খরতাপ পেরিয়ে যখন বিকেলের মৃদু বাতাসে প্রকৃতিতে স্বস্তির আভাস, জেবাদের বাড়ির মূল ফটকের সামনে পৌঁছলাম তখন। বাতাসে ভেসে এলো সুমধুর কণ্ঠে ‘আমি যার নূপুরের ছন্দ’ গানটি। মনে করেছিলাম, স্পিকারে গান বাজছে। কলিংবেল টিপতেই দরজা খুলে দিলেন জেবার মা। ভেতরে প্রবেশ করেই সুরের মূর্ছনায় আমার নজর গেল একটি কামরায়। সেখানে মেঝেতে বসে হারমোনিয়ামে হাত চেপে দরদভরা কণ্ঠে জেবা গাচ্ছে গানটি। তার বাবা আব্দুর রহিম মৃধা তবলা বাজিয়ে মেয়েকে সঙ্গ দিচ্ছেন। এই নজরুলসংগীতটি গেয়ে একাধিক পুরস্কার পেয়েছে জেবা। এইটুকুন বয়সেই কৃতিত্বের স্বীকৃতির পাল্লা যেন অনেক বড়। একে একে শুনলাম কৃতিত্বের এসব কথা।

জীবনে প্রথম মঞ্চে উঠেছিল তৃতীয় শ্রেণিতে পড়ার সময়, গান গাইতে। সেটা ২০১৪ সাল। বাবার ইচ্ছা আর শিক্ষকদের প্রেরণায় স্কুলের এক অনুষ্ঠানে। কিন্তু মনের মতো হয়নি গান গাওয়া। অনেক লোকের সামনে কিছুটা নার্ভাস হয়ে পড়া সেই জেবা এখন মঞ্চে শুধু গান গাওয়ায় নয়, আবৃত্তি, বক্তৃতা ও ইংরেজিতে অনুষ্ঠান সঞ্চালনায়ও সমান পারদর্শী। আর এসবের স্বীকৃতিতে তাঁর হাতে উঠেছে উপজেলা, জেলা, বিভাগীয় ও জাতীয় পর্যায়ের ২৮টি পুরস্কার।

তৃতীয় শ্রেণিতে পড়ার সময়ই জীবনের প্রথম পুরস্কার হাতে ওঠে তার। সেটিও জেবার মনে আছে। শেকড়ের সন্ধানে নামে একটি সংগঠনের চিত্রাঙ্কন প্রতিযোগিতায় প্রথম হয়েছিল। শীতের সকালে প্রচণ্ড কুয়াশার মধ্যে মা-বাবার সঙ্গে জেলার মণিরামপুরে গিয়ে সে পুরস্কার নেওয়ার সময় মনে যে অন্য রকম ভালো লাগা কাজ করেছে, সেটি মনে আছে আজও।

পাঠ্যপুস্তকের পাশাপাশি বিভিন্ন ধরনের বই পড়ার প্রেরণা পেয়েছে মা-বাবার কাছে। পত্রিকাও পড়ে। তাই সাধারণ জ্ঞানেও সমৃদ্ধ।

২০১৫ সালে চিত্রাঙ্কন প্রতিযোগিতায় বিভাগ, জেলা ও উপজেলা পর্যায়ের চারটি শ্রেষ্ঠত্বের ক্রেস্ট ওঠে তার হাতে। ২০১৭ সালে বাংলাদেশ স্কাউটসের জাতীয় পর্যায়ে মেধা পুরস্কার পায়। সে বছর জাতীয় শিশু পুরস্কার, উপস্থিত বক্তৃতা ও বিতর্ক প্রতিযোগিতায় সম্মাননা ক্রেস্ট ও সনদপত্র পায়।

২০১৮ সালে জেবা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কাছ থেকে স্কাউটের শাপলা কাব অ্যাওয়ার্ড গ্রহণ করেছে। একই সালে বক্তৃতা, চিত্রাঙ্কন, আবৃত্তি, বিতর্ক, মেধা ও রচনা লেখা প্রতিযোগিতায় জাতীয়, বিভাগ, জেলা-উপজেলা পর্যায়ে শ্রেষ্ঠত্বের ১৫টি সনদ উঠেছে তার হাতে। ২০১৮ সালে অষ্টম জাতীয় কাব ক্যাম্পুরিতে শান্তির বাণী লিখে দেশসেরা নির্বাচিত হয়। চলতি বছর সে জাতীয় ম্যাথ অলিম্পিয়াডে জুনিয়র গ্রুপে কোয়ালিফিকেশন ও আন্তর্জাতিক কারাতে চ্যাম্পিয়নশিপে ইংরেজিতে উপস্থাপনায় সম্মাননা ক্রেস্ট ও সনদ পেয়েছে। তবে এসবের মধ্যে ইংরেজিতে উপস্থাপনায় তার আগ্রহ সবচেয়ে বেশি। উপস্থিত বক্তৃতাও উপভোগ করে জেবা।

মেধাবী ছাত্রী জেবা কখনো প্রাইভেট পড়েনি। বরং সময় পেলে অন্যদের পড়ায়। ওর নিচের শ্রেণির শিক্ষার্থীরা প্রায়ই আসে পড়তে। ‘আমার কাছে কেউ পড়তে চাইলে নিষেধ করি না। বিশেষ করে ইংরেজি পড়তে আসে। প্রাইভেট না পড়লেও ইন্টারনেট ব্যবহার করে লেখাপড়ার নানা বিষয় জেনে নিই।’ বলল জেবা।

জেবার স্কুলের প্রধান শিক্ষক আব্দুস সামাদ জানান, ‘জেবা খুব মেধাবী। ইংরেজিসহ সব বিষয়ে তার রয়েছে পারদর্শিতা। সে নম্র ও মার্জিত।’

জেবা ফারিহার বাবা আব্দুর রহিম মৃধা একজন ব্যবসায়ী। মা রোজিনা খাতুন ঝিকরগাছা বি এম হাই স্কুলের শিক্ষিকা। দুই ভাই-বোনের মধ্যে সে ছোট। ঝিকরগাছা পৌর সদরের কৃষ্ণনগরে তাদের বাড়ি। পিইসিতে সর্বোচ্চ নম্বর পাওয়া জেবা ভবিষ্যতে প্রশাসনিক কর্মকর্তা হয়ে দেশের সেবা করতে চায়।

মন্তব্য