kalerkantho

বৃহস্পতিবার । ২০ জুন ২০১৯। ৬ আষাঢ় ১৪২৬। ১৬ শাওয়াল ১৪৪০

ম্যাজিক্যাল চাকমা

ফিফার ফ্যানস ফেভারিটে স্থান পেয়েছে মনিকার গোল। প্রথম কোনো বাংলাদেশি ফুটবলারের এমন কীর্তি। মনিকা চাকমাকে নিয়ে লিখেছেন আফরা নাওমী

২২ মে, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



ম্যাজিক্যাল চাকমা

ছবি : মীর ফরিদ

পরিচিত সেই মাঠ, বঙ্গবন্ধু জাতীয় স্টেডিয়াম। বঙ্গমাতা অনূর্ধ্ব-১৯ আন্তর্জাতিক গোল্ডকাপের সেমিফাইনালে মঙ্গোলিয়ার বিপক্ষে বাংলাদেশের খেলা চলছে। চাপা উত্তেজনা চারদিকে। বিরতিতে যাওয়ার সময় হয়ে এলো বলে। এমন সময় এক অদ্ভুত ঘটনা ঘটে গেল। প্রথমে প্রতিপক্ষ দলের একজনকে পেছনে ফেলে হেড দিয়ে প্রতিপক্ষের আরেক খেলোয়াড়ের মাথার ওপর দিয়ে সামনে বল পাঠিয়ে এগিয়ে গেল বাংলাদেশি দলের ৬ নম্বর জার্সি পরিহিত ফুটবলার। মঙ্গোলিয়ার দুজন তাকে বাধা দিতে এবার সামনে চলে এলো। কিন্তু কিশোরী ফুটবলার ডান প্রান্তে, ডি-বক্সের ঠিক বাইরে শূন্যে ভাসা বলটি বাঁ পায়ের ভলিতে জালে জড়াল। গোল। মঙ্গোলিয়ার বিপক্ষে তিন গোলে জেতা এই ম্যাচে অসাধারণ গোলটি করে মনিকা চাকমা। আর এই গোলের কল্যাণেই জায়গা করে নিল ফিফার ‘ফেভারিট ফাইভ’-এও।

প্রতি সপ্তাহে বিশ্বের সর্বোচ্চ ফুটবল নিয়ন্ত্রণ সংস্থা ফিফা ফুটবলভক্তদের পছন্দে সপ্তাহের সেরা কোনো এক ফুটবল মুহূর্তের ছবি, ভিডিও কনটেন্ট বা ফুটবলসংক্রান্ত কোনো এক অনন্য মুহূর্ত চেয়ে থাকে। গোটা বিশ্বের ফুটবলভক্তরা হ্যাশট্যাগ, # ডবখরাবঋড়ড়ঃনধষষ-এর মাধ্যমে ফিফার কাছে পৌঁছে দেয় তাদের পছন্দের কনটেন্টটি। যেকোনো পাঁচটি সেরা মুহূর্ত বাছাই করে প্রকাশ করে ফিফা। এই পছন্দের তালিকায় বাংলাদেশ কোনোকালেই জায়গা করে নিতে পারেনি। তবে এ বছর প্রথমবারের মতো ফিফার এই ‘ফ্যানস ফেভারিট’ কনটেন্টে স্থান পেল বাংলাদেশের খাগড়াছড়ির কিশোরী, বাংলাদেশি নারী ফুটবলার মনিকা চাকমার করা গোলটি। ‘ফ্যানস ফেভারিট’ তালিকায় প্রকাশিত মনিকার গোলটিকে ফিফা নাম দিয়েছে, ‘ম্যাজিক্যাল চাকমা’ নামে।

বাংলাদেশের পার্বত্য জেলা খাগড়াছড়ির লক্ষ্মীছড়িতে জন্ম তুখোড় ফুটবলার মনিকার। বাবা বিন্দু কুমার চাকমা পেশায় কৃষক এবং মা রানী বালা চাকমা গৃহিণী। এই কৃষক পরিবারের সর্বকনিষ্ঠ সদস্য মনিকা। পাঁচ বোনের মধ্যে মনিকার আরেক বোন অনিকা চাকমাও ছোটবেলায় তাঁর সঙ্গী ছিলেন ফুটবলে। কিন্তু অনিকা বেশিদূর না খেললেও খেলা ছাড়েনি মনিকা।

প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের কোলে বেড়ে ওঠা ছোট্ট মনিকা মাঠ আর বলের সঙ্গে বন্ধুত্ব করে ফেলেছিল নিজের অজান্তেই। শৈশবে কাকাতো ভাই কিরণ চাকমা ও সৃজন চাকমার সঙ্গে মাঠে ফুটবল খেলতে নামত। সেই থেকেই ফুটবল খেলায় হাতেখড়ি। একসঙ্গে হলেই খেলা শুরু। ভাইদের সঙ্গে খেলেছে, বন্ধুদের সঙ্গে খেলেছে, পাড়ার ছেলেদের সঙ্গে খেলেছে, খেলেছে স্কুলেও। কখনো ছেলে-মেয়ে একসঙ্গে খেলেছে, কখনো খেলা হয়েছে ছেলে-মেয়ে আলাদা দলে। স্কুলের মাঠে মনিকার খেলার চমক টের পেলেন ফুটবল কোচ বীর সেন স্যার। বুঝতে পারলেন এই কিশোরীর মধ্যে একটা ব্যাপার আছে। মনিকার বাবা মেয়ের ফুটবল নিয়ে মেতে থাকা পছন্দ করতেন না। কিন্তু সেই বাধাকেও স্যার সম্পূর্ণ গায়েব করে মনিকাকে প্রস্তুত করলেন বঙ্গমাতা প্রাথমিক বিদ্যালয় ফুটবল টুর্নামেন্টের জন্য। প্রথম বঙ্গমাতা প্রাথমিক বিদ্যালয় টুর্নামেন্টে ফুটবল খেলেছে খাগড়াছড়ির মরাচেংগী স্কুলের হয়ে। পরে খেলেছে রাঙামাটি ঘাগড়া উচ্চ বিদ্যালয়ের জার্সি গায়ে।

সাফ অনূর্ধ্ব-১৫ নারী চ্যাম্পিয়নশিপ জয়ের কথা ওর মনে থাকবে সব সময়। কমলাপুর বীরশ্রেষ্ঠ শহীদ সিপাহি মোহাম্মদ মোস্তফা কামাল স্টেডিয়ামের ৩-০ গোলে ভারতকে হারায় লাল-সবুজ জার্সিধারীরা। নেপালকে ৬-০ গোলে উড়িয়ে দেওয়ার পর ভুটানের বিপক্ষে ৩-০ ব্যবধানে জেতে বাংলাদেশ। আর ফাইনালে ভারতের বিপক্ষে ১:০ গোলে জিতে একেবারে চ্যাম্পিয়ন। এই প্রতিযোগিতায়ও দুটি গোল ছিল মিডফিল্ডার মনিকার। আনন্দের যেন সীমা নেই। ‘প্রথমবার এত বড় অর্জন আমার খুবই ভালো লেগেছিল’—এ কথা বলে যেন ফিরে গেল সেই চ্যাম্পিয়ন হওয়ার মুহূর্তে। দুইবার ম্যাচসেরা খেলোয়াড় হয়েছিল।

এদিকে সাফ অনূর্ধ্ব-১৮ নারী চ্যাম্পিয়নশিপে ভুটানের মাঠে নেপালকে এক গোলে হারিয়ে চ্যাম্পিয়ান হওয়া বাংলাদেশ দলেও ছিল মনিকা।

তাজিকিস্তানে এএফসি অনূর্ধ্ব-১৪ চ্যাম্পিয়নশিপের আঞ্চলিক পর্বের ম্যাচেও ভারতকে দুইবার হারিয়েছিল বাংলাদেশ। এই প্রতিযোগিতায় চমত্কার হ্যাটট্রিক ছিল মনিকার। গত বছর তাজিকিস্তানে এএফসি অনূর্ধ্ব-১৯ চ্যাম্পিয়ানশিপেও একটা হ্যাটট্রিক ছিল মনিকার। বিভিন্ন খেলায় যে হারেনি মনিকা, তা নয়। হেরে গেলে কেমন বোধ হতো মনিকার? জানতে চাইলে বলে, ‘খুবই খারাপ লাগত। মাঝেমধ্যে চোখে পানিও চলে আসত; কিন্তু আবার অনুশীলনে নামতাম আরো ভালো পারফরম্যান্সের আশায়।’

মনিকা জানায়, ফ্যানস ফেভারিটে ওর গোলটা স্থান করে নিয়েছে জানার আগে ওর ধারণাই ছিল না ফিফার এমন একটা বিষয় আছে। অনুভূতির কথা বলতে গিয়ে জানায়, ‘স্বাভাবিকভাবেই আশা করিনি এমন কিছু। তবে খুব ভালো লেগেছে।’

এই আত্মবিশ্বাসই মনিকাকে অনন্য করে তুলেছে। খেলতে খেলতে যেন নেশায় পরিণত হলো ফুটবল খেলা। বাবার বকুনি আটকাতে পারেনি তার স্বপ্নকে। যখন বাবা বাসায় থাকত না, খেলতে চলে যেত কিংবা যখন ঘরের কাজে মনোযোগ দেওয়ার কথা, তখন হুট করে চলে যেত অনুশীলনে। মনিকার খেলা অনুপ্রাণিত করেছে খাগড়াছড়ির আরো অনেক মেয়েকে। চতুর্থ শ্রেণি পর্যন্ত মনিকা পড়েছে খাগড়াছড়ি মরাচেংগী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে। তারপর পড়ে রাঙামাটি ঘাগড়া উচ্চ বিদ্যালয়ে। সেখান থেকেই এসএসসি পাস করেছে। খেলার পেছনেই সময় কাটে বেশি। বিভিন্ন সময় ঢাকায় কাটিয়েছে মনিকা। তখন কিভাবে হতো পড়াশোনা? মনিকা বলে, ‘ঢাকায় যখন অনুশীলন করেছি, এখানে পড়াশোনাও করেছি। সন্ধ্যায় আমরা পড়তে বসতাম। আমাদের জন্য এখানে টিচার আছে, যিনি প্রতিদিন আমাদের নিয়ম করে পড়ান। তাই লেখাপড়ার বিশেষ ক্ষতি হয়নি।’ মনিকা আরো পড়াশোনা করতে চায়। পৌরনীতি তার প্রিয় বিষয়।

মনিকা নাম শুনলেই চোখে ভাসে ফুটবলার মনিকার দৃশ্য। কিন্তু ফুটবল ছাড়াও আরো অনেক খেলায় আগ্রহী মনিকা। ভলিবল, টেবিল টেনিস, ক্রিকেট—এসব খেলাও টানে তাকে।  ভলিবলে অষ্টম শ্রেণিতে পড়ার সময় জেলাপর্যায়ে চ্যাম্পিয়ন হয়েছিল মনিকা ও তার দল। অবসরে অন্যান্য খেলা খেলে, খেলা দেখে, ছবি এঁকে এবং গান শুনে সময় কাটায়।

মনিকার সবচেয়ে কাছের বন্ধু আরেক তুখোড় ফুটবলার মারিয়া মান্ডা। জাতীয় নারী ফুটবল দলের অধিনায়ক সাবিনা খাতুন তার আইডল। ক্লাব ফুটবলে প্রিয় বার্সেলোনা ও জুভেন্টাস। অবাক করা ব্যাপার হলো, ব্রাজিল আর আর্জেটিনা দুই দলকেই ভালোবাসে; কেননা পছন্দের খেলোয়াড়ের তালিকায় আছে একই সঙ্গে মেসি ও নেইমার।

খুদে এই ফুটবলারের ইচ্ছা দেশের জন্য আরো বড় জয় ছিনিয়ে আনার। বাংলাদেশের নারী ফুটবলকে কী করে বিশ্বের দরবারে তুলে ধরবে, সে চিন্তাই করছে। কাজ কিন্তু শুরু করে দিয়েছে ‘ফেভারিট ফাইভ’-এ পৌঁছে! এখন মনিকা চাকমার নাম উচ্চারণ করলেই উঠে আসে বাংলাদেশের নাম। এই দেশকে আরো অনেক কিছু দেওয়ার অঙ্গীকার মনিকার।

মন্তব্য