kalerkantho

বুধবার । ২৬ জুন ২০১৯। ১২ আষাঢ় ১৪২৬। ২৩ শাওয়াল ১৪৪০

প্রাঙ্গণজুড়ে কবি নজরুল

জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়ের নানা জায়গায় ছড়িয়ে রয়েছে আমাদের প্রিয় বিদ্রোহী কবির নানা কীর্তির পরশ। সেসবের কথা জানাচ্ছেন মোস্তাফিজ নোমান ও সজীব আহমেদ

২২ মে, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



প্রাঙ্গণজুড়ে কবি নজরুল

প্রায় শতবর্ষ আগে এক স্বপ্নবাজ কিশোর এসেছিলেন ময়মনসিংহ শহরের অদূরে, ত্রিশালে। জনমানবহীন এক বটতলায় তিনি আপনমনে বাঁশি বাজাতেন। তিনি কবি কাজী নজরুল ইসলাম। সময়ের পরিক্রমায়, সেই দিনের ত্রিশালের সেই বটতলা ঘিরে ২০০৬ সালের ৯ মে তাঁরই নামে গড়ে উঠেছে বিশ্ববিদ্যালয়। মাত্র চারটি বিভাগ নিয়ে যাত্রা শুরু করলেও এখন এখানে চার অনুষদের ২৩টি বিভাগে প্রায় সাত হাজার শিক্ষার্থী পাঠ নিচ্ছেন। প্রতিটি বিভাগে রয়েছে ‘নজরুল স্ট্যাডিজ’ নামে ১০০ নম্বরের একটি বাধ্যতামূলক বিষয়। কবির জীবন ও কর্মের ওপর গবেষণা এবং উচ্চতর শিক্ষার জন্য রয়েছে ‘ইনস্টিটিউট অব নজরুল স্টাডিজ’। প্রতিবছর এই ইনস্টিটিউট থেকে মেধাবী শিক্ষার্থীদের বৃত্তি দেওয়া হয়। প্রকাশ করা হয় গবেষণা গ্রন্থ। কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগারে নজরুলের বই নিয়ে রয়েছে আলাদা কর্নার। এরই মধ্যে এই বিশ্ববিদ্যালয়টি কবির জন্মস্থান ভারতের আসানসোলে তাঁরই নামে গড়ে ওঠা কাজী নজরুল বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে ‘মেমোরেন্ডাম অব আন্ডারস্ট্যান্ডিং’ চুক্তি করেছে।

কবির পরশ

জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রায় সবখানেই ছড়িয়ে আছে কবির ম্যুরাল, ছবি, গান ও কবিতার বাণী। এখানকার স্বাধীনতা স্মৃতিস্তম্ভের নাম ‘চির উন্নত মম শির’, ক্যাফেটেরিয়ার নাম ‘চক্রবাক’। শিক্ষার্থীদের আবাসিক হল দুটির নামও কবির সৃষ্টিকর্মের নামে ‘অগ্নিবীণা’ ও ‘দোলনচাঁপা’। ভিসি বাংলোর নাম ‘দুখুমিয়া বাংলো’; বাসগুলোর নাম ‘সাঁঝের তারা’, ‘স্নেহপরশ’, ‘ধূমকেতু’, ‘বাঁধনহারা’, ‘বিদ্যাপতি’, ‘দখিন হাওয়া’, ‘সওগাত’, ‘সাম্যবাদী’, ‘মহুয়া প্রভাতী’, ‘ঝিঙে ফুল’, ‘বিদ্রোহী’ এবং ‘প্রলয়শিখা’। নানা অনুষ্ঠান উদ্যাপনের জন্য ক্যাম্পাসে যে দুটি মঞ্চ রয়েছে, তার একটির নাম ‘চুরুলিয়া’, অন্যটি ‘গাহি সাম্যের গান’। ভাসমান মঞ্চের নাম ‘সিন্ধু সারস মঞ্চ’। অন্যদিকে বিশ্ববিদ্যালয়ের একমাত্র মেডিক্যাল সেন্টারটির নামও কবির বইয়ের নামে ‘ব্যথার দান’। শিক্ষার্থীদের জন্য প্রচলিত বৃত্তিগুলোর নামকরণ হয়েছে কবির পরিজনদের নামে ‘প্রমিলা বৃত্তি’, ‘বুলবুল বৃত্তি’, ‘কাজী অনিরুদ্ধ বৃত্তি’। চারুকলা বিভাগের ছাত্র অন্তর পাল বলেন, ‘এই ক্যাম্পাসে সকাল হলেই নজরুলের গানের সুর ভেসে বেড়ায়। সেই সুরে বিভোর হয়ে আমরা ছবি আঁকি।’ সংগীত বিভাগের ছাত্রী সেতু হালদারের কাছে এই ক্যাম্পাসে বসে নজরুলগীতি চর্চা করার অনুভূতি অতুলনীয়। একই বিভাগের ছাত্র সমুদ্র প্রবাল বেশ গর্বের সঙ্গেই দাবি করেন, ‘নজরুলের গানের চর্চার জন্য আমাদের ক্যাম্পাসই সেরা!’ এখানকার নাট্যকলা বিভাগ নিয়মিতই নজরুলের নাটকগুলো মঞ্চে আনে।

বটতলা ও বাঁশি

প্রতিবছর মে মাসে এখানে কেন্দ্রীয়ভাবে আয়োজন করা হয় তিন দিনব্যাপী নজরুল জন্মোত্সব। এটিই এই বিশ্ববিদ্যালয়ের সবচেয়ে বড় আয়োজন। বাংলাদেশ ও পশ্চিমবঙ্গের নজরুলপ্রেমী, নজরুলগীতি শিল্পী, কবি আর নজরুল বিশেষজ্ঞদের পদচারণে তখন ক্যাম্পাস থাকে দারুণ রঙিন। এক মঞ্চে যখন কবির জীবন ও কর্ম নিয়ে আলোচনা চলে, অন্য মঞ্চে হয়তো চলে নজরুলের গান। গ্যালারিতে চলে শিল্পকর্মের প্রদর্শনী। শিক্ষার্থীদের উদ্যোগে আলোকচিত্র ও চলচ্চিত্র প্রদর্শনীর আয়োজন বসে। ইংরেজি ভাষা ও সাহিত্য বিভাগের ছাত্র কল্লোল কুমার রায় জানালেন, ‘ওই তিনটা দিন আমাদের জন্য যেমন অপার আনন্দের, তেমনি শিক্ষণীয় অনেক কিছুর সন্ধান মেলে। কবিকে নানাভাবে, নানা উপায়ে জানার সুযোগ পাই আমরা।’

চিরদিনের নজরুল

চির আধুনিক, অসাম্প্রদায়িক আর সদা তরুণ নজরুল ত্রিশালের এই ক্যাম্পাসের সবখানে আজও প্রতিদিন মুক্তি আর সাম্যের সুবাস ছড়িয়ে যাচ্ছেন। শ্রেণিকক্ষ থেকে শুরু করে খেলার মাঠ, ক্যাফেটেরিয়া থেকে বটগাছের ছায়া, পরীক্ষা থেকে শুরু করে সংস্কৃতিচর্চা—সব সময়, সমস্ত তরুণমনে কবি জ্বালিয়ে রেখেছেন বিদ্রোহের আলো আর ফুটিয়ে যাচ্ছেন মানবপ্রেমের অসংখ্য কেয়া, হাসনাহেনা ও দোলনচাঁপা।

এই বটতলায় বসে এক সময় বাঁশি বাজাতেন কবি নজরুল

ইনস্টিটিউট অব নজরুল স্টাডিজ বিভাগের দেয়ালে শিক্ষার্থীদের আঁকা কবির প্রতিকৃডু

 

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা