kalerkantho

বুধবার । ২৬ জুন ২০১৯। ১২ আষাঢ় ১৪২৬। ২৩ শাওয়াল ১৪৪০

ড. করিম আছেন চরের কৃষি নিয়ে

কৃষি নিয়ে গবেষণা করেন অধ্যাপক আব্দুল করিম। বেশ কয়েকটি ফসলের নতুন জাতও উদ্ভাবন করেছেন। জাপানের কাগুশিমা ইউনিভার্সিটি আর কিয়েটো ইউনিভার্সিটিতে ভিজিটিং প্রফেসর হিসেবেও কাজ করেছেন। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের এ অধ্যাপককে নিয়ে লিখেছেন মীর হুযাইফা আল মামদূহ

২২ মে, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে




ড. করিম আছেন চরের কৃষি নিয়ে

কুড়িগ্রামের নাগেশ্বরী, ভূরুঙ্গামারী এসব চরে বন্যা নিয়মিত ব্যাপার। বন্যা হলেই টানা দুই থেকে তিন সপ্তাহ ধরে পানি থাকে। এলাকার ফসল ডুবে যায়। কৃষকের ক্ষতি হয়। কখনো কখনো কয়েক দফা বন্যার কবলে পড়ে ফসল। ড. আব্দুল করিম তখন এ ব্যাপারটা নিয়ে গবেষণা করলেন—কেমন করে ফসল ডুবে যাওয়ার পরও বীজ সংরক্ষণ করা যায়। বেশ ভালো একটা উপায় পেলেন। সেটা হচ্ছে, কলাগাছ বা বাঁশের ভেলায় একটা চাটাই বিছিয়ে তার ওপরে মাটি দিয়ে বীজ সংরক্ষণ করা হবে। এটাকে ভাসমান বীজতলা নাম দিলেন। দুই সপ্তাহ পর্যন্ত এই বীজ ভালো থাকবে। ওই চরগুলোর ফসল নিয়ে তার আরো একটা গবেষণা আছে। তা হচ্ছে, এখানকার কৃষক আগে আমন ধানের যে জাত বুনত, সেই ধান পাকতে নভেম্বর অবধি সময় নিত। নভেম্বরে ফসল কেটে তারা গম কিংবা মসুর করত। কিন্তু গম আর মসুর নভেম্বরে মাঠে না থাকলে অত ভালো ফলন দেয় না। ড. করিম বিরি ধান-৫৬, বিউ (বঙ্গবন্ধু ইউনিভার্সিটি) ধান-১, বিনা ধান-৭সহ কৃষকদের ধানের নতুন কয়েকটি জাত দিলেন, যেটা অক্টোবরের মধ্যে ফলন হবে, ফসল তোলাও যাবে। এবার কৃষকরা খুব সহজেই নভেম্বরে গম কিংবা মসুর বুনতে পারল, আর তারপর মুগডাল। অর্থাত্ বছরে তিনটি ফসল।

ড. আব্দুল করিম বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক। এসএসসি পাস করেছেন ১৯৭৪ সালে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় স্কুল থেকে। তারপর ঢাকা কলেজে এইচএসসি। এরপর ভর্তি হলেন বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের অ্যাগ্রিকালচার বিভাগে। মাস্টার্স করলেন কৃষিতত্ত্বে। এরপর বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউটের গবেষক হিসেবে যোগ দেন। সেখানে একই সঙ্গে দুই রকম ফসলের লাভজনক উত্পাদনের কৌশল উদ্ভাবন করেন। তিনি বলছিলেন, ‘কৃষক সরিষা আর মসুর, নইলে ভুট্টা আর গোল আলু একত্রে বুনত। কিন্তু এই বোনার নিয়ম সঠিক ছিল না, ফলে কোনো ফসলই কাঙ্ক্ষিত মাত্রায় উত্পাদিত হতো না। তাই আমরা এই ফসলগুলো বোনার একটা নির্ধারিত দূরত্ব ও পন্থা আবিষ্কার করলাম। এতে একটা ফসল অন্যটার ক্ষতি করছিল না; বরং এর কারণে ফসলের উত্পাদন বেড়ে গেল। যেমন—ভুট্টাগাছের ছায়ায় আলু বেশ ভালো উত্পাদিত হয়। আমরা আলুতে ভুট্টার ছায়া পরিমাণমতো পড়ার জন্য কতটা দূরত্ব দরকার, তা উদ্ভাবন করলাম।’ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউটে ছয় বছর চাকরি করার পর জাপানের কিয়েটো ইউনিভার্সিটিতে গেলেন পিএইচডি করতে। লবণাক্ত এলাকায় লবণসহিষ্ণু গমের জাত খুঁজে বের করে তার লবণ সহিষ্ণুতার কারণ অনুসন্ধান করেছিলেন পিএইচডির গবেষণায়। বলছিলেন, ‘এই জাতের গমগুলো ফিল্টারিং পদ্ধতিতে লবণ থেকে বেঁচে থাকে। আমরা দেখেছি, এই জাত শিকড়েই অনেকটা লবণ আটকে দেয়, ফলে সেটা পুরোপুরি ওপরে উঠতে পারে না। আর শিকড় থেকেও যেটুকু লবণ ওপরে ওঠে, সেগুলো কাণ্ড ও একটু বয়েসী পাতা শুষে নেয়। ফলে নতুন পাতায় লবণ একদম কম থাকে, আর বীজ লবণ থেকে বেঁচে যায়।’

১৯৯৩ সালে পিএইচডি শেষ করে ডক্টর করিম দেশে ফেরেন। এখানে এসে আরডিআরএস বা রংপুর দিনাজপুর রুরাল সার্ভিসে কৃষি সমন্বয়ক পদে যোগ দেন। এখানে থাকাকালীন ওই অঞ্চলের কৃষকদের সংগঠিত করে প্রশিক্ষণ দিতেন। ১৯৯৪ সালে তিনি সুইজারল্যান্ডে অতিথি গবেষক হিসেবে ডাক পান। জুরিখের সুইস ফেডারেল ইনস্টিটিউটে ভুট্টার তাপসহনশীলতা নিয়ে গবেষণা করেন। বললেন, বৈশ্বিক উষ্ণতা ক্রমে বৃদ্ধি পাচ্ছে। এতে সব ধরনের ফসল ক্ষতিগ্রস্ত হবে। কিন্তু এই বর্ধমান তাপমাত্রার সঙ্গে ভুট্টার কিছু লাইন (ভিন্ন ভিন্ন বৈশিষ্ট্যসম্পন্ন কয়েকটি প্রজাতি। গবেষণার পর একটা প্রজাতিকে পূর্ণাঙ্গ ‘জাত’ হিসেবে ঘোষণা দেন বিজ্ঞানীরা) পাল্লা দিতে পারছে। এর কারণ অনুসন্ধান করলেন ড. করিম। বললেন, এই গবেষণা আমরা গ্রিন হাউস সেন্টারে করেছি। সেখানে সূর্যের আলো ধরে রেখে তাপমাত্রার নিয়ন্ত্রণ করা যেত। দেখলাম, ভুট্টার এই লাইনগুলো দিনের বেলা নিজেদের গুটিয়ে রাখে, বাড়ে না। তাপ সয়ে নেয়। রাতে যখন অনুকূল তাপমাত্রা পায়, তখন অন্যান্য লাইনের চেয়ে বেশি পরিমাণে বাড়ে। তা ছাড়া এসবে গ্রোথ হরমোন বেশি। এই ভুট্টার সেলে অ্যান্টি অক্সিডেন্ট প্রপার্টি থাকে, যা মরে যাওয়াকে বিলম্বিত করে। ক্ষয়রোধ করে।’ সুইজারল্যান্ডে আড়াই বছর গবেষণা করেছেন তিনি। এর মাঝেই তত্কালীন ইনস্টিটিউট অব পোস্ট গ্র্যাজুয়েট স্টাডিজ ইন অ্যাগ্রিকালচারে (এখনকার বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়) সহকারী অধ্যাপক হিসেবে কাজ শুরু করলেন। এরপর পোস্ট ডকের জন্য গেলেন জাপানের ইন্টারন্যাশনাল রিসার্চ সেন্টার ফর অ্যাগ্রিকালচারাল সায়েন্সে। জাপানের দক্ষিণের অকিনাওয়া শহরে এটি অবস্থিত। এবারের গবেষণা ছিল ফাইটু ট্রন নিয়ে। ফাইটু ট্রন গ্রিন হাউসের মতোই একটি প্রযুক্তি। গ্রিন হাউসে সূর্যের আলো ধরে রেখে তাপমাত্রার নিয়ন্ত্রণ করা হয়, আর ফাইটু ট্রনে আলো, তাপ আর আর্দ্রতা সবই কৃত্রিম। বললেন, ‘তীব্র আলোতে মুগডালের কী ক্ষতি হয়, সেটি বের করলাম আমরা। দেখলাম, মুগডালের ফুলের ভেতরে একই সঙ্গে পুরুষ ও স্ত্রী লিঙ্গ থাকে। আলোতে পুরুষ অংশের প্রজনন ক্ষমতা মরে যায়। মরে বলতে, ওই পুরুষ অংশের চারপাশে একটা আঠালো আবরণ থাকে, সেটা আলোয় রাবারের মতো হয়ে যায়। ওই রাবারটা সরিয়ে দিতে পারলেই আবার সেটা প্রজনন সক্ষম হয়ে ওঠে। আমরা তাই করলাম। নতুন মুগ আবিষ্কার হলো—বারি-৪। এটি উচ্চ তাপ ও আলোয় প্রজন সক্ষম।’ তারপর ফিরে আসেন দেশে। এবার বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রদের নিয়ে গবেষণা শুরু করলেন। মুগডালের খরাসহিষ্ণুতা নিয়ে কাজ হলো। মুগডালের পাঁচটি নতুন জাত বের করলেন তাঁরা।

প্রফেসর করিম বললেন, ‘এখন সয়াবিন নিয়ে কাজ করছি। সয়াবিনে থাকে ৪০ শতাংশ প্রোটিন, যা গরুর মাংসের চেয়েও বেশি। বাংলাদেশের বিদ্যমান অপুষ্টি দূর করতে সয়াবিন বেশ সহায়ক হতে পারে। এ ছাড়া এতে পটাশিয়াম, ক্যালসিয়াম, ম্যাগনেসিয়াম ও পর্যাপ্ত আয়রন থাকে। থাকে ভিটামিন ‘ডি’। আমরা নোয়াখালীর সুবর্ণচর, লক্ষ্মীপুরের রামগতি আর কুড়িগ্রামের চরগুলোতে এই সয়াবিনের বহুল ব্যবহার নিয়ে কাজ করছি। নোয়াখালীতে আমরা বেশ সাড়াও পাচ্ছি। মানুষ আটার সঙ্গে মিশিয়ে খাচ্ছে, পিঠা বানাচ্ছে। খিচুড়ির সঙ্গে খাচ্ছে।’

তিনি আরো বলেন, কৃষি ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে ফসলে নতুন কোনো গুণাগুণ নিয়ে আসা নিয়েও কাজ করছি। ধরুন, একটি জাত আবিষ্কার করতে ছয়-সাত বছর লেগে যায়। কিন্তু আমরা যা করছি, তাতে একটা ফসলে কোনো গুণ সহজেই চলে আসে। ধানের কথাই বলি। আমরা পানির সঙ্গে জিঙ্ক মিশিয়ে স্প্রে করছি ধানে। ফলে ধানেও দেখছি জিঙ্কের গুণ চলে আসছে।’ এরই মাঝে ২০০৫ জাপানের কাগুশিমা ইউনিভার্সিটিতে আর ২০১৬ সালে কিউটো ইউনিভার্সিটিতে ভিজিটিং প্রফেসর হিসেবেও কাজ করেছেন। শুধু গবেষণাতেই থেমে নেই অধ্যাপক করিম। নিজের গ্রামে স্কুল খুলেছেন। এতিমখানা দিয়েছেন। স্ত্রী, দুই ছেলে, এক মেয়ে নিয়ে করিমের পরিবার।

ছবি : মোহাম্মদ আসাদ ও সংগ্রহ

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা