kalerkantho

বৃহস্পতিবার । ২৭ জুন ২০১৯। ১৩ আষাঢ় ১৪২৬। ২৩ শাওয়াল ১৪৪০

এক পায়ে তামান্নার যুদ্ধ

তামান্না আক্তার নূরা। দুই হাত দিয়ে কখনো মমতাময়ী মাকে জড়িয়ে ধরতে পারেনি। দুই পায়ে ভর দিয়ে কখনো সহপাঠীদের সঙ্গে বিদ্যালয় ক্যাম্পাসে ছোটাছুটি করা সম্ভাব হয়নি। মায়ের কোল আর হুইলচেয়ারে বসে বিদ্যালয়ে যাতায়াত করা এই মেয়েটিই এবার এসএসসিতে পেল জিপিএ ৫। তাকে নিয়ে লিখেছেন এম আর মাসুদ

১৫ মে, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৭ মিনিটে




এক পায়ে তামান্নার যুদ্ধ

সকালে যখন সূর্য সোনালি আলো ছড়াচ্ছিল, তখন তামান্নাদের বাড়ির কাছে পৌঁছলাম। যশোরের ঝিকরগাছার বাঁকড়া বাজারের গা ঘেঁষে আলীপুর মৌজায় ওদের বাড়ি। বাড়িতে যাতায়াতের নির্দিষ্ট কোনো রাস্তা না থাকায় অন্য এক বাড়িতে সীমানায় ঢোকার সঙ্গে সঙ্গে বৃদ্ধ এক মহিলা দেখিয়ে দিলেন তামান্নাদের বাড়িটা। এখন ওদের বাড়ি চেনে সবাই। দক্ষিণ দুয়ারি আধাপাকা তিন কামরার একটি ঘরে চৌকির মতো একটি খাটের ওপর বসে আছে হার না-মানা মেয়ে তামান্না। তামান্না যেখানে বসে আছে, পাশে বইয়ের স্তূপ। কিন্তু একটি বইও যে ও নিজের ইচ্ছামতো নিয়ে চোখ বোলাতে পারবে না! স্তূপ থেকে মা বই সামনে দিলে তা পড়তে হয় তাকে।

তামান্না শোনাল তার লেখাপড়ার শুরুর গল্প। যখন ওর জ্ঞানবুদ্ধি হয়, তখন তার মা একমাত্র সম্বল বাঁ পায়ের আঙুলের ভেতর চক দিয়ে লেখা রপ্ত করাতেন। সকাল-সন্ধ্যা পড়াতেন। এভাবে এক-দেড় বছর পর ওকে একটি প্রাইভেট স্কুলে ভর্তি করিয়ে দেন। পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত মা-ই তাকে কোলে করে স্কুলে নিয়ে যেতেন-আসতেন। ক্লাসে বসিয়ে মা বাইরে বসে থাকতেন মেয়ের ডাকের অপেক্ষায়। হাই স্কুলে ভর্তির পর হুইলচেয়ারে বসিয়ে তাকে মায়ের মতো বাবাও কখনো কখনো আনা-নেওয়া করতেন। যতক্ষণ না তার স্কুলের পড়া শেষ হতো, ততক্ষণ মা পাশে বসে থাকেন। এ পর্যন্ত মায়ের পরিশ্রমই তার এই ফল এনে দিয়েছে বলে জানাল তামান্না। মায়ের শেখানোর বদৌলতে পা দিয়ে শুধু লেখে না, চামচ ধরে খেতেও পারে। মুঠোফোন ব্যবহার করতে পারে। যেন একটি পা-ই তার দুই হাতের সমান। বিজ্ঞান বিভাগ থেকে এসএসসি পরীক্ষায় কৃতিত্ব দেখানো তামান্না প্রাথমিক শিক্ষা সমাপনী ও জুনিয়র স্কুল সার্টিফিকেট পরীক্ষায়ও জিপিএ ৫ পেয়েছিল। একসময়  ডাক্তার হওয়ার স্বপ্ন দেখত। এখন ভবিষ্যতে বিসিএস পরীক্ষা দিয়ে প্রশাসনের বড় কর্মকর্তা হয়ে দেশের সেবা করতে চায়। একসময় শ্রেণি পুস্তক পাঠের বাইরে অবসরে চিত্রাঙ্কন করলেও এখন আর সেটি করা হয়ে ওঠে না। তার অবসর কাটে কোরআন শরিফ, বিভিন্ন গল্প ও কবিতার বই পড়ে। প্রিয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম। তার সঙ্গে যখন কথা চলছিল, তখন এগিয়ে এলেন তামান্নার মা খাদিজা পারভীন শিল্পী। তিনি মেয়ের উচ্চশিক্ষা নিয়ে শঙ্কিত। অনটনের সংসারে তাঁর আরো দুটি সন্তান আছে। অপর মেয়ে মুমতাহেনা রেশমী তৃতীয় শ্রেণিতে পড়ে। ছেলে মহিবুল্লাহ তাজও স্কুলে যাওয়া-আসা করছে।

তামান্নার বাবা রওশন আলী। শিক্ষকতা করেন ছোট পৌদালীয়া দাখিল মাদরাসায়। কিন্তু মাদরাসাটি নন-এমপিওভুক্ত হওয়ায় টিউশনি করে সংসার চালাতে হয়। মাদরাসাটি বাড়ি থেকে বেশ দূরে। সেখানে যাওয়ার প্রস্তুতি নেওয়ার ফাঁকে কিছু কথা হয় তাঁর সঙ্গে। বলেন, ‘মেয়েকে ভালো কলেজে ভর্তি করতে হবে, বিজ্ঞানের শিক্ষার্থী, অনেক খরচ হবে। তা ছাড়া ওর সঙ্গে তো একজন লোকও দরকার হবে, যদি আমাদের থাকতে হয় ওর সঙ্গে, তাহলে এত খরচ কোথা থেকে আসবে?’ রওশন আলী জানালেন, মেয়ের ধারাবাহিক ভালো ফলে এরই মধ্যে অনেকেই নানাভাবে সহযোগিতা দিয়েছেন; কিন্তু এখন তো স্থায়ী একটা সমাধান দরকার। আল্লাহ ব্যবস্থা একটা নিশ্চয়ই করবেন—এ কথা বলতে বলতে তিনি কর্মস্থলের উদ্দেশে রওনা দেন।

সুর্যের আলোর তাপ তখন বাড়ছে। এমন সময় তামান্নাদের বাড়ির সামনে এসে হাজির তার স্কুল বাঁকড়া জে কে মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক হেলাল উদ্দীন খান। সঙ্গে এসেছেন তামান্নার পরীক্ষার ফলে মুগ্ধ স্থানীয় সংবাদকর্মী আবুল কাসেম, আলমগীর হোসেনসহ অনেকেই। তাঁরাও খুশির সঙ্গে জানালেন তামান্নার জীবনযুদ্ধজয়ে তার মায়ের ভূমিকার অনেক কথা। প্রধান শিক্ষক হেলাল উদ্দীন খান বলেন, তামান্না শুধু এলাকার নয়, গোটা সমাজের প্রেরণা। সবাইকে দেখে তামান্নার মা আবেগভরা কণ্ঠে বলেন, ‘তামান্না শুধু আমার সন্তান না, ওকে মানুষের মতো মানুষ করার দায়িত্ব আপনাদেরও। আমি কখনো মনে করি না, তামান্না প্রতিবন্ধী। সে আমার আর দুটি সন্তানের মতো। সবার সুনজরে তামান্না একদিন এলাকার নাম করবে, আমি যেন ওকে সেই দিনে পৌঁছিয়ে দিতে পারি।’ মা শিল্পী যখন এমন সব কথা বলছিলেন, তখন ঘর থেকে মেঝে ঘষটে ঘষটে বেরিয়ে এলো তামান্না। তারও অনেক কথার মধ্যে সারকথা ছিল, ‘আমাকে সাহায্য করেন, আমি লেখাপড়া শিখে স্বাবলম্বী হতে চাই।’

অবশ্য তামান্না আর তার মা-বাবার দুশ্চিন্তা এখন কাটার পথে। গণমাধ্যমে তামান্নার উচ্চ শ্রেণিতে লেখাপড়ার বিষয় নিয়ে উদ্বেগ উঠে আশায় বিভিন্ন ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠান তার লেখাপড়ার খরচ জোগাতে চেয়েছে। অনেকেই আবার তামান্নার লেখাপড়ার বিষয়ে সম্পূর্ণ ব্যয়ভার বহন করতে চেয়েছেন। সাহায্য করতে চাওয়া এই মানুষদের মধ্যে রয়েছেন রাজধানীর ধানমণ্ডি এলাকার ব্যবসায়ী মোমিনুল হাসান, অবসরপ্রাপ্ত সরকারি কর্মকর্তা রোজারিও, যশোর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক মিজানুর রহমান মিজান, কানাডাপ্রবাসী ফরিদ হাসান।

 

তামান্নার মাও লড়ছেন

মা-বাবার সঙ্গে তামান্না

২০০৩ সালে যশোর ফাতিমা হাসপাতালে জন্ম হয় তামান্নার। সন্তান প্রসবের পর তার মা খাদিজা পারভীন শিল্পী দেখেন, নাড়িছেঁড়া ধনের দুটি হাত নেই, নেই ডান পা। তখন মা শিল্পীর মানসিক অবস্থা খুব খারাপ হয়ে যায়। কিন্তু একপর্যায়ে তিনি মনস্থির করেন, জন্ম নেওয়া সন্তানের কী দোষ? সবই সৃষ্টিকর্তার বিষয়। আমি এই সন্তানকে মানুষের মতো মানুষ করে গড়ে তুলব। এ প্রতিজ্ঞায় পরিবর্তন আনেন মানসিকতার। স্বপ্ন বোনেন প্রতিবন্ধী সন্তানকে নিয়ে। আজ মা খাদিজা পারভীন শিল্পীর সেই স্বপ্ন ডানা মেলতে শুরু করেছে। তবে সে জন্য তাঁকে গঞ্জনাও কম সহ্য করতে হয়নি। ধারণ করতে হয়েছে নিদারুণ ধৈর্য। একদিন যেমন কিছু মহিলা পথ দিয়ে হেঁটে আসছিল। এ সময় হঠাত্ তাদের সামনে পড়ে যান তিনি। তখন তারা চলার গতি পরিবর্তন করে অন্য পথে যায়। পরে তিনি জানতে পারেন, তাঁর সন্তান প্রতিবন্ধী হওয়ায় ওই মহিলারা চলার পথে তাঁর মুখ দর্শন করতে চায়নি। শুধু ওই মহিলারা নয়, পাড়া, মহল্লা, গ্রামের অনেক লোক শিল্পীর মুখ দেখলে যাত্রা শুভ হবে না—এমন মন্তব্য করত। ‘ওর যখন চার বছর বয়স, আমি তখন স্কুলে ভর্তির জন্য ওকে নিয়ে যাই ব্র্যাকের উপ-আনুষ্ঠানিক শিক্ষাকেন্দ্রে। কিন্তু সেখানকার সুপারভাইজর আমার মেয়েকে দেখে বলেন, ‘ওর দুই হাত নেই, একটি পা নেই! কিভাবে ও লেখাপড়া শিখবে? ওকে বাড়ি নিয়ে যান।’ মেয়েকে নিয়ে বাড়ি ফিরে এলেও মা খাদিজা পারভীন শিল্পীর সন্তানকে মানুষ করার মনোবল আরো দৃঢ় হয়। পরে তিনি বাড়ির পাশে আজমাইন এডাস স্কুলে তাকে ভর্তি করিয়ে দেন। তখন সেই স্কুলের শিক্ষকরা জানান, তাঁর মেয়ের চমত্কার মেধাশক্তি। এ কথায় মা যেন আশার আলো দেখতে পান। মেয়েকে মানুষের মতো মানুষ করার মনোবল যেন শক্ত হতে লাগল কংক্রিটের মতো। ধীরে ধীরে মেধা আর তাঁর পরিশ্রমে অদম্য তামান্না জয় করতে শুরু করেছে প্রতিবন্ধকতা। যারা একসময় তাঁকে, তাঁর সন্তানকে দেখত না, অমঙ্গল হবে বলত; তারা আজ বলতে শুরু করেছে—তামান্না আশীর্বাদ, প্রেরণা।

 


খবরটি ইউনিকোড থেকে বাংলা বিজয় ফন্টে কনভার্ট করা যাবে কালের কণ্ঠ Bangla Converter দিয়ে

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা