kalerkantho

বুধবার। ১৯ জুন ২০১৯। ৫ আষাঢ় ১৪২৬। ১৫ শাওয়াল ১৪৪০

‘আমি না হয় নৃত্যশিল্পী হলাম’

পটুয়াখালীর দুর্গম এলাকার মেধাবী ছাত্রী সাথী। নাচেও আছে দারুণ প্রতিভা। বাবা মারা যাওয়ার পর পড়ালেখা যখন বন্ধ হওয়ার উপক্রম, তখন নাচেই খুঁজে পায় আশা। এখন পড়ালেখার খরচ চালাচ্ছে নাচ শিখিয়ে। বিস্তারিত জানাচ্ছেন সাইমুন রহমান এলিট

৮ মে, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



‘আমি না হয় নৃত্যশিল্পী হলাম’

ঘূর্ণিঝড় ফণীর তাণ্ডব একেবারে থেমে যায়নি তখনো। ঝোড়ো হাওয়া বইছে। ৭ নম্বর বিপত্সংকেত জারি আছে। মানবকণ্ঠের প্রতিনিধি আল মামুনকে নিয়ে রওনা হই। গলাচিপার রামনাবাদ চ্যানেলের হরিদেবপুর-গলাচিপা খেয়া পারাপার শুরু হয়নি। উত্তাল নদী, ঢেউ আছড়ে পড়ছে তীরে। কোনো মাঝি যেতে রাজি হচ্ছিল না। অনেক অনুরোধে শেষমেশ একজন মাঝিকে নিয়ে খেয়া পার হয়ে হরিদেবপুর সাথীদের বাড়ি পৌঁছলাম। ছোট্ট একটি খুপরিঘর। ফণীর ভয়ে মোটা রশি দিয়ে বড় গাছের সঙ্গে বেঁধে দেওয়া হয়েছে, যেন বাতাসে উড়ে না যায়। আগের রাতে সাথীরা সাইক্লোন শেল্টারে ছিল, তাই ঘুম হয়নি। বাড়ি এসে মা-মেয়ে ঘুমাচ্ছে। পড়ার টেবিলে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছে পরীক্ষার বই-খাতা।

কাগজপত্রে সাথী বেগম নাম থাকলেও বাবা কখনো শান্তা, আবার কখনো সাথী নামে ডাকতেন। গলাচিপা উপজেলার প্রত্যন্ত গোলখালী ইউনিয়নের হরিদেবপুর গ্রামের রাজমিস্ত্রি আনসার সর্দার ও রাশিদা বেগমের মেয়ে সাথী। ছোটবেলা থেকেই নাচ-গানে মন ছিল তার। বাবা মারা যাওয়ার পর থেকে সংসারে অভাব। নাচ শিখিয়েই এখন পড়ার খরচ জোগাড় করছে সাথী। ইচ্ছা—ভবিষ্যতে নাচের ওপর উচ্চশিক্ষা নেওয়ার।

 

অনুপ্রেরণা পায় যেভাবে

স্কুলে নাচ ও গানের প্রতিযোগিতায় অংশ নেওয়ার ইচ্ছা হতো সাথীর। মেজো ভাই রাসেল সর্দারকে বলে মনের কথা। ভাই গিয়ে মাকে বলেন। মা-ও অমত করেন না। রাসেলও নাচ ভালোবাসে। টিভি দেখে দেখে নিজে কিছু নাচ শিখেছিল। বোনকেও সেগুলো দেখাতে থাকে। স্কুলের প্রতিযোগিতায় ভালো করতে থাকে সাথী। মেয়ের সাফল্য দেখে বাবাও উত্সাহ দিতেন। সাথী বলল, ‘ষষ্ঠ শ্রেণিতে পড়ার সময় জাতীয় শিশু পুরস্কার প্রতিযোগিতায় উপজেলা পর্যায়ে নৃত্যে প্রথম স্থান অধিকার করি। তারপর জেলা পর্যায়ে অংশ নিই। তখনই বুঝতে পারি, একজন প্রশিক্ষক ছাড়া ভালো নাচ শেখা সম্ভব না।’ একটু বিরতি নিয়ে আবার বলতে শুরু করল, ‘পরের বছর—অর্থাত্ যখন সপ্তম শ্রেণিতে পড়ি, তখন পটুয়াখালীর নৃত্য শিক্ষক ওস্তাদ নয়নের সঙ্গে কথা হয়। তিনি জানান, এটিএনে নাচ করতে আগ্রহী কি না? আমি সম্মতি দিলে পটুয়াখালীর জুবলী স্কুলের একটি কক্ষে ইভান, সজীব ও নয়ন স্যার নাচ শেখাতে শুরু করেন। সজীব স্যারের কাছে দীর্ঘদিন নাচ শিখেছি। তাঁর কাছে লোকনৃত্য, সাধারণ নৃত্য শিখেছি। মূলত তাঁরাই আমার নাচের ওস্তাদ।’

 

সব বাধা পেরিয়ে

সপ্তাহে দুই দিন গলাচিপার হরিদেবপুর থেকে পটুয়াখালী গিয়ে নাচ শিখত সাথী। কিন্তু সমস্যা শুরু হয় সে যখন অষ্টম শ্রেণিতে পড়ে তখন, বড় ভাই বিদেশে গিয়ে দালালচক্রের কাছে সব হারিয়ে নিঃস্ব হয়ে বাড়ি আসে। তখন ভাইয়ের প্রায় পাঁচ লাখ টাকার ঋণ বাবাকে পরিশোধ করতে হয়। রাজমিস্ত্রি বাবার জন্য এটা ছিল খুব কঠিন। একপর্যায়ে বাবা অসুস্থ হয়ে পড়েন। ধীরে ধীরে বাড়তে থাকে অসুস্থতা। অনেক ডাক্তার দেখানোর পর জানা যায়, লিভারসিরোসিসে আক্রান্ত হয়েছেন। পরিবারের আয়ের পথ প্রায় বন্ধ হয়ে যায়। এ সময় বড় ভাই শুরু করেন দিনমজুরের কাজ। ‘একসঙ্গে মেজো ভাই ও আমার পড়ার খরচ আর সংসার খরচ, তার ওপর বাবার চিকিত্সার খরচ জোগান দিতে গিয়ে রীতিমতো দিশাহারা হয়ে যান বড় ভাই।  কিন্তু এত কিছুর পরও ভাই আমাদের পড়াশোনা ও নাচ শেখা বন্ধ করেননি।’ বলল সাথী।

একাদশ শ্রেণিতে ভর্তি হওয়ার পরই সাথীর বাবা আনসার সর্দার চলে যান না-ফেরার দেশে। এদিকে বড় ভাইও আর একা টানতে পারছিলেন না সংসারের বোঝা। কয়েক মাস পর সব কিছু বন্ধ হওয়ার উপক্রম হয়। সাথী নিজেই সিদ্ধান্ত নেয়, পড়াশোনা বন্ধ করা যাবে না। তাই প্রথমে বাড়ি বাড়ি গিয়ে শিশুদের অঙ্ক-ইংরেজি প্রাইভেট পড়াত। পাশাপাশি নাচ শেখাতে শুরু করে। সাথী বলে, ‘জীবনে অনেক কষ্ট করেছি। একসময় অর্থাভাবে আমার পড়াশোনা বন্ধ হয়ে যাচ্ছিল। ভাইয়েরও কষ্ট হচ্ছিল। তখন সিদ্ধান্ত নিই নাচ শিখিয়ে নিজের পড়ার খরচ চালাব। প্রথম মাত্র দুটি ছাত্র পেলাম। তা দিয়ে কিছুই হয় না। হাল ছাড়িনি। এরই মধ্যে হঠাত্ শুনলাম, গলাচিপা চিলড্রেন থিয়েটার গ্রুপ চাঁদের হাটে নাচ শেখানোর জন্য শিক্ষক খুঁজছে। সেখানে নাচ শেখানোর কাজটি পেয়ে যাই। চাঁদের হাটে ৯৫ জন ছেলে-মেয়েকে নাচ শেখাচ্ছি। এখান থেকে যে টাকা পাই, তা দিয়ে আমার পড়াশোনার খরচ চালাই। মাঝেমধ্যে মা-ভাইকেও কিছু সহযোগিতা করি। সত্যি বলতে কী, চাঁদের হাটের এ কাজটি না পেলে আমার পড়াশোনার খরচ চালানো খুব কষ্ট হয়ে যেত। হয়তো বা  পড়াশোনা বন্ধ হয়ে যেত। ’

 

মেধাবী ছাত্রী

এত সব ঘটনার মধ্যেও বরাবর ভালো রেজাল্ট করে এসেছে সাথী। পঞ্চম শ্রেণির সমাপনী পরীক্ষায় ও অষ্টম শ্রেণির জেএসসি পরীক্ষায় এ প্লাস পায়। কিন্তু নানা প্রতিকূলতার কারণে ২০১৭ সালে এসএসসিতে বিজ্ঞান বিভাগ থেকে জিপিএ ৪.৭৭ পায়। আর গলাচিপা সরকারি ডিগ্রি কলেজ থেকে এইচএসসি পরীক্ষা দিচ্ছে এবার সে। আশা করছে জিপিএ ৫ পাবে।

 

চলার পথে সমস্যা

বছরের চার মাস রামনাবাদ নদীটি উত্তাল থাকে। তার মধ্যেই পৌর এলাকায় গিয়ে নাচ শেখানোর কাজ করেন সাথী। এ ছাড়া আছে বখাটেদের উত্পাত। এলাকার মুরব্বিরাও বিষয়টি সহজভাবে নেন না। ‘আমার আত্মীয়-স্বজন ও প্রতিবেশীরাও কম যায় না—প্রায় দিনই বলে, মেয়েদের এত ঘরের বাইরে যেতে নেই। এতে অমঙ্গল হয়। যারা নাচ করে, তারা ভালো মেয়ে না।’ তবে এসব কথায় কান না দিয়ে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করতে আপ্রাণ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে সাথী।

 

বড় ভাই ও মায়ের স্বপ্ন

সাথীর বড় ভাই জসীম বলে, ‘দুই ভাই এক বোন আমাদের। বাবা মারা যাওয়ার পর পড়াশোনা বন্ধ করে সংসারের হাল ধরতে হয়েছে। কিন্তু বাবা স্বপ্ন দেখতেন, বোন পড়াশোনা করে একদিন অনেক বড় হবে। বাবার সেই ইচ্ছাকে এগিয়ে নিতে আমি শত কষ্টের মাঝেও ওর পড়াশোনা ও নাচের খরচ চালিয়ে গিয়েছিলাম। এখন তো ও নিজেই অনেক কিছু করছে।

মা-ও স্বপ্ন দেখেন মেয়েকে নিয়ে, ‘আমাদের আর্থিক সমস্যা আছে ঠিকই। অন্য সবাই পারলে আমরা পারব না কেন? হয়তো টাকার সমস্যা থেকে যাবে, তাই বলে মেয়ের ইচ্ছা পূরণ করতে পারব না? যতটুকু পারি, চেষ্টা করে যাব। আমি দেখতে চাই, সাথী নাচের উঁচু একটি জায়গায় গিয়ে পৌঁছেছে।’ 

 

আমি না হয় নৃত্যশিল্পী হলাম

‘মা-বাবা, ভাইদের ইচ্ছা, পড়াশোনা করে ডাক্তার বা ইঞ্জিনিয়ার হই। কিন্তু আমার ইচ্ছা, নৃত্য বিষয়ে পড়াশোনা করে বড় কোনো ডিগ্রি নিয়ে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করব। এখন এইচএসসি পরীক্ষা দিচ্ছি। এরপর নৃত্য বিষয়ে উচ্চশিক্ষার কোনো প্রতিষ্ঠানে ভর্তি হওয়ার চেষ্টা করব। ডাক্তার-ইঞ্জিনিয়ার তো অনেকেই হয়, আমি না হয় একজন নৃত্যশিল্পী হলাম। একসময় নৃত্য শিখেছি মনের তাগিদে। কিন্তু এটাই যে আমার পড়াশোনা করার মাধ্যম বা আয়ের উত্স হবে, তা কখনো কল্পনাও করিনি।’ বলল সাথী।

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা