kalerkantho

সোমবার । ২৪ জুন ২০১৯। ১০ আষাঢ় ১৪২৬। ২০ শাওয়াল ১৪৪০

ভয়ের গল্পে ঐশীর জয়

সিলেট আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উত্সবে স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র (বাংলাদেশ) বিভাগে সেরা হয়েছে ইন্ডিপেনডেন্ট ইউনিভার্সিটির ছাত্রী ঐশীর চলচ্চিত্র ‘ড্রেড’। লিখেছেন ইফতেখার আহমেদ ফাগুন

৮ মে, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে




ভয়ের গল্পে

ঐশীর জয়

একজন মেয়ে শৈশব থেকে শুরু করে জীবনের কোনো না কোনো পর্যায়ে যৌন হয়রানি ও সহিংসতার শিকার হয়। শৈশবে এ রকম ঘটনার মুখোমুখি হলে পরবর্তী জীবনেও ভয় তাড়া করে ফেরে তাকে। কেউ কেউ ভয়কে শক্তিতে পরিণত করে, কেউ কেউ নিজেকে আরো গুটিয়ে নেয়। কোনো ঘটনা মনে এতটাই দাগ কাটে যে জীবনভর দুঃসহ স্মৃতি নিয়ে বেঁচে থাকতে হয় ওই মেয়েকে। জীবনের যেকোনো পর্যায়ে ঘরে কিংবা বাইরে যে কারো দ্বারা যৌন নিপীড়নের শিকার হতে পারে সে। শারীরিক ও মানসিক নিপীড়নের কারণে মেয়েদের ভয় পাওয়ার ঘটনাগুলো নিয়েই স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র ‘ড্রেড’। পরিচালক ফারহা জাবীন ঐশী। ২ মিনিট ৩৬ সেকেন্ডের এই অ্যানিমেশন মুভিটি ‘তৃতীয় সিলেট আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উত্সবে’ ‘সেরা স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র (বাংলাদেশ)’ পুরস্কার জিতে নিয়েছে। স্বাধীনধারার চলচ্চিত্র নির্মাতাদের উত্সাহ দিতে সিলেট কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় চলচ্চিত্র সংসদ প্রতিবছর আয়োজন করে এই উত্সব। এবার উত্সবের তৃতীয় আসর। ২৩ থেকে ২৬ এপ্রিল পর্যন্ত চলা এই আসরে ১১১টি দেশ থেকে তিন হাজার ৩৬টি স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র জমা পড়েছে। যার মধ্যে তিন শতাধিক স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র ছিল বাংলাদেশি নির্মাতাদের তৈরি। বাছাই করা ৯৬টি স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র উত্সবে প্রদর্শিত হয়। সেখানেই বিচারকদের রায়ে বিজয়ী হয় ঐশীর চলচ্চিত্রটি। তিনি ইন্ডিপেন্ডেন্ট ইউনিভার্সিটির কম্পিউটার বিজ্ঞান ও প্রকৌশল বিভাগের তৃতীয় বর্ষের ছাত্রী।

পুরস্কার পাওয়ার প্রতিক্রিয়ায় বললেন, ‘খুব ভালো লাগছে। এত এত সিনেমার ভিড়ে আমারটি সেরা হবে ভাবিনি। ভীষণ ভালো লাগছে।’

অবশ্য ‘ড্রেড’ চলচ্চিত্রটি এর আগেও বেশ কয়েকটি পুরস্কার জিতেছে। গেল বছর আন্তর্জাতিক শিশু চলচ্চিত্র উত্সব ২০১৮, বাংলাদেশে সামাজিক বিভাগে সেরা স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র, ইন্টারন্যাশনাল ওপেন ফিল্ম ফেস্টিভাল ২০১৮-এ জুরি মেনশন অ্যাওয়ার্ড, নারী দিবস উপলক্ষে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় জেন্ডার অ্যান্ড উইমেন স্টাডিজ বিভাগ, ইউএনডিপি ও ঢাকা ইউনিভার্সিটি ফিল্ম সোসাইটি আয়োজিত ‘জেন্ডার ফেস্ট ২০১৯’-এ শর্ট ফিল্ম কম্পিটিশনে প্রথম রানার আপ হয় চলচ্চিত্রটি। এই চলচ্চিত্রটির জন্য ইয়াং ফেমিনিস্ট ফিল্ম ফেস্টিভাল ২০১৮-এ বেস্ট ডিরেক্টরও হয়েছিলেন ঐশী।

এর আগেও ‘লং ওয়ে টু গো’ এবং ‘আনকালারড মাইন্ড’ নামে দুটি অ্যানিমেশন মুভি বানিয়েছেন তিনি। বললেন, ‘‘আমার প্রতিটি কাজের পেছনে অনেক আবেগ আর স্মৃতিবহুল ঘটনা থাকে। ‘ড্রেড’ তৈরির ব্যাপারটিও ভিন্ন ছিল না। প্রায় প্রতিদিনই দেশের বিভিন্ন জায়গায় নারী ও শিশু ধর্ষণ এবং খুনের খবর দেখি পত্রিকায়। চারদিকে এসব নিয়ে আলোচনা-সমালোচনাও কম হচ্ছে না। কিন্তু তাতে ঘটনার ব্যাপকতা কমছে না। একদিন ক্যাম্পাস থেকে ফেরার পথে ভাবলাম—এসবের বিরুদ্ধে যার যার জায়গা থেকে সোচ্চার হওয়া দরকার। ঠিক করলাম, চলচ্চিত্রই হবে আমার হাতিয়ার।” তারপর বাস্তব ঘটনার ছায়া অবলম্বনে স্ক্রিপ্ট লেখলেন। চরিত্রগুলো আঁকলেন। এসব করতে মাস তিনেকের মতো সময় লেগেছিল তাঁর। বললেন, শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত স্ক্রিপ্টিং, স্টোরি-বোর্ডিং, স্কেচিং, কালার, ভিজুয়াল ইফেক্ট—সব কিছু নিজে নিজে পরিকল্পনা করেছি। তারপর বাস্তবায়ন। একা একা এসব করতে বেশ বেগ পেতে হয়েছে। শেষ দিকে ছোট বোন ফারিন সহযোগিতা করেছে।’ তিনি আরো যোগ করেন, ড্রেড মানে শঙ্কা বা ভয়। একটা মেয়ে জীবনের যেকোনো পর্যায়ে শারীরিক বা মানসিক নিপীড়নের শিকার হলে এই ট্রমা কাটিয়ে উঠতে অনেক লড়াই করতে হয় তাকে। অনেক সময় সমাজও দোষারোপ করে নিপীড়নের শিকার মেয়েটিকেই। তবু কেউ কেউ লড়াই চালিয়ে যায়। আমি এই লড়াইটা দেখাতে চেয়েছি। এ রকম একটি বিষয় ফ্রেমের পর ফ্রেমে এঁকে তুলে ধরার ব্যাপারটি বেশ কষ্টসাধ্য। এমনও হয়েছে যে ঠিকমতো শেষ করতে পারব কি না তা নিয়ে সংশয়ে ছিলাম। কারণ অ্যানিমেশনে গল্প বলার ধরনটাও বেশ ভিন্ন।’ ভবিষ্যতেও সমাজের অসংগতিগুলো অ্যানিমেশনের মাধ্যমে তুলে ধরতে চান তিনি। ছবি : ফায়জা জেরিন

মন্তব্য