kalerkantho

বৃহস্পতিবার । ২৭ জুন ২০১৯। ১৩ আষাঢ় ১৪২৬। ২৩ শাওয়াল ১৪৪০

সব্যসাচী সাবিনা

বাংলাদেশের মেয়েদের ফুটবলে সেরা স্ট্রাইকার সাবিনা খাতুন। জাতীয় দলে নেতৃত্ব দেওয়ার পাশাপাশি বিদেশি লিগও মাতিয়েছেন। তাঁর অলরাউন্ড নৈপুণ্যে বঙ্গবন্ধু আন্ত বিশ্ববিদ্যালয় স্পোর্টস চ্যাম্পিয়নশিপে ফুটবল, ক্রিকেট ও হ্যান্ডবলে স্বর্ণপদক জিতেছে গণবিশ্ববিদ্যালয়। সেখানকার সমাজকর্ম ও সমাজবিজ্ঞান বিষয়ের এ ছাত্রীকে নিয়ে লিখেছেন মোহাম্মদ রনি খাঁ

৮ মে, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



সব্যসাচী সাবিনা

তখন ২০১৪ সাল। সেপ্টেম্বরের শুরুর দিকে গণবিশ্ববিদ্যালয়ে প্রথমবারের মতো আন্ত বিভাগীয় প্রমীলা ফুটবল আয়োজনের প্রস্তুতি চলছিল। বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ ভাবল, প্রতিযোগিতার আগে মেয়েদের প্রশিক্ষণ এবং অনুশীলন দরকার। তখন প্রশিক্ষক হিসেবে বাংলাদেশ জাতীয় মহিলা ফুটবল দলের ফরোয়ার্ড সাবিনা খাতুনকে নিয়ে আসা হলো। তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ের মেয়েদের ফুটবলের কলাকৌশল দেখিয়ে দিচ্ছিলেন। এভাবেই একদিন কথায় কথায় বিশ্ববিদ্যালয়ের রেজিস্ট্রার দেলোয়ার হোসেন জানতে পারলেন, সাবিনা এখনো উচ্চ মাধ্যমিকের গণ্ডি পার হননি। তখন তিনি সাবিনাকে বললেন, ‘এইচএসসি শেষে গণবিশ্ববিদ্যালয়ের কলা ও সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদের যেকোনো বিষয়ে ভর্তি হতে পারো।’ সাবিনাও হাসিমুখে সায় দিলেন।

২০১৮ সাল। উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে এইচএসসি পাসের পর ভর্তি হলেন গণবিশ্ববিদ্যালয়ে। সমাজকর্ম ও সমাজবিজ্ঞান বিভাগে। এখন তিনি তৃতীয় সেমিস্টারের ছাত্রী।

মন যার সারাক্ষণ বিচরণ করে মাঠের আঙিনায়, ক্যাম্পাসের ছকে বাঁধা ক্লাস কি তাঁর হূদয় প্রশান্ত থাকে? সাবিনা জানালেন, ‘অন্যান্য শিক্ষার্থীর যেমন নিয়মিত ক্লাস, সাপ্তাহিক-মাসিক পরীক্ষায় বসতে হয়; আমার ক্ষেত্রে ঠিক তেমনটা নয়। জাতীয় দলের খেলা থাকলে ক্যাম্পেই সময় কাটে বেশি। ক্লাস করা হয় না। অন্যান্য সময় ক্লাসে থাকি।’ এ জন্য স্যারদের কাছে কৃতজ্ঞ সাবিনা। বললেন, ‘স্যাররা আমাকে অনেক সাহায্য করেন। নিয়মিত খোঁজ-খবর নেন। জাতীয় দলের খেলার সময় ক্লাস পরীক্ষা থাকলে পরীক্ষাগুলো পরবর্তী সময় নিয়ে থাকেন।’

বছরের অনেকটা সময়জুড়ে জাতীয় দল, বিভিন্ন লিগের খেলা থাকে। সাবিনাও সেসব নিয়ে ব্যস্ত থাকেন। ফলে বন্ধুরা তাঁকে ক্যাম্পাসে পায় খুব কম সময়ই। তাই সাবিনা যেদিন ক্যাম্পাসে আসেন তার আগেই খবর রটে যায়—সাবিনা আসছেন। ক্যাম্পাসে খেলাপাগল ছাত্রীদের মধ্যে উদ্দীপনার সঞ্চার হয়। আড্ডা-গল্পে তাদের মাতিয়ে রাখেন সাবিনা।

প্রথমবারের মতো আয়োজিত বঙ্গবন্ধু আন্ত বিশ্ববিদ্যালয় স্পোর্টস চ্যাম্পিয়নশিপে ফুটবলে চ্যাম্পিয়ন হয়েছে গণবিশ্ববিদ্যালয়। জাতীয় দলের ক্যাম্প থাকায় গ্রুপ পর্বের প্রথম ম্যাচ খেলতে পারেননি সাবিনা। দ্বিতীয় ম্যাচে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের বিপক্ষে একাই পাঁচ গোল করেন। ফাইনালে সাবিনার হ্যাটট্রিকের সুবাদে তাঁর দল ৭-০ গোলের ব্যবধানে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়কে হারিয়ে স্বর্ণপদক অর্জন করে।

শুধু ফুটবল নয়, ক্রিকেটেও দারুণ সিদ্ধহস্ত সাবিনা। গণবিশ্ববিদ্যালয় নারী ক্রিকেট দলের অধিনায়ক তিনি। সদ্য সমাপ্ত বঙ্গবন্ধু আন্ত বিশ্ববিদ্যালয় স্পোর্টস চ্যাম্পিয়নশিপে নারী ক্রিকেটের ফাইনালে তাঁর অলরাউন্ড পারফরমেন্সের কারণে চ্যাম্পিয়ন হয়েছে গণবিশ্ববিদ্যালয়। ধারাবাহিকভাবে ভালো খেলে দলকে ফাইনালে তুলেছেন। ফাইনাল ম্যাচে ব্যাট হাতে হাফ সেঞ্চুরি ও বল হাতে তিন উইকেট নিয়ে ম্যান অব দ্য সিরিজও হয়েছেন তিনি। একই প্রতিযোগিতায় হ্যান্ডবলে   স্বণপদর্ক অর্জন করে গণবিশ্ববিদ্যালয়। সেখানে অনবদ্য ভূমিকা ছিল সাবিনার। হ্যান্ডবলের ফাইনালে সাত গোল করেন সাবিনা। এতে ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের বিপক্ষে ২৫-১৪ গোলের ব্যবধানে জয় পায় গণবিশ্ববিদ্যালয়।

সব সময় গণবিশ্ববিদ্যালয়ের খেলোয়াড়দের পরামর্শ ও উত্সাহ দেন সাবিনা। তিনি মনে করেন, যেভাবে বাংলাদেশের ফুটবল এগিয়ে যাচ্ছে, এতে শিগগিরই মেয়েদের ফুটবল একটি ভালো পর্যায়ে চলে যাবে।

সমাজবিজ্ঞান ও সমাজকর্ম বিভাগের শিক্ষক সুজন মিয়া বলেন, ‘সাবিনার মতো তারকাকে পেয়ে আমরা গর্বিত। সে খুবই বিনয়ী। আমাদের সঙ্গে সর্বদা যোগাযোগ রাখে।’ বিশ্ববিদ্যালয়ের বায়োকেমিস্ট্রি অ্যান্ড মলিকুলার বায়োলজি বিভাগের শিক্ষার্থী রাকিবুল হাসান বলেন, ‘সাবিনা আপু খুবই আন্তরিক। আমাদের সঙ্গে তারকাসুলভ আচরণ করেন না। বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতি তাঁর অন্য রকম একটা ভালোবাসা আছে।’

সাতক্ষীরার মেয়ে সাবিনা। সৈয়দ গাজী ও মমতাজ বেগমের চতুর্থ সন্তান। ২০০৯ সাল থেকেই ফুটবলের সঙ্গে সম্পর্ক তাঁর। ফুটবলের হাতেখড়ি সাতক্ষীরা জেলা ফুটবল কোচ আকবরের মাধ্যমেই। আন্ত স্কুল ও আন্ত জেলা পর্যায়ে খেলে নজর কেড়েছেন ফুটবলপ্রেমীদের। সে সুবাদে ডাক পান জাতীয় মহিলা দলে। ২০০৯ সালের ডিসেম্বরে জাতীয় দলে অভিষেক হয় সাবিনার। এখন তিনি দলটির অধিনায়ক। ব্রাজিলের ফুটবল তারকা মার্তাকে আদর্শ হিসেবে মানেন সাবিনা খাতুন। বাংলাদেশের প্রথম মহিলা ফুটবলার হিসেবে মালদ্বীপ এবং ভারতের লিগেও খেলেছেন। স্বপ্ন দেখেন ভবিষ্যতেও আন্তর্জাতিক লিগে অংশগ্রহণ করার। জাতীয় দলে থেকে অবসরে যাওয়ার পরে কোনো না কোনোভাবে জাতীয় দলের সঙ্গে নিজেকে সংযুক্ত রাখতে চান।

 

ক্যাম্পাসে সহপাঠীদের সঙ্গে সাবিনা (ডান থেকে তৃতীয়)। ছবি : রনি খাঁ

 

 


খবরটি ইউনিকোড থেকে বাংলা বিজয় ফন্টে কনভার্ট করা যাবে কালের কণ্ঠ Bangla Converter দিয়ে

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা