kalerkantho

সোমবার । ২৪ জুন ২০১৯। ১০ আষাঢ় ১৪২৬। ২০ শাওয়াল ১৪৪০

উদ্যোগ

আমাদের স্বপ্নকলি

হ্যাপি নাটোর নামে স্বেচ্ছাসেবকদের একটি প্রতিষ্ঠান সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের পড়ালেখা শেখাচ্ছে। বিস্তারিত জানাচ্ছেন স্কুলের শিক্ষক ও হ্যাপি নাটোরের সদস্য মোস্তাফিজুর রহমান সৈকত

১ মে, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৩ মিনিটে



আমাদের স্বপ্নকলি

২০১৫ সাল। আমাদের স্বেচ্ছাসেবকদের সংগঠন হ্যাপি নাটোরের কর্মীরা ভাবল নাটোরের রেলস্টেশনের আশপাশের সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের পড়ালেখা শেখাতে হবে। কিন্তু স্টেশনের বস্তি, প্ল্যাটফর্ম, সাঁওতাল পল্লী, হরিজন পল্লীসহ বেশ কিছু এলাকায় ঘুরেও প্রথম দিকে সাড়া মিলল না। শেষ পর্যন্ত হরিজন পল্লীর কিছু পরিবার শিশুদের আমাদের স্কুলে পাঠাতে আগ্রহ দেখাল। সেখান থেকে ১০ জন এবং স্টেশনের সামনের বস্তি থেকে পাঁচজন শিশুসহ মোট ১৫ জন শিশু নিয়ে যাত্রা শুরু স্বপ্নকলি স্কুলের। শিক্ষার্থী তো পাওয়া গেল, কিন্তু পড়ানোর কোনো কক্ষ ছিল না আমাদের। পাশে দাঁড়ালেন স্বপ্নপূরণ মহিলা সমিতির সভাপতি সুফিয়া আপু। তিনি তাঁর অফিসরুমটা প্রতিদিন তিন ঘণ্টা ব্যবহারের জন্য ছেড়ে দিলেন। শুরু হলো আমাদের স্বপ্নের স্কুল। ক্লাসরুম সাজালাম, কিছু রং পেনসিল কিনলাম, শিক্ষা অফিসে যোগাযোগ করে বইয়ের ব্যবস্থা করলাম, সবাই চাঁদা দিয়ে স্লেট, চক কিনলাম, কিছু কবিতা এবং গল্পের বই সংগ্রহ করলাম। আমি এবং তনয় ক্লাস নেওয়া শুরু করলাম। বেশ ভালোই চলছিল সব কিছু। ২০১৬ সালে স্বপ্নপূরণ মহিলা সমিতি তাদের অফিস ছেড়ে দেয়। আমরা পড়ে যাই বিপাকে। স্বপ্নকলি স্কুলের কী হবে? এ সময় দেখা হয় ইউসুফ নামের ওই এলাকার এক বাসিন্দার। ইউসুফ ভাই বললেন, স্টেশনের ০২ নম্বর প্ল্যাটফর্মের সামনে চামড়ার বাজারে একটা ঘর খালি আছে। সেই ঘরের মালিকের সঙ্গে কথা বলে ওটা ভাড়া নিই। পড়াশোনার মান ভালো হওয়া, বিনা মূল্যে পড়ার সুযোগ আর বাড়িতে বাড়িতে খোঁজ নেওয়ার ফলে আরো বেশ কিছু ছাত্র-ছাত্রী যোগ হলো। এবার আরো কিছু বিষয়ে মনোযোগ দিলাম। শিশুদের নিয়ে জাতীয় দিবস, আন্তর্জাতিক দিবস, বার্ষিক ক্রীড়া প্রতিযোগিতা, বার্ষিক শিক্ষা সফরসহ বিভিন্ন অনুষ্ঠানের আয়োজন শুরু করল হ্যাপি নাটোর। ঈদে প্রজেক্ট রঙিন জামা, প্রজেক্ট মজার খাবার এবং প্রজেক্ট রাঙা হাতের হাসির মাধ্যমে হ্যাপি নাটোর সব সময় সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের পাশে ছিল। বর্তমানে স্বপ্নকলি স্কুলে শিশু বিকাশ, প্রথম শ্রেণি এবং দ্বিতীয় শ্রেণিতে মোট ৮৩ জন শিশু শিক্ষা গ্রহণ করছে। এর নাম এখন বেশ ছড়িয়ে গেছে, কেউ কেউ অন্যের মুখে শুনেও পড়তে আসছে। যেমন রিমন ট্রেনে পানি বিক্রি করে, সে বন্ধু সঞ্জয়ের কাছ থেকে শুনে তার মাকে জানায় এখানে পড়তে চায়। আমরা ওর বাসায় গিয়ে ওকে ভর্তি করিয়ে নেই। এখন মনের আনন্দে ক্লাস করছে সে। সপ্তাহে একদিন মাল্টিমিডিয়া ক্লাস, চিত্রাঙ্কন, নৃত্যক্লাসসহ শিশুদের পড়শোনায় আরো মনোযোগী করার লক্ষ্যে কাজ করে যাচ্ছি আমরা। আমরা পাঁচজন ভলান্টিয়ার স্কুলে ক্লাস নিই। আমি মাল্টিমিডিয়া ক্লাস, সুষ্ময় দাস তনয় চিত্রাংকন এবং অভিনয় ক্লাস, মো. আসলাম আলী শিকদার শ্রেণি শিক্ষক, মোছা. আরমিনা ইসলাম রিতু শ্রেণি শিক্ষক এবং মো. সাজেদুল ইসলাম শারীরিক শিক্ষক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। প্রতিবছর স্বপ্নকলি স্কুলের শিশুরা স্বাধীনতা দিবস ও বিজয় দিবসে জেলা পর্যায়ে কুচকাওয়াজ এবং ডিসপ্লেতেও অংশ নেয়। হ্যাপি নাটোর চায় স্বপ্নকলি স্কুলকে আরো অনেক দূর নিয়ে যেতে। সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের স্কুল হবে স্বপ্নের মতো সুন্দর। ভবিষ্যতে স্বপ্নকলি স্কুল হবে নাটোর জেলার প্রতিটি স্টেশনে এই প্রত্যাশায় কাজ করছি আমরা।

মন্তব্য