kalerkantho

বৃহস্পতিবার । ২৭ জুন ২০১৯। ১৩ আষাঢ় ১৪২৬। ২৩ শাওয়াল ১৪৪০

ম্যারাথনের মাহফুজ

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের ইনস্টিটিউট অব ইনফরমেশন টেকনোলজির ছাত্র মাহফুজুল হক। ম্যারাথনে অংশ নিয়ে জিতেছেন অনেক পুরস্কার। তাঁকে নিয়ে লিখেছেন আবু নাঈম তরুণ

১ মে, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



ম্যারাথনের মাহফুজ

ঢাকা হাফ ম্যারাথনে দৌঁড়াচ্ছেন মাহফুজ

পুরো নাম এম মাহফুজুল হক। বন্ধুরা ডাকে, ‘ম্যারাথনের মাহফুজ’ বলে। ছোটবেলা থেকেই চঞ্চল প্রকৃতির। খেলাধুলায়ই বেশি মত্ত থাকতেন। সুযোগ পেলেই বন্ধুদের সঙ্গে মাঠে চলে যেতেন। এ জন্য মা-বাবার বকুনিও কম খেতে হয়নি। তাতেও কাজ হচ্ছে না দেখে একপর্যায়ে ছেলেকে ঢাকা রেসিডেন্সিয়াল মডেল কলেজে ভর্তি করিয়ে দেওয়া হলো। উদ্দেশ্য, খেলা থেকে দূরে রেখে পড়াশোনায় মনোযোগী করা। কিন্তু এটা যেন মাহফুজের জন্য শাপে বর হলো। এখানে তিনি আগের চেয়ে আরো বেশি খেলার সুযোগ পান। বিভিন্ন প্রতিযোগিতায় অংশ নিয়ে ভারী করতে থাকেন পুরস্কারের ঝুলি। সেই স্কুলপর্যায় থেকে শুরু করে বিশ্ববিদ্যালয়—পড়ালেখার পাশাপাশি খেলাধুলাও চালিয়ে যাচ্ছেন সমানতালে। দীর্ঘ হচ্ছে পুরস্কারের তালিকা। এ তালিকায় সর্বশেষ সংযোজন বঙ্গবন্ধু আন্ত বিশ্ববিদ্যালয় স্পোর্টস চ্যাম্পিয়নশিপে স্বর্ণপদক। প্রথমবারের মতো আয়োজিত এই প্রতিযোগিতার মিনি ম্যারাথন ক্যাটাগরিতে সেরা হয়েছেন মাহফুজ। সাড়ে পাঁচ কিলোমিটারের এই মিনি ম্যারাথন অনুষ্ঠিত হয় রাজধানীর হাতিরঝিলে। সেখানে ৩৫ জন প্রতিযোগীকে পেছনে ফেলে মাত্র ১৮ মিনিট ২৯ সেকেন্ডে গন্তব্যে পৌঁছান তিনি।

মাহফুজ জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের ইনস্টিটিউট অব ইনফরমেশন টেকনোলজির মাস্টার্সের শিক্ষার্থী। থাকেন আ ফ ম কামাল উদ্দিন হলে। গ্রামের বাড়ি বগুড়ায়। বাবার চাকরির সুবাদে শৈশব-কৈশোর কেটেছে ঢাকার মোহাম্মদপুরে। মা-বাবা আর ছোট ভাইকে নিয়ে তাঁদের পরিবার।

এখন পর্যন্ত তিনি বিভিন্ন প্রতিযোগিতায় সর্বোচ্চ ২ মিনিট ১৫ সেকেন্ডে ৮০০ মিটার, ৪ মিনিট ৪৯ সেকেন্ডে ১৫০০ মিটার, ১৭ মিনিট ৩৩ সেকেন্ডে পাঁচ হাজার মিটার এবং ৩৮ মিনিট সময়ের মধ্যে ১২ হাজার মিটার পথ দৌড়ে অতিক্রম করেছেন।

অবশ্য খেলাধুলায় মাহফুজের প্রথম প্রেমের নাম দৌড় নয়, ফুটবল। ছোটবেলা থেকেই মনেপ্রাণে ফুটবলার হতে চেয়েছিলেন। স্কুলে বার্ষিক ক্রীড়া প্রতিযোগিতায় ফুটবলে খেলায় পুরস্কারও জিতেছেন। পাইওনিয়ার ফুটবল অনূর্ধ্ব ১৬তে শেরেবাংলা ফুটবল ক্লাবের হয়েও খেলেছেন। ওই টুর্নামেন্টে তিনটি হ্যাটট্রিকসহ ১৩ গোল করে সর্বোচ্চ গোলদাতা ছিলেন। তাহলে ফুটবল ছেড়ে দৌড়ে কেন এলেন? হাসিমুখে মাহফুজ বললেন, ‘না, ফুটবলের সঙ্গে একেবারে বিচ্ছেদ হয়নি। সময় পেলে খেলি। দৌড়বিদ হওয়ার গল্পটা মজার। ২০০৪ সাল। অলিম্পিক গেমস চলছে। সেবার আমাদের হোস্টেলে সিনিয়ররা প্রতীকী অলিম্পিকের আয়োজন করে। দুই কিলোমিটারের একটা দৌড় ছিল। বন্ধুদের অনুরোধে তাতে নাম লেখালাম। মজার ব্যাপার হলো, সেখানে প্রথম হলাম আমি। এরপর ফুটবল আর দৌড় সমানতালে চালিয়েছি।’

নবম শ্রেণিতে পড়ার সময় স্কুলের বার্ষিক ক্রীড়া প্রতিযোগিতায় ৮০০ মিটার ও ১৫০০ মিটার দৌড়ে দ্বিতীয় হয়েছিলেন। দশম শ্রেণিতে দুটিতেই সেরা হয়েছেন। কলেজে ভর্তির পর ইন্টার কলেজ অ্যানুয়াল স্পোর্টসে ঢাকা জোনে ২০১১ থেকে ২০১৩ সাল পর্যন্ত পরপর তিনবার ৮০০ ও ১৫০০ মিটার দৌড়ে সেরা হয়েছিলেন। হোস্টেল পালিয়েও একবার ফুটবল খেলায় অংশ নিয়েছিলেন। তখন মাহফুজের এসএসসি পরীক্ষা চলছে। ইংরেজি দ্বিতীয় পত্রের পরীক্ষার ঠিক আগের দিন ছিল পাইওনিয়ার ফুটবল অনূর্ধ্ব ১৬-এর সুপার লিগের খেলা। বিকেলে হোস্টেল পালিয়ে চলে যান মাঠে। দলকে জিতিয়ে তবেই ফিরেছিলেন।

মাহফুজ খেলাপাগল। তবে পড়াশোনা ঠিক রেখেই করেন সব কিছু। এসএসসি ও এইচএসসিতে জিপিএ ৫ পেয়েছেন।

কলেজের পাট চুকিয়ে ভর্তি হন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে। ক্যাম্পাসে এসেই প্রথম অংশ নেন ৫ কিলোমিটার

ও ১০ কিলোমিটার ম্যারাথনে। ২০১৫ সালে বিশ্ববিদ্যালয়ের বার্ষিক ক্রীড়া প্রতিযোগিতায়—দুই ক্যাটাগরিতেই চ্যাম্পিয়ন হন। ৮০০ মিটারে হন দ্বিতীয়। মাহফুজের প্রথম কোচ সাদাত হোসেন। বললেন, ‘সাদাত স্যারই প্রথম আমাকে লং ডিস্ট্যান্স রানিংয়ে উত্সাহ দেন। তিনি আমাকে স্বর্ণপদকের স্বপ্ন দেখাতেন। আর আলট্রা রানিংয়ে শামসুজ্জামান আরাফাতের কাছ থেকে অনেক কিছু শিখেছি। এ ছাড়াও আব্দুল্লাহ তাহির চৌধুরী ও রাকিবুল ইসলামের নামও বলতে হয়। তাঁরাও যথেষ্ট সাপোর্ট দিয়েছেন।’

২০১৮ সালে প্রথমবারের মতো ঢাকা হাফ ম্যারাথনে অংশগ্রহণ করেন মাহফুজ। ২১.১ কিলোমিটারের এ ম্যারাথনে ১২০০-এর বেশি প্রতিযোগী অংশ নেয়। দ্বিতীয় রানার আপ হন মাহফুজ। পরের বছর একই প্রতিযোগিতায় চ্যাম্পিয়ন হওয়ার গৌরব অর্জন করেন।

দেশের বাইরেও নানা প্রতিযোগিতায় নাম লিখিয়েছেন। গেল বছর ভারতের রাজস্থানে অনুষ্ঠিত ‘আলট্রা টাফম্যান ডেজার্ট চ্যাম্পিয়নশিপ ২০১৮’ এ অংশ নেওয়াকে নিজের সেরা অর্জন বলে মনে করেন মাহফুজ। প্রতিযোগিতায় দ্বিতীয় রানার আপ হয়েছিলেন। সেখানে ১৬১ কিলোমিটার দৌড়াতে সময় নেন ৩৩ ঘণ্টা ৫৭ মিনিট ২৯ সেকেন্ড। একই বছর টিএসকে ২৫ কিমি রান কলকাতা ২০১৮তেও অংশ নিয়েছিলেন। সেখানে ১৯তম হয়েছিলেন। যেকোনো প্রতিযোগিতার অংশ নিলে অন্তত এক সপ্তাহ আগে থেকে প্রস্তুতি নেন মাহফুজ। বললেন, ‘কত কিলোমিটার দৌড়াতে হবে সে অনুযায়ী সম্ভাব্য সময় ঠিক করি। পরে কেন্দ্রীয় খেলার মাঠে দৌড়াই। আর প্রতিযোগিতা ঘনিয়ে এলে দুই দিন আগে বিশ্রাম নিই। প্রাকটিসের সময় ডায়েট চার্ট মেনে চলি। অন্য যেকোনো খেলার চেয়ে ম্যারাথনে ঝুঁকি বেশি। শুরুর দিকে ছোটখাটো চোটেও পড়েছিলাম। এখন অভ্যস্ত হয়ে গেছি।’

মাহফুজ এখন স্বপ্ন দেখেন দেশের হয়ে ইন্টারন্যাশনাল রানিং ইভেন্টে পোডিয়াম অর্জন করার। সামনের লাদাখ ম্যারাথনে অংশ নেওয়ার ইচ্ছা আছে। মাল্টিস্টেজ রানিং ইভেন্ট যেখানে প্রতিযোগীদের পাঁচ দিনে মরক্কোর সাহারা মরুভূমিতে ২৫৭ কিলোমিটার দূরত্ব অতিক্রম করতে হয়। সেখানেও দৌড়াতে চান তিনি। সুযোগ পেলে বিগ সিক্স ম্যারাথনের সবটিতে অংশ নিতে চান।


খবরটি ইউনিকোড থেকে বাংলা বিজয় ফন্টে কনভার্ট করা যাবে কালের কণ্ঠ Bangla Converter দিয়ে

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা