kalerkantho

সোমবার । ২৪ জুন ২০১৯। ১০ আষাঢ় ১৪২৬। ২০ শাওয়াল ১৪৪০

জায়ান যেমন ছিল

শ্রীলঙ্কায় সন্ত্রাসী হামলায় নিহত বাংলাদেশি শিশু জায়ান চৌধুরী ছিল সানবিম্স স্কুলের ওয়ানের ছাত্র। প্রিয় ছাত্র ও সহপাঠীর হঠাত্ মৃত্যুতে যেন থমকে গেছে পুরো স্কুলই। জায়ানকে নিয়ে স্মৃতিচারণা করেছেন তার দুই শিক্ষক

১ মে, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে




জায়ান যেমন ছিল

স্কুলে শিক্ষিকা এবং সহপাঠীদের সঙ্গে জায়ান (দাঁড়ানোদের মধ্যে ডান থেকে চতুর্থ)

ও খুব হেল্পফুল বাচ্চা সবাইকে সহায্য করতে চাইত

 

সৈয়েদা ফেরদৌস হাসিন, শ্রেণিশিক্ষক, কেজি ওয়ান

 জায়ান ২০১৪-১৫ শিক্ষাবর্ষের প্লে গ্রুপে ভর্তি হয়। যখন কেজি ওয়ানে পড়ে, তখন আমি ছিলাম ওর ক্লাসটিচার। ক্লাসের কারো মনে কষ্ট দিত না জায়ান। বন্ধুদের খুব খেয়াল রাখত। বন্ধুদের পাশে গিয়ে বসত, আবার ওর পাশে নিয়েও বসাত। কেউ যদি রংপেনসিল আনতে ভুলে যেত, নিজেরটা দিয়ে সাহায্য করত। ও খুব হেল্পফুল বাচ্চা, সবাইকে সহায্য করতে চাইত। কখনো কারো বিরুদ্ধে অভিযোগ করত না। খুব গোছানো ছিল, নিজের জিনিসপত্র যত্ন করে গুছিয়ে রাখত। সব বিষয়ে খুব মনোযোগীও ছিল। সাধারণত ছোটদের একটা কথা বারবার বলে দিতে হয়। কিন্তু জায়ানকে একটা বিষয় একবার বলে দিলে কখনো ভুল করত না। বলত, ‘মিস বলে দিয়েছেন’। স্কুলেও ঠিক সময়মতো আসত। বেশির ভাগ সময় ওর বাবাই স্কুলে নিয়ে আসতেন। মামাতো ভাই-বোনদের সঙ্গেও আসত। ওর মামাতো ভাই জায়দানও আমাদের স্কুলে পড়ে। জায়ানের থেকে এক বছরের ছোট জায়দান। জায়ান যখন কেজি ওয়ানে পড়ে, জায়দান তখন নার্সারিতে। জায়ান ওকে অনেক আদর করত। প্রতিদিন স্কুল থেকে বাসায় ফিরে যাওয়ার সময় জায়দানকে এত আদর করে হাত ধরে নিয়ে যেত, ওই দৃশ্যটাই আমাদের সবার কাছে স্মৃতি হয়ে থাকবে। বন্ধুদের কাছেও জায়ান ছিল খুব জনপ্রিয়। জায়ানের ব্যাপারে তারা কখনো অভিযোগ করেনি। জায়ান খেলতে পছন্দ করত। ভালোবাসত ফুটবল, ক্রিকেট। জায়ান মারা যাওয়ার পর আমরা ওর সম্পর্কে স্কুলের অন্যদের লিখতে বলেছিলাম। ওর এক বন্ধু লিখেছে, ‘ফুটবল খেলায় যেই দল হেরে যেত, সেই দলের প্লেয়াররা সাধারণত গোলকিপারকে দায়ী করত। কারণ গোলকিপার বল ঠেকাতে পারেনি। তাই বেশি গোল খেয়ে হেরে গেছে। কিন্তু জায়ানের এই ধরনের অভিযোগ ছিল না।’

জায়ান ঠিকঠাক হোমওয়ার্ক করে নিয়ে আসত। ক্লাসের পড়া দিত। ওর একটা ভালো গুণ হলো—খুব ভালো কোরআন তেলাওয়াত করতে পারত। বছরের শেষে আমাদের স্কুলে একটা বড় অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। তখন আমাদের অনেক দায়িত্ব থাকে। ওদের আমরা আগে থেকেই শিখিয়ে দিই কখন কী করতে হবে। জায়ান নিজে থেকেই দায়িত্ব নিয়ে নিত, যেন আমাদেরই একজন প্রতিনিধি। বন্ধুদের বলত, ‘চলো রেডি হয়ে যাই’। একটা দায়িত্ববোধ ছিল ওর মধ্যে। নিজে সচেতন থাকত, আবার বন্ধুদেরও সচেতন করে দিত।

ওই হাসিটাই সব সময় ওর মুখে লেগে থাকত

সুমাইয়া ইসলাম, বাংলা শিক্ষক, ওয়ান

জায়ান আমার খুব ভালো ছাত্র ছিল। দুই বছর ধরে ও আমার কাছে পড়ছে। গত বছর (কেজি টু) আমি ওর ক্লাস টিচার ছিলাম। এ বছর (ওয়ান) বাংলা পড়িয়েছি। ক্রিকেট ছিল ওর সবচেয়ে প্রিয় খেলা। ক্লাসের সবার প্রতি ওর খুব মায়া ছিল। খুবই নম্র, ভদ্র ও স্বল্পভাষী একটা বাচ্চা। পত্রিকায় হাসি দেওয়া যে ছবিটি দেখা যায়, ওই হাসিটাই সব সময় ওর মুখে লেগে থাকত। বন্ধুদের সঙ্গে নিয়ে চলত। আমাদের সঙ্গে গল্প ভাগাভাগি করত। বাসায় কোনো মজার ঘটনা ঘটলে সেটাও আমাদের বলত। যখন একটা ছোট ভাই হলো, সবার আগে ও-ই আমাদের জানিয়েছে। আমাদের কাছে এসে বলেছে, ‘মিস, আমার একটা ছোট ভাই হয়েছে, ভাইয়ের নাম রেখেছি জোহান।’ বাংলা ক্লাসে ওকে যখন লিখতে দিতাম বাবা, মা ও ভাইকে নিয়ে বাক্য লিখত—‘আমার ভাইয়ের নাম জোহান। আমি ভাইয়ের সঙ্গে খেলতে পছন্দ করি।’ জায়ানের পছন্দের খাবার ছিল বার্গার। প্রতিদিন টিফিন নিয়ে আসত। সুন্দর করে গুছিয়ে পরিপাটি হয়ে খেত। জায়ান ওর বন্ধুদের সঙ্গে চিপস ভাগাভাগি করে খেত। খুব নিয়মের মধ্যে চলত। শিক্ষদের সঙ্গে ওর খুব ভালো সম্পর্ক গড়ে উঠেছিল। আমরা যা বলতাম মেনে নিত। অনেক সময় অন্য বাচ্চারা প্রশ্ন করে যে কেন করব? কিন্তু ও কখনো প্রশ্ন করত না। ও বলত, টিচার বলেছে, এটা করতে হবে। টিচারকে খুশি করার জন্য ও আপ্রাণ চেষ্টা করত। পড়ার ভেতরে নতুন বিষয় পেলে জানতে চাইত। জানার আগ্রহ ছিল খুব।     

অনুলিখন : আব্দুর রাজ্জাক

মন্তব্য