kalerkantho

সোমবার । ২৪ জুন ২০১৯। ১০ আষাঢ় ১৪২৬। ২০ শাওয়াল ১৪৪০

পাঁচরুখীর মেয়েদের রুখবে কে?

বঙ্গমাতা গোল্ডকাপ প্রাথমিক বিদ্যালয় ফুটবল টুর্নামেন্টে চ্যাম্পিয়ন হয়েছে পাঁচরুখী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের মেয়েরা। এদের কারো বাবা রিকশাচালক, কারো বাবা কাঠুরে। দারিদ্র্যকে জয় করা তাদের এই সাফল্যের গল্প শুনিয়েছেন আলম ফরাজী

২৪ এপ্রিল, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৯ মিনিটে




পাঁচরুখীর মেয়েদের রুখবে কে?

গোল, গোল। প্রমি আক্তার তাসমির ফ্রি কিকে বল জড়াল জালে। আর আনন্দে ভাসল পাঁচরুখীর মেয়েরা। আনন্দ স্থায়ী হলো খেলা শেষেও। ওই এক গোলই যে ভাগ্য নির্ধারণ করে দেয় বঙ্গমাতা শেখ ফজিলাতুন্নেছা মুজিব গোল্ডকাপ প্রাথমিক বিদ্যালয় ফুটবল টুর্নামেন্টের ফাইনালের। রংপুর বিভাগের একটি দলকে হারিয়ে চ্যাম্পিয়ন হয়ে যায় বিদ্যালয়টি।

 

সাফল্যের ধারাবাহিকতায়

বাংলাদেশের নারী ফুটবলের বিজ্ঞাপন হয়ে যাওয়া কলসিন্দুরের মেয়েদের কথা সবারই মনে আছে। রীতিমতো অপরাজেয় হয়ে উঠেছিল তারা। কিন্তু গত কয়েক বছরে তিন-তিনবার তাদের হারিয়ে চমকে দেয় ময়মনসিংহের নান্দাইলের পাঁচরুখী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের মেয়েরা। গত বছর বঙ্গমাতা গোল্ডকাপের ফাইনালে তারা তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ খেলায় টাইব্রেকারে হেরে রানার্স-আপ হয়েছিল। আর এবার তো চ্যাম্পিয়নই হয়ে গেল।

 

সব বাধা পেরিয়ে

শহর থেকে দূরের প্রত্যন্ত অঞ্চলের বাসিন্দা প্রমি আক্তার তাসমি, রোকসানা, সুইটি, প্রীতি, স্বর্ণা, মদিনা, পান্না, সাবা, হালিমা, সুবর্ণা, রুপালি, স্বপ্না, তানিয়া, রুনা, প্রীতি (ছোট), পুতুল ও মীম। ওই মেয়েদের পরিবারের অবস্থা ভারি নাজুক। রোকসানার বাবা আব্দুল জব্বার, তানিয়ার বাবা দুলাল মিয়া, রুনার বাবা শহীদ মিয়া রিকশাচালক। সুইটি, প্রীতি, মদিনার বাবা দিনমজুর। তা ছাড়া কারো কারো বাবারা পরের জমিতে কাজ করে জীবিকা নির্বাহ করেন। নুন আনতে পান্তা ফুরোয় অবস্থা যাকে বলে। বিদ্যালয়ের মাঠের অবস্থা খুবই খারাপ। তা ছাড়া প্রত্যন্ত গ্রামের মধ্যে মেয়েদের খেলা অনেকেই ভালো চোখে দেখে না। ফলে বিভিন্ন ধরনের কথাবার্তা শুনে মেয়েরা মানসিকভাবে ভেঙে পড়ে। এ অবস্থায় প্রায় ১৫ কিলোমিটার দূরে সদরে এসে চণ্ডীপাশা সরকারি উচ্চ বিদ্যালয় খেলার মাঠে অনুশীলন করত। এখানেও ছিল সমস্যা। উঠতি বয়সের  বিভিন্ন পাড়ার ছেলেরা বিকেল হলেই মাঠ দখলে রাখত। এ অবস্থায় তাদের পাশ কাটিয়েই এক চিলতে জায়গায় চলত অনুশীলন। কঠোর এই অনুশীলনের পর গত বছর রানার্স-আপ হওয়ায় এই মেয়েদের নিয়ে আর কোনো ধরনের মাতামাতি ছিল না কারো। অনেকটা অবহেলা ও অনাদরে ছিল তারা। প্রশাসনেও একটা গাছাড়া ভাব ছিল। প্রয়োজনীয় সরঞ্জামের ছিল অভাব। কোচের পারিশ্রমিক দিতে না পারায় একসময় কোচও ছেড়ে চলে যান। পরে ধার করে কয়েক মাসের পারিশ্রমিক পরিশোধ করে ফিরিয়ে আনা হয় কোচকে। খাবারের অভাবে শারীরিক দুর্বলতার কারণে অনুশীলনেও ভাটা পড়ত। তবে অনুশীলনে হাঁফিয়ে ওঠা মেয়েরা হাল ছাড়েনি। থেমে যাননি বিদ্যালয়ের শিক্ষক ও সহকারী কোচ দেলোয়ার হোসেন উজ্জ্বল। কোচ মকবুল হোসেনের তত্ত্বাবধানে মেয়েদের প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করেছেন। মকবুল হোসেন এর আগে কলসিন্দুরের মেয়েদের প্রশিক্ষণ দিয়েছেন। স্থানীয় সংসদ সদস্য আনোয়ারুল আবেদীন খানের সাহায্য ও মেয়েদের অদম্য মনোবলের কারণে অবশেষে বড় একটা সাফল্য আসে।

 

ওদের কথা

চূড়ান্ত খেলায় দলের ক্যাপ্টেন প্রমি আক্তার তাসমির একমাত্র গোলে দলটি চ্যাম্পিয়ন হয়। বাবা আব্দুল মোতালেব ঢাকায় একটি পোশাক কারখানায় চাকরি করেন। মা করুণা বেগম জানান, তিনি মেয়েকে প্রথমে খেলায় দিতে চাননি। এলাকার লোকজন বাজে কথা বলত। এরপর মেয়ের প্রবল ইচ্ছার কারণেই আর বাধা দেননি। এখন মেয়ের সাফল্যে তিনি অনেক খুশি। প্রমি বলে, ‘ফাইনাল খেলায় রংপুর বিভাগের লালমনিরহাট জেলার টেপুরগাড়ী বিকে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সঙ্গে লড়ছি। প্রথমার্ধে কোনো গোল হয়নি। দ্বিতীয়ার্ধে খেলা শুরু হওয়ার ৫ মিনিটের মধ্যেই প্রীতির দূরপাল্লার শটে গোল পেয়ে যাই। কিন্তু তার পরই গোল বাতিলের সিদ্ধান্ত। সবাই যেন আকাশ থেকে পড়ল। এ অবস্থায় আমাদের সহকারী কোচ দেলোয়ার হোসেন উজ্জ্বল স্যারের প্রতিবাদ। পুরো মাঠে প্রতিবাদের ঝড়। কিন্তু কেউ কথা শুনল না—এ অবস্থায় মাঠের মধ্যে কান্নায় ভেঙে পড়েন উজ্জ্বল স্যার। অবশেষে নিরাপত্তারক্ষীরা এসে তাকে সান্ত্বনা দিয়ে নিয়ে যান। খেলা চলছে। ঠিক দুই মিনিট পরই আবারও গোল। এবার গোল করলাম আমি। একটা জেদ কাজ করছিল মনের মধ্যে। গোল আমাকে করতেই হবে। এ গোলেই আমরা চ্যাম্পিয়ন।

রোকসানার বাবা রিকশাচালক আব্দুল জব্বার জানান, তাঁর বয়স ষাটের ওপর। এরই মধ্যে শরীরে বিভিন্ন ধরনের রোগ দেখা দিয়েছে। তার পরও ছয় সদস্যের সংসারে রিকশা চালিয়ে জীবিকা নির্বাহ করেন। কাকডাকা ভোরে রিকশা নিয়ে বের হয়ে মাগরিবের নামাজের আগেই বাড়িতে চলে আসেন। এরপর বাড়ির পাশে মসজিদেই সময় দেন। মেয়ে ফুটবল খেলে—এ জন্য এলাকার লোকজন তাঁকে ‘ভণ্ড’ বলে কানাঘুষাও করে। অনেকেই আবার প্রকাশ্যে বলে দেয়, মেয়েকে খেলাতেই যদি হয় তাহলে এলাকা ছেড়ে চলে যেতে। এত সবের পরও তিনি মেয়ের খেলায় বাধা দেননি। এক রকম একটি জেদ নিয়েই তিনি অপেক্ষা করেন সামনের দিনের জন্য। এর মধ্যেই খবর হয়, তাঁর মেয়ে রোকসানার দল চ্যাম্পিয়ন হয়েছে। সে-ও ভালো খেলেছে। আনন্দে আত্মহারা হয়ে অপেক্ষায় থাকেন মেয়ে আসার। এক দিন পর নান্দাইল আসে বিজয়ীরা। মেয়েকে নিতে আব্দুল জব্বার নিজের রিকশা নিয়ে ভোরবেলায়ই চলে আসেন নান্দাইল সদরে। কেউ আঁচ করতে পারেনি তিনিই রোকসানার বাবা। মাইক্রোবাস থেকে নেমেই খোলোয়াড়রা সবাই যে যার অভিভাবকদের সঙ্গে করে বিভিন্ন যানবাহনে নিজ এলাকার দিকে রওনা হচ্ছে। এমন সময় সবার দৃষ্টি পড়ে রোকসানার রিকশায় ওঠার দৃশ্য। তাকে নিয়ে এক বৃদ্ধ খুশিতে আত্মহারা হয়ে পেডাল চেপে চলে যাচ্ছেন। তাঁর পথরোধ করে জানতে চাইলে বলেন, ‘স্যার, আমারে আটকাইয়েন না। আমি ছেড়িডারে লইয়া গেরামে যাইয়াম। সারা দিন তারে লইয়া ঘুরবাম, হেরারে দেহাইয়াম আমি খারাপ না—আমার পরিবার খারাপ না। আমার মতো ভাগ্যবান কেলা, প্রধানমন্ত্রীর হাতে দেওয়া এই জিনিসটাই (ট্রফি) অহন আমার মেয়ের হাতে। আমার ছেড়িই অহন সবার ওপরে।’ এইভাবে কথা বলতে বলতে রিকশায় মেয়েকে চড়িয়ে সদর ছাড়েন।

জান্নাতুল মাওয়া রুনার বাবাও রিকশা চালান। মা মাজেদা খাতুন কাঁথা সেলাই করেন। রুনা জানায়, ‘হাফ প্যান্ট ও গেঞ্জি পরে খেলি, তা কেউ মানতে নারাজ। অবশেষে খেলাটাই ছাড়তে হলো। নিয়মিত স্কুলে গেলেও মন খারাপ করে সোজা বাড়িতে চলে আসতে হয়। কিন্তু মন মানেনি। একদিন সদরে থাকা এক আত্মীয়কে অনুরোধ করি আমাকে তাঁদের বাসায় একটু জায়গা করে দিতে। তাঁরা রাজি হওয়ায় এলাকা ছেড়ে চলে যাই সদরে। সেখানে থেকেই ১৫ কিলোমিটার দূরে বিদ্যালয়ে আসি। আর বিকেল হলেই অন্যদের সঙ্গে অনুশীলনে যোগ দিই। এ খবর এলাকায় পৌঁছলে মা-বাবাকেও এলাকা ছাড়ার নির্দেশ দেয় এলাকার কিছু লোক। কিন্তু শত বাধা উপেক্ষা করেও আমি আর খেলা ছাড়িনি। পিএসসি পরীক্ষায়ও ৪.৭৮ পেয়ে পাস করেছি। সেই সঙ্গে দলকে চ্যাম্পিয়ন করেছি। এখন কারো বাজে কথায় ভয় পাই না। মাধ্যমিক পর্যায়ের দলেও এখন সুযোগ পেয়েছি।’

রিকশাচালক বাবার মেয়ে তানিয়াও। তাকে সবাই গোল মেশিন বলে। তার পায়ে বল মানেই ধরে নেওয়া যায় এবার বিপক্ষের জালে বল যাবেই। পা ও মাথা একসঙ্গে চলে। লেখাপড়ায় আছে প্রখর মেধা। পঞ্চম শ্রেণিতে পড়ার পরও অন্য এক ভাইকে সে নিজেই পড়ায়। বাবার অর্থ নেই, তাই প্রাইভেট পড়ার সুযোগও নেই। অসুস্থ মাকে ঘরের কাজে সাহায্য করে। এরপর বিদ্যালয়ে নিয়মিত উপস্থিতি সবাইকে অবাক করে দেয়। তানিয়া জানায়, ‘যদি আরেকটু ভালামন্দ খাইতে পারতাম, তা অইলে দেহাইতাম।’

খুদে খেলোয়াড় পান্না আক্তার। মাত্র তৃতীয় শ্রেণিতে পড়ে। হালকা-পাতলা শরীর। দ্রুতগতির খেলায় সবার দৃষ্টি কাড়ে। বাবা গার্মেন্টকর্মী। তার মাকে নিয়ে ঢাকায় অবস্থান করছেন ছয় বছর ধরে। দাদি আহেলা খাতুনের কাছে থাকে দুই বোন। সেই খুদে পান্নাই প্রধানমন্ত্রীর হাত থেকে নিজের ব্যক্তিগত পুরস্কার আনতে গিয়ে প্রধানমন্ত্রীর হাত ধরে দাদি ডেকে সম্বোধন করা। ওই মঞ্চে দাঁড়িয়েই সে বলে ওঠে, ‘দাদি, আমরার ইস্কুলের মাঠ ভালা না, খেলতে পারি না। আপনে ঠিক কইর্যা দিবেন।’ প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তার এই কথায় মাথায় হাত রেখে মাঠ সংস্কারের প্রতিশ্রুতি দিলে পান্না খুশি মনে মঞ্চ ত্যাগ করে। টেলিভিশনের মাধ্যমে এই দৃশ্য দেখালে নিজ এলাকাসহ সারা দেশেই আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে চলে আসে পান্না।

সোনিয়া আক্তার প্রীতি পড়ে চতুর্থ শ্রেণিতে। তার বড় দুই বোনও ফুটবল খেলে। শ্রবণপ্রতিবন্ধী বাবা মোসলেম উদ্দিন একজন কাঠুরে। নান্দাইল পৌরসভার কাকচর মহল্লায় তাদের বাসা। এখান থেকে ১৫ কিলোমিটার দূরে তাদের নানাবাড়ি, ওই পাঁচরুখী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের পাশেই। সেখানে থেকেই ওই বিদ্যালয়ে পড়ে সুইটি ও প্রীতি। সুইটি গোলকিপার এবং প্রীতি ফরোয়ার্ডে খেলে। প্রীতি জানায়, মেয়েদের ফুটবল খেলা অনেকেই ভালো চোখে দেখে না। নানা কথা ছড়ায়। তার পরও পড়ালেখার পাশাপাশি নিয়মিত ফুটবল খেলা চালিয়ে যাচ্ছি। মা-বাবা উত্সাহ দেন। বাবার কথা একটাই—পড়া আর খেলা দুটিই সম্মানের। সুইটি বলে, আগে বাবা বাজার-সদাই যা-ই করতেন, এখন আমরার লাইগ্যা আলাদা করেন। নিজেরা কষ্ট করে হলেও আমাদের জন্য ভালো খাবারের ব্যবস্থা করেন।

 

কোচদের কথা

কোচ মকবুল হোসেন বলেন, ‘তিন বছর ধরে নান্দাইলের এই মেয়েদের প্রশিক্ষণ দিচ্ছি। এখানে সম্ভাবনাময় অনেক খেলোয়াড় আছে। তবে গ্রামাঞ্চলে মেয়েদের ফুটবল খেলাকে অনেকে ভালো চেখে দেখে না। অনেক ক্ষেত্রে ভালো মানের খেলোয়াড় পাওয়া গেলেও পরিবারের অনীহার কারণে মেয়েরা ফুটবল খেলায় আসতে পারছে না। বর্তমানে নারী ফুটবলে বাংলাদেশ অনেক এগিয়েছে। সরকারের পাশাপাশি বিত্তবানদের এগিয়ে আসতে হবে। ফুটবল খেলায় তারা সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দিলে দেশের নারী ফুটবল আরো এগোবে।

দলটির সহকারী কোচ দেলোয়ার হোসেন উজ্জ্বল। তিনি পাঁচরুখী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষকও। নিজেও একজন ফুটবল খেলোয়াড়। শিক্ষকতার পাশাপাশি বিদ্যালয়ের মেয়েদের নিয়ে মেতে থাকেন ফুটবল নিয়ে। আলোচিত কলসিন্দুরই তাঁকে সামনে এগোতে পথ দেখিয়েছে। ওই স্কুলের মেয়েরা পরপর তিনবার চ্যম্পিয়ন হওয়ার পর তাঁর স্বপ্ন জাগে কলসিন্দুরকে রুখে দেওয়ার। আর এই স্বপ্ন বাস্তবে রূপ নিল ২০১৫, ১৬ ও ১৭ সালে। কলসিন্দুরকে পরপর তিনবার হারিয়ে তাঁর দল  চমক দেখায়। উজ্জ্বল জানান, ‘অর্থের অভাবই এখন বড় বাধা। এই মেয়েদের নিয়ে আমি অনেক দূর এগোতে চাই। এ জন্য প্রয়োজন সব ধরনের সুযোগ-সুবিধা। তাহলেই জাতীয় টিমে এখান থেকেই যেতে পারবে ভালো মানের খেলোয়াড়রা।’

মন্তব্য