kalerkantho

বৃহস্পতিবার । ২৭ জুন ২০১৯। ১৩ আষাঢ় ১৪২৬। ২৩ শাওয়াল ১৪৪০

রচনা লিখেই সাড়ে সাত হাজার ডলার

বিশ্বে স্থাপত্যবিদ্যার শিক্ষার্থীদের জন্য অত্যন্ত মর্যাদাপূর্ণ পুরস্কার ‘বার্কলে প্রাইজ’। প্রতিযোগিতার চূড়ান্ত আসরে ২০১৪ সালে প্রথম ও এ বছর দ্বিতীয়বারের মতো উচ্চারিত হলো বাংলাদেশের নাম। এবার ৪৩টি দেশের প্রতিযোগীদের হারিয়ে প্রথম হয়েছেন বুয়েটের সেমন্তী ও রাকিব। জিতে নিয়েছেন সাত হাজার ৫০০ মার্কিন ডলার।লিখেছেন পিন্টু রঞ্জন অর্ক। ছবি : মোহাম্মদ আসাদ

২৪ এপ্রিল, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



রচনা লিখেই সাড়ে সাত হাজার ডলার

পুরো নাম ‘দ্য অ্যানুয়াল ইন্টারন্যাশনাল বার্কলে আন্ডারগ্র্যাজুয়েট প্রাইজ ফর আর্কিটেকচারাল এক্সিলেন্স’। ‘বার্কলে প্রাইজ’ নামেই সারা বিশ্বে পরিচিত। ১৯৯৮ সাল থেকে শুরু হওয়া মর্যাদাপূর্ণ এই প্রতিযোগিতার আয়োজক ইউনিভার্সিটি অব ক্যালিফোর্নিয়ার বার্কলে কলেজ অব এনভায়রনমেন্টাল ডিজাইন। মূলত স্থাপত্যবিদ্যার শিক্ষার্থীরাই এতে অংশ নেয়। তিন ধাপের প্রতিযোগিতার পুরোটাই হয় অনলাইনে। আয়োজকরা প্রতিবছর একটা নির্দিষ্ট বিষয় ঠিক করে দেন। সেই বিষয়ের ওপর স্থাপত্যবিদ্যার শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে প্রস্তাবনা (প্রপোজাল) আহ্বান করা হয়। শুরুতে ৫০০ শব্দের প্রস্তাবনা লিখে পাঠাতে হয়। এরপর ২৫ জন সেমিফাইনালিস্ট ঠিক করা হয়। এরপর ওই বিষয়ের ওপর ২৫০০ শব্দের মধ্যে রচনা লিখে পাঠাতে বলা হয়। এই ২৫ জন থেকে ফাইনালে যায় আটজন। তারপর সেরা তিন।

 

দিনটি ছিল ১৭ এপ্রিল

এবারের প্রতিযোগিতা শুরু হয়েছিল ২০১৮ সালের ১৫ আগস্ট। বাংলাদেশ ছাড়াও যুক্তরাষ্ট্র, ইংল্যান্ড, অস্ট্রেলিয়া, জার্মানি, সিঙ্গাপুর, ভারতসহ ৪৩টি দেশের স্থাপত্যবিদ্যার শিক্ষার্থীরা মোট ১৫২টি প্রস্তাবনা জমা দিয়েছিল। এখান থেকে বিচারকদের রায়ে সেমিফাইনালিস্ট নির্বাচিত হন ২৫ জন। মূল প্রবন্ধ জমা দেওয়ার জন্য তাঁরা সময় পেয়েছিলেন ১ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত।

প্রায় অর্ধবছরব্যাপী চলা এই প্রতিযোগিতার চূড়ান্ত ফল ঘোষণা হয়েছে ১৭ এপ্রিল। সেখানে শেষ হাসি হাসেন বাংলাদেশের শাহ্রীন মুকাশাফাত সেমন্তী ও রাকিবুল হাসান ভূঁইয়া। দুজনই বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের স্থাপত্যবিদ্যা বিভাগের শেষ বর্ষের শিক্ষার্থী। ভারতের স্কুল অব প্ল্যানিং অ্যান্ড আর্কিটেকচার বিভাগের একটি দলের সঙ্গে যৌথভাবে প্রথম হয়েছেন তাঁরা। জিতে নিয়েছেন সাড়ে সাত হাজার ইউএস ডলার। প্রতিযোগিতায় দ্বিতীয় ও তৃতীয় পুরস্কার জিতেছে যথাক্রমে যুক্তরাষ্ট্রের ইউনিভার্সিটি অব টেনেসির স্কুল অব আর্কিটেকচার এবং ভারতের জামিয়া মিল্লিয়া ইসলামিয়া ইউনিভার্সিটির দুটি দল।

রাকিব বড় হয়েছেন চট্টগ্রামে। আর সেমন্তী ঢাকায়। তিনি বুয়েটের সাংস্কৃতিক ক্লাব ‘মূর্ছনা’র সহসভাপতি হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেছেন। এর আগে বিভাগের বিভিন্ন প্রজেক্টে একসঙ্গে কাজ করেছেন দুজন। ফলে দুজনের মধ্যে বোঝাপড়াটা দারুণ। কিন্তু দেশের বাইরে আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় অংশ নেওয়া এবারই প্রথম। আর প্রথমবারেই বাজিমাত। হাসিমুখে সেমন্তী বলছিলেন, ‘বুয়েটে ভর্তি হওয়ার পর থেকে এই প্রতিযোগিতার কথা যে কত শুনেছি, তার ইয়ত্তা নেই। ১৭ এপ্রিল যখন আমাদের কাছে এমন সুখবর নিয়ে ই-মেইল এলো, তখন মনে হলো, যেন স্বপ্ন মুঠোয় ধরা দিয়েছে। এমন অর্জনের পেছনে অধ্যাপক ড. শায়ের গফুর স্যারসহ বিভাগের শিক্ষক, অভিভাবক এবং বন্ধুদের অবদান অনেক বেশি।’

রাকিবুল জানালেন, ‘অন্যান্য প্রতিযোগিতার তুলনায় এই প্রতিযোগিতার একটা ভালো দিক হলো, প্রতিটি ধাপ শেষে আয়োজকদের পক্ষ থেকে একটা রিভিউ পাঠানো হয়। সেখানে কোথায় অস্পষ্টতা আছে, কোথায় আরো ফোকাস করা উচিত, সেসব বলে দেয় তারা। এমনকি আমরা কোন বিচারকের কাছ থেকে কত নম্বর পেয়েছি, সেটাও জানায়। এটাও দারুণ কাজে দিয়েছে। ফাইনালে তিনজন বিচারক থাকেন। প্রত্যেকের হাতে ২৫ নম্বর করে থাকে। একজন বিচারক আমাদের ২৫-এ ২৫ দিয়েছেন। সব মিলিয়ে আমরা ৭৫-এর মধ্যে ৭০ নম্বর পেয়েছি।’

 

থিংকিং ওয়াটার, থিংকিং ফ্লুইড

রাকিবুল হাসান বললেন, আমাদের রচনার শিরোনাম ‘থিংকিং ওয়াটার, থিংকিং ফ্লুইড’। দুই হাজার ৫০০ শব্দ আর চারটি আলোকচিত্র দিয়ে তাঁরা সাজিয়েছেন রচনাটি। ছবিগুলোর মধ্যে একটা বান্দরবানের ঝিনাপাড়া আরেকটা সিলেটের বিছানাকান্দি থেকে তোলা, বাকি দুটি গাইবান্ধার ফ্রেন্ডশিপ সেন্টারের।

এবার প্রতিযোগিতার ২১তম আসর। বিষয় ‘আর্কিটেকচার অ্যান্ড ক্লাইমেট রিজিলিয়েন্স’। প্রতিযোগীদের কাছে প্রশ্ন ছিল : বিষয়টি নিয়ে তোমার দেশের স্থপতিরা অতীতে কী করেছেন, এখন কী করছেন এবং ভবিষ্যতে তাঁরা কী করে জলবায়ু পরিবর্তনের নেতিবাচক প্রভাবগুলো হ্রাস করতে পারেন?

 

উত্তরে যা লিখেছেন

প্রশ্নগুলোর উত্তর খুঁজতে গিয়ে রাকিব ও সেমন্তী দেখলেন, অতীতে এখানকার স্থপতিদের চিন্তাভাবনা ছিল শহরকেন্দ্রিক। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে যারা সরাসরি ক্ষতিগ্রস্ত, সেই সব অঞ্চলের মানুষদের কাছে যাওয়ার সুযোগ পাননি অথবা যাননি তাঁরা। বিষয়টি নিয়ে শহরের স্থপতিরা না ভাবলে গ্রামের মানুষ ঠিকই ভেবেছে। যেমনটি বলছিলেন রাকিবুল ইসলাম, ‘তখন গ্রামের লোকজন জলবায়ু পরিবর্তনের মতো শব্দের সঙ্গে পরিচিত ছিলেন না। কিন্তু প্রতিনিয়ত প্রকৃতির সঙ্গে লড়াই করে টিকে থাকতে হয়েছে তাদের। ফলে নিজেদের ঘরবাড়ি বানানোর সময় প্রকৃতির কথা মাথায় রেখেই নকশা করেছেন।’ রাকিবের সঙ্গে সেমন্তী যোগ করলেন, ‘আমাদের এখানে অনেক মানুষের বাস। যেহেতু জলবায়ুর সঙ্গে খাপখাইয়ে বসবাস করার অভিজ্ঞতা আছে এখানকার মানুষের, ফলে জনসংখ্যাকে জনসম্পদে রূপান্তরিত করতে পারি। আমরা দেখিয়েছি, প্রকৃতির সঙ্গে লড়াই করা মানুষের অভিজ্ঞতা এবং আধুনিক স্থাপত্যবিদ্যার জ্ঞান—এই দুটির সমন্বয় সাধন করা গেলে জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকি মোকাবেলা সহজ হবে।’

পুরো বাংলাদেশকে ফোকাস করে রচনাটা লিখেছেন তাঁরা। তাঁদের লেখায় বান্দরবানে ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর বাঁশের মাচার ওপর তৈরি উঁচু ঘরগুলো যেমন এসেছে, তেমনি হাওরাঞ্চলের বাড়িগুলো এসেছে। সেমন্তী বললেন, ‘রাজশাহী অঞ্চলে তুলনামূলক গরম বেশি। ফলে ওই দিকটায় বাড়িগুলোতে মাটির মোটা দেয়াল ব্যবহার করা হয়েছে, যাতে গরম কম লাগে। আবার খুলনার ওই দিকটায় দেখবেন, দরজাগুলো খুব নিচু। কারণ, ওখানে ঘূর্ণিঝড় বেশি হয়। বাতাস থেকে ঘর বাঁচাতে এমনটা করা হয়েছে। এগুলো আমাদের পুুঁথিগত বিদ্যা। অথচ স্থানীয়রা বানিয়ে যাচ্ছে আগে থেকেই। মানে পরিবেশের সঙ্গে মানুষের যোগ অনেক বেশি।’ 

‘চর (ঈযধত্), উঠান (ঁঃযধহ), খাল (শযধষ), বর্ষা (ইড়ত্ংযধ), বন্যার (ইড়হহধ) মতো শব্দগুলো ব্যবহারের মধ্য দিয়ে এখানকার মানুষের মুখের ভাষা তুলে এনেছি রচনায়। ভাটিয়ালি গান, নকশিকাথা, পটযাত্রার প্রসঙ্গ এনে বলার চেষ্টা করেছি, পানির সঙ্গে এখানকার মানুষের সম্পর্ক মধুর। এটা আমাদের সংস্কৃতিকেও সমৃদ্ধ করেছে। বর্ষায় এখানকার মানুষের জীবনযাত্রা থেমে থাকে না। এই বিষয়টি বিচারকদের প্রশংসা কুড়িয়েছে।’ জানালেন রাকিব।

 

মেরিনা তাবাসসুম আর কাশেফ মাহবুব উদাহরণ

এখনকার স্থপতিদের মধ্যে মেরিনা তাবাসসুম এবং কাশেফ মাহবুবের কাজ দারুণ অনুপ্রাণিত করেছে তাঁদের। কাশেফ মাহবুব গাইবান্ধায় ফ্রেন্ডশিপ সেন্টার বানিয়েছিলেন। সেটাকে এখনকার স্থপতিদের কাজের উদাহরণ হিসেবে তুলে ধরেছেন তাঁরা। রাকিবুল হাসান জানালেন, ‘ফ্রেন্ডশিপ সেন্টারের মাধ্যমে কাশেফ মাহবুব দেখিয়েছেন, পরিবেশের ক্ষতি না করেই স্থানীয় উপকরণ দিয়ে স্বল্প বাজেটে আধুনিক স্থাপনা নির্মাণ সম্ভব।’

 

ভবিষ্যতের ভাবনা

সেমন্তী-রাকিব দুজনই জানালেন, এই প্রতিযোগিতা তাদের জীবনের লক্ষ্য ঠিক করে দিয়েছে। উচ্চশিক্ষার জন্য বিদেশ যেতে চান দুজন। দেশে ফিরে জলবায়ু পরিবর্তনের বিষয় নিয়ে কাজ করতে চান। ল্যান্ডস্কেপিং ডিজাইন নিয়ে কাজ করতে ভালো লাগে সেমন্তীর। তিনি চান প্রকৃতির সঙ্গে স্থাপত্যের মেলবন্ধন ঘটাতে। অন্যদিকে আরবান ডিজাইনিংয়ে আগ্রহ আছে রাকিবের।


খবরটি ইউনিকোড থেকে বাংলা বিজয় ফন্টে কনভার্ট করা যাবে কালের কণ্ঠ Bangla Converter দিয়ে

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা