kalerkantho

রবিবার । ২৬ মে ২০১৯। ১২ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৬। ২০ রমজান ১৪৪০

মাটির টান

কুলাঘাট। লালমনিরহাট সদর উপজেলার দারিদ্র্য পীড়িত ও অবহেলিত একটি ইউনিয়ন। নদীভাঙনসহ নানা সমস্যায় জর্জরিত এই ইউনিয়নটি আগে থেকেই শিক্ষাক্ষেত্রে অনেক পিছিয়ে। এখানে শিক্ষার আলো ছড়াতে বিশ্ববিদ্যালয়পড়ুয়া কিছু তরুণ গড়ে তুলেছেন একটি সংগঠন—‘ক্যাম্পাস’। তাঁরা এ এলাকারই সন্তান। তাঁদের কথা জানাচ্ছেন আরিফুল ইসলাম

১৭ এপ্রিল, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৩ মিনিটে



মাটির টান

‘ক্যাম্পাস’ সংগঠনের সদস্যদের একাংশ

একসময় এই অঞ্চল থেকে বিশ্ববিদ্যালয়পড়ুয়া কাউকে খুঁজে পাওয়া ছিল বিরল। এখন কুলাঘাট ইউনিয়নের ৬৩ জন তরুণ-তরুণী পড়ছেন বিভিন্ন পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে। তাঁদেরই সংগঠন ‘ক্যাম্পাস’। ২০১৪ সালে প্রতিষ্ঠার পর থেকেই এলাকায় শিক্ষার উন্নয়নে কাজ করে যাচ্ছেন এই স্বপ্নবাজ তরুণরা। অর্থের অভাবে কোনো ছাত্র-ছাত্রীর শিক্ষাগ্রহণ হুমকির মুখে পড়লেই তাঁরা হাত বাড়িয়ে দেন।

ক্যাম্পাসের সভাপতি মো. আরিফুল ইসলাম বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের মাস্টার্সের শিক্ষার্থী। তিনি বললেন, ‘আমরা এলাকার শিক্ষার্থীদের বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে ভর্তি হওয়ার যোগ্যতা অর্জন করাতে নানা রকম কাজ করি। সভা, সেমিনার করে সবাইকে এ বিষয়ে সচেতন করার চেষ্টা চালাই। এরই ধারাবাহিকতায় এই ইউনিয়ন থেকে ২০১৭-১৮ সেশনে আটজন এবং ২০১৮-১৯ সেশনে সাতজন শিক্ষার্থী বিভিন্ন পাবলিক ভার্সিটিতে সুযোগ পেয়েছেন। আমাদের লক্ষ্য ২০২২ সালের মধ্যে এই সংগঠনের সদস্যসংখ্যা ৬৩ থেকে ১০০-তে উন্নীত করা।’

সাধারণ সম্পাদক মো. রফিকুল ইসলাম পড়েন বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে। তিনি জানালেন, ‘আমাদের সংগঠনের যেকোনো কাজে এলাকার জনসাধারণ, বিশেষ করে ছাত্র-ছাত্রী ও অভিভাবকদের ভালো সাড়া পাচ্ছি। সবার সহযোগিতায় কুলাঘাটকে শিক্ষার আলোয় উদ্ভাসিত করে একটি মডেল ইউনিয়ন হিসেবে গড়ে তোলার স্বপ্ন দেখি আমরা।’

সংগঠনের প্রতিষ্ঠাকালীন সাধারণ সম্পাদক মো. জহুরুল ইসলাম সদ্যই একই বিশ্ববিদ্যালয় থেকে মাস্টার্স সম্পন্ন করেছেন। তাঁর কাছ থেকে জানা গেল, ‘এলাকার শিক্ষার উন্নয়নে ভূমিকা রাখতেই এ সংগঠনের জন্ম। প্রতিষ্ঠার পর থেকেই সে লক্ষ্যে কাজ করে যাচ্ছি। আশা করি, অবহেলিত এই জনপদ দ্রুতই শিক্ষা-দীক্ষায় এগিয়ে যাবে।’

প্রতিষ্ঠাকালীন সহসভাপতি মো. মোবারক হোসেন পড়তেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে। তিনি বলেন, ‘এই সংগঠন এরই মধ্যে বিভিন্ন সমাজসেবামূলক কাজের মাধ্যমে এলাকায় সাড়া ফেলেছে। সাফল্যও পেয়েছে। তাই বলে তৃপ্তির ঢেকুর তুলতে আমরা নারাজ। বরং আরো পরিকল্পিতভাবে কাজ করতে চাই।’

ক্যাম্পাসের নিয়মিত কার্যক্রমের মধ্যে রয়েছে—এই ইউনিয়নের ছাত্র-ছাত্রীদের নিয়ে নিয়মিত সভা, সেমিনার ও বার্ষিক প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষা ও পুরস্কারের ব্যবস্থা করা। প্রতিষ্ঠার পর থেকে এ পর্যন্ত বিভিন্ন পর্যায়ের প্রায় আড়াই হাজার শিক্ষার্থী নিয়ে প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষার আয়োজন করেছে সংগঠনটি। এর মধ্যে প্রথম, দ্বিতীয় ও তৃতীয় স্থান অধিকারী ৭৫ জনকে দেওয়া হয়েছে পুরস্কার। পুরস্কৃত করেছে পাবলিক পরীক্ষায় ভালো ফল করা শিক্ষার্থীদেরও। অন্যদিকে বিশ্ববিদ্যালয় ভর্তি পরীক্ষার সময় কুলাঘাটের ছাত্রদের থাকার ব্যবস্থা করাসহ অন্যান্য তথ্য সরবরাহের দায়িত্বটিও সংগঠনটির সদস্যরা আন্তরিকতার সঙ্গে পালন করছেন। ভর্তির পর কারো পড়াশোনায় কোনো বিঘ্ন ঘটলে পাশে থাকছেন; প্রয়োজনে আর্থিক অনুদানেরও ব্যবস্থা করছেন তাঁরা। এ রকম সহযোগিতা পাওয়া শিক্ষার্থীদের একজন বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের ২০১৮-১৯ শিক্ষাবর্ষের ইতিহাস বিভাগের চুমকি আক্তার। তিনি বললেন, ‘অর্থসংকটে বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়া আমার পক্ষে কঠিন হয়ে পড়েছিল। এ সময় ক্যাম্পাসের সদস্যরা জেলা প্রশাসকের কাছ থেকে অনুদান এনে দিয়েছেন।’

সম্প্রতি নদীভাঙনে সব হারানো সুমি নামের এক ছাত্রীর টাকার অভাবে কলেজে ভর্তি হওয়া অনিশ্চিত হয়ে পড়ে। তাঁরও ভর্তির ব্যবস্থা করে দিয়েছে সংগঠনটি। অন্যদিকে ২০১৮ সালে এসএসসিতে জিপিএ ৫ পাওয়া শাহ আলম জানান, পরীক্ষার আগেই মাকে হারিয়েছি। এ ছাড়া আরো নানা কারণে আমাদের পরিবার বেশ খারাপ সময়ের মধ্য দিয়ে যাচ্ছিল। এ খবর শুনে আমার পাশে দাঁড়িয়েছে ‘ক্যাম্পাস’।

 

 

মন্তব্য