kalerkantho

সোমবার । ২০ মে ২০১৯। ৬ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৬। ১৪ রমজান ১৪৪০

ইশালের বিশাল অর্জন

মার্চের প্রথম সপ্তাহেই শেষ হয়ে গেল ব্রিটিশ গণমাধ্যম চ্যানেল ফোর-এর জনপ্রিয় অনুষ্ঠান ‘চাইল্ড জিনিয়াস ইউকে’-এর ষষ্ঠ আসর। আর এর ফাইনাল রাউন্ডে উঠে রীতিমতো তাক লাগিয়ে দিয়েছে ব্রিটিশ বাংলাদেশি শিশু ইশাল মাহমুদ। এ ছাড়া তার আছে আরো নানা অর্জন। তার এসব অর্জনের ঝুলি পাঠকদের সামনে মেলে ধরেছেন কালের কণ্ঠ’র যুক্তরাজ্য প্রতিনিধি জুয়েল রাজ

৩ এপ্রিল, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



ইশালের বিশাল অর্জন

ইশালের বয়স এখন ১৩। চাইল্ড জিনিয়াস ইউকে, প্রতিযোগিতার মধ্য দিয়ে ব্রিটেনের সবচেয়ে প্রতিভাধর শিশুকে খুঁজে বের করে মেনসা (MENSA) নামের একটি প্রতিষ্ঠান। এবার তাতে দ্বিতীয় রানার-আপ হয়েছে ইশাল। পূর্ব লন্ডনে মেনর পার্ক এলাকায় তার নানার বাসায় বসে কথা হয় ইশালের সঙ্গে। 

জানতে পারলাম, ইশালের জন্ম লন্ডন থেকে ৮০ মাইল দূরের শহর পোর্টসমাউথে। বাবা ফরহাদ মাহমুদ, মা মমতাজ বেগমের দুই সন্তানের মধ্যে বড় ইশাল, ওর ছোট ভাই জিশান মাহমুদ। ইশালই প্রথম কোনো বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত শিশু, যে এই প্রতিযোগিতার চূড়ান্ত পর্বে অংশ নিয়েছে। এই প্রতিযোগিতায় সাধারণ জ্ঞান থেকে শুরু করে গণিত, স্বাস্থ্য, শিক্ষা, বিনোদন, ইতিহাসসহ নানা বিষয়ে কুইজ জিজ্ঞেস করা হয়, নেওয়া হয় নানা ধরনের বুদ্ধিমত্তার পরীক্ষা। ১০০০ জনের মতো প্রতিযোগীর মধ্যে মনোনীত করা হয় ২০ জনকে। তবে এই ২০ জনের স্কোরই খুব কাছাকাছি ছিল। এদের মধ্যে আবার ফাইনাল রাউন্ডে ওঠে পাঁচজন। ইশাল এদের একজন। সে জানায়, ‘একসঙ্গে প্রতিযোগিতায় অংশ নিলেও দারুণ বন্ধুত্ব হয়ে যায় অনেকের সঙ্গেই। বিভিন্ন বিষয়ে প্রশ্ন হওয়াতে এমনকি একজন আরেকজনের থেকে সাহায্যও নিতাম।’

ব্রিটেনের হ্যাম্পশায়ার এলাকার ইয়ুথ পার্লামেন্টের সদস্য ইশাল, মেনসারও সদস্য সে। মেনসা হচ্ছে আইকিউ সোসাইটি। বুদ্ধিমত্তা নিয়ে নানা পরীক্ষা-নিরীক্ষার পরই শুধু তারা সদস্য পদ দিয়ে থাকে। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে মেনসার সদস্য আছে। ইশালের আইকিউ স্কোর ছিল ১৫৭ পয়েন্ট। 

শুধু পড়ালেখা নয়, মিউজিকে সমান দক্ষতা ইশালের, সে পিয়ানোতে পঞ্চম গ্রেডে, অর্গানে চতুর্থ গ্রেডে এবং গিটারে তৃতীয় গ্রেডে আছে। গ্রেড ৮ হচ্ছে সর্বোচ্চ। ছোট্ট মেয়েটি রয়েল কলেজ অব ইংল্যান্ডের অর্গানিস্ট হিসেবেও সক্রিয়। যুক্তরাজ্যভিত্তিক প্রতিষ্ঠানটি গোটা বিশ্বে সংগীত প্রসারে কাজ করে। বিশেষ করে অর্গান ও দলীয় সংগীত শেখানোর জন্য উচ্চতর প্রশিক্ষণ দিয়ে থাকে। ঘোড়দৌড়েও ইশালের জুড়ি মেলা ভার।

এই বয়সেই মানবতার কাজেও নিজেকে নিয়োজিত করেছে ইশাল। স্বেচ্ছাসেবী হিসেবে কমিক রিলিফ ও স্পোর্টস রিলিফের সঙ্গে যুক্ত আছে, যারা শিশুদের জন্য কাজ করে। জাতিসংঘের গার্লস আপ অ্যাক্টিভিস্টের দূত হিসেবে প্রতিনিধিত্ব করেছে। সে পোর্টসমাউথের সেন্ট জোন্স অ্যাম্বুল্যান্স ক্যাডেট এবং পোর্টসমাউথ শহরের তরুণ প্রতিনিধি। প্রচুর গল্পের বইও পড়ে। তার প্রিয় বইয়ের তালিকায় আছে ডায়েরি অব অ্যানা ফ্রাঙ্ক এবং দ্য ক্রনিকলস অব নার্নিয়া : দ্য লায়ন দ্য উইচ অ্যান্ড দ্য ওয়ার্ডরোব। ১৩ বছর বয়সেই লিখে ফেলেছে তার প্রথম সায়েন্স ফিকশন উপন্যাস। ব্লুমসবারি পাবলিকেশন শিগগিরই বইটি প্রকাশ করতে যাচ্ছে বলে জানায় ইশাল। নিয়মিত বিভিন্ন বিতর্ক, সংগীত ও গণিত প্রতিযোগিতায় অংশ নিচ্ছে।

এত কিছু করছে ইশাল; কিন্তু পড়াশোনায় বিন্দুমাত্র ঢিল দেয়নি। প্রি-স্কুল থেকে শুরু করে এখন পর্যন্ত শতভাগ উপস্থিতি তার। ছয় বছরের স্যাট (ঝঅঞ) পরীক্ষায় শতভাগ নম্বর পেয়ে পাস করেছিল। সাত বছর বয়সে প্রাইমারি স্কুলে পড়ালেখা শুরু ইশালের। সর্বোচ্চ নম্বর পেয়ে প্রাইমারি স্কুল শেষ করে, ব্রিটেনের বিখ্যাত ১০টি বোর্ডিং স্কুলে আবেদন করেছিল। সবগুলোতেই সুযোগ পায়। ইশালের মায়ের খুব ইচ্ছা ছিল মেয়েদের নামি বোর্ডিং স্কুল সেন্ট সুইথানস স্কুলে তাঁর মেয়ে পড়ুক। তাঁর খুশি আর ধরে না, যখন উইনচেস্টারের সেন্ট সুইথানস স্কুল ইশালকে সম্পূর্ণ বৃত্তি দিয়ে তাদের স্কুলে পড়ার সুযোগ দেয়। বাংলাদেশি কমিউনিটি থেকে তার এই সুযোগ পাওয়া নিঃসন্দেহে অনেক গর্বের বিষয়।

এত এত কাজ করছে, সম্মাননা স্বীকৃতিও কম জোটেনি। তার ঝুলিতে জমা হয়েছে—মুসলিম নিউজ অ্যাওয়ার্ড ২০১৮, এরিক থমসন ট্রাস্ট অ্যাওয়ার্ড, রয়েল কলেজ অব অর্গানিস্ট অ্যাওয়ার্ড, ফ্রেন্ডস অব মিউজিক ইন উইনচেস্টার অ্যাওয়ার্ড, দ্য রিগটসন ট্রাস্ট অ্যাওয়ার্ড, চেথহামস ইন্টারন্যাশনাল সামার স্কুল অ্যান্ড ফেস্টিভালে পিয়ানো বাদক অ্যাওয়ার্ড। হ্যাম্পশায়ার ফাউন্ডেশনের ইয়াং মিউজিশিয়ান অ্যাওয়ার্ড। অর্জন করেছে হেড টিচার অ্যাচিভমেন্ট অ্যাওয়ার্ডসহ অসংখ্য সম্মাননা।

ইশাল হতে চায় জ্যোতির্বিজ্ঞানী, গণিত তার প্রিয় বিষয়। কারণ সে মনে করে, এটি তাকে বৃত্তের বাইরে চিন্তা করতে এবং নানা ধরনের সমস্যার সমাধানে সাহায্য করে। গান শুনতে ভালোবাসে ইশাল। এ ছাড়া বন্ধু ও পরিবারে সঙ্গে সিনেমা দেখতে এবং বরফ স্কেটিং করতে ভালো লাগে। ঘুরতে ভালোবাসে নতুন নতুন জায়গায়।

বাংলাদেশ ও বাংলা ভাষা নিয়েও কথা উঠল। বলল, বাংলা সব  বুঝি, কিন্তু বলতে গেলে একটু ঝামেলা হয়। তবে বাংলাদেশ তার খুব পছন্দের জায়গা। সিলেটের বিয়ানীবাজারের লাউতা ইউনিয়নে দাদার বাড়ি। দেশে গেলে শহরের বাসায় না থেকে গ্রামের বাড়িতে থাকতে পছন্দ করে। সেখানকার খোলামেলা পরিবেশ, মানুষের আন্তরিকতা তাকে টানে। বড় হয়ে বাংলাদেশের শিশুদের জন্য কাজ করতে চায় সে।

তার বাবা ফরহাদ মাহমুদ পেশায় একজন ট্যাক্সিচালক। মা মমতাজ বেগম, স্বাস্থ্যবিষয়ক প্রকল্পে কাজ করেন। তবে ইশালের এত দূর আসার পেছনে সবচেয়ে বড় ভূমিকা মামা এমরান হোসেনের।  অবসর পেলেই ইশালকে নানা বিষয়ে তথ্য দিয়ে থাকেন তিনি। অক্সফোর্ডের গ্র্যাজুয়েট এমরানের কোনো সন্তান নেই। তাই তিনি প্রতিটি মুহূর্ত ভাগ্নি ইশালকে গড়ে তুলতে সচেষ্ট।  মামা যেন তার আরেক দুনিয়া।

ডেইলি মেইলসহ ব্রিটেনের স্থানীয় পত্রিকাগুলোও তাঁকে নিয়ে সংবাদ, ফিচার প্রকাশ করেছে।

দীর্ঘ সময় মুগ্ধ হয়ে শুনি তাঁর কথা, এক রত্তি মেয়ে, কী প্রাণোচ্ছল, উজ্জ্বল, কী বিশাল পৃথিবী তার। জ্যোতির্বিজ্ঞানী হয়ে হয়তো একদিন আলো ছড়াবে আকাশের ওপারে আকাশে। তখনো হয়তো বাংলাদেশে তার দাদার বাড়ির খোলা উঠানের কথা মনে পড়বে আনমনে, বাংলাদেশের মায়াটুকু মনে পড়বে তার, আমরাও গর্বিত হব। শুভ কামনা ইশাল, আরো আরো বিশাল হও তুমি।

মন্তব্য