kalerkantho

রবিবার । ২৬ মে ২০১৯। ১২ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৬। ২০ রমজান ১৪৪০

হারানো মুখগুলো মনে পড়ে

নাঈমা তানজিম স্বর্ণা। ইউনাইটেড ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি থেকে সদ্যই পাঠ চুকিয়ে যোগ দিয়েছিলেন ডার্ড গার্মেন্টের মানবসম্পদ বিভাগে। এফআর টাওয়ারের ১২ তলায় অফিস। আগুন লাগার সপ্তাহখানেক আগেই গর্ভে সন্তানের অস্তিত্ব টের পেয়েছিলেন। এ সুসংবাদ শুধু তিনি আর তাঁর স্বামী জানতেন। আগুনের সঙ্গে লড়াইয়ের লোমহর্ষক অভিজ্ঞতা মীর হুযাইফা আল মামদূহকে শুনিয়েছেন তিনি

৩ এপ্রিল, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



হারানো মুখগুলো মনে পড়ে

নাঈমা তানজিম স্বর্ণা

কাচের দেয়াল ভেদ করে ধোঁয়া কিংবা চিৎকার—কিছুই আসেনি। তাই আগুন লাগার খবরটা সঙ্গে সঙ্গে টের পাইনি। দুপুর ১টায় যখন মধ্যাহ্নভোজের প্রস্তুতি নেব, এক সহকর্মীর ফোনে অচেনা নাম্বার থেকে ফোন এলো, ‘বিল্ডিংয়ে আগুন লাগছে, যেভাবে পারেন, নিজেদের বাঁচান।’ সঙ্গে সঙ্গেই বিদ্যুৎ চলে গেল। প্রচণ্ড ধোঁয়ায় চারপাশ আচ্ছন্ন। ওপরে যাওয়ার জন্য বের হতেই সিঁড়িতে প্রচণ্ড ধোঁয়া নিঃশ্বাস আটকে দিচ্ছিল। বাধ্য হয়ে ফিরে এলাম। এখানে প্রচণ্ড তাপ। পুরো ফ্লোর ধোঁয়ায় আচ্ছন্ন। কিছুই দেখা যাচ্ছে না। ফ্লোরের একপাশ দিয়ে প্রচণ্ড ধোঁয়া বের হচ্ছিল, আমরা তাই অন্য পাশ, বনানীর মূল রাস্তার পাশের দিকের গ্লাস ভাঙার সিদ্ধান্ত নিলাম। ভীষণ মোটা গ্লাস। অফিসের ভাইয়ারা খুব কষ্টে ভাঙতে পারলেন। আমরা নিচে তাকিয়ে দেখি, প্রচণ্ড আগুন ও ধোঁয়া। আমাদের বাঁচাবে এমন কেউ নেই।

কেউ কেউ তখন ওপর থেকে কাগজে চিরকুট লিখে নিচে ফেলছিলেন। কিন্তু সেগুলো আদৌ কারো কাছে পৌঁছবে কি না, সেই সন্দেহ থেকে আমি একটা ভিডিও করে ফেসবুকে পোস্ট দিলাম। ভেবেছিলাম, ভিডিওটা ফ্রেন্ড প্রাইভেসিতে দিয়েছি। তাই ফোন করে নিচে থাকা এক বান্ধবীকে বলেছিলাম দায়িত্বশীল কাউকে দেখাতে।  কিন্তু সেটা পাবলিক করা ছিল, আর মুহূর্তেই ছড়িয়ে গেল। (আমি অবশ্য এটা পরে জেনেছি।) আমরা তারপর আটতলার দিকে একটা ক্রেন দেখতে পেয়ে ডাক দিলাম। জবাব পেলাম, ওদের নাকি শুধু আটতলা পর্যন্ত ওঠার সরঞ্জাম আছে। এতক্ষণ যা-ও বাঁচার কিছু আশা ছিল, এবার যেন সব শেষ! সবাই যে যার মতো স্রষ্টাকে স্মরণ করলাম। অনেকের সঙ্গে আমিও নফল নামাজ পড়লাম। বাসায় সবাইকে ফোন করে বিদায় দেওয়ার কথা বললাম। ততক্ষণে কালো ধোঁয়া পুরো ফ্লোর অন্ধকার করে দিয়েছে। এক হাত দূরত্বের কিছুও দেখতে পাচ্ছিলাম না। প্লাস্টিক পোড়ার বিকট গন্ধ চারপাশে। আমরা এই সময়টায় তোয়ালে, কাপড় ভিজিয়ে নাকে ধরে রাখলাম। কাপড় ভেজাচ্ছিলাম ফায়ার সার্ভিসের ছুড়ে মারা পানি দিয়ে। এতটাই আতঙ্কগ্রস্ত ছিলাম, বেসিনের টেপে যে পানি আছে—সেটাও মাথায় আসেনি। ক্রমে দুর্বল হয়ে পড়ছিলাম আমরা। কেউ ডাকলে সাড়া দেওয়া ছাড়া আর কিছু করার শক্তি ছিল না। এই সময় বারবার ফোন আসছিল স্বামী, মা-বাবা-শাশুড়ির। ফোন ধরতে পারছিলাম না। আমার অ্যাজমার সমস্যা আছে। সবাই ভয় পাচ্ছিলেন, এই ধোঁয়ায় যদি জ্ঞান হারিয়ে ফেলি, আমার বাঁচার কোনো উপায় থাকবে না।

এমন করে কতটা সময় চলে গেল, বুঝতে পারিনি। একসময় দেখি, দুজন ফায়ার ফাইটার আমাদের তলার দিকে আসছেন। আমরা তুমুল আগ্রহ নিয়ে দৌড়ে গেলাম। তাঁরা জানালেন, নারীদের আগে বাঁচাবেন। আর তিন থেকে চারজন করে এক দফায় নামাবেন। প্রথমবার আমার এক সহকর্মী আপু নামলেন। আমি তাঁদের বললাম, ‘ভাই, আমি প্রেগন্যান্ট, আমাকে বাঁচান।’ তাঁদের একজন বললেন, ‘আপু, আমি যদি বেঁচে থাকি, আপনাকে বাঁচাব।’ এভাবে ১৫ মিনিটের মতো কেটে গেল। এরপর দেখলাম, ক্রেনটি আবার উঠছে। কিন্তু এবার আমাদের তলায় না থেমে ওপরে চলে গেল। প্রায় ৪০ মিনিট পর আবার আমাদের কাছে এলো। আমাদের এক সিনিয়র সহকর্মী ‘প্যানিক’ করছিলেন নামার জন্য, লাফ দেওয়ার জন্য। আমাকে ক্রেনে তোলার সময় তিনি লাফ দিয়ে আগে উঠতে চাইলেন। অন্যরা তাঁকে থামানোর পর আমাকে উঠতে বলা হলো। জানালা থেকে একটু দূরে লাফ দিয়ে যেতে হবে। আমাকে চোখ বন্ধ করে হাত বাড়াতে বলা হলো। বারণ করা হলো, যেন নিচের দিকে না তাকাই।

স্বর্ণার ফেসবুক লাইভে সহকর্মীর মুখ

অবশেষে উদ্ধার পেলাম। প্রথমে কুর্মিটোলা হাসপাতাল, তারপর ইউনাইটেড হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হলো আমাকে। দুইদিন পর হাসপাতাল থেকে ছাড়া পেয়েছি। শরীর ভালোই আছে। বাবুটাও সুস্থ আছে পেটের ভেতর। তবে আমার ত্বকে জ্বালা করছে এখনো। গিলে ফেলা ধোঁয়ার রেশ শরীর থেকে বের হয়নি। আশা করছি, শিগগিরই সব ঠিক হয়ে যাবে। কিন্তু মানসিক অবস্থা কবে ঠিক হবে, জানি না। আমি চোখ বুজলেই আগুন দেখছি, ধোঁয়া দেখছি! সেই ভয়ংকর সময়গুলো চোখে ভাসছে। আমাদের ভার্সিটির সিনিয়র বৃষ্টি আপু, ২১ তলার হুইলচেয়ারের ওই ভাইটা—তাঁদের সঙ্গে লিফটে প্রায়ই দেখা হতো। সহকর্মী তাঁরা ছিলেন না, তবু একটা হৃদ্যতা তৈরি হয়েছিল। তাঁরা বাঁচতে পারেননি। তাঁদের মুখগুলো মনে পড়ে।

মন্তব্য