kalerkantho

শুক্রবার । ২১ জুন ২০১৯। ৭ আষাঢ় ১৪২৬। ১৭ শাওয়াল ১৪৪০

হাল ছাড়েননি আবু সুফিয়ান

মানিক আকবর   

২০ ফেব্রুয়ারি, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



হাল ছাড়েননি আবু সুফিয়ান

চুয়াডাঙ্গার দামুড়হুদা উপজেলার দর্শনার আবু সুফিয়ানের পাঠাগারের কথা জানেন না এমন মানুষ জেলায় কমই আছে। দর্শনা ও আশপাশের গ্রামের অনেকেই ফুরসত পেলেই ছুটে যান এই পাঠাগারে। চুয়াডাঙ্গা, দামুড়হুদা ও জীবননগর উপজেলা এলাকার মানুষও দর্শনায় এলে আবু সুফিয়ানের পাঠাগারে ঢু মারতে ভোলেন না। আবু সুফিয়ান জানালেন, ১৯৮৯ সালে পাঠাগারটির যাত্রা শুরু। তখন  তাঁর বয়স ২৩-২৪ বছর, স্নাতক পাস করেছেন। ওই সময় ঢাকার সিডিএল (কমিউনিটি ডেভেলপমেন্ট লাইব্রেরি) নামের একটি উন্নয়ন সংস্থা দেশের অনেক জেলায় গণ-উন্নয়ন গণগ্রন্থাগার নাম দিয়ে পাঠাগার চালু করার উদ্যোগ নেয়। আবু সুফিয়ান অনুপ্রাণিত হন। ছাত্রজীবন থেকেই তিনি নিজে বিভিন্ন ধরনের বই পড়তেন। শতাধিক বইও ছিল সংগ্রহে। সেই বই দিয়েই দর্শনা সরকারি কলেজের পাশে একটি ঘর ভাড়া নিয়ে সংস্থাটির সহায়তায় শুরু করেন পাঠাগারের কাজ। বিভিন্ন ধরনের দৈনিক সংবাদপত্র রাখা শুরু করেন। এলাকার মানুষ ধীরে ধীরে পাঠাগারমুখী হতে থকে। ছাত্র-ছাত্রীরাই বেশি এসেছে পাঠাগারে।

উদ্যোক্তা সংস্থা শুধু ঘরভাড়া দিত। এ অবস্থায় বিল পরিশোধ করতে না পারার কারণে পাঠাগারে পত্রিকা সরবরাহ বন্ধ হয়ে গেল। পাঠক আসে, মন খারাপ করে বসে থাকে। বাড়িতে রান্না করার জন্য চাল কেনা ছিল। তা বিক্রি করে পত্রিকার বিল দেওয়া হলো। পাঠকের মুখে হাসি ফুটল। কিন্তু আবু সুফিয়ানকে পরিবারের লোকজন নিয়ে বিপাকে পড়তে হলো।

১৯৯৭ সালে সহপাঠী সেলিনা আক্তার কনককে বিয়ে করেন আবু সুফিয়ান। স্ত্রীর জন্য আবু সুফিয়ানের মা দিয়েছিলেন হাতের বালা। কনক জানতেন, পাঠাগারটিকে তাঁর স্বামী সন্তানের মতো ভালোবাসেন। তাই হাতের বালা দুটি তাঁর হাতে দিয়ে বললেন, বিক্রি করে দাও, ভালোভাবে চালাও পাঠাগার। কেটে গেল আরো দু-তিন বছর। তত দিনে এক পুত্রসন্তানের জনক হয়েছেন আবু সুফিয়ান। এ সময় আবার পত্রিকার বিল বকেয়া পড়ল। এবার সন্তানের দুধ কেনার জন্য রাখা টাকা দিয়ে পত্রিকার বিল দিলেন। পাঠাগার শুরু হওয়ার দু-তিন বছর পরই উদ্যোক্তা সংস্থা ঘরভাড়া দেওয়াও বন্ধ করে দেয়। কিন্তু আবু সুফিয়ান পাঠাগারটি বন্ধ করতে পারেননি। তিনি বলেন, স্কুল-কলেজে পড়া শিক্ষার্থীরা এসে যদি দেখে পাঠাগার বন্ধ, তারা খুব কষ্ট পাবে। এত কিছুর পরও কারো কাছে হাত পাতেননি। নামমাত্র টাকা নিয়ে সদস্য করা শুরু করেন সুফিয়ান। সদস্যদের চাহিদা অনুযায়ী জাতীয় ভালো মানের প্রায় সব পত্রিকাই রাখেন। কখনো কোনো দানশীল ব্যক্তি সহায়তা করলে বই কেনেন পাঠাগারের জন্য। বর্তমানে এখানে রয়েছে চার হাজার বই। পাঠকরা ইচ্ছা করলে বই বাড়িতেও নিয়ে যেতে পারেন। উপন্যাস, গল্প, ভ্রমণকাহিনি, রাজনীতি ও শিশু-কিশোরদের বই ছাড়াও আরো নানা ধরনের বই আছে। শুরুর পর থেকে সব সময় পাঠাগারের বেশির ভাগ পাঠকই শিক্ষার্থী। সদস্য না হলেও পাঠাগারে এসে পড়তে নিষেধ নেই। পড়ার জন্য আলাদাভাবে কোনো টাকা-পয়সা দিতে হয় না।

যারা নিয়মিত পাঠক, আবু সুফিয়ান তাদের চেনেন। অসুস্থতার কারণে এমন কোনো পাঠক পাঠাগারে আসতে না পারলে আবু সুফিয়ান বই নিয়ে তার বাড়িতে চলে যান। গেল শুক্রবার তাঁকে ফোন করে জানা গেল, সাত দিনের জন্য পাঠাগার বন্ধ। দর্শনা অডিটরিয়াম চত্বরে শুরু হওয়া অনির্বাণ একুশে নাট্য মেলায় স্টল নিয়েছেন। মেলা চলবে ২১ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত। নাট্যোত্সবের মাঠে গিয়ে দেখলাম, আবু সুফিয়ানের পাঠকরা পত্রিকা পড়ছেন। কেউ কেউ স্টলের ভেতরে ঢুকে বই দেখছেন। এখনো পাঠাগারের নাম গণ-উন্নয়ন গ্রন্থাগার থাকলেও মানুষ আবু সুফিয়ানের পাঠাগার হিসেবে চেনে। এখানের অনেক পাঠক এখন বড় কোনো পদে চাকরি করেন কিংবা বড় ব্যবসায়ী। তাঁরা দর্শনায় এলে পাঠাগারে এসে স্মৃতিচারণা করেন। এসব দেখে দেখে মনের খুশিতে দিন কাটাচ্ছেন আবু সুফিয়ান।

 

 

মন্তব্য