kalerkantho

রবিবার। ১৬ জুন ২০১৯। ২ আষাঢ় ১৪২৬। ১২ শাওয়াল ১৪৪০

জীবনের আহ্বানে

১৯৭৭ সালের ২ নভেম্বর ‘সন্ধানী’র আয়োজনে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে অনুষ্ঠিত হয়েছিল দেশের প্রথম স্বেচ্ছায় রক্তদান কর্মসূচি। সেই ঘটনা স্মরণীয় করে রাখতে প্রতিবছর এ দিনটি পালিত হয় ‘জাতীয় স্বেচ্ছায় রক্তদান ও মরণোত্তর চক্ষুদান দিবস’ হিসেবে। স্বাধীনতা পদকপ্রাপ্ত একমাত্র ছাত্রসংগঠন ‘সন্ধানী’কে নিয়ে লিখেছেন মনির হোসেন শিমুল

৩১ অক্টোবর, ২০১৮ ০০:০০ | পড়া যাবে ১৯ মিনিটে



জীবনের আহ্বানে

পহেলা বৈশাখে সন্ধানীর ভ্রাম্যমাণ স্বেচ্ছায় রক্তদান কর্মসূচি

রক্ত দিন জীবন বাঁচান

১৯৭৭ সালে হঠাৎ একদিন ঢাকা মেডিক্যাল কলেজের এক বন্ধু সন্ধানীর সদস্যদের কাছে ছুটে এসে বললেন, ‘বাবার অপারেশন করতে হবে, জরুরি ভিত্তিতে রক্ত প্রয়োজন।’ আশপাশে অনেক পেশাদার রক্তদাতা; কিন্তু তাদের রক্ত নিতে বড় ভয়। হাসপাতালের পাশে বসেই তারা মাদক গ্রহণ করে! সুস্থ, স্বাভাবিক রক্তদাতার খোঁজ না পেয়ে সন্ধানীর সদস্যরা সিদ্ধান্ত নিলেন, নিজেরাই রক্ত দেবেন। তাঁদের উপলব্ধি হলো, নিয়মিত রক্ত দিলে আরো অনেক রোগীর জীবন বাঁচানো যাবে। ফলে ২ নভেম্বর ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ ও হাসপাতালে বাংলাদেশের প্রথম ‘স্বেচ্ছায় রক্তদান কর্মসূচি’র আয়োজন করল সন্ধানী। হাসপাতালটির ব্লাড ব্যাংকের তখনকার ‘ডিউটি ডক্টর’ অধ্যাপক ডা. আবদুল কাদের উদ্যোগটিতে খুব সহযোগিতা করলেন। সন্ধানীর অন্যতম সদস্য ইদ্রিস আলী মঞ্জু সবার আগে রক্ত দিয়ে এসংক্রান্ত ভীতি কাটিয়ে দিলেন। শিক্ষকদের রক্তদানে উত্সাহী করতে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজের মেডিসিন বিভাগের প্রধান অধ্যাপক ডা. ইউসুফ আলী রক্ত দিলেন। ভীতি কাটাতে তিনিও তাঁদের নানাভাবে সাহস জোগালেন। মেয়েদের রক্তদান কার্যক্রমে যুক্ত করতে রক্ত দিলেন তৃতীয় বর্ষের ছাত্রী হোসনে আরা লাকী। সবার সহযোগিতায় প্রথম দিনই ২৭ ব্যাগ রক্ত জোগাড় হলো। অন্য মেডিক্যাল কলেজের আড্ডায়, বন্ধুদের চায়ের দোকানের আলাপে এই কার্যক্রমের গল্প ছড়িয়ে পড়ল। সন্ধানীর সদস্যরা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের হাজারো ছাত্র-ছাত্রীর মাঝে রক্তদান কর্মসূচিকে ছড়িয়ে দিতে চাইলেন। মোশাররফ হোসেন মুক্ত জীববিদ্যা বিভাগের বন্ধু মিজান ও জামালের সঙ্গে আলাপ করে তাঁদের সহযোগিতায় ১৯৭৯ সালের ১৭ জানুয়ারি অপরাজেয় বাংলার পাদদেশে দ্বিতীয় রক্তদান কর্মসূচির আয়োজন করলেন। ঢাকা মেডিক্যালের চক্ষুবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ডা. হারুন উর রশিদ কর্মসূচিতে স্বেচ্ছায় অংশ নিয়ে রক্তদানে কোনো ভয় নেই—এই বিশ্বাসটি প্রতিষ্ঠা করলেন। আরো অনেকের মধ্যে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক ডা. আবুল কালাম আজাদও রক্ত দিলেন সেদিন।

কিভাবে রক্তদান কর্মসূচি ছড়িয়ে গেল, সেই গল্প শোনা যাক তাঁর কাছ থেকে; “রক্ত দেওয়ার কথা বললে তখন মেডিক্যালের ছাত্র-ছাত্রী, এমনকি শিক্ষকরাও ভয় পেতেন। সন্ধানী থেকে আমরা এ কার্যক্রমের আয়োজন করে, নিজেরা রক্ত দিয়ে সে ভয় কাটিয়ে দিতাম। এ ছাড়া লিফলেট বানিয়ে মেডিক্যাল ক্যাম্পাসগুলোতে বিলি করতাম, মাইকিং করতাম। শহীদ মিনার, বইমেলা, সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের গণজমায়েতে রক্তের গ্রুপ নির্ণয় ও উন্মুক্ত রক্তদান কর্মসূচির আয়োজন করতাম। শুরু থেকেই আমাদের স্লোগান হলো—‘রক্ত দিন, জীবন বাঁচান’।” প্রথম বছরে সন্ধানী ২০৭ ব্যাগ রক্ত সংগ্রহ করেছিল। সংগঠনটির কেন্দ্রীয় পরিষদের রোগী কল্যাণবিষয়ক সম্পাদক নয়ন পাল জানালেন, সন্ধানীর পক্ষ থেকে এখন ২২টি মেডিক্যাল ইউনিট ও ৯টি ডোনার ক্লাবের মাধ্যমে বছরে ৯০ হাজার ব্যাগ রক্ত সংগ্রহ করা হয়।

কিভাবে রক্ত সংগ্রহ করেন—এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বললেন, ‘আমরা মেডিক্যাল কলেজগুলোতে নিয়মিত রক্তদান কর্মসূচির আয়োজন করি। এ ছাড়া বিভিন্ন দিবসে সাধারণ মানুষের মধ্যে এ কর্মসূচি নিয়ে কাজ করি। সংকটাপন্ন কোনো মানুষের জীবন বাঁচানোর জন্য ছুটির দিনে শহীদ মিনার, স্মৃতিসৌধের মতো গুরুত্বপূর্ণ স্থানে, বিভিন্ন মেলায় সারা দিন দাঁড়িয়ে থেকে, মানুষকে উদ্বুদ্ধ করে রক্ত সংগ্রহ করি।’ সন্ধানীর রাজশাহী মেডিক্যাল কলেজ ইউনিটের সভাপতি মো. নুরুন নবী আরাফাত রক্ত সরবরাহ পদ্ধতি সম্পর্কে বললেন, ‘রোগীর কোনো সুস্থ আত্মীয় অন্যের প্রয়োজনে অন্য কোনো সময় সন্ধানীতে রক্তে দেবেন—এই বিনিময় পদ্ধতিতে আমরা রক্ত সরবরাহ করি। তবে জরুরি প্রয়োজনে যেকোনো সময়, যেকোনো হাসপাতালে গরিব ও অসহায় রোগীদের জন্য আমরা রক্ত সংগ্রহ করে দিই।’ কেন্দ্রীয় পরিষদের যুগ্ম রোগী কল্যাণ সম্পাদক মোহাম্মদ শাহজান আলী বলেন, ‘গরিব রোগীদের জন্য সন্ধানী বছরে গড়ে ২০ হাজার ব্যাগ রক্ত সরবরাহ করে।’ কিভাবে রক্ত পরীক্ষা করেন—সে সম্পর্কে তাঁর ভাষ্য, ‘আমাদের সদস্যদের চাঁদায় ও হাসপাতালের খরচে রক্তদাতার শরীরে এইডস, ম্যালেরিয়া, সিফিলিস, হেপাটাইটিস বি ও সি-সহ সংক্রামক ও ঘাতক ব্যাধি রয়েছে কি না—তা বিনা খরচে পরীক্ষা করে নেওয়া হয়। অথচ প্রচলিত প্রক্রিয়ায় এসব রোগের উপস্থিতি জানতে একেকজন মানুষের কয়েক হাজার টাকা খরচ হতো।’

কিভাবে রোগীর কাছে রক্ত পৌঁছে—সে কথা জানালেন কেন্দ্রীয় পরিষদের সভাপতি মুশফিক উল মুকিত, ‘আমাদের ইউনিটগুলোর মাধ্যমে প্রতিটি হাসপাতালে জরুরি রক্তের প্রয়োজনে যোগাযোগের জন্য মোবাইল নম্বরের তালিকা টাঙিয়ে দেওয়া হয়, এমনকি ওয়ার্ডগুলোতেও রক্তের প্রয়োজনে আমাদের সঙ্গে যোগাযোগের জন্য অনুরোধ করা থাকে। তা ছাড়া প্রতিটি মেডিক্যালের প্রতিটি ব্যাচের ছাত্র-ছাত্রীদের মধ্যে সম্ভাব্য রক্তদাতার নাম, রক্তের গ্রুপ ও ফোন নম্বরের তালিকা করা হয়। হঠাৎ রক্তের প্রয়োজনে তাঁদের সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়।’ তিনি আরো বলেন, “যেকোনো সুস্থ মানুষ চার মাস পর পর রক্ত দিতে পারেন। সন্ধানীর কোনো কর্মসূচিতে কেউ রক্ত দিলেই তাঁকে ‘ডোনার কার্ড’ দেওয়া হয়। এই কার্ডের মাধ্যমে তিনি সন্ধানীর যেকোনো ইউনিট থেকে যেকোনো সময়, স্বজনের জীবন বাঁচাতে যতবার প্রয়োজন রক্ত সংগ্রহ করতে পারেন।”

 

চোখ ফিরিয়ে দেয় চোখের আলো

সারা বিশ্বে মরণোত্তর চক্ষুদান আন্দোলনের প্রাণপুরুষ শ্রীলঙ্কার ডা. হাডসন ডি সিলভা ১৯৮৪ সালের ২৫ নভেম্বর বাংলাদেশে এসেছিলেন। নিজের দেশ থেকে সঙ্গে নিয়ে এসেছিলেন এক জোড়া কর্নিয়া। রংপুরের অন্ধ কিশোরী টুনটুনির দুই চোখে সেগুলো স্থাপনের মাধ্যমে ‘সন্ধানী জাতীয় চক্ষুদান সমিতি’র জন্ম হয়েছে। বাংলাদেশে কর্নিয়াজনিত অন্ধত্ব দূরীকরণ কার্যক্রমের শুরুও এভাবেই। সন্ধানী জাতীয় চক্ষুদান সমিতির সমন্বয়ক ডা. সাইফুল ইসলাম চৌধুরী বলেন, ‘১৯৮৪ সাল থেকে এ পর্যন্ত আমরা চার হাজার ২৮টি কর্নিয়া সংগ্রহ করে তিন হাজার ৪১৭ জন মানুষের চোখে আলো ফিরিয়ে দিয়েছি।’ সমিতির মহাসচিব ডা. মো. জয়নাল আবেদিন বলেন, ‘‘বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার হিসাবে দেশে বছরে গড়ে ১৪ লাখ মানুষের বেশির ভাগই কর্নিয়া অস্বচ্ছ হয়ে অন্ধ হয়ে যায়। অন্ধত্বের হার কমাতে ও নানা দেশে মরণোত্তর চক্ষুদানে উদ্বুদ্ধ করতে সরকার ও স্বেচ্ছাসেবী সংস্থাগুলো বিভিন্ন কর্মসূচির আয়োজন করে থাকে; কিন্তু আমাদের দেশে মরণোত্তর চক্ষুদান করা যাবে—এই মর্মে ১৯৭৫ সালে আইন পাস হলেও বিভিন্ন রকমের অসহযোগিতা এবং প্রচারণা ও কর্নিয়া সংগ্রহ প্রশিক্ষণের অভাবে সাধারণ মানুষকে মরণোত্তর চক্ষুদানে উদ্বুদ্ধ করা যাচ্ছে না। অনেক চেষ্টা করেও সন্ধানী জাতীয় চক্ষুদান সমিতি বছরে গড়ে মাত্র ২০ জোড়া কর্নিয়া সংগ্রহ করতে পারে। সেগুলোর প্রায় সবই ঢাকা মেডিক্যাল ও পঙ্গু হাসপাতালের বেওয়ারিশ লাশের চোখ। তা ছাড়া শোকার্ত স্বজনের মধ্যে গ্রিফ কাউন্সেলিংয়ের মাধ্যমেও এ সমিতি কর্নিয়া সংগ্রহ করে। গ্রিফ কাউন্সেলিং মানে হলো, মরণোত্তর চক্ষুদান করলে অন্যের চোখের আলোয় আপনার প্রিয়জন বেঁচে থাকবে এবং এটি খুব মহৎ কর্মসূচি—এ বিষয়টি মৃতের স্বজনদের বোঝানো। এভাবে সংগৃহীত কর্নিয়াগুলো সন্ধানী ভবনের ‘আন্তর্জাতিক চক্ষু ব্যাংকে’ সংরক্ষণ করে বিভিন্ন মেডিক্যাল কলেজে প্রতিস্থাপনের জন্য পাঠানো হয়।” তিনি আরো জানালেন, ১৯৮৪ সাল থেকে মরণোত্তর চক্ষুদানে সাধারণ মানুষকে উদ্বুদ্ধ করতে তাঁরা ‘অঙ্গীকারপত্র’ সংগ্রহ করছেন। সন্ধানীর এ পর্যন্ত পাওয়া কর্নিয়ার মধ্যে ১১৮ জোড়া মরণোত্তর অঙ্গীকারে এবং ৪২টি অনুরোধের মাধ্যমে সংগ্রহ করা হয়েছে। সমিতির কোষাধ্যক্ষ অধ্যাপক ডা. মো. তোসাদ্দেক হোসেন সিদ্দিকী বললেন, ‘আমাদের কার্যক্রমে উদ্বুদ্ধ হয়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, সাবেক রাষ্ট্রপতি অধ্যাপক ডা. এ কিউ এম বদরুদ্দোজা চৌধুরী, সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী ও সন্ধানীর সাবেক কর্মী ডা. দীপু মনি, সাবেক স্বাস্থ্যমন্ত্রী অধ্যাপক ডা. আ ফ ম রুহুল হক, সংস্কৃতিমন্ত্রী আসাদুজ্জামান নূর, অভিনেত্রী সারা যাকের, সুবর্ণা মুস্তাফা, গায়িকা মেহরীন, কৃষ্ণকলিসহ ৩৬ হাজার ৩৫৫ ব্যক্তিত্ব মৃত্যুর পর চক্ষুদান করতে সম্মত হয়ে লিখিত অঙ্গীকার করেছেন। ২০১৩ সালের ১৮ ডিসেম্বর ঢাকার নীলক্ষেত বাবুপুরা রোডে সন্ধানী ভবন উদ্বোধন করে রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ তাঁর মৃত্যুর পর কর্নিয়া কোনো অন্ধ ব্যক্তির চোখে প্রতিস্থাপনের জন্য সন্ধানীকে দান করা হবে বলে অঙ্গীকার করেছেন।’

মরণোত্তর চক্ষুদান পদ্ধতি সম্পর্কে সমিতির সভাপতি অধ্যাপক ডা. এ কে এম সালেক জানালেন, সংক্রামক রোগ নেই এমন যেকোনো সুস্থ মানুষই মৃত্যুর পর চোখ দান করতে পারেন। সে জন্য তাঁকে সমিতির অঙ্গীকারপত্র পূরণ করলেই হবে। সন্ধানীর সব মেডিক্যাল ইউনিট, ডোনার ক্লাব ও সমিতির ১১টি আঞ্চলিক কেন্দ্রে এ অঙ্গীকারপত্র পাওয়া যায়। সন্ধানী জাতীয় চক্ষুদান সমিতির ওয়েবসাইট (www.snedsbd.org) থেকে অনলাইনে অঙ্গীকারপত্র পূরণ করে প্রবাসী বাংলাদেশিরাও চোখ দান করতে পারেন। তবে পরে যেন কোনো অসুবিধা না হয়, সে জন্য অঙ্গীকারপত্রে তাঁর পরিবারের দুই সদস্যের ও পরিচিত দুই সাক্ষীর স্বাক্ষর প্রয়োজন হয়। অঙ্গীকারবদ্ধ মানুষের মৃত্যুর ছয় ঘণ্টার মধ্যে সন্ধানীর চিকিত্সক ও শিক্ষার্থী সদস্যরা কর্নিয়া সংগ্রহ করেন। কর্নিয়া প্রতিস্থাপনের পদ্ধতি সম্পর্কে তিনি বলেন, ‘অন্ধ ব্যক্তির চোখ পরীক্ষা করতে চিকিত্সকের সম্মতির প্রয়োজন হয়। কর্নিয়া প্রতিস্থাপনের জন্য ১৫ থেকে ৩০ দিন আগেই ৫০০ টাকা জমা দিয়ে অগ্রিম বুকিং করতে হয়। প্রতিস্থাপনের খরচ পড়ে ১৪ থেকে ১৫ হাজার টাকা। তবে গরিব ও অসহায় রোগীদের কাছ থেকে নামমাত্র ফি নেওয়া হয়।’

 

ড্রাগ ব্যাংক

রাজশাহী মেডিক্যাল কলেজ ও হাসপাতালের শিশু ওয়ার্ডে অনেক দিন ভর্তি আছে পাঁচ বছরের শিশু আবদুল্লাহ। ব্লাড ক্যান্সারে আক্রান্ত সে। কয় দিন পর পরই কেমোথেরাপি দিতে হয়; খেতে হয় দামি ওষুধ। গরিব বাবা খরচ চালাতে পারছিলেন না বলে একসময় চিকিত্সা বন্ধ হয়ে গেল। এ খবর জেনে সন্ধানী রাজশাহী মেডিক্যাল কলেজ ইউনিট পাঁচ হাজার টাকার ওষুধ দিয়ে শিশুটির পাশে দাঁড়ায়। এই ইউনিটের সাধারণ সম্পাদক সৌরভ দেবনাথ হূদয় বললেন, “টাকার অভাবে ওষুধ খাওয়ানো যাচ্ছে না, জরুরি অপারেশন বন্ধ আছে, থ্যালাসেমিয়ায় আক্রান্ত শিশুদের জন্য আলাদাভাবে তৈরি মুখে খাওয়ার ‘আয়রন চিলেটিং’ নামের খুব দামি ওষুধ দরকার—এমন জরুরি প্রয়োজনে আমরা যথাসাধ্য রোগীর পাশে দাঁড়াই। গত এক বছরে গরিব রোগীদের মধ্যে শুধু রাজশাহী মেডিক্যাল কলেজ ও হাসপাতালেই ড্রাগ ব্যাংক থেকে ৮০ হাজার টাকার ওষুধ বিলি করা হয়েছে।” কেন্দ্রীয় পরিষদের সাধারণ সম্পাদক কে এম আব্দুল্লাহ আল মুঈদ জানালেন, যেসব রোগী টাকার অভাবে ওষুধ কিনতে পারেন না, তাঁদের পাশে দাঁড়াতে ১৯৮২ সালে ঢাকা ও ময়মনসিংহ মেডিক্যাল কলেজে ‘সন্ধানী ড্রাগ ব্যাংক’ চালু হয়। এই ব্যাংকের মাধ্যমে সংগ্রহ করা ওষুধ সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন—এমন রোগীর তালিকা তৈরি করে বিতরণ করা হয়। ১৯৮৬ সালে এ ব্যাংকের কার্যক্রম অন্যান্য মেডিক্যালে ছড়িয়ে পড়ে। ১৯৮৯ সালে এই কার্যক্রমের অন্যতম প্রধান পৃষ্ঠপোষক সিলেট মেডিক্যাল কলেজের প্যাথলজি বিভাগের প্রয়াত অধ্যাপক ডা. আবদুল হাকিমের নামানুসারে এটির নাম রাখা হয় ‘অধ্যাপক ডা. আবদুল হাকিম ড্রাগ ব্যাংক।’ জানা গেল, বিভিন্ন মেডিক্যালের অধ্যাপক, সাধারণ চিকিত্সক, ইন্টার্ন ডাক্তার, ইনডোর মেডিক্যাল অফিসার, সিভিল সার্জনের ‘দুর্যোগ ফান্ড’ ও মেডিক্যালের অধ্যক্ষের কাছে ‘ওষুধ চাহিদাপত্র’ শিরোনামে আবেদনের মাধ্যমে, হেলথ ক্যাম্পের জন্য পাওয়া বাড়তি ওষুধ সংরক্ষণ করে গড়ে তোলা হয় ব্যাংকটি। জরুরি প্রয়োজনে সন্ধানীর টাকায়ও ওষুধ কেনা হয়। ২০১৬ সাল থেকে প্রতিবছর সেরা ওষুধ বিতরণ করা ইউনিটকে পুরস্কার দেওয়া হচ্ছে। গত বছর সিলেটের এম এ জি ওসমানী মেডিক্যাল কলেজ ইউনিট পাঁচ হাজার রোগীর মধ্যে দুই লাখ ৪৯ হাজার ৫০০ টাকার ওষুধ বিতরণ করে ‘সেরা ড্রাগ ব্যাংক’ পুরস্কার পেয়েছে। এ ইউনিটের সাধারণ সম্পাদক সালমা বেগম বললেন, “গত বছর ২১টি মেডিক্যাল ইউনিটের মাধ্যমে ড্রাগ ব্যাংক সারা দেশে ১৩ হাজার ৮৪১ জন রোগীকে ১৬ লাখ ৬০ হাজার টাকার জীবনরক্ষাকারী ও সাধারণ ওষুধ প্রদান করেছে। পাশাপাশি এসব স্কুল-কলেজ, হাসপাতাল ও হেলথ ক্যাম্পের রোগীদের মধ্যে ‘চিকিত্সকের পরামর্শ ছাড়া অ্যান্টিবায়োটিক খাবেন না’ শিরোনামে স্বাক্ষর সংগ্রহ ও স্বাস্থ্য সচেতনতামূলক লিফলেট ও স্টিকার বিতরণ করা হয়েছে।”

 

একটি স্বপ্নের জন্ম

১৯৭৭ সালের কথা। ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ ও হাসপাতালে দ্বিতীয় বর্ষে পড়েন মোশাররফ হোসেন মুক্ত। হঠাৎ একদিন জানতে পারেন, তাঁদের এক বন্ধু টাকার অভাবে টানা দুই বছর ধরে সকালে খালি পেটে ক্লাস করেন। দুপুর ২টায় ক্লাস শেষ হলে শুধু কলা-রুটি খান। এ কথা শুনেই মন খারাপ হয়ে গেল তাঁর। সকালে ক্যান্টিনে আলাপ করে, ক্লাস শেষে শহীদ মিনারে বিষয়টি নিয়ে আলোচনার জন্য ছয় বন্ধু একত্র হলেন। কড়ইগাছের নিচে বসে আলাপ শেষে সিদ্ধান্ত হলো, চাঁদা তুলে তাঁরা বন্ধুটিকে সকালের নাশতার টাকা দেবেন। ঠিক হলো, একজন সাত আর বাকিরা পাঁচ টাকা করে চাঁদা দেবেন। এভাবেই সে বছরের ৫ ফেব্রুয়ারি সেই বন্ধুটির পাশে দাঁড়ানোর মাধ্যমে এক মহতী উদ্যোগের জন্ম হলো। তার পর থেকে নিয়মিতই মাসের প্রথম দিন তাঁরা টাকা দিয়ে গেছেন। একসময় তাঁদের মনে হলো, ঢাকা মেডিক্যালসহ অন্য মেডিক্যালগুলোতে এমন অভাবী আরো অনেক ছাত্র-ছাত্রী নিশ্চয়ই রয়েছেন। চিকিত্সার টাকা জোগাড় করতে না পেরে চোখের সামনে অনেক রোগীও মারা যাচ্ছেন। তাঁদের জন্য কিছু করার দায়িত্ববোধ থেকে তাঁরা একটি সংগঠন গড়তে চাইলেন। সেটির কী নাম হতে পারে, সবাই আলাদাভাবে লিখলেন। সে বছরের ১৯ মার্চ বিকেল ৫টায় সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে তাঁদের একটি মিটিং হলো। মুক্তর দেওয়া ‘সন্ধানী’ নামটি বন্ধুদের মনে ধরল। সেদিনই সন্ধানীর প্রথম কমিটির জন্ম। সদস্যরা সবাই ঢাকা মেডিক্যালের ছাত্র-ছাত্রী। সভাপতি মোস্তাফিজুর রহমান স্বপন, সাধারণ সম্পাদক মোশাররফ হোসেন মুক্ত, অর্থ সম্পাদক ইদ্রিস আলী মঞ্জু, সাহিত্য, পত্রিকা ও প্রকাশনা সম্পাদক খুরশিদ আহমেদ অপু, পাঠাগার সম্পাদক মোস্তফা সেলিমুল হাসনাইন ও সাংগঠনিক সম্পাদক আব্দুল কাইউম। সন্ধানীকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেওয়ার জন্য তাঁরা সংবিধানও লিখলেন—‘সন্ধানী নিয়মাবলি’। সেটির মূল কথা ছিল, ‘যাবতীয় অন্যায়-অনাচার থেকে মুক্ত রেখে নিজেদের আদর্শ মানুষ হিসেবে গড়ে তোলা এবং মানবতার কল্যাণের জন্য সাধ্যানুযায়ী সার্বিক প্রচেষ্টা চালিয়ে যাওয়া।’ ১৯৭৯ সালে ময়মনসিংহ মেডিক্যাল কলেজে সন্ধানীর দ্বিতীয় ইউনিট খোলা হলো

কলেজটির তখনকার তৃতীয় বর্ষের ছাত্র ও পরে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য অধ্যাপক ডা. কামরুল হাসান খান ও অন্যান্যের উদ্যোগে। ধীরে ধীরে সরকারি ও বেসরকারি মেডিক্যাল কলেজগুলোতে স্বেচ্ছাসেবামূলক এই সংগঠনটি ছড়িয়ে পড়ল। সন্ধানীর সদস্যদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, কোনো ইউনিটে যদি কখনো রাজনীতি ঢুকে যায়, তাহলে সেই মেডিক্যাল কলেজের অধ্যক্ষ বরাবর আবেদন করে সেটির কার্যক্রম বন্ধ করে দেওয়া হয়। এভাবেই তাঁরা এ ধরনের প্রভাব থেকে মুক্ত রাখেন সংগঠনটিকে।

 

বন্ধুদের পাশে

স্বেচ্ছাসেবী বন্ধু, ভাই-বোনদের জন্য সন্ধানী নানা উদ্যোগ গ্রহণ করে থাকে। মেডিক্যালের দরিদ্র, অসচ্ছল ছাত্র-ছাত্রীদের জন্য ১৯৯৩ সাল থেকে জাপানের ‘আশিনাগা-ওবাসান’ ও ‘শিনসু-সন্ধানী’ প্রকল্পের মাধ্যমে শিক্ষাবৃত্তি দেওয়া হয়। তা ছাড়া উপদেষ্টা ও ইউনিটগুলোর সম্মিলিত চাঁদায় মোট ৫৪টি শিক্ষাবৃত্তি দেওয়া হয়। সে টাকায় বছরে গড়ে দুই শতাধিক ছাত্র-ছাত্রী লেখাপড়া করে। কিভাবে সদস্য সংগ্রহ করা হয়—সে প্রশ্নের জবাবে ময়মনসিংহ মেডিক্যাল ইউনিটের সভাপতি মির্জা মিনহাজুল ইসলাম বলেন, ‘প্রতিবছর সন্ধানী ফুল, মিষ্টি, স্বেচ্ছায় রক্তদানে উদ্বুদ্ধ করতে লিফলেট নিয়ে নবীনবরণ করা হয়। এ ছাড়া প্রতিটি ইউনিট তাদের সামনে সন্ধানীর সব অর্জন প্রেজেন্টেশনের মাধ্যমে তুলে ধরে। তাদের মানবসেবায় যুক্ত হতে আবেদন জানায়। তা ছাড়া ষাণ্মাসিক ও বার্ষিক সম্মেলনে সদস্যদের নিয়ে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান আয়োজন করা হয়।’ সন্ধানীর সদস্যদের জন্য রয়েছে লাইব্রেরিও। এ সম্পর্কে সিলেট এম এ জি ওসমানী মেডিক্যাল কলেজ ইউনিটের কেন্দ্রীয় প্রতিনিধি সামিরা আকন্দ বললেন, “আমাদের লাইব্রেরিগুলোতে পড়ালেখার বই ছাড়াও পরীক্ষার জন্য প্রয়োজনীয় দেশি-বিদেশি চিকিত্সাবিজ্ঞানের বই থাকে। এই যেমন—আমাদের ইউনিটের ‘সন্ধানী আশরাফুল ইমাম ভূইয়া শাকিল গ্রন্থাগার’-এ রয়েছে এক হাজার ২৫৮টি বই।” তিনি আরো বলেন, ‘এমবিবিএস ফাইনালের আগে আমরা সন্ধানীর উদ্যোগে সব সদস্যের মধ্যে উপহার হিসেবে পরীক্ষার জন্য কলমসহ সব উপকরণ বিতরণ করি।’

 

সন্ধানী চক্ষু হাসপাতাল

‘সন্ধানী জাতীয় চক্ষুদান সমিতি’র গণযোগাযোগ সম্পাদক ডা. আহমেদুল কবির মিলন জানান, গরিব, দুস্থ ও প্রত্যন্ত এলাকার চিকিত্সার সুযোগবঞ্চিত রোগীদের চিকিত্সাসেবা দিতে ২০০৮ সালে সন্ধানীর স্থায়ী কার্যালয়ে সন্ধানী চক্ষু হাসপাতাল চালু হয়। এখানে উন্নত চক্ষু হাসপাতালের সব সুযোগ-সুবিধা রয়েছে। মাত্র ২৫ টাকা টিকিটের বিনিময়ে চোখের রোগের সব ধরনের চিকিত্সা ও অস্ত্রোপচার করানো হয় এখানে। এই হাসপাতালের চিকিত্সক ও ছাত্র-ছাত্রীদের মাধ্যমে প্রতি মাসে দেশের বিভিন্ন এলাকায় চক্ষু শিবিরের আয়োজন করা হয়। এ পর্যন্ত ৫০টি চক্ষু শিবিরে ১৬ হাজার রোগীকে বিনা মূল্যে চিকিত্সা ও ওষুধপত্র দেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া ‘ইন্টারন্যাশনাল ফেডারেশন অব আই ব্যাংকস’-এর সঙ্গে দুই বছরের চিকিত্সাসেবা বিনিময় চুক্তিতে ২০১৬-১৭ সালে ‘জাতীয় অন্ধত্ব বিমোচন কর্মসূচি’ পালন করা হয়েছে। তখন অন্য কার্যক্রমের পাশাপাশি বিভিন্ন মেডিক্যাল কলেজের ৮০০ শিক্ষার্থী, চিকিত্সক, রোটারিয়ান ও স্বেচ্ছাসেবককে কর্নিয়া সংগ্রহ প্রশিক্ষণ প্রদান ও সার্টিফিকেট দেওয়া হয়েছে। ফলে তাঁরা দেশের যেকোনো এলাকায় কর্নিয়া সংগ্রহ করতে পারবেন।’

 

আছে জড়িয়ে

রক্তদান, ড্রাগ ব্যাংক, মরণোত্তর চক্ষুদান, হেলথ ক্যাম্প ইত্যাদি কার্যক্রমের পাশাপাশি আরো অনেক কাজে সন্ধানী জড়িয়ে আছে। এগুলোর মধ্যে রয়েছে—মেধাবৃত্তি প্রদান, রক্তের গ্রুপ নির্ণয়, রোজায় ইফতারি বিতরণ, ঈদসামগ্রী ও ঈদের পোশাক, শীতবস্ত্র বিতরণ ইত্যাদি। কেন্দ্রীয় পরিষদের ডোনার ক্লাব ও সমাজকল্যাণ সম্পাদক রায়হান শরীফ বলেন, ‘প্রতি শীতে সন্ধানী ইউনিটগুলোর মাধ্যমে চার হাজারের বেশি শীতবস্ত্র বিতরণ করা হয়।’ গণস্বাস্থ্য সমাজভিত্তিক মেডিক্যাল কলেজ ইউনিটের সাধারণ সম্পাদক পার্থ বসু জানালেন, গত দুই বছর তাঁদের ইউনিট দুই রমজানে ৭০টি বস্তির পরিবারে ইফতারি ও ঈদসামগ্রী উপহার দিয়েছে এবং ১৬৮টি এতিম শিশুকে কিনে দিয়েছে ঈদের পোশাক। দিনাজপুরের এম আব্দুর রহিম মেডিক্যাল কলেজ ইউনিটের সভাপতি মো. নিজাম উদ্দিন সম্রাটের কাছ থেকে জানা যায়, ঢাকা মেডিক্যাল, বাংলাদেশ মেডিক্যাল, সন্ধানী জাতীয় চক্ষুদান সমিতি ও তাঁদের ইউনিট মিলে এ বছরের ৪ জানুয়ারি দিনাজপুরের বীরগঞ্জ উপজেলায় এক হাজার ৫০০ গরিব মানুষকে একবেলা খাবার দিয়েছে এবং বিতরণ করেছে ৫৫০টি কম্বল। ৯ জানুয়ারি তাঁরা চট্টগ্রাম মেডিক্যাল কলেজ ইউনিটের সঙ্গে যৌথভাবে দিনাজপুরের কাহারোল উপজেলায় চার শতাধিক শীতবস্ত্র বিতরণ করেছেন। কিভাবে এই সাহায্য তহবিল গড়ে ওঠে—এই প্রশ্নের জবাবে মুকিত জানালেন, শীতের শুরুতে সন্ধানী মেডিক্যাল ও ডেন্টাল ইউনিটের মাধ্যমে ছাত্র-ছাত্রী ও শিক্ষকদের কাছে শীতবস্ত্র দানের জন্য আবেদন করা হয়। পরে সেই ইউনিট ও কাছাকাছি আরো কয়েকটি ইউনিট মিলে দেশের প্রত্যন্ত শীতার্ত এলাকায় শীতবস্ত্র বিতরণ করেছে। ‘রক্তের গ্রুপ নির্ণয় কর্মসূচি’ সম্পর্কে কেন্দ্রীয় পরিষদের শিক্ষা, গবেষণা ও পরিসংখ্যান সম্পাদক সৌরভ দে উদয় বলেন, ‘‘প্রতিবছর আমরা গড়ে ১৩০টি স্কুল-কলেজে রক্তের গ্রুপ নির্ণয় করে শিক্ষার্থীদের সুস্থ থাকার জন্য উত্সাহিত করি, রক্তদানে আগ্রহী করি। এ ছাড়া সারা বছর ধরে শহীদ মিনারসহ ঐতিহাসিক স্থানে, জাতীয় দিবসে গণজমায়েত স্থলে গড়ে ৭০টি রক্তের গ্রুপ নির্ণয় কার্যক্রম করি। তা ছাড়া স্কুল-কলেজে যোগাযোগ করে বা কর্তৃপক্ষের আমন্ত্রণে দিন, সপ্তাহব্যাপী হেপাটাইটিস ‘বি’, জরায়ুমুখে ক্যান্সারের মতো ঘাতকব্যাধি প্রতিরোধে টিকাদান ও সচেতনতা কার্যক্রম করি।’’

 

দুর্যোগে দুর্গতের পাশে

জলোচ্ছ্বাস, ঘূর্ণিঝড়, বন্যা, ভয়াবহ রোগের প্রাদুর্ভাব—যেকোনো দুর্যোগে বিনা মূল্যে ‘সন্ধানী’ চিকিত্সাসেবা দিয়ে চলেছে। বিভিন্ন হাসপাতালের চিকিত্সক, ছাত্র-ছাত্রীরা সন্ধানীর সব ইউনিট ও অঙ্গপ্রতিষ্ঠান নিয়ে মানবতার সেবায় ঝাঁপিয়ে পড়েন। স্কুল ঘরে, খোলা মাঠে, পানিতে ভেলায় তাঁরা ভেসে থাকেন। অন্যের রোগের চিকিত্সা করতে গিয়ে তাঁরাও যে রোগে ভোগেন, সে খবর হয়তো কেউ রাখে না! এখন রোহিঙ্গাদের মধ্যে কত চিকিত্সক বিনা মূল্যে, বস্তিতে থেকে চিকিত্সাসেবা দিচ্ছেন, তা কেউ জানতে চায় না। তার পরও বছরের পর বছর ফ্রি হেলথ ক্যাম্প করে চলেছে সন্ধানী; ওষুধ বিলি করছে, রক্ত সংগ্রহ করে জীবন বাঁচাচ্ছে।

দেশের দক্ষিণাঞ্চলেই সবচেয়ে বেশি দুর্যোগ হয়ে থাকে। দুর্গতের সেবা কার্যক্রমের উদাহরণ দিতে গিয়ে চট্টগ্রাম মেডিক্যাল কলেজের সন্ধানী ইউনিটের সভাপতি মোহাম্মদ ওমর ফয়সাল বললেন, ‘১৯৯১ সালের ঘূর্ণিঝড়ের পর পরই সন্ধানীর ২০ জনের একটি দল কক্সবাজারের চকরিয়া উপজেলায় গিয়েছে। তারা চিকিত্সাসেবা দিয়েছে। সেখানে হাজারো কষ্ট সহ্য করে টানা এক মাস চিকিত্সাসেবা দিয়েছে তারা। তাদেরই একটি দল সেবার প্রয়োজনে নৌকায় সাগর পাড়ি দিয়ে সন্দ্ব্বীপে গিয়ে ঘূর্ণিঝড়ে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষকে তিন সপ্তাহ চিকিত্সা দিয়েছে। বিশুদ্ধ পানি খাওয়ার জন্য সন্দ্বীপে জাপানি সাহায্যপুষ্ট ডা. হাসিনা নামের একটি প্রকল্পের মাধ্যমে ৩১টি টিউবওয়েল বিতরণ করেছে। চকরিয়ার দলটি সাধারণ মানুষের সঙ্গে নিজেরাও খেটে মেহেরনামা গ্রামে ভেঙে পড়া হাই স্কুল মেরামত করে দিয়েছে। নতুন স্কুলঘর তৈরি করে দিয়েছে হারবাং গ্রামে। সেগুলোতে গ্রামের মানুষ আশ্রয় নিয়েছে, পরে শিশুরা লেখাপড়া করছে। এমন উদাহরণ রয়েছে ভূরি ভূরি।’ এসব উদ্যোগ ও কার্যক্রমের ফলে ১৯৯৫ সালে যুবসমাজকে মানবকল্যাণে সম্পৃক্ত করার অবদানের স্বীকৃতি হিসেবে এশিয়ার একমাত্র সংগঠন সন্ধানী ‘কমনওয়েলথ ইয়ুথ সার্ভিস অ্যাওয়ার্ড’ লাভ করেছে। ২০০৪ সালে সমাজসেবায় বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় রাষ্ট্রীয় সম্মান ‘স্বাধীনতা পদক’ পেয়েছে এটি। তবে সন্ধানীর সবচেয়ে বড় স্বীকৃতি হলো—সংগঠনটির জন্ম দিবস ২ নভেম্বর ‘জাতীয় স্বেচ্ছায় রক্তদান ও মরণোত্তর চক্ষুদান দিবস’ হিসেবে সারা দেশে পালিত হয়।

কর্নিয়া প্রতিস্থাপন কর্মশালা শেষে অধ্যাপক-চিকিত্সকদের সঙ্গে মেডিক্যালের ছাত্র-ছাত্রীরা

প্রত্যন্ত গ্রামে শীতবস্ত্র বিতরণ কার্যক্রম

রাজশাহীতে শিশু আবদুল্লাহর মায়ের হাতে ওষুধ তুলে দেওয়া হচ্ছে

প্রাথমিক বিদ্যালয়ে করা হচ্ছে রক্তের গ্রুপ নির্ণয়

 

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা