kalerkantho

শুক্রবার । ২১ জুন ২০১৯। ৭ আষাঢ় ১৪২৬। ১৭ শাওয়াল ১৪৪০

এবার হবে পড়াখেলা!

খেলাধুলায় বারণ নেই, বরং খেলার ফাঁকে চলে পড়ালেখা! বিশ্বাস হচ্ছে না? বিকেএসপিতে ভর্তির সুযোগ পেলে এমন স্বাধীনতা পাবে তুমিও। সম্প্রতি বিভিন্ন বিভাগে ভর্তির বিজ্ঞপ্তি দিয়েছে প্রতিষ্ঠানটি। বিস্তারিত জানাচ্ছেন আরাফাত শাহরিয়ার

১৩ ডিসেম্বর, ২০১৭ ০০:০০ | পড়া যাবে ৭ মিনিটে



এবার হবে পড়াখেলা!

অঙ্কন : মাসুম

সাকিব আল হাসানের দারুণ ভক্ত অষ্টম শ্রেণির সাব্বির। সময় পেলেই মেতে ওঠে ব্যাট-বলের লড়াইয়ে। গত বছর সপ্তম শ্রেণিতে ভর্তির সুযোগ পেয়েছে বাংলাদেশ ক্রীড়া শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান—বিকেএসপিতে। সেই থেকেই মেতে আছে ক্রিকেট নিয়ে। জাতীয় দলে খেলার স্বপ্ন।

সাব্বিরের মতো খেলাপাগলদের স্বপ্নপূরণে কাজ করছে দেশের ক্রীড়া শিক্ষার একমাত্র সরকারি প্রতিষ্ঠান বিকেএসপি। এখান থেকে উঠে এসেছেন বাংলাদেশ জাতীয় ক্রিকেট দলের অভিষেক টেস্টের অধিনায়ক নাঈমুর রহমান দুর্জয়, বিশ্বের এক নম্বর অলরাউন্ডার, টি-টোয়েন্টি ও টেস্ট অধিনায়ক সাকিব আল হাসান, সাবেক অধিনায়ক মুশফিকুর রহিম, জাতীয় দলের নাসির হোসেন, আবদুর রাজ্জাক, সোহরাওয়ার্দী শুভ, নাঈম ইসলাম, নাজমুল হোসেন, শাহাদাত হোসেনসহ অনেক খ্যাতিমান ক্রিকেটার। শুধু ক্রিকেট নয়, দেশের ক্রীড়াঙ্গনের অন্যান্য ক্ষেত্রেও এ প্রতিষ্ঠান রেখে চলেছে অনন্য অবদান। কমনওয়েলথ গেমসে শুটিংয়ে স্বর্ণপদক জয়ী আসিফ হোসেন খান, খ্যাতিমান হকি খেলোয়াড় রাসেল মাহমুদ জিমি, জাতীয় ফুটবলার জাহিদ, এমিলিসহ অনেকেই বিকেএসপির সাবেক ছাত্র।

পাঠশালাটাই খেলাধুলার

বিকেএসপির উপপরিচালক (প্রশিক্ষণ) শামীমা সাত্তার মিমো জানান, ১৯৮৬ সালের ১৪ এপ্রিল ১১৫ একর জায়গা নিয়ে ঢাকার সাভারের জিরানিতে আনুষ্ঠানিকভাবে পথচলা শুরু করে বাংলাদেশ ক্রীড়া শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান (বিকেএসপি)। প্রতিষ্ঠানটির উদ্দেশ্য দেশের জন্য আন্তর্জাতিকমানের ক্রীড়াবিদ তৈরি করা। শুধু তা-ই নয়, এর পাশাপাশি এখানে পড়াশোনায়ও সমানভাবে গুরুত্ব দেওয়া হয়। অনূর্ধ্ব ৯ থেকে ১৪ বছর বয়সী শিক্ষার্থীরা আবেদন করতে পারে। ঢাকার সাভারের পাশাপাশি চট্টগ্রাম, সিলেট, বরিশাল, খুলনা ও দিনাজপুর আঞ্চলিক কেন্দ্রেও আছে ভর্তির সুযোগ।

খেলার সঙ্গে পড়া

বাসায় খেলতে বারণ। স্কুলসময়েও খেলাধুলার ফুরসত কোথায়! কিন্তু এমন যদি হয়, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে খেলাধুলাই হবে মূল বিষয়। একই সঙ্গে চলবে পড়ালেখাও। স্বপ্নের মতো মনে হলেও এমন সুযোগই মেলে বিকেএসপিতে। মাধ্যমিক, উচ্চ মাধ্যমিক পর্যন্ত, এমনকি ডিগ্রি পড়ারও সুযোগ রয়েছে এখানে। মূলধারার পাঠ্য বই পড়েই একাডেমিক পরীক্ষায় বসতে হয় শিক্ষার্থীদের। বিকেএসপির প্রশিক্ষক এস এম জাহাঙ্গীর আলম রনি জানান, আবাসিক এ প্রতিষ্ঠানে সকাল ৭টা থেকে সাড়ে ৮টা আর বিকেল ৩টা থেকে ৫টা পর্যন্ত চলে খেলাধুলার প্রশিক্ষণ। তবে শনি, সোম ও বুধ—এই তিন দিন সকালে প্র্যাকটিস বন্ধ থাকে। শনিবার সকাল ৯টায় অ্যাসেমব্লি হয়। রবি, মঙ্গল ও বৃহস্পতিবার সকাল ৯টা ২৫ মিনিট থেকে ১টা এবং সোম ও বুধবার সকাল সাড়ে ৮টা থেকে ১টা পর্যন্ত চলে শ্রেণি কার্যক্রম। মাঝে খাওয়াদাওয়া ও বিশ্রাম। সময়সূচি শীত ও গ্রীষ্মভেদে কিছুটা পরিবর্তন হয়ে থাকে।

বিকেএসপির শিক্ষক ও জনসংযোগ কর্মকর্তা মো. আশরাফুজ্জামান জানান, প্রতিবছর নির্দিষ্ট বয়সে আসনসংখ্যা খালি থাকা সাপেক্ষে শিক্ষার্থী ভর্তি করানো হয় বিকেএসপিতে। ২০১৮ শিক্ষাবর্ষে শুরু হয়ে গেছে ভর্তি কার্যক্রম। ২৬ ডিসেম্বর শুরু হয়ে প্রাথমিক বাছাই চলবে ২৯ ডিসেম্বর ২০১৭ পর্যন্ত। প্রাথমিক নির্বাচনের সময়সূচি পাওয়া যাবে বিজ্ঞপ্তিতে। বিজ্ঞপ্তিটি প্রকাশ হয়েছে ৭ ডিসেম্বরের যুগান্তর পত্রিকার ১৬ পৃষ্ঠায়। পাওয়া যাবে www.bksp.gov.bd ওয়েবসাইট ও http://bit.ly/2BhkIX8 লিংকেও।

যত ইভেন্ট

২০১৮ সালে বিকেএসপিতে মোট ১৭টি ইভেন্টে শিক্ষার্থী ভর্তি করা হবে। ইভেন্টগুলো হলো ক্রিকেট, আরচারি, অ্যাথলেটিকস, ফুটবল, টেনিস, কারাতে, বক্সিং, জুডো, উশু, তায়কোয়ান্দো, বাস্কেটবল, সাঁতার, হকি, ভলিবল, জিমন্যাস্টিকস, শুটিং ও টেবিল টেনিস। ১৭টি খেলার মধ্যে ক্রিকেট, আরচারি, কারাতে, হকি বিভাগে শুধু সপ্তম শ্রেণিতে ভর্তির আবেদন করতে পারবে। অ্যাথলেটিকস, উশু, তায়কোয়ান্দো ও টেবিল টেনিসে ষষ্ঠ ও সপ্তম শ্রেণিতে ভর্তি করা হবে। ফুটবলে ভর্তি করা হবে পঞ্চম-সপ্তম শ্রেণিতে। টেনিস, বক্সিং, সাঁতার ও জিমন্যাস্টিকসে চতুর্থ-ষষ্ঠ শ্রেণিতে ভর্তি করা হবে। জুডো, শুটিং সপ্তম ও অষ্টম শ্রেণিতে ভর্তি করা হবে। এ ছাড়া বাস্কেটবল, ভলিবল বিভাগে ভর্তি করা হবে অষ্টম ও নবম শ্রেণিতে।

আবেদন অনলাইনে

ভর্তি হতে চাইলে প্রথমে অনলাইনে নিবন্ধন করতে হবে। বিকেএসপির ওয়েবসাইটে বা http://bkspbd.com/?app=online_admission লিংকে লগইন করে ফরম পূরণ করে অনলাইনে নিবন্ধন করতে হবে। অনলাইন আবেদন ফরমে খেলার নাম নির্বাচন করে ছাত্র-ছাত্রীর নাম, মা-বাবার নাম, জন্ম তারিখ, মোবাইল নম্বর, শ্রেণির নাম ও ঠিকানা উল্লেখ করতে হবে। আবেদনের সময় আপলোড করতে হবে ছবি। ছবির সাইজ হতে হবে সর্বোচ্চ ৩০০ কেবি। প্রাথমিক বাছাইয়ে অংশ নেওয়ার জন্য প্রার্থীকে নির্ধারিত তারিখে সকাল সাড়ে ৮টার মধ্যে সাভারের আশুলিয়ার জিরানিতে অবস্থিত ঢাকা বিকেএসপিতে উপস্থিত হতে হবে। প্রাথমিক নির্বাচনের দিন অনলাইনে পূরণ করা ভর্তি ফরমের প্রিন্ট কপি জমা দিয়ে পরীক্ষায় অংশ নিতে হবে।

প্রাথমিক বাছাই, ব্যবহারিক ও লিখিত পরীক্ষা

শামীমা সাত্তার মিমো জানান, বিকেএসপিতে শিক্ষার্থী ভর্তির ক্ষেত্রে তিনটি ধাপ অনুসরণ করা হয়। এগুলো হলো প্রাথমিক বাছাই, প্রাথমিকভাবে নির্বাচিত শিক্ষার্থীদের প্রশিক্ষণ ও চূড়ান্ত নির্বাচন। প্রাথমিক বাছাইয়ে অংশ নেওয়ার জন্য প্রয়োজনীয় ক্রীড়া সরঞ্জাম ও পোশাক সঙ্গে নিতে হবে। তারপর বয়স নির্ধারণ ও শারীরিক যোগ্যতা যাচাইয়ের জন্য নেওয়া হবে প্রাথমিক ডাক্তারি পরীক্ষা। নেওয়া হতে পারে ফিটনেস পরীক্ষাও। তারপর অংশ নিতে হবে ব্যবহারিক পরীক্ষায়। মেডিক্যাল ও ফিটনেস টেস্টে উত্তীর্ণ প্রার্থীরাই শুধু ব্যবহারিক পরীক্ষায় অংশ নেওয়ার সুযোগ পাবে।

প্রাথমিকভাবে নির্বাচিত খেলোয়াড়দের নিয়ে সাত দিনের প্রশিক্ষণ ক্যাম্পের আয়োজন করা হবে। এ বিষয়ে দরকারি তথ্য মোবাইলে এসএমএসে জানানো হবে। প্রশিক্ষণ ক্যাম্পে নিজ নিজ বিভাগের ব্যবহারিক পরীক্ষা নেওয়া হবে।

এস এম জাহাঙ্গীর আলম রনি জানান, প্রশিক্ষণ ক্যাম্প শেষে মোট ১০০ নম্বরের পরীক্ষা নেওয়া হবে। এর মধ্যে ৭০ নম্বর থাকবে ব্যবহারিক। এতে সংশ্লিষ্ট খেলায় দক্ষতা ও ফিজিক্যাল ফিটনেস দেখা হয়।  যেমন ক্রিকেটে ভর্তির ক্ষেত্রে ব্যাটিং, বোলিং ও ফিল্ডিং—এ তিনটি দিক এবং শারীরিক সক্ষমতা দেখা হবে। ২০ নম্বরের লিখিত পরীক্ষা হবে বিষয়ভিত্তিক। এতে বাংলা, ইংরেজি, গণিত থেকে প্রশ্ন করা হবে। প্রশ্ন করা হবে সর্বশেষ শ্রেণির সিলেবাস অনুযায়ী। বাকি ১০ নম্বর বরাদ্দ ক্রীড়াবিজ্ঞানে। এতে ফিজিক্যাল ফিটনেস ও সাইকোলজিক্যাল বিষয় থেকেও প্রশ্ন হতে পারে।

চূড়ান্ত নির্বাচন

চূড়ান্ত নির্বাচনের দিন প্রার্থীকে সদ্য তোলা পাসপোর্ট সাইজের চার কপি রঙিন ছবি, জন্মনিবন্ধন সনদ, পিইসি, জেএসসি বা জেডিসির সনদ ও নাগরিকত্ব সনদের সত্যায়িত কপি আনতে হবে। ব্যবহারিক ও লিখিত পরীক্ষার সমন্বিত ফলাফলের ভিত্তিতে চূড়ান্ত নির্বাচন করা হবে। এ সময় চূড়ান্ত ডাক্তারি পরীক্ষাও নেওয়া হবে। ভর্তির সময় শিক্ষার্থীকে নির্দিষ্ট পরিমাণ টাকা জামানত (ফেরতযোগ্য) দিতে হয়। এ ছাড়া নিজ খরচে সংশ্লিষ্ট খেলার সরঞ্জামাদি ও পোশাক কিনতে হয়।

বেতন ও সুযোগ-সুবিধা

বিকেএসপিতে বিভিন্ন বিষয়ে প্রশিক্ষণ দেন দেশি-বিদেশি প্রশিক্ষকরা। অভ্যন্তরীণ ক্লাব, জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে খেলার সুযোগ তো আছেই। কৃতী প্রশিক্ষণার্থীদের জন্য আছে বিশেষ সুযোগ-সুবিধা। শিক্ষা বোর্ডের সিলেবাস অনুযায়ী সাধারণ শিক্ষা, আবাসিক পরিবেশে সুশৃঙ্খল জীবনযাপন, পুষ্টিকর খাবার ও নৈতিক শিক্ষার সুব্যবস্থাও করে কর্তৃপক্ষ। রুটিন মেনে সপ্তাহে ছয় দিন প্র্যাকটিস ও একাডেমিক পড়াশোনা করতে হয়। শুক্রবার সাপ্তাহিক ছুটি। বেতন দিতে হয় তিন মাস অন্তর, এটি নির্ধারিত হয় অভিভাবকের বার্ষিক আয়ের ওপর। তবে মেধাবী অথচ দরিদ্র শিক্ষার্থীদের জন্য আছে বেতন মওকুফের ব্যবস্থা বা বিনা বেতনে পড়ার সুযোগ।

যোগাযোগ

সব খেলার জন্য প্রাথমিক বাছাই শুরু হবে সকাল ৮টা ৩০ মিনিটে, ঢাকা বিকেএসপিতে। আরো তথ্যের জন্য যোগাযোগ করতে পারো বাংলাদেশ ক্রীড়া শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান-বিকেএসপির কার্যালয়ে। ঠিকানা : জিরানি, সাভার, ঢাকা। ফোন : ৭৭৮৯২১৫, ৭৭৮৯২১৬, ৭৭৮৯২১৯, ৭৭৮৯৫১৫, ০১৭০৯৩৩০০৭০, ০১৯৮৯৪০৬৯৬৪

ই-মেইল : [email protected]

ওয়েব : www.bksp-bd.org, www.bksp.gov.bd

মন্তব্য