kalerkantho

বৃহস্পতিবার । ১ ডিসেম্বর ২০২২ । ১৬ অগ্রহায়ণ ১৪২৯ ।  ৬ জমাদিউল আউয়াল ১৪৪৪

সুদহার বাড়াচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র, চাপে পুরো বিশ্ব

মুহাম্মদ শরীফ হোসেন   

২৫ সেপ্টেম্বর, ২০২২ ০৯:২৭ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



সুদহার বাড়াচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র, চাপে পুরো বিশ্ব

মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে দফায় দফায় নীতিসুদ হার বাড়াচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র। তাতে উল্টো মূল্যস্ফীতির চাপ বাড়ছে বিশ্বজুড়ে। ডলার ক্রমাগত শক্তিশালী হওয়ায় দেশে দেশে স্থানীয় মুদ্রার দরপতন ঘটছে, বাড়ছে আমদানি ব্যয়। এর পাশাপাশি ডলারকেন্দ্রিক বিনিয়োগ বাড়ায় পুঁজি চলে আসছে উন্নয়নশীল দেশগুলো থেকে।

বিজ্ঞাপন

এতে মুদ্রাবাজারের পাশাপাশি শেয়ারবাজারেও অস্থিরতা দেখা যাচ্ছে।

যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় ব্যাংক ফেডারেল রিজার্ভ গত সপ্তাহে আরো ৭৫ বেসিস পয়েন্ট নীতি সুদহার বাড়িয়েছে। এ বছর এ নিয়ে পঞ্চম দফায় সুদহার বাড়ানো হলো। একই সঙ্গে ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছে সামনে আরো বাড়ানো হবে। এতে ফেডারেল রিজার্ভের নীতি সুদহার বছরের শুরুতে শূন্য শতাংশ থেকে এখন ৩ থেকে ৩.২৫ শতাংশে উঠে এলো। এমনকি চলতি বছর তা ৪.৪ শতাংশও হতে পারে বলে পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের পথ ধরে ইউরোপসহ অন্যান্য দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোও মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে সুদহার বাড়াচ্ছে।

সুদহারের ক্রমাগত বৃদ্ধিতে গত বুধবারই মার্কিন ডলারের দাম বেড়ে নতুন করে দুই দশকে সর্বোচ্চ হয়েছে। ওই দিন ডলারের সূচক বেড়ে হয় ১১১.৬৩ পয়েন্ট। যদিও পরে মূল্যসূচক কিছুটা কমে হয়েছে ১১০.৯৭। স্কটিয়াব্যাংক ইন টরন্টোর প্রধান এফএক্স কৌশলী শন ওসবর্নে বলেন, ‘ডলার অতিমাত্রায় মূল্যায়িত হচ্ছে। বছরের শুরু থেকে এ পর্যন্ত অন্যান্য বৈশ্বিক মুদ্রাগুলোর বিপরীতে ডলারের দাম প্রায় ১৬ শতাংশ বেড়েছে। ’

ডলারের উত্থান ইউরোপের জন্যও বড় শঙ্কার কারণ হয়ে উঠেছে। ওই অঞ্চলে মুদ্রার দরপতন ও ভয়াবহ মূল্যস্ফীতিতে মন্দা অনেকটা অনিবার্য হয়ে উঠেছে। এ বছর ডলারের বিপরীতে ইউরোর দর পড়েছে ১২ শতাংশ, ব্রিটিশ পাউন্ডের দাম ৩৭ বছরে সর্বনিম্নে নেমেছে। জাপানি মুদ্রা ইয়েনের দর পড়েছে ২০ শতাংশ। মুদ্রার মান ধরে রাখতে এরই মধ্যে জাপানের কেন্দ্রীয় ব্যাংক বাজারে হস্তক্ষেপ করেছে। ভারতীয় রুপির দর পড়েছে প্রায় ৭ শতাংশ এবং পাকিস্তানি মুদ্রার দর পড়তে পড়তে প্রতি ডলার ২৩৫ পাকিস্তানি রুপিতে উঠেছে। বিশ্লেষকরা বলছেন, ফেডের সুদের হার বৃদ্ধিতে বিশ্বের প্রায় সব অঞ্চলই ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে ২০২২ সালে। বিশেষ করে লাতিন আমেরিকান দেশ ব্রাজিল, আর্জেন্টিনা, উন্নয়নশীল দেশ থাইল্যান্ড, ইন্দোনেশিয়া, শ্রীলঙ্কাসহ আরো অনেক দেশ। তাদের আমদানি ব্যয় যেমন বেড়েছে, তেমনি পুঁজির বহির্মুখী প্রবাহ বেড়েছে এবং সরবরাহ ব্যবস্থাও বিঘ্নিত হয়েছে।

বিআরআই শ্রীলঙ্কার পরিচালক মায়া মাজুয়েরান বলেন, ‘এই সংকটকালে যুক্তরাষ্ট্রের সুদের হার বাড়ানোর চিন্তা একেবারে স্বার্থপর চিন্তা। কারণ তাদের সুদহার বৃদ্ধির ফলে মারাত্মক নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে উন্নয়নশীল দেশগুলোতে। ’ তাঁর মতে, সুদের হার বৃদ্ধির ফলে ডলার শক্তিশালী হচ্ছে। জ্বালানি, খাদ্যপণ্য, ওষুধ এবং অন্যান্য কাঁচামালের আমদানি ব্যয় বাড়ছে। এতে মূল্যস্ফীতি বেড়ে শ্রীলঙ্কার জনজীবনে বিপর্যয় নেমে এসেছে। গত মার্চ থেকেই শ্রীলঙ্কার মুদ্রার মান পড়ছে। এরই মধ্যে প্রতি ডলার দাঁড়িয়েছে ৩৬৩ শ্রীলঙ্কান রুপি। একই বিপদে আছে আর্জেন্টিনাও। দেশটিতে আগস্টে মূল্যস্ফীতি বেড়ে হয়েছে ৭৮.৫ শতাংশ। যেখানে ২০১৯ সালে ছিল ৫৪ শতাংশ। বাংলাদেশেও মূল্যস্ফীতি বাড়ার পাশাপাশি স্থানীয় মুদ্রা টাকার ব্যাপক দরপতন হয়েছে।

থিংক ট্যাংক সংস্থা পিটারসন ইনস্টিটিউট ফর ইন্টারন্যাশনাল ইকোনমিক্সের সিনিয়র ফেলো মরিস অবসফেল্ড বলেন, ‘যুক্তরাষ্ট্রে স্বল্প ও দীর্ঘমেয়াদি সুদহার বৃদ্ধির মধ্য দিয়ে ডলারের বাহুবল বাড়ে; আবার বিশ্ববাজার অস্থিতিশীল হলেও বিনিয়োগকারীরা মার্কিন মুদ্রার দিকে ঝোঁকেন সম্পদের নিরাপত্তার আশায়। এখন দুনিয়াজুড়ে মন্দার শঙ্কা উঁকি দিচ্ছে, আর্থিক বাজার সংকোচনের এসব হালহকিকত উন্নত অর্থনীতিগুলোর বিকাশের গতি কেড়ে নিচ্ছে। ’ বিশ্বব্যাংক এক প্রতিবেদনে জানিয়েছে, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে ঘন ঘন সুদের হার বৃদ্ধির ফলে ২০২৩ সালে বিশ্ব মন্দার দিকে যাবে। বিশেষ করে উদীয়মান ও উন্নয়নশীল দেশগুলোতে অর্থনৈতিক সংকট তৈরি হবে, যা দীর্ঘমেয়াদে ক্ষতির কারণ হবে। সাম্প্রতিক গ্রাহকদের দেওয়া নোটে ওয়েলস ফার্গোর অর্থনীতিবিদরা আরো জানান, ‘এ বছর বিশ্বের অন্যান্য ব্যাংকগুলোর তুলনায় যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় ব্যাংক অনেক বেশি সুদের হার বাড়িয়েছে। ফলে অর্থনৈতিক অস্থিরতার এ সময়ে নিরাপদ বিনিয়োগ হিসেবে ডলারের আকর্ষণ বেড়েছে। নিম্ন আয়ের দেশে থাকা বিনিয়োগকারীরা ডলারকেন্দ্রিক বিনিয়োগ বাড়িয়েছেন। ’

সূত্র : গ্লোবাল টাইমস, রয়টার্স, সিএনবিসি।



সাতদিনের সেরা