kalerkantho

শনিবার । ১২ অগ্রহায়ণ ১৪২৮। ২৭ নভেম্বর ২০২১। ২১ রবিউস সানি ১৪৪৩

‘ঋণগ্রহীতার দুঃসময়েও পাশে থাকবো’

জিয়াদুল ইসলাম    

১৭ অক্টোবর, ২০২১ ১০:২৬ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



‘ঋণগ্রহীতার দুঃসময়েও পাশে থাকবো’

সিটিজেনস ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মোহাম্মদ মাসুম

ব্যাংকের তহবিলের বেশির ভাগের উৎস হলো আমানতকারীদের অর্থ। আমানতকারীদের এই অর্থ ব্যাংকের তারল্য সৃষ্টি করে এবং সেই তারল্যের একটা অংশ ব্যাংকগুলো তার ঋণ কার্যক্রম পরিচালনা করে। এ জন্য আমানতকারীদের অর্থের সর্বোচ্চ সুরক্ষা নিশ্চিত করা ব্যাংকারদের নৈতিক ও মূল দায়িত্ব। অন্যদিকে ঋণগ্রহীতা নির্বাচনের ক্ষেত্রে তাদের অর্থনৈতিক অবস্থান, অর্থের প্রয়োজনীয়তা ও অতীত রেকর্ড যথার্থভাবে যাচাই-বাছাই এবং বিশ্লেষণ করাও ব্যাংকারদের অন্যতম কাজ। কারণ একটি ব্যাংকের আর্থিক সক্ষমতা অনেকাংশে নির্ভর করে তার ক্রেডিট পোর্টফোলিওর গুণগত মানের ওপর। সম্প্রতি কালের কণ্ঠকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে এসব কথা বলেন সিটিজেনস ব্যাংক পিএলসির ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মোহাম্মদ মাসুম।

বর্তমান প্রতিযোগিতাপূর্ণ ব্যাংকিং খাতে প্রচুর কাজ করার সুযোগ আছে—এমন মন্তব্য করে মোহাম্মদ মাসুম বলেন, ‘এখনো ব্যাংকিংসেবার বাইরে অনেক মানুষ রয়ে গেছে। এসব মানুষের দোরগোড়ায় সেবা পৌঁছে দিতে সিটিজেনস ব্যাংক কর্মপরিকল্পনা তৈরি করছে। সব শ্রেণি-পেশার মানুষের কাছে সেবা ছড়িয়ে দিতে নতুন শাখা খোলার পাশাপাশি উপশাখা খোলায় জোর দেওয়া হবে। অংশীদারির মানসিকতা নিয়ে গ্রাহকদের সহযোগিতা করা হবে। অর্থাৎ আমাদের অর্থায়নের ক্ষেত্রে অংশীদারির একটা কনসেপ্ট থাকবে। নতুন উদ্যোক্তা তৈরিতে চালু করা হবে স্টার্ট-আপ ঋণ সুবিধা, যা হবে নতুন উদ্যোক্তা সৃষ্টির একটি দৃশ্যমান প্ল্যাটফর্ম। যার বাস্তবায়নে ব্যাংকিং খাতের উল্লেখযোগ্য অবদান রাখার যথেষ্ট সুযোগ রয়েছে।’

গত বছরের ১৫ ডিসেম্বর বাংলাদেশ ব্যাংকের লাইসেন্স পায় সিটিজেনস ব্যাংক পিএলসি। তবে এখনো বাণিজ্যিক কার্যক্রম আরম্ভ করার চূড়ান্ত অনুমোদন পায়নি ব্যাংকটি। চলতি বছরের ১৪ জানুয়ারি ব্যাংকটির এমডি হিসেবে যোগ দেন অভিজ্ঞ ও খ্যাতনামা ব্যাংকার মোহাম্মদ মাসুম। এর আগে তিনি মিডল্যান্ড ব্যাংকের অতিরিক্ত ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এএমডি) হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।

মোহাম্মদ মাসুম আরো বলেন, ‘দেশে কার্যত সব ব্যাংক মোটামুটি একই ধরনের সেবা দিচ্ছে। কিন্তু আমরা কৌশলগত মানসিকতা নিয়ে একটা উদ্ভাবনী পথে এগোতে চাই। সেবার ধরনের মধ্যে কী ভ্যালু-অ্যাড করতে পারব, অন্যদের চেয়ে আমরা কতখানি ব্যতিক্রম—সেটা আমাদের কার্যক্রমের মাধ্যমে প্রতিফলন ঘটাতে হবে।’

তিনি বলেন, ‘সিটিজেনস ব্যাংকের করপোরেট স্লোগান হলো—টুডে, টুমোরো, টুগেদার। এর অন্তর্নিহিত অর্থ হলো—গ্রাহকদের সঙ্গে আজকেও আছি, আগামী এবং ভবিষ্যতেও থাকব। অর্থাৎ সিটিজেনস ব্যাংক গ্রাহক তথা ঋণগ্রহীতার কেবল ভালো সময়েই নয়, দুঃসময়ে পাশে থাকবে।’

তিনি বলেন, ‘ব্যাংকের মূল কাজ হলো মধ্যস্থতাকারী হিসেবে এক পক্ষ থেকে আমানত নিয়ে আরেক পক্ষকে ফিন্যান্স করা। তবে এ ক্ষেত্রে আমরা আমাদের দৃষ্টিভঙ্গি একটু পরিবর্তন করতে চাচ্ছি। সেই পরিবর্তনটা হলো—আমরা গতানুগতিক ধারার ঋণদান কার্যক্রমের পাশাপাশি প্রগতিশীল মানসিকতা নিয়ে কার্যক্রম পরিচালনা করব এবং যে ব্যবসায় অর্থায়ন করব, গ্রাহকদের সেই ব্যবসায় অংশীদারির মানসিকতা নিয়ে সহযোগিতা করব। অর্থাৎ আমাদের অর্থায়নের ক্ষেত্রে অংশীদারির একটা কনসেপ্ট থাকবে। এর মানে আমরা ঋণগ্রহীতাকে আলাদাভাবে দেখব না। কেননা, তাদের আর্থিক উন্নতি আমাদের ব্যাংকের আর্থিক উৎকর্ষতা ও ব্যবসায় লেনদেনের প্রসারে যথার্থ ভূমিকা রাখবে।’

ব্যক্তি আমানতে মূল্যস্ফীতির কম সুদ দেওয়া যাবে না, বাংলাদেশ ব্যাংকের এ নির্দেশনার ফলে ঋণের সুদহারে এর প্রভাব পড়বে কি না জানতে চাইলে মোহাম্মদ মাসুম বলেন, ‘বেসরকারি খাতের ব্যাংকে প্রাতিষ্ঠানিক আমানতের চেয়ে ব্যক্তিগত আমানতের পরিমাণই বেশি। তবে এর উল্টো চিত্র সরকারি খাতের ব্যাংকে। তাদের প্রাতিষ্ঠানিক আমানতের পরিমাণ বেশি। তবে এটাও ঠিক যে একজন আমানতকারী তার মূল্যস্ফীতি সমন্বয় রেটে আয় আশা করেন।’

তিনি বলেন, ‘মূল্যস্ফীতির হার যদি সাড়ে ৫ বা ৬ শতাংশ হয়, আর এর নিচে আমানতের সুদহার হলে একজন আমানতকারীর প্রকৃত আয় বলে কিছু থাকবে না। ফলে তিনি সঞ্চয়ে আগ্রহ হারিয়ে ফেলতে পারেন। এমন বাস্তবতায় আমানতকারীদের স্বার্থরক্ষায় মূল্যস্ফীতির সঙ্গে সুদের এই সমন্বয়টা দরকার ছিল। কিন্তু এখন প্রশ্ন হলো—আমানতের সুদের হার বাড়ানো হলেও ঋণের সুদের হার ৯ শতাংশই নির্ধারণ করা আছে। ফলে ঋণ ও আমানতের সুদের যে ব্যবধান তথা স্প্রেড, সেটা সংকুচিত হয়ে যাচ্ছে। এর ওপর সার্বিক ব্যাংকিং খাতে উচ্চ খেলাপি ঋণের একটা সমস্যা আছে।’

তিনি বলেন, ‘খেলাপি ঋণ একটি ব্যাংকের আর্থিক বুনিয়াদকে দুর্বল করে ফেলে। কারণ খেলাপি ঋণের বিপরীতে প্রয়োজনীয় সঞ্চিতি (প্রভিশন) রাখতে ব্যর্থ হলেই ব্যাংকের মূলধনের ওপর বিরূপ প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয় এবং এর ফলে সংশ্লিষ্ট ব্যাংক রুগ্ণতার দিকে অগ্রসর হয়। তাই খেলাপি ঋণের পরিমাণ যত কমিয়ে আনা সম্ভব হবে, ততই ব্যাংকের অভ্যন্তরীণ অবস্থানের গুণগত পরিবর্তন আসবে এবং সংশ্লিষ্ট ব্যাংক আনুপাতিক হারে আর্থিক সক্ষমতা অর্জন করবে।’

তিনি বলেন, ‘ঋণগ্রহীতাদের মধ্যে যারা ইচ্ছাকৃত খেলাপি তাদের বিরুদ্ধে ব্যাংকগুলোকে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। কারণ তাদের ইচ্ছাই ছিল ঋণের টাকা ফেরত না দেওয়া। অন্যদিকে যারা যথাযথ আর্থিক ও বাস্তবভিত্তিক ব্যবসায় পরিকল্পনা করার অভাবে এবং বাহ্যিক অবস্থার কারণে ব্যবসায় ক্ষতির সম্মুখীন হয়, তাদের ক্ষেত্রে ব্যাংকারদের সহযোগিতার মনোবৃত্তি নিয়ে এগোতে হবে। কারণ এ ধরনের গ্রাহক ইচ্ছাকৃত ঋণখেলাপির পর্যায়ে পড়ে না। সব ঋণখেলাপির জন্য একই ধরনের ব্যবস্থা গ্রহণ সমীচীন নয়।’

তিনি বলেন, ‘কভিডের কারণে ব্যবসায়ীরা খুব সচেতনভাবে এগোচ্ছে। তবে করোনা পরিস্থিতি উন্নতির দিকে যাওয়ায় এখন ব্যবসা-বাণিজ্যে সবাই মনোযোগী হয়েছেন। ফলে সামনের দিনগুলোতে বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহ বাড়বে বলে আশা করছি।’ অবকাঠামোগত বেশ কিছু বড় প্রকল্প সরকার হাতে নিয়েছে। এটা অর্থনীতির চালিকাশক্তিকে আরো গতিশীল করতে সহায়তা করবে বলে উল্লেখ করেন তিনি।

করোনা সংকটের সময় সরকার থেকে যে ওয়ান ট্রিলিয়ন টাকার অধিক প্রণোদনা প্যাকেজ ঘোষণা করা হয়েছে, সেই প্যাকেজ বাস্তবায়নে ব্যাংকিং খাত উল্লেখযোগ্য ভূমিকা পালন করছে মন্তব্য করে তিনি বলেন, ‘করোনা সংকটের  সময়ে অনেকে ঘর থেকে বের না হলেও সম্মুখসারির যোদ্ধা হিসেবে ব্যাংকাররা দেশ ও অর্থনীতির স্বার্থে কাজ করে গেছেন। কভিডে আক্রান্ত হয়ে অনেক ব্যাংকার মারাও গেছেন। এদিক থেকে ব্যাংকারদের ভূমিকা কোনোভাবেই ছোট করে দেখার সুযোগ নেই।’

নতুন ব্যাংকগুলো রাজনৈতিকমুক্ত হয়ে কাজ করার সুযোগ পাবে কি না এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘কোন বিবেচনায় নতুন ব্যাংকের লাইসেন্স দেওয়া হয়েছে সেটি মুখ্য নয়। একটা ব্যাংক যখন এসে যায়, তখন সেই ব্যাংকের সুশাসন যদি ঠিক থাকে এবং ব্যাংকের বোর্ড ও ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষ যার যার ভূমিকা সঠিকভাবে পরিপালন করে, তাহলে কিন্তু সমস্যা সমাধান করা সম্ভব। তা ছাড়া সুশাসন ইস্যুতে বাংলাদেশ ব্যাংক যথাযথভাবে সচেতন আছে বলে প্রতীয়মান হয়।’

সিটিজেনস ব্যাংককে কোন পর্যায়ে নিয়ে যেতে চান—এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘ব্যাংকের বিচক্ষণ পরিচালনা পর্ষদের নীতিমালার আঙ্গিকে এবং বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্দেশনা যথাযথভাবে পরিপালন করে সিটিজেনস ব্যাংক প্রতিযোগিতা ও প্রতিকূলতার মধ্যেও নিজস্ব অবস্থান সৃষ্টি করে নেবে বলে একান্তভাবে আশা করি।’



সাতদিনের সেরা