kalerkantho

বুধবার । ১৬ অগ্রহায়ণ ১৪২৮। ১ ডিসেম্বর ২০২১। ২৫ রবিউস সানি ১৪৪৩

উঠছে বিভিন্ন ব্র্যান্ডের ১১৩টি দামি গাড়ি

কারনেট সুবিধার গাড়ি নিলামে উঠলেও বিক্রি হয় না কেন?

আসিফ সিদ্দিকী, চট্টগ্রাম    

১৬ অক্টোবর, ২০২১ ১৩:৫৫ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



কারনেট সুবিধার গাড়ি নিলামে উঠলেও বিক্রি হয় না কেন?

ফাইল ছবি

পর্যটন সুবিধায় এনে অবৈধভাবে ব্যবহার করতে না পারা ১১৩টি গাড়ি চট্টগ্রাম বন্দরের শেডে পড়ে আছে দীর্ঘ প্রায় ১০ বছর। এগুলো নিলামে বিক্রি করতে চট্টগ্রাম কাস্টমস চার থেকে আটবার নিলামে তুলেছিল। কোনো গাড়ির দর ঠিকমতো হয়নি, আবার কোনো গাড়ির মামলা, আবার কোনো গাড়ির কাগজপত্র জটিলতা থাকায় শেষপর্যন্ত বিক্রি করতে পারেনি কাস্টমস। এই নিলামেও ১২৫টি গাড়ি তোলার কথা ছিল। কিন্তু মামলার কারণে নিলামে উঠছে ১১৩টি। 

এই পরিস্থিতিতে গাড়িগুলোর নিলামে তুলতে সরকারের সর্বোচ্চ মহলের নির্দেশনার পর আগামী ৪ নভেম্বর বেশ ঘটা করেই আবারো এসব গাড়ি নিলামে তুলছে কাস্টমস। দেশব্যাপী চালানো হচ্ছে ব্যাপক প্রচারণা। গাড়িগুলো অনলাইন-অফলাইন দুভাবেই বিক্রির লক্ষ নির্ধারণ করেছে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত গাড়িগুলো নিলামে বিক্রি হবে কিনা তা নিয়ে কিছুটা সংশয় রয়েই গেছে। 

পর্যটন সুবিধায় আনা গাড়ির অপব্যবহার রোধে কাস্টমসের কড়াকড়ি আরোপের পর থেকেই এসব গাড়ি বন্দর থেকে খালাস নেয়নি বিদেশি পর্যটক বা প্রবাসীরা। ২০১১ সালের পর থেকেই মুলত গাড়িগুলো বন্দর শেডে পড়ে আছে। আর সবগুলো গাড়িই বিশ্ববিখ্যাত ব্রান্ডের এবং দামি। যদিও সেসব গাড়ি দীর্ঘদিন কন্টেইনারের ভিতর এবং বাইরে পড়ে থাকার কারণে কিছু যন্ত্রপাতি নষ্ট হয়েছে। গাড়িগুলোর মধ্যে আছে ২৬টি মিত্শুবিসি, ২৫টি মার্সিডিজ বেঞ্জ, ২৫টি বিএমডব্লিউ, ৭টি ল্যান্ড রোভার, ৭টি ল্যান্ড ক্রুজার, ৬টি লেক্সাস, ৫টি ফোর্ড, ৩টি জাগুয়ার, ১টি দাইয়ু, ১টি হোন্ডা ও ১টি সিআরভি।

জানতে চাইলে চট্টগ্রাম কাস্টমস কমিশনার মোহাম্মদ ফখরুল আলম কালের কণ্ঠকে বলেন, এবার গাড়ি বিক্রি করেই ছাড়বো। এজন্য দেশব্যাপী প্রচারণা চালাচ্ছি, সরাসরি গাড়িগুলো দেখারও সুযোগ দিচ্ছি। আমরা চাইছি বেশিসংখ্যক ক্রেতার অংশগ্রহণ; তাহলে উপযুক্ত দামটা পাবো।

নির্ধারিত মূল্যের ৬০ শতাংশ না পাওয়ায় বেশিরভাগ গাড়িই শেষ পর্যন্ত নিলামে বিক্রি হয় না। এবারও কী পুনরাবৃত্তি হবে কিনা জানতে চাইলে কাস্টমস কমিশনার বলেন, আমরা একটা নির্দেশনা পেয়েছি গাড়িগুলো বিক্রি করার। এজন্য নিলামে বেশি সংখ্যক অংশগ্রহণকারী চাই। যাতে দীর্ঘদিনের জটিলতা থেকে মুক্ত হতে পারি।  

তবে গাড়ি ব্যবসায়ীদের সংগঠন বারভিডার সাবেক মহাসচিব মাহবুবুল হক চৌধুরী বাবর দ্রুত নিলাম সম্পন্ন করতে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ পরামর্শ দিয়েছেন। প্রথমটি হচ্ছে, আমদানি নীতি ও শুল্ক নীতিতে সংশোধন না এনে নিলামে তুললে এসব গাড়ি কয়েক যুগেও বিক্রি হবে না। আর এসব গাড়ির নিলাম জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের বিশেষ নির্দেশনায় হতে হবে বিশেষ নিলাম। আর দ্বিতীয় হচ্ছে, নিলামে উর্ত্তীণদের নিজ উদ্যোগে বাণিজ্য মন্ত্রণালয় থেকে ‘কমার্শিয়াল পারমিট’ সিপি নেয়ার বিধান আছে, সেটি আন্তঃমন্ত্রণালয়ে বসে সহজ করার সিদ্ধান্ত দিতে হবে। তাহলে এই কারনেট গাড়ি এবং সাধারণ নিলাম দ্রুত সম্পন্ন হবে। কাস্টমস, বন্দরের লক্ষ্য অর্জিত হবে। 

উল্লেখ্য, ২০১১ সাল পর্যন্ত পর্যটন সুবিধায় গাড়ি আনা হতো অহরহ। প্রবাসী বাংলাদেশিরা যুক্তরাজ্য, আমেরিকা এবং ইউরোপ থেকে বাংলাদেশে আসার সময় নিজের ব্যবহৃত গাড়ি এনে চট্টগ্রাম বন্দর দিয়ে ছাড় নিতেন। দেশে থাকার সময় সেই গাড়ি বাংলাদেশে ব্যবহার শেষে দেশেই বিক্রি করে চলে যেতেন। এই গাড়ি আনতে কোনো শুল্ক দিতে হতো না। ফলে এসব গাড়ি এনে দেশে বিক্রি করেই তারা প্রবাসে কর্মস্থলে চলে যেতেন। এতে বিপুল লাভ হতো দেখে অনেকেই এই অবৈধ ব্যবসায় যুক্ত হন। এমনও দেখা গেছে সেই সময়ে চট্টগ্রাম ক্লাবের সামনে এসব কারনেটের গাড়ির বিক্রির মেলা বসতো। 

২০০৯ সাল থেকে ২০১০ সাল পর্যন্ত এ নিয়ে ব্যাপক লেখালেখি হয়। এরপর ২০১১ সালে কাস্টমস, শুল্ক গোয়েন্দা দলের ব্যাপক অভিযানের পর গাড়ি বিক্রির অবৈধ ব্যবসায়ীরা ভয় পেয়ে যান। অনেকেই অভিযানের ভয়ে সড়কে গাড়ি ফেলে চলে যান। 

কাস্টমস বলছে, সাধারণত পর্যটন সুবিধায় গাড়ি আনলে শুল্কমুক্ত সুবিধা পাওয়া যায়, তবে তা আবার নিজ দেশে ফেরত নেওয়ার শর্তও থাকে। কিন্তু অতীতে এ সুবিধায় আনা অনেক গাড়ি ফেরত নেওয়া হয়নি। সে জন্য শুল্কমুক্ত সুবিধার অপব্যবহার রোধে কড়াকড়ি আরোপ করে কাস্টমস। অভিযানের পাশাপাশি গাড়ির বিপরিতে নির্ধারিত ব্যাংক গারান্টি দিয়ে খালাসের শর্ত আরোপ করলে গাড়ি আনা বন্ধ হয়ে যায়। এমনকি বন্দর থেকে গাড়ি ছাড়ও বন্ধ হয়ে যায় এতে আটকা পড়ে সব গাড়ি।

বার বার নিলামে তোলার পরও বিক্রি করতে না পেরে গাড়িগুলোর প্রকৃত অবস্থা জানতে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের নির্দেশে কাস্টমস, বিআরটিএ, কাস্টমস গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদপ্তর, কাস্টমস মূল্যায়ন ও নিরীক্ষা অধিদপ্তরের কর্মকর্তাদের সমন্বয়ে গঠিত হয় পাঁচ সদস্যের কমিটি। সেই কমিটি সরেজমিন পরিদর্শন করে বন্দরে পড়ে থাকা ১২১টি গাড়ির মধ্যে ১২০টি গাড়ির বর্তমান চিত্র তুলে ধরে।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, ১২০ গাড়ির মধ্যে পুরোপুরি ভালো অবস্থায় আছে, এমন গাড়ির সংখ্যা কম। ৫৮টি গাড়ির চাবি নেই, একটির চাবি ভাঙা। ১১৪টি গাড়ির চাকা ও ব্যাটারি নষ্ট হয়ে গেছে। ইঞ্জিনে জং ধরেছে ৭৯টির। দুটি গাড়ির পেছনের কাচ ভাঙা। 

চট্টগ্রাম কাস্টমসের উপ কমিশনার (নিলাম) মো. আল আমিন কালের কণ্ঠকে বলেন, আমরা ১২০টি গাড়িই নিলামে তুলতে চেয়েছিলাম। কিন্তু মামলার কারণে ৭টি গাড়ি নিলামে উঠছে না। বাজার দরের সাথে গাড়ির বর্তমান অবস্থা মিল রেখেই কমিটি দর নির্ধারন করেছে। আমরা চাইছি ভালো দাম পেলে যেকোনো মূল্যে গাড়িগুলো বিক্রি করতে। 



সাতদিনের সেরা