kalerkantho

বুধবার । ২৩ অগ্রহায়ণ ১৪২৮। ৮ ডিসেম্বর ২০২১। ৩ জমাদিউল আউয়াল ১৪৪৩

নজরদারি না থাকায় বিক্রি হচ্ছে মানহীন পণ্যও

দ্রুত বড় হচ্ছে লুব্রিক্যান্টের বাজার

সজীব আহমেদ    

৩ অক্টোবর, ২০২১ ১০:২২ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



দ্রুত বড় হচ্ছে লুব্রিক্যান্টের বাজার

দেশের উন্নয়নের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে যানবাহন, সেই সঙ্গে কৃষি ও শিল্পে ভারী যন্ত্রপাতির ব্যবহার। এতে দ্রুত বড় হচ্ছে লুব্রিক্যান্টের বাজারও। সাধারণত গাড়িসহ বিভিন্ন মেশিনারি ইঞ্জিনে ঘর্ষণ ও ক্ষয় কমানোর জন্য যে তেল ব্যবহার করা হয়, সেটিকে বলা হয় লুব্রিক্যান্ট। ইঞ্জিনের রক্ষণাবেক্ষণের জন্য মানসম্মত লুব্রিক্যান্টের ব্যবহার অত্যন্ত প্রয়োজন। তাই দেশে লুব্রিক্যান্টের চাহিদা বেড়ে যাওয়ায় লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়ছে দামও। যদিও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, আন্তর্জাতিক বাজারে বাড়তি থাকায় দেশেও দাম ঊর্ধ্বমুখী।

শুধু গত এক বছরেই ব্র্যান্ডের লুব্রিক্যান্টের দাম লিটারপ্রতি বেড়েছে ১৫ শতাংশ। এমনকি দু-একটি ব্র্যান্ডের এ পণ্যের দাম ২০-২৫ শতাংশ পর্যন্ত বেড়েছে। বাংলাদেশ লুব ব্লেন্ডারস অ্যাসোসিয়েশনের তথ্য মতে, দেশে বছরে দুই লাখ টনের বেশি লুব্রিক্যান্টের চাহিদা রয়েছে। ২০টির মতো লুব প্লান্ট রয়েছে। এ বাজার প্রায় ছয় হাজার কোটি টাকার। দেশে অনেক আন্তর্জাতিক মানের ব্র্যান্ডের লুব তৈরি হওয়ায় দেশীয় বাজারের চাহিদা মিটিয়ে রপ্তানি করাও সম্ভব। কিন্তু এ বাজারে বিএসটিআইয়ের নজরদারি না থাকায় নামে-বেনামে ভেজাল লুব্রিক্যান্ট আমদানি করে ব্র্যান্ডের নামে বিক্রি করছে অনেকেই।

ব্যবসায়ীরা বলছেন, বর্তমান বাজারে শতাধিক ব্র্যান্ডের লুব্রিক্যান্ট রয়েছে। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি চলে মবিল, বিপি, শেল, ক্যালটেক্স, ক্যাস্ট্রল, মিটাসো এবং টয়োটা ব্র্যান্ডের লুব্রিক্যান্ট। এসব প্রতিটি ব্র্যান্ডের চার-পাঁচটি করে আইটেম বা গ্রেড রয়েছে। গাড়িতে ব্যবহারের লুব্রিক্যান্ট মূলত চার লিটারের ক্যানে বিক্রি হয় এবং মোটরসাইকেলের জন্য এক লিটারে বিক্রি হয়। শিল্প প্লান্টের যন্ত্রপাতিতে ব্যবহারের জন্য ড্রামেও বিক্রি হয়।

সরেজমিন ঘুরে ব্যবসায়ীদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, এ বাজারে কোনো মান নিয়ন্ত্রণ না থাকায় বিশাল এ চাহিদাকে পুঁজি করে এক শ্রেণির অসাধুচক্র নকল ও নিম্নমানের লুব্রিক্যান্টের ব্যবসা করে ক্রেতাদের দিনের পর দিন ঠকিয়ে যাচ্ছে। এভাবে প্রতি মাসে কোটি কোটি টাকার নিম্নমানের ও পোড়া রিফাইনিং লুব্রিক্যান্ট বিক্রি হচ্ছে।

বাজারে ভালো মানের লুব্রিক্যান্ট চেনারও কোনো সুযোগ নেই। নিম্নমানের লুব্রিক্যান্ট ব্যবহারের ফলে গাড়ির যন্ত্রপাতি টেকসই হচ্ছে না।

এমনকি এতে গ্রামাঞ্চলে ব্যবহৃত কৃষি যন্ত্রপাতিও দ্রুত নষ্ট হয়ে যায়, ব্যবহারকারীর মেরামত খরচ বেড়ে যায়।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ‘বাংলাদেশে লুব্রিক্যান্টের বাজার দ্রুত বড় হচ্ছে। তাই লুব্রিক্যান্টের মান নিয়ন্ত্রণ করা জরুরি। মান নিয়ন্ত্রণ করতে রেগুলেটরি বডিকে পলিসি নির্ধারণ করতে হবে। পাশাপাশি মান নিয়ন্ত্রণের জন্য ভালো ল্যাবরেটরি স্থাপন করাও জরুরি।’

দেশে লুব্রিক্যান্টের বড় পাইকারি বাজার রাজধানীর বাংলামোটর। ওই এলাকার লুব্রিক্যান্টের পাইকারি ও খুচরা দোকান ভাই ভাই মোটরসের মালিক মজিবুর রহমান কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘দেশে নামে-বেনামে অনেক ব্র্যান্ডের লুব্রিক্যান্ট পাওয়া যায়। সব ব্র্যান্ডের লুব্রিক্যান্ট আমরা বিক্রি করি না। যেগুলো বাজারে ভালো চলে সেগুলোই বিক্রি করি। বছরে বছরে লুব্রিক্যান্টের দাম বাড়ছেই। বর্তমানে বাজারে চলে বেশি মবিল, বিপি, মিটাসো, ক্যাস্ট্রল ও শেল ব্র্যান্ডের বিভিন্ন গ্রেডের লুব্রিক্যান্ট। মোটরসাইকেলের জন্য হোন্ডা লুব্রিক্যান্ট, মবিল ব্র্যান্ডের বিভিন্ন গ্রেডের লুব্রিক্যান্ট ও সুপার বি বেশি চলছে।’

পাশের দোকান মোস্তফা অটোমোবাইলের মালিক মো. মোস্তফা কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘মানুষ এখন গাড়ির প্রতি খুবই যন্ত্রশীল। প্রতি তিন হাজার কিলোমিটার চলার পর লুব্রিক্যান্ট পরিবর্তন করে ফেলে। আবার অনেকে দুই হাজার-আড়াই হাজার কিলোমিটার চালিয়েও পরিবর্তন করছে। এখন বাজারে অনেক ব্র্যান্ডের লুব্রিক্যান্ট রয়েছে। দাম বেশি লাগলেও ভালো ব্র্যান্ডের লুব্রিক্যান্ট ব্যবহার করছে। বর্তমান বাজারে বিপি ব্র্যান্ডের সুপার বি, মবিল ব্র্যান্ডের মবিল স্পেশাল ও মবিল-১ এবং ক্যাস্ট্রল ব্র্যান্ডের লুব্রিক্যান্টের চাহিদা ব্যাপক।’

রাজধানীর প্রগতি সরণি বারিধারা এলাকায়

মক্কা মোটরসের মালিক মো. জয়নাল আবেদীন বলেন, ‘দেশে গাড়ি বাড়ছে, লুব্রিক্যান্টের চাহিদাও বাড়ছে। একই সঙ্গে প্রতি বছর লুব্রিক্যান্টের দামও বাড়ছে। গত বছরের তুলনায় গড়ে লুব্রিক্যান্টের বাজারে ১৫ শতাংশ দাম বেড়েছে। কিছু ব্র্যান্ডের লুব্রিক্যান্ট ১০ শতাংশ, আবার কিছু ব্র্যান্ডের লুব্রিক্যান্টের ২০-২৫ শতাংশ পর্যন্ত দাম বেড়ে গেছে। বর্তমান বাজারে শতাধিক ব্র্যান্ডের লুব্রিক্যান্ট রয়েছে। এর মধ্যে বাজারে সবচেয়ে বেশি চলছে মবিল, বিপি, শেল, ক্যালটেক্স ও ক্যাস্ট্রল ব্র্যান্ডের লুব্রিক্যান্ট।’

তিনি বলেন, ‘মবিল ব্র্যান্ডের চার লিটারের বিভিন্ন গ্রেডের একটি ক্যান বিক্রি হচ্ছে এক হাজার ৫০০ থেকে চার হাজার ৫০০ টাকায়। ক্যালটেক্স বিক্রি হচ্ছে এক হাজার ৫০০ থেকে তিন হাজার ৫০০ টাকা। ক্যাস্ট্রল ব্র্যান্ডের দাম অন্য ব্র্যান্ডের চেয়ে তুলনামূলক বেশি এক হাজার ৮০০ থেকে পাঁচ হাজার টাকা পর্যন্ত গ্রেড অনুযায়ী বিক্রি হচ্ছে। শেল বিক্রি হচ্ছে এক হাজার ৬০০ থেকে চার হাজার টাকা। বিপি দুই হাজার থেকে আড়াই হাজার টাকা। মিটাসো এক হাজার ৭০০ থেকে দুই হাজার ৮০০ টাকা এবং টয়োটা ব্র্যান্ডের গ্রেড অনুযায়ী লুব্রিক্যান্ট বিক্রি হচ্ছে দুই হাজার থেকে তিন হাজার ৫০০ টাকা পর্যন্ত। মোটরসাইকেলের জন্য মবিল ব্র্যান্ডের গ্রেড অনুযায়ী এক লিটারের লুব্রিক্যান্ট বিক্রি হচ্ছে ৪০০ থেকে এক হাজার ৩০০ টাকা। ক্যালটেক্স ৪০০-৫০০ টাকা ও ক্যাস্ট্রল ৫০০ টাকা। শেল ব্র্যান্ডের ৪০০ থেকে এক হাজার টাকা এবং মটোল গ্রেড অনুযায়ী ৫০০ থেকে এক হাজার ৩০০ টাকা পর্যন্ত বিক্রি হচ্ছে।’

 

বাংলাদেশ লুব ব্লেন্ডারস অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি মোহাম্মদ উল্লাহ বলেন, ‘গাড়ি বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে লুব্রিক্যান্টের বাজার বাড়ছে। বছরে কত শতাংশ হারে বাড়ছে তার হিসাব নেই, তবে দ্রুতগতিতেই লুব্রিক্যান্টের বাজার বাড়ছে। বর্তমানে দেশে বছরে দুই লাখ টনের বেশি লুব্রিক্যান্টের চাহিদা রয়েছে। মবিল, ফুকস, প্যাসিফিক, গ্লোবাল, ন্যাশনাল, এইচপি, লুবজোনসহ বেশ কয়েকটি লুব্রিক্যান্ট কম্পানি দেশে প্লান্ট স্থাপন করেছে। বিদেশ থেকে কাঁচামাল এনে এসব প্লান্টে বিভিন্ন গ্রেডের লুব্রিক্যান্ট তৈরি করে বাজারজাত করছে কম্পানিগুলো।’

তিনি বলেন, ‘বিএসটিআইয়ের নজরদারি না থাকায় নামে-বেনামে ভেজাল লুব্রিক্যান্ট আমদানি করে ব্র্যান্ডের নামে বিক্রি হচ্ছে, যার ফলে দ্রুতই গাড়ির যন্ত্রাংশ নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। দেশে ছোট-বড় অনেক লুব্রিক্যান্ট প্লান্ট হচ্ছে। কিন্তু অনেকের উন্নত মানের ল্যাবরেটরি নেই। উন্নত মানের ল্যাবরেটরি ছাড়া ভালো মানের লুব্রিক্যান্ট উৎপাদন করা যায় না। তবে কিছু প্লান্টে আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন লুব্রিক্যান্ট উৎপাদিত হচ্ছে।’



সাতদিনের সেরা