kalerkantho

বৃহস্পতিবার । ১২ কার্তিক ১৪২৮। ২৮ অক্টোবর ২০২১। ২০ রবিউল আউয়াল ১৪৪৩

দেশি পেঁয়াজে শাপে বর

বাড়তি উৎপাদনের সুফল মিলছে বাজারে ছাড়িয়ে গেল যুক্তরাষ্ট্রকেও

রোকন মাহমুদ   

২৫ সেপ্টেম্বর, ২০২১ ০২:৫৬ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



দেশি পেঁয়াজে শাপে বর

একেই বলে শাপে বর। উনিশের ধাক্কার পর দেশ পেঁয়াজে স্বয়ংসম্পূর্ণতার প্রায় কাছাকাছি পৌঁছে গেছে। এক অর্থবছরেই সাড়ে ছয় লাখ টন পেঁয়াজ উৎপাদন বেড়েছে দেশে, যা শতকরা হিসাবে প্রায় ২৫ ভাগ। সংশ্লিষ্ট অনেকের মতে, পেঁয়াজ কেন, কোন ফসলে এমন প্রবৃদ্ধি দেখা যায়নি এর আগে। 

২০১৯ সালের সেপ্টেম্বরে ভারত নিজেদের বাজার সামলাতে পেঁয়াজ রপ্তানি বন্ধ করে দেওয়ায় বাংলাদেশের বাজারে দেশি পেঁয়াজের দাম উঠেছিল ৩০০ টাকা কেজি। পেঁয়াজের সেই ভোগান্তি গত বছরও ছিল। দেশে উৎপাদন ঘাটতি ও বাজার ব্যবস্থাপনার দুর্বলতার কারণে পেঁয়াজের বাজার লাগাম ছাড়া হয়ে পড়েছিল। এতে ভোক্তার পকেট ফাঁকা হয়েছে। তবে কৃষক লাভবান হয়েছিলেন আগের যেকোনো বছরের তুলনায় অনেক বেশি। সেই লাভের সুফলও পাওয়া গেল। ২০১৯-২০ অর্থবছরে দেশে পেঁয়াজ উৎপাদন বেড়েছে সর্বোচ্চ প্রায় ১০ শতাংশ। পরের অর্থবছর অর্থাৎ ২০২০-২১ এ দেশে পেঁয়াজ উৎপাদন প্রবৃদ্ধিতে উল্লম্ফন দেখা গেল।

সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, এ খাতে সরকারের মনোযোগ ও রোডম্যাপ তৈরি, কৃষকের ভালো দাম পাওয়া, পেঁয়াজের মৌসুমে আমদানিতে রক্ষণশীলতার নীতি, উচ্চ ফলনশীল বীজ ব্যবহার, চাষের জমি বৃদ্ধি, সরকার ও কৃষকের উৎপাদন ব্যবস্থাপনায় নজর ইত্যাদি বিষয়ই এ খাতের সাফল্যের পেছনে বড় ভূমিকা রেখেছে।

এত দিন দেশে পেঁয়াজের চাহিদার তুলনায় ঘাটতি ছিল প্রায় ১০ লাখ মেট্রিক টন। চলতি বছর সেই ঘাটতি কমে মাত্র তিন লাখ টনে নেমে এসেছে। পেঁয়াজের ঘাটতি কমে আসায় বাজারেও স্বস্তি ফিরেছে। গত বছর পর্যন্ত সেপ্টেম্বর মাস এলেই পেঁয়াজের দাম বাড়া নিয়ে সাধারণ ক্রেতারা আতঙ্কে থাকত। চলতি বছর সেপ্টেম্বরের এই শেষভাগেও দামের কোনো পরিবর্তন হয়নি। আবার আমদানিও করতে হচ্ছে না।

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের (ডিএই) মাঠ ফসলের সর্বশেষ তথ্যে দেখা যায়, ২০২০-২১ অর্থবছরের জন্য দেশে শীত ও গ্রীষ্মকালীন মিলিয়ে মোট পেঁয়াজ উৎপাদনের লক্ষ্য ধরা হয়েছিল ২৯ লাখ ৫৫ হাজার ৩০০ মেট্রিক টন। বছর শেষে উৎপাদিত হয়েছে ৩২ লাখ মেট্রিক টন। ডিএইর হিসাবে গত বছর (২০১৯-২০) দেশে পেঁয়াজ উৎপাদিত হয়েছিল ২৫ লাখ ৬০ হাজার টন। অর্থাৎ উৎপাদন বেড়েছে ছয় লাখ ৩৯ হাজার ২০০ হাজার টন বা ২৪.৯৬ শতাংশ। এর আগে ২০১৮-১৯ অর্থবছর দেশে পেঁয়াজের উৎপাদন ছিল ২৩ লাখ ৩০ হাজার ৫০০ টন। আগের অর্থবছরের চেয়ে ওই বছর উৎপাদন বেড়েছিল দুই লাখ ৩০ হাজার ৩০০ টন বা ৯.৮৮ শতাংশ। ডিএই বলছে, যদিও প্রতিবছর দেশে যে পরিমাণ পেঁয়াজ উৎপাদিত হয় তার ২০ থেকে ২৫ শতাংশ উৎপাদন-পরবর্তী ব্যবস্থাপনায় নষ্ট হয়। তবে এখন সেই লোকসান অনেক কমে আসছে।

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক মো. আসাদুল্লাহ কালের কণ্ঠকে বলেন, পেঁয়াজের এই উৎপাদন বৃদ্ধির পেছনে কৃষকের ভালো দাম পাওয়ার সূচক অবশ্যই কাজ করেছে। তবে আরো কিছু বিষয়ও রয়েছে এর সঙ্গে। এর মধ্যে অন্যতম হলো ফসলের বাড়তি যত্ন নেওয়া, যথাযথ ব্যবস্থাপনা, ভালো মানের উচ্চ ফলনশীল বীজ ব্যবহার করা, ফসল তোলার পরের ব্যবস্থাপনায় সতর্ক হওয়া এবং পেঁয়াজ উৎপাদনের জমির পরিমাণ বৃদ্ধি। এসব ক্ষেত্রে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের মাঠকর্মীরাও কাজ করেছেন জানিয়ে তিনি বলেন, ‘আমাদের লক্ষ্য হলো পেঁয়াজে ভারতের ওপর নির্ভরশীলতা কমিয়ে আনা। আমরা সেটা অনেকটাই পেরেছি। চলতি বছর আরো বাড়বে। কারণ আমরা গ্রীষ্মকালীন পেঁয়াজ উৎপাদনের জন্য এরই মধ্যে ১২ টন বীজ নিয়ে এসেছি।’

ডিএইর তথ্যে দেখা যায়, ২০১৯-২০ অর্থবছরে মোট দুই লাখ ৩৮ হাজার হেক্টর জমিতে পেঁয়াজ আবাদ করা হয়েছিল। গত অর্থবছরে ১৫ হাজার হেক্টর বেড়ে দুই লাখ ৫৩ হাজার হয়েছে। এর আগে ২০১৮-১৯ অর্থবছরে ছিল দুই লাখ হেক্টর। এ ছাড়া হেক্টরপ্রতি উৎপাদনও বেড়েছে গত মৌসুমে। আগের বছর প্রতি হেক্টরে পেঁয়াজের উৎপাদন ছিল প্রায় ১১ টন। গত মৌসুমে তা ১৩ টনের বেশি হয়েছে। এটা ১৫ টনেও নেওয়া সম্ভব বলে মনে করছেন ডিএইর কর্মকর্তারা। আর তখন পেঁয়াজ আমদানি করার প্রয়োজন হবে না বলে আশাবাদী তাঁরা।

খাদ্যনীতিবিষয়ক আন্তর্জাতিক সংস্থা ইন্টারন্যাশনাল ফুড পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউট (ইফপ্রি) ২০১৪ সালে বাংলাদেশে পেঁয়াজের উৎপাদন, বাজার ও অর্থনীতি নিয়ে একটি গবেষণা করে। এতে বলা হয়, ভালো দাম পেলে চাষিরা পরের বছর বেশি আবাদ করেন। ২০১৪ থেকে ২০১৮ সাল পর্যন্ত দেশে পেঁয়াজের উৎপাদন বৃদ্ধির হার ৮ থেকে ১০ শতাংশ। জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার (এফএও) হিসাবে, বাংলাদেশ পাঁচ বছর আগেই বিশ্বের পেঁয়াজ উৎপাদনকারী শীর্ষ ১০ দেশের তালিকায় প্রবেশ করে।

যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল ওনিয়ন অ্যাসোসিয়েশনের (এনওএ) তথ্য অনুসারে, প্রতিবছর দেশটিতে ৬.৭৫ বিলিয়ন পাউন্ড (৩০৬ কোটি ১৭ লাখ কেজি) বা ৩০ লাখ ৬১ হাজার মেট্রিক টন পেঁয়াজ উৎপাদিত হয়। সে হিসাবে পেঁয়াজ উৎপাদনে যুক্তরাষ্ট্রকে ছাড়িয়ে গেছে বাংলাদেশ। বিশ্বের সবচেয়ে বেশি পেঁয়াজ উৎপাদিত হয় চীনে, ২০০ লাখ টনের বেশি। এর পরের অবস্থান ভারতের, ৮১ লাখের বেশি। ওই হিসাবে যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান ছিল তৃতীয়।

কৃষি মন্ত্রণালয় পেঁয়াজে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জনের জন্য সরকার ২০২১-২৩ অর্থবছর পর্যন্ত তিন বছরের যে রোডম্যাপ তৈরি করেছে, তাতে জনপ্রতি পেঁয়াজের অপচয় বাদে নিট ভোগ ধরা হয়েছে দৈনিক ৫৫ গ্রাম। সে হিসাবে বছরে দৈনন্দিন খাবারের জন্য পেঁয়াজ লাগে ৩৩ লাখ ৪৪ হাজার ৮৯৬ টন। এ ছাড়া হোটেল-রেস্তোরাঁ, ওষুধশিল্পসহ বিভিন্ন কাজে লাগে আরো এক লাখ ৫৫ হাজার টন। সব মিলিয়ে পেঁয়াজের চাহিদা দাঁড়ায় ৩৫ লাখ টন। দেশি উৎপাদনে পুরো চাহিদা মেটে না বিধায় পেঁয়াজ আমদানি হয় ভারত ও মিয়ানমার থেকে। গত বছর চীন ও তুরস্ক থেকেও আমদানি হয়েছে।

কিন্তু পর পর দুই বছর ভারতের রপ্তানি বন্ধ করে দেওয়ায় দেশি পেঁয়াজের বাজারে অস্বাভাবিকতা দেখা গেলেও ভালো দাম পাওয়ায় উৎপাদনে আগ্রহী হয়ে ওঠেন কৃষকরা। চলতি বছর বাজারে যার সুফল দেখা যাচ্ছে। পেঁয়াজের দাম বাড়েনি, বরং কমেছে কিছুটা।

রাজধানীর বাজারগুলো ঘুরে দেখা যায়, এখন তিন ধরনের পেঁয়াজ পাওয়া যায়। এর মধ্যে প্রকৃত দেশি পেঁয়াজের দাম কেজিপ্রতি সর্বোচ্চ ৫০ টাকা, দেশে উৎপাদিত উচ্চ ফলনশীল পেঁয়াজের কেজি ৪৫ টাকা এবং ভারত থেকে আমদানি করা পেঁয়াজ বিক্রি হচ্ছে ৩৫ থেকে ৪০ টাকা কেজি।



সাতদিনের সেরা