kalerkantho

সোমবার  । ১২ আশ্বিন ১৪২৮। ২৭ সেপ্টেম্বর ২০২১। ১৯ সফর ১৪৪৩

ঋণ নিয়ে চলছে মধ্যবিত্তের সংসার

জিয়াদুল ইসলাম    

১ আগস্ট, ২০২১ ০৯:৪০ | পড়া যাবে ৭ মিনিটে



ঋণ নিয়ে চলছে মধ্যবিত্তের সংসার

মহামারিতে দিন দিনই আর্থিক চাপে পড়ছে সাধারণ মানুষ। পরিস্থিতি এতটাই শোচনীয় যে পরিবারের সদস্যদের জন্য যেটুকু না হলেই নয়, সেটুকুর জন্যও ব্যাংকের দ্বারস্থ হতে হচ্ছে সাধারণ মানুষকে। করোনাকালে সংসার চালানোসহ বিভিন্ন প্রয়োজনে ব্যাংক থেকে সাধারণ মানুষের ঋণ নেওয়ার পরিমাণ বাড়ছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য বলছে, করোনার এক বছরে ভোক্তা ঋণ বেড়েছে প্রায় ১৫ হাজার কোটি টাকা বা ২২ শতাংশ। ক্রেডিট কার্ড, নিজ বেতন ও প্রভিডেন্ট ফান্ডের বিপরীতে ঋণ নেওয়া ছাড়াও ব্যাংকে জমানো টাকার বিপরীতেও ঋণ নিচ্ছেন চাকরিজীবীসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ। এ সময়ে ব্যক্তিগত গাড়ি, ফ্ল্যাট, টিভি, ফ্রিজ, এসি, কম্পিউটার ও ফার্নিচার ক্রয়েও ঋণ নেওয়ার পরিমাণ বেড়েছে।

সাধারণভাবে ভোক্তা ঋণ অনুৎপাদনশীল খাতে ব্যবহৃত হয়। ভোক্তা ঋণ বাড়লে মূল্যস্ফীতি বাড়ার আশঙ্কা থাকে। এ কারণে অর্থনীতিবিদরা এই ঋণ নিয়ন্ত্রণে রাখার পক্ষে মত দেন। এ কারণে গত কয়েক বছর ধরেই ভোক্তা ঋণে খানিকটা কড়াকড়ি আরোপ করে আসছিল কেন্দ্রীয় ব্যাংক। তবে করোনার কারণে স্থবির অর্থনীতিতে চাহিদা তৈরিতে গত বছরের ২০ অক্টোবর ভোক্তা ঋণের বিপরীতে ব্যাংকের প্রভিশন সংরক্ষণে ছাড় দেয় কেন্দ্রীয় ব্যাংক। আগে সব ধরনের অশ্রেণীকৃত ভোক্তা ঋণে ৫ শতাংশ হারে প্রভিশন রাখতে হতো, যা ওই সময় কমিয়ে ২ শতাংশ করা হয়। এ ছাড়া ভোক্তা ঋণের সুদহারও ৯ শতাংশে নামিয়ে আনা হয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মকর্তারা বলছেন, প্রভিশন সংরক্ষণে ছাড় দেওয়ার পর থেকে ভোক্তা খাতে ঋণ বিতরণে বেশ আগ্রহ দেখাচ্ছে ব্যাংকগুলো। অন্যদিকে সুদের হার কমে আসায় মানুষও এই ঋণ নিতে উৎসাহিত হচ্ছেন।

বাংলাদেশ ব্যাংকের ডেপুটি গভর্নর আবু ফরাহ মো. নাছের কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘করোনার কারণে এরই মধ্যে দেশের অনেক মানুষ বেকার হয়েছেন। অনেকের চাকরি থাকলেও বেতন কমে গেছে বা নিয়মিত বেতন পাচ্ছেন না। ফলে সংসার চালানোসহ বিভিন্ন প্রয়োজনে করোনাকালে মানুষ ভোক্তা ঋণের প্রতি বেশি ঝুঁকছেন। আবার এ খাতে ঋণের সুদ কমে আসার কারণেও ঋণের চাহিদা বেড়েছে।’

গত ২২ এপ্রিল খাদ্য অধিকার বাংলাদেশ নামের একটি প্রতিষ্ঠানের ‘দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি ও খাদ্যগ্রহণে প্রভাব’ বিষয়ে এক জরিপে বলা হয়, করোনার কারণে দেশের প্রায় ৬৬ শতাংশ মানুষের আয় কমে গেছে। ৩৭ শতাংশের বেশি মানুষ এখন বিভিন্ন উৎস থেকে ঋণ করে সংসার চালাচ্ছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে সাম্প্রতিক দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি, যা দরিদ্র মানুষের জন্য বাড়তি ও অসহনীয় চাপ তৈরি করেছে। গত ২৫ মার্চ থেকে ৬ এপ্রিল পর্যন্ত ৭০টি পরিবারের মধ্যে এই জরিপ চালানো হয়।

এর আগে গত ৮ এপ্রিল এসডিজি বাস্তবায়নে নাগরিক প্ল্যাটফর্ম, বাংলাদেশের এক খানা জরিপে বলা হয়, করোনা সংকটের সময় প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর প্রায় ৬১ শতাংশ পরিবার ঋণ নিয়ে পরিস্থিতি সামাল দিতে বাধ্য হয়েছেন। সঞ্চয় ভেঙে খেয়েছে প্রায় ২৬ শতাংশ পরিবার। এ ছাড়া নিজের গবাদি পশু, সোনা ও জমি বিক্রি বিক্রি করে এবং এনজিও থেকে ঋণ করেও অনেকে জীবন ধারণ করছেন। গত ফেব্রুয়ারি মাসে এক হাজার ৬০০ খানার ওপর এই জরিপ পরিচালনা করা হয়।

এই জরিপগুলোর সঙ্গে ব্যাংকের ভোক্তা ঋণ বিতরণের চিত্রে মিল খুঁজে পাওয়া যায়। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য বলছে, করোনার পর থেকে ব্যক্তিগত ঋণ নেওয়ার প্রবণতা বেশি বেড়েছে। প্রাপ্ত তথ্যানুযায়ী, গত বছরের মার্চ পর্যন্ত ব্যাংকগুলোর বিতরণ করা ভোক্তা ঋণের পরিমাণ ছিল ৬৮ হাজার ২৫৪ কোটি টাকা, যা চলতি বছরের মার্চ শেষে বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৮৩ হাজার ২৯২ কোটি টাকা। ফলে করোনার গত এক বছরে (এপ্রিল থেকে মার্চ) ভোক্তা খাতে ব্যাংকের ঋণ বিতরণ বেড়েছে প্রায় ১৫ হাজার ৩৮ কোটি টাকা বা প্রায় ২২  শতাংশ। অথচ স্বাভাবিক সময়ে ২০১৯ সালের এপ্রিল থেকে ২০২০ মালের মার্চ পর্যন্ত ভোক্তা খাতে ব্যাংকের ঋণ বিতরণ বেড়েছিল মাত্র পাঁচ হাজার ১৩৬ কোটি টাকা বা ৮ শতাংশ। শুধু ভোক্তা ঋণের পরিমাণই নয়, এ সময়ে ভোক্তা ঋণের গ্রাহকও বেড়েছে বেশ। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য বলছে, করোনার গত এক বছরে ভোক্তা খাতে গ্রাহক সংখ্যা এক লাখ ৩৬ হাজার ৮০৯ জন বেড়ে মার্চে দাঁড়িয়েছে ২৬ লাখ ৪৬ হাজার ৭০৩ জন।

অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকার্স বাংলাদেশের (এবিবি) সাবেক চেয়ারম্যান ও বেসরকারি মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংকের এমডি সৈয়দ মাহবুবুর রহমান কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘করোনার কারণে এখন অনেকের হাতে টাকা-পয়সা নেই। ফলে ঋণ করেই সংসারের চাকা ঠিক রাখতে হচ্ছে তাঁদের। আবার সম্প্রতি ভোগ্যপণ্য বিক্রি অনেক বেড়েছে। ভোক্তা ঋণ নিয়ে এসব পণ্য কেনা হচ্ছে।’

তিনি বলেন, ‘কালো টাকা সাদা করার সুযোগ বাড়ি ও ফ্ল্যাট কেনায়ও ভোক্তা ঋণ বেড়েছে। কারণ বাড়ি-ফ্ল্যাট কেনার একটা অংশ ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়ে পরিশোধ করা হচ্ছে। আরেকটি কারণ হলো অন্যান্য ঋণের সঙ্গে এখন ভোক্তা ঋণের সুদের হারও কমে এসেছে। বর্তমানে অনেক ব্যাংক ৬, ৭ ও সাড়ে ৭ শতাংশ সুদেও ভোক্তা ঋণ দিচ্ছে। এই কম সুদ ভোক্তা ঋণ নিতে উৎসাহিত করছে অনেককেই।’

বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রাপ্ত তথ্যানুযায়ী, গত মার্চ শেষে নিজ বেতন হিসাবের বিপরীতে ঋণ নেওয়া চাকরিজীবীর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে দুই লাখ ২৫ হাজার ২৫৬ জন। ঋণ নিয়েছেন সাত হাজার ৭৩৬ কোটি টাকা। ২০২০ সালের মার্চ পর্যন্ত এক লাখ ৬৫ হাজার ৩৮৬ জন চাকরিজীবী ঋণ নিয়েছিলেন চার হাজার ৭৫৬ কোটি টাকা। এই হিসাবে করোনার গত এক বছরে নিজ বিতন হিসাবের বিপরীতে ঋণ নেওয়া চাকরিজীবীর সংখ্যা বেড়েছে ৫৯ হাজার ৮৭০ জন। আর ঋণের পরিমাণ বেড়েছে প্রায় দুই হাজার ৯৮০ কোটি টাকা।

করোনার এক বছরে প্রভিডেন্ট ফান্ডের বিপরীতে ঋণ নেওয়া ব্যক্তির সংখ্যা এক হাজার ৭৮৯ জন বেড়ে চলতি বছরের মার্চে দাঁড়িয়েছে ৩২ হাজার ৬৭৫ জন। ঋণ নিয়েছেন এক হাজার ২৩৬ কোটি টাকা। অথচ স্বাভাবিক সময়ে ২০১৯ সালের এপ্রিল থেকে ২০২০ সালের মার্চ পর্যন্ত প্রভিডেন্ট ফান্ডের বিপরীতে ঋণ নেওয়া ব্যক্তির সংখ্যা উল্টো কমেছিল আট হাজার ৩৭১ জন। একই সময়ে প্রভিডেন্ট ফান্ডের বিপরীতে ঋণ বিতরণ কমেছিল ৬৬০ কোটি টাকা। এই সময়ে ব্যাংকে জমানো সঞ্চয়ী হিসাবের বিপরীতে গত এক বছরে ব্যাংকঋণ নেওয়ার পরিমাণ কমলেও চলতি বছরের প্রথম তিন মাসে বেড়েছে। চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে মার্চ—এই তিন মাসে সঞ্চয়ী হিসাবের বিপরীতে ঋণ নেওয়া ব্যক্তির সংখ্যা দুই হাজার ৭৯৮ জন বেড়েছে। আর ঋণ নেওয়ার পরিমাণ বেড়েছে ৫৩৪ কোটি টাকা।

ক্রেডিট কার্ডের বিপরীতেও এই সময়ে ঋণ নেওয়ার পরিমাণ বেশ বেড়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্যানুযায়ী, চলতি বছরের মার্চ শেষে ক্রেডিট কার্ডের বিপরীতে ব্যাংকগুলোর বিতরণ করা ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ছয় হাজার ২২৪ কোটি টাকা, যা গত বছরের মার্চে ছিল পাঁচ হাজার ৪৪৯ কোটি টাকা। এ হিসাবে করোনার গত এক বছরে ক্রেডিট কার্ডে ব্যাংকের ঋণ বেড়েছে প্রায় ৭৭৫ কোটি টাকা। আর ক্রেডিট কার্ডের গ্রাহক ৯২ হাজার ৭৬১ জন বেড়ে হয়েছে ১০ লাখ ৬৪ হাজার ১৭৭ জন। যদিও স্বাভাবিক সময়ে ২০১৯ সালের এপ্রিল থেকে ২০২০ সালের মার্চ পর্যন্ত ক্রেডিট কার্ডের গ্রাহক বেড়েছিল এক লাখ ১৬ হাজার। তবে ঋণ বিতরণ বেড়েছিল ৭৫৫ কোটি টাকা।



সাতদিনের সেরা