kalerkantho

রবিবার । ১০ শ্রাবণ ১৪২৮। ২৫ জুলাই ২০২১। ১৪ জিলহজ ১৪৪২

নাজুক বীমা খাতে করোনার হানা

এ এস এম সাদ    

১৮ জুলাই, ২০২১ ১১:২৪ | পড়া যাবে ৭ মিনিটে



নাজুক বীমা খাতে করোনার হানা

করোনার কারণে গত বছর বীমা খাতে নতুন পলিসি কেনার পরিমাণ কমেছে। ভবিষ্যতে আর্থিক নিরাপত্তা ও ঝুঁকি মোকাবেলার কারণে অনেকেই মাস শেষে আয়ের উদ্বৃত্ত অর্থ থেকে নতুন পলিসি কিনে থাকেন। গত বছর করোনার প্রকোপে অর্থনীতির সব খাতেই আঘাত এসেছে। ধানমণ্ডি এলাকায় বেসরকারি চাকরিজীবী সামসুর নাহার (৩৯) ভবিষ্যতের আর্থিক নিরাপত্তার কারণে একটি বীমা কম্পানি থেকে জীবন বীমার পলিসি কিনতে চেয়েছিলেন। তবে করোনার কারণে তাঁর প্রতিষ্ঠান বেতন ১০ শতাংশ কমিয়ে দেয়। ফলে বীমা করার আগ্রহ থাকলেও এই অর্থনৈতিক সংকটে তিনি আর বীমা কিনতে আগ্রহ প্রকাশ করেননি। তিনি কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘গত বছর একটি বীমা পলিসি কিনতে চেয়েছিলাম। কিন্তু পরে এই সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করি। কারণ মাসিক আয় কমে যাওয়ায় একটু অসুবিধায় পড়ে যাই। তবে আগামী বছর ভেবে দেখব।’

সামসুর নাহারের মতো বীমার পলিসি কিনতে চেয়েও কেনেননি এর সংখ্যা বহু। দেশের বীমা খাতের নিয়ন্ত্রক সংস্থা বীমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষের (আইডিআরএ) তথ্য মতে, ২০১৯ সাল অপেক্ষা ২০২০ সালে নতুন পলিসি বিক্রি কমেছে প্রায় ১৬ শতাংশ। ২০১৯ সালে পুরো দেশে ১৬ লাখ ৭৩ হাজার ৪৬৫ জন নতুন পলিসি কেনেন। আর ২০২০ সালে কমে এ সংখ্যা দাঁড়ায় ১৪ লাখ সাত হাজার ৬২১ জন। যদিও ২০১৮ সালের নতুন গ্রাহকসংখ্যা ১৭ লাখ ৭৫ হাজার ৩১৮ জন।

বীমা খাতসংশ্লিষ্টরা জানান, গত বছর মার্চ থেকে পুরো বীমা খাতের চিত্রই বদলে গেছে। ২০১৯ সালের তুলনায় ২০২০ সালে দেশে জীবন বীমায় গ্রাহকসংখ্যা কমেছে প্রায় ১১ শতাংশ। ২০১৯ সালে জীবন বীমায় গ্রাহকসংখ্যা ছিল ৯৭ লাখ ৪১ হাজার ৩৩৫ জন। আর ২০২০ সালে এই সংখ্যা নেমে দাঁড়ায় ৮৬ লাখ ৬৬ হাজার ৬২৯ জন। যদিও জীবন বীমায় গ্রাহকসংখ্যা ২০১৮ সালে ছিল এক কোটি সাত লাখ ১৬ হাজার ৮৩২ জন।

যদিও বিভিন্ন জীবন বীমা কম্পানি ও আইডিআরএর ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা জানান, ২০১৫ সালের পর থেকে বীমা খাতে আস্থার অভাবে ও বীমার সুফল না পাওয়ায় গত দুই বছরের তুলনায় নতুন গ্রাহকসংখ্যা কমেছে। আবার নতুন পলিসির সংখ্যা কম হওয়ায় ২০২০ সালের বিগত বছরের তুলনায় তামাদি পলিসির সংখ্যাও কমেছে। তবে প্রতিবছরই বহুসংখ্যক তামাদি পলিসি থাকে। ২০১৯ সালে এই সংখ্যা ছিল ১৪ লাখ ৪৯ হাজার ৫৩ জন। আর ২০২০ সালে এই সংখ্যা নেমে দাঁড়ায় ১৩ লাখ ৯১ হাজার ৬৪৯ জন। অর্থাৎ গত বছর ৩ শতাংশ পর্যন্ত তামাদি পলিসির পরিমাণ কমেছে।

আবার অতিমারির প্রভাবে প্রিমিয়াম জমা দেওয়ার পরিমাণও কমেছে। রেহানা খানম (৪২) একজন বেসরকারি স্কুল শিক্ষিকা। তিনি একটি বেসরকারি জীবন বীমা কম্পানিতে পাঁচ বছরের জন্য তাঁর মেয়ের জন্য একটি পলিসি করেছিলেন। করোনার আগ পর্যন্ত রেহানা তাঁর জীবন বীমার প্রিমিয়াম নিয়মিত জমা দিতেন। তবে গত বছরের মার্চ মাস থেকে দেশে সব স্কুল-কলেজ বন্ধ হয়ে যায়। এতে তাঁর আয়ের পথও বন্ধ হয়ে যায়। এর পর থেকে বীমা পলিসির অর্থ নিয়মিত জমা দিতে পারছেন না। গত বছরে মে মাসের পর এখন পর্যন্ত পলিসির টাকা পরিশোধ করেননি। পলিসি তামাদি হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা করছেন রেহানা। কালের কণ্ঠকে তিনি বলেন, ‘আগে মাস শেষে কিছু টাকা সঞ্চয় হতো। সেখান থেকে প্রিমিয়াম জমা দিতাম। কিন্তু করোনার পর আর টাকা দিতে পারি নাই।’

বিভিন্ন বীমা কম্পানির সঙ্গে যোগাযোগ করে জানা যায়, রেহানা খানমের মতো অনেকে বীমার পলিসির অর্থ নিয়মিত জমা দিতে পারছেন না। জীবন বীমার ক্ষেত্রে ২০১৮ সালে পলিসি জমা দেওয়ার পরিমাণ ছিল আট হাজার ৯৯২ কোটি টাকা। এ সময় জীবন বীমায় গ্রাহকসংখ্যা ছিল প্রায় এক কোটি ৬৫ হাজার জন। ২০১৯ সালে এসে পলিসির পরিমাণ দাঁড়ায় ৯ হাজার ৫৮৯ কোটি টাকা। অর্থাৎ পরের বছর প্রবৃদ্ধি হয়ে টাকার অঙ্ক দাঁড়ায় ৯৭ লাখ ৪০ হাজার। তবে ২০২০ সালে পলিসির পরিমাণ নেমে দাঁড়ায় ৯ হাজার ৫০১ কোটি টাকা। অর্থাৎ ২০২০ সালে ঋণাত্মক প্রবৃদ্ধি হয় ০.৯২ শতাংশ, এ সময়ে গ্রাহকের সংখ্যা ছিল ৮৬ লাখ ৭০ হাজার। প্রিমিয়াম জমা দেওয়ার হার সাধারণ বীমা খাতেও কমেছে। ২০১৮ সালে টাকার অঙ্কে প্রিমিয়াম ছিল চার হাজার ১৮৬ কোটি টাকা। ২০১৯ সালে চার হাজার ৭১৮ কোটি টাকা এবং ২০২০ সালে চার হাজার ৪০২ কোটি টাকা। অর্থাৎ ২০২০ সালের ঋণাত্মক প্রবৃদ্ধি ৬.৭ শতাংশ।

দেশে বর্তমানে ৩৫টি জীবন বীমা কম্পানি রয়েছে। কম্পানিগুলোর কর্মকর্তা ও এজেন্টের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, ২০২০ সালে প্রায় প্রত্যেকটি কম্পানির প্রিমিয়াম জমা দেওয়ার রেট কমেছে। আইডিআরএর তথ্য মতে, করোনার পর পুরো দেশের বীমা খাতের পলিসি জমা দেওয়ার পরিমাণ কমেছে।

শীর্ষস্থানীয় কম্পানি মেটলাইফ ইনস্যুরেন্সের ২০১৯ সাল থেকে ২০২০ সালে নতুন পলিসি ইস্যুর সংখ্যা কমেছে। আইডিআরএর তথ্য মতে, ২০১৯ সাল অপেক্ষা ২০২০ সালে কম্পানিটির নতুন পলিসি ইস্যু কমেছে ৩৮%। ২০১৯ সালে নতুন পলিসির সংখ্যা ছিল দুই লাখ পাঁচ হাজার ৫৯৩, আর ২০২০ সালে এসে দাঁড়ায় এক লাখ ২৪ হাজার ৭১। আরেক কম্পানি বায়রা লাইফ ইনস্যুরেন্সের ২০১৯ সালে নতুন ইস্যুকৃত পলিসি ছিল দুই হাজার ১৮০। ২০২০ সালে নেমে এই সংখ্যা দাঁড়ায় প্রায় ৮৪১। অর্থাৎ নতুন পলিসির সংখ্যা কমেছে প্রায় ৬২ শতাংশ।

বাংলাদেশ জীবন বীমা করপোরেশনের ২০১৯ সালে নতুন ইস্যুকৃত পলিসির সংখ্যা ছিল ৪১ হাজার ৯৭২। ২০২০ সালে এই সংখ্যা নেমে দাঁড়িয়েছে ১৭ হাজার ৬৭৪ জনে। আবার ফারইস্ট ইসলামী লাইফ ইনস্যুরেন্সে ২০১৯ সালে নতুন পলিসির সংখ্যা ১১ লাখ ৮৬ হাজার ৩৭২ জন থাকলেও ২০২০ সালে এসে নেমে দাঁড়িয়েছে পাঁচ লাখ ১০ হাজার ৭৩৬ জনে। অর্থাৎ কম্পানিগুলোর করোনার সময় ঋণাত্মক প্রবৃদ্ধি হয়েছে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্যাংকিং ও ইনস্যুরেন্স বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. আব্দুল্লাহ আল মাহমুদ কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘সারা দেশেই বীমা পলিসির সংখ্যা কম, করোনার কারণে এটি আরো কমেছে। কারণ মানুষের আয়-ব্যবসা কমে গেছে। আমাদের দেশে হেলথ ইনস্যুরেন্সের মধ্যে কভিড কাভারেজ নেই, ফলে এই অতিমারিতেও মানুষ নতুন পলিসি কিনতে আগ্রহ প্রকাশ করছে না।’

তিনি আরো বলেন, ‘সাধারণ বীমাও কমেছে। কারণ কলকারখানা ও অন্যান্য সব ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান এখন বন্ধ। তাই অনেকে বীমার আওয়তায় আসেনি।’ ঢাকার বাইরের জেলাগুলোতেও মানুষের পলিসি জমা দেওয়ার হার কমেছে। নওগাঁ জেলার সাপাহার থানার পদ্মা লাইফ ইনস্যুরেন্সের ম্যানেজার আব্দুর রাজ্জাক কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘করোনার আগে গ্রাহকের কাছ থেকে টাকা নিয়ে কম্পানিগুলোতে মাসে এক-দুই লাখ পর্যন্ত প্রিমিয়াম জমা দিতাম। করোনায় টাকা দেওয়া কমে গেছে। আর নতুন করে কেউ পলিসিও কিনছে না।’

আইডিআরএর এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে কালের কণ্ঠকে বলেন, বীমা কম্পানিগুলো নানা রকমের অনিয়ম করছে। জনগণের টাকা সময় মতো ফেরত দেয় না। ফলে মানুষও পলিসি কিনতে কিছুটা আগ্রহ কম প্রকাশ করেন। তবে ২০২১ সালের রিপোর্ট সামনে বের হবে, তখন আরেকটি চিত্র পাওয়া যাবে। নাম প্রকাশ না করার শর্তে এক বেসরকারি বীমা কম্পানির ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা বলেন, ‘করোনার জন্য মানুষের আয় কমেছে। জীবিকার জন্য সঞ্চয় ভেঙে ফেলেছেন অনেকে। ফলে গত বছর থেকে এ বছর পর্যন্ত নতুন পলিসি কেনার পরিমাণ অনেক কমেছে।’



সাতদিনের সেরা