kalerkantho

শনিবার । ১৬ শ্রাবণ ১৪২৮। ৩১ জুলাই ২০২১। ২০ জিলহজ ১৪৪২

এযাবৎকালের সর্বোচ্চ রেকর্ড হয়েছে হাউজ বিল্ডিংয়ে : আফজাল করিম

অনলাইন ডেস্ক   

৪ জুলাই, ২০২১ ১৬:৩১ | পড়া যাবে ১৫ মিনিটে



এযাবৎকালের সর্বোচ্চ রেকর্ড হয়েছে হাউজ বিল্ডিংয়ে : আফজাল করিম

সরকারি পর্যায়ে গৃহঋণ প্রদানকারী একমাত্র আর্থিক আর্থিক প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ হাউজ বিল্ডিং ফাইনান্স করপোরেশন (বিএইচবিএফসি) ২০২১ অর্থবছরে অধিকাংশ খাতে এযাবৎকালের সর্বোচ্চ ব্যবসায়িক সাফল্য অর্জন করেছে। সদ্যসমাপ্ত অর্থবছরে প্রতিষ্ঠানটির ঋণ মঞ্জুরি, বিতরণ ও আদায়ে এ সাফল্যের পাশাপাশি সীমাবদ্ধতা, ক্ষেত্রবিশেষে ঋণ দিতে না পারার কারণ ও ভবিষ্যত পরিকলপনাসহ নানা বিষয় কালের কণ্ঠকে জানিয়েছেন বিএইচবিএফসির ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. আফজাল করিম।

অর্থবছর তো শেষ হলো- সাফল্য-ব্যর্থতা কীভাবে দেখছেন?

আফজাল করিম : এ বছর আমাদের ব্যবসায়িক লক্ষ্যমাত্রার প্রতিটি সূচকে, বিশেষ করে ঋণ মঞ্জুরি, বিতরণ ও আদায়ে হাউস বিল্ডিং এর ইতিহাসে এ যাবৎকালের সর্বোচ্চ রেকর্ড হয়েছে। প্রতিষ্ঠানের ইতিহাসে এ যাবৎকালের মধ্যে এই অর্থবছরে ঋণ মঞ্জুরি হয়েছে সর্বোচ্চ, ৬১৬ কোটি টাকা, যা গত বছরের তুলনায় প্রায় ১৬১ কোটি টাকা বেশি। আমরা ঋণ বিতরণ করেছি ৫১৪ কোটি টাকা, যা গত বছরের তুলনায় ৯২ কোটি টাকা বেশি - এটাও সর্বোচ্চ। বেড়েছে ঋণ আদায়ও, মোট ৫৪৯ কোটি টাকা - যা গত বছরের তুলনায় ৬৪ কোটি টাকা বেশি। ২০১৯-২০ অর্থবছরের শেষ তিন মাস পেনডামিক ছিল এবং উক্ত বছরে আগের ২০১৮-১৯ অর্থবছরের তুলনায় ৮৬ কোটি টাকা কম গ্রোথ হয়েছিল। এবার ২০২০-২১ অর্থবছরে লক্ষ্যমাত্রার বিপরীতে ঋণ মঞ্জুরি ১১২ শতাংশ এবং বিতরণে প্রায় ১০৩ শতাংশ অর্জন। নিম্ন আদালতে বিচারাধীন মামলা নিস্পত্তিতেও উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়েছে, ১১৭টি - যা গত বছর ছিল ৮৫টি। এ সাফল্য এসেছে পেনডামিকের মধ্যেও আমাদের কঠোর পরিশ্রম ও নিরবচ্ছিন্ন সেবা প্রদানের ফলে।

কীরকম তৎপরতা ছিল এবার?

আফজাল করিম : বিএইচবিএফসি-এ যোগদানের পূর্বে আমি সোনালী ব্যাংকে ডিএমডি পদে দায়িত্ব পালন করেছি। বিএইচবিএফসি-তে আমি এমডি পদে যোগদান করেই প্রতিটি সূচকে শতভাগ লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের জন্য প্রতিষ্ঠানের সকল কর্মকর্তা-কর্মচরীকে সম্পৃক্ত করে ১০০ দিনের সময়ভিত্তিক কর্মসূচি গ্রহণ করি, যা সকল পর্যায়ে নিবিড় তদারকির মাধ্যমে যথাযথ বাস্তবায়ন করা হয়েছে। ফিল্ড- অফিসগুলোর সামর্থ্য অনুযায়ী টার্গেটও পুনঃনির্ধারণ করে দেয়া হয়েছিল। প্রতিটি শাখায় পেন্ডিং ঋণ কেইসসমূহের কেইস টু কেইসভিত্তিক কতদিন যাবৎ পেন্ডিং, কি কারণে পেন্ডিং, সে তথ্য সংগ্রহ করে যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়। যৌক্তিক কারণ ছাড়া কোন ঋণ কেইস অতিরিক্ত একদিনও যেন পেন্ডিং না থাকে সে বিষয়ে তদারকি জোরদার করা হয়। শাখা ব্যবস্থাপকদের শাখার শীর্ষ ৫০ ঋণ খেলাপির তালিকা করে প্রত্যেকের সাথে টেলিফোনে যোগাযোগ, এসএমএস প্রদান, বিশেষ নোটিশ প্রদান ইদ্যাদি কার্যাদি নিবিড় তদারকির মাধ্যমে শতভাগ করা হয়েছে। এক্ষেত্রে গ্রাহকের বকেয়া পরিশোধে তার কমিটমেন্ট নিয়ে প্রয়োজনে রিসিডিঊল সুবিধা দেয়া হয়েছে। মাঠ পর্যায়ে এ কাজগুলো করে পৃথকভাবে প্রত্যায়নপত্র পাঠাতে বলেছি। শাখা ব্যবস্থাপকরা তা করেছেন। হেড অফিস থেকেও আমি নিজে, জিএম এবং ফাংশনাল বিভাগীয় প্রধানগণ নিয়মিতভাবে এ কার্যক্রম নিবিড় তদারকিতে রেখেছি। আমাদের একটি দক্ষ পরিচালনা পর্ষদ রয়েছে। এছাড়াও অর্থ মন্ত্রণালয় এর আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের সার্বিকতত্ত্বাবধান ও সহযোগিতায় এবং কর্পোরেশনের সকল কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় উল্লিখিত অর্জন সম্ভব হয়েছে।

আমি মনে করি, অফিস প্রধানের যথাযথ কর্মতৎপরতা থাকলে প্রতিষ্ঠানের অন্যরাও তাঁকে অনুসরণ করবেন। আলহামদুলিল্লাহ বছর শেষে আমরা খুব ভাল একটা ফলাফল পেয়েছি। নিম্ন আদালত পেনডামিকে অনেক দিন বন্ধ ছিল। অনেকেই ডাউনপেমেন্ট দিয়ে রিশিডিউল করতে চেয়েছেন, কিন্তু আমাদের প্রস্তুতি থাকায় দীর্ঘদিন পর গত সপ্তাহে কোর্ট খোলার পর কোর্টের সহযোগিতায় আমরা উল্লেখযোগ্য সংখ্যক মামলা সোলে নিস্পত্তি করতে পেরেছি।

করোনা মহামারীজনিত কারণে আপনাদের অনেক গ্রাহক কিস্তি খেলাপি হয়েছেন। আপনাদের মোট গ্রাহক সংখ্যা কত?

আফজাল করিম : করোনার মধ্যে আমরা মামলা করি নাই। কিন্তু প্রত্যেককে নোটিশ করেছি। প্রথমে এসএমএস দিয়েছি মোবাইলে। পাশাপাশি স্পেশাল নোটিশ দিয়েছি (লাল রং এর কাগজে)। আমরা জানি রং এর সাইকোলজিক্যাল ইফেক্ট আছে। রেডকে বলা হয় একসাইটিং কালার। এসব নোটিশ পেয়ে অনেকেই অফিসে যোগাযোগ করেছেন। আমার কাছেও এসেছেন। বলেছেন, করোনাকালে তো এতো টাকা দেয়া এখন সম্ভব না। তাঁদেরকে বলেছি - বঙ্গবন্ধুর জন্মশতবার্ষিকী উপলক্ষ্যে আমাদের একটা বিশেষ রিশিডিউল প্রোগ্রাম আছে - সম্পূর্ণ বকেয়া এককালীন পরিশোধ করা সম্ভব না হলে প্রয়োজনীয় ডাউন পেমেন্ট জমা করে রিশিডউল করে নেন। শেষ পর্যন্ত আমরা প্রায় সাড়ে সাতশত লোন কেইস রিশিডউল করেছি। এর বেশিরভাগই হয়েছে গত মার্চ থেকে এই জুন পর্যন্ত সময়ে। বর্তমানে আমাদের মোট ঋণগ্রহীতা প্রায় ২৫,২০০ জন ।

গ্রাহক ২৫ হাজার। হাউস বিল্ডিংয়ের মতো পুরানো প্রতিষ্ঠানের জন্য সংখ্যাটি কি কম নয়?

আফজাল করিম : আমরাও সন্তুষ্ট না, তবে আমরা গ্রাহক বাড়াতে চাই। ২০২০-২১ অর্থবছরে আমরা প্রায় ১৮০০ জন নতুন গ্রাহককে ঋণ দিয়েছি, যার সুবিধাভোগীর

সংখ্যা প্রায় ১০ হাজার ৮০০ জন। আবার যারা পূর্বে ঋণ গ্রহণ করেছিলেন মেয়াদান্তে তাদের সমুদয় পাওনা পরিশোধে ঋণ হিসাব নিস্পত্তি হয়েছে প্রায় ১১০০ জন। আমাদের গ্রাহক বাড়ছে। পাশাপাশি যদি তুলনা করেন আমাদের যে এস্টাবলিশমেন্ট, যে জনবল, যে শাখা সংখ্যা, সে হিসাব করলে অন্য প্রতিষ্ঠানের তুলনায় আমাদের কম নয় । আমরা বেশি লোককে সেবা দিচ্ছি। আমাদের কর্মী সংখ্যা ৬০০ এরও কম। এই সীমিত জনবল দিয়ে সারাদেশে আমরা ঋণ কার্যক্রম অব্যাহত রেখেছি এবং বিগত সময়ের তুলনায় আমাদের সক্ষমতা বৃদ্ধি পেয়েছে।

আমরা মাত্র ৬১টি শাখার মাধ্যমে সারাদেশে সেবা দিচ্ছি। আমাদের অনুমোদিত পদসংখ্যা ১২৯১ এর বিপরীতে কর্মরত সংখ্যা মাত্র ৫৮৮ জন। বাকি পদগুলো শূন্য। এর মধ্যে আবার অনেকে অবসরে চলে যাচ্ছেন। আমি আসার পরই মার্চ মাসে ৬ জন ডিজিএম হতে জিএম পদে পদোন্নতি পেয়ে অন্য ব্যাংকে চলে গেছেন। ক্রমহ্রাসমান জনবল নিয়েই আমাদের এই প্রবৃদ্ধিটা হয়েছে।

মামলার কথা বলছিলেন, হাউস বিল্ডিংয়ে কী ধরনের মামলা হয়, কোন পরিস্থিতিতে?

আফজাল করিম : আমাদের ঋণটা দীর্ঘ মেয়াদি। কোন কোনে ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ ২৫ বছর পর্যন্ত। আমাদের যেহেতু ঋণের রিপেমেন্ট পিরিয়ড অনেক লম্বা, সে জন্য বাস্তব অসুবিধা বিবেচনায় ঋণ আপ-টু-ডেট করার জন্য ঋণগ্রহীতাগণ সু্যোগ কিছুটা বেশিই পান। দেখা যায়, একজন ঋণগ্রহীতার সামর্থ্য আছে, ৫/৬ তলা বাড়ি, প্রচুর ভাড়া পাচ্ছেন, কিন্তু কিস্তি দিচ্ছেন না - উইলফুল ডিফল্টার। সেক্ষেত্রে আমরা মামলা করি। আবার কোন কোন ক্ষেত্রে দেখা যায় যে তাঁর ঋণ পরিশোধের সামর্থ্য নাই, তার হয়তো একটাই ফ্ল্যাট আছে, তখন তাঁকে আমরা একটু সময় দিতে চাই এবং প্রয়োজনে বিদ্যমান নিয়মে রিশিডিউলের মাধ্যমে ঋণ হিসাব নিয়মিতকরণের সুযোগও দেয়া হয়।

চূড়ান্ত খেলাপিদের ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ শাস্তি কী?

আফজাল করিম : পানিশমেন্ট হচ্ছে ঋণ আদায়ের জন্য মিস মামলা দায়ের করা। আমাদের ঋণ নেয়ার পর জমিসহ নির্মিত বাড়ির মূল্য ঋণের তুলনায় বেশি থাকে। ইচ্ছাকৃত-অনিচ্ছাকৃত যেভাবেই একজন খেলাপি হোক না কেন, ঋণ আদায়ের মামলা চূড়ান্ত পর্যায়ে অর্থাৎ নিলাম পর্যায়ে যাবার আগেই সাধারণত ঋণের বকেয়া বা সমুদয় পাওনা আদায় হয়ে যায়, যেহেতু বন্ধকী সম্পত্তির এ্যাসেট ভ্যালু বেশি।

অভিযোগ আছে যোগ্যতা থাকার পরও হাউস বিল্ডিংয়ের লোন পাওয়া যায় না, অনিয়মের কথাও শোনা যায়।

আফজাল করিম : বর্তমানে জবাবদিহিতা বেড়েছে। আমরা জিরো টলারেন্স নীতিতে আছি, যদি কারো বিরুদ্ধে অভিযোগ পাওয়া যায়, সেক্ষেত্রে তাৎক্ষণিক সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা/কর্মচারীর বিরুদ্ধে যথাযথ ব্যবস্থা নেয়া হয়। আর বর্তমানে ইচ্ছাকৃত বিলম্বের সুযোগ নেই। সেক্ষেত্রে জবাবদিহিতা আছে। গত মাসে আমরা আমাদের সিটিজেন চার্টারটি অনেক বেশি তথ্য সমৃদ্ধ করে হালনাগাদ করেছি। চার্টারে সকল সেবা সংক্রান্ত বিস্তারিত তথ্যাদি উল্লেখের পাশাপাশি প্রতিটি ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ কত দিনের মধ্যে সেবা প্রদান করা হবে তা উল্লেখ করা হয়েছে। ইতোমধ্যে সিটিজেন চার্টারটি আমাদের ওয়েবসাইটে আপলোড করা হয়েছে। এছাড়া বিএইচবিএফসি’র প্রতিটি অফিসে দৃশ্যমান জায়গায় সিটিজেন চার্টার স্থাপন করা হয়েছে। এভাবে সেবা প্রত্যাশীদের কাছে আমাদের কর্মকর্তা/কর্মচারীদের জবাবদিহিতা বৃদ্ধি পেয়েছে। আমাদের এমনও রেকর্ড আছে - ৭ দিনে, ১৫ দিনেও ঋণ মঞ্জুর করেছি। এগুলো ফোকাসে আসে না। ঋণ মঞ্জুরির ক্ষেত্রে প্রথমতঃ মূল মালিকানা দলিল, বায়া দলিল, পরচা, খাজনা হালনাগাদের রশিদ জমা করতে হয়। জমিটা যে অন্য কোথাও মর্টগেজ করা নাই, এটাও এনইসি জমা নেয়া ও তল্লাশি করে নিশ্চিত করতে হয়। এছাড়া ঋণ আবেদনের সাথে রাজউক অনুমোদিত প্লান দিতে হয়, সাথে সয়েল টেস্ট রিপোর্ট ও স্ট্রাকচারাল ডিজাইন। ইমারত নির্মাণ বিধিমালা অনুসারে ফ্লোর-এরিয়া-রেশিও (FAR) অনুসরণে রাজউক প্লান পাশ করে। কেউ কেউ রাজউক অনুমোদিত প্লান অনুসারে সাইট স্পেস রাখেন না বা বাড়ি নির্মাণ করেন না। এক্ষেত্রে আমরা নিয়ম অনুসরণ করি। নকশা প্রদানকারী কর্তৃপক্ষের প্লানের বাইরে নির্মাণ হলে বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই আমাদের কিছু করার থাকে না। প্রতিবেশী আপত্তি দিল যে উনি নিচ তলা ঠিকই করেছেন দোতলা-তিন তলায় অনেকটা বাড়িয়ে নির্মাণ করেছেন- এমন আপত্তিও পাওয়া যায়। আমাদের প্রকৌশলীরা সময়ে সময়ে নির্মাণ কাজের অগ্রগতি পরিদর্শনের জন্য সাইট ইন্সপেকশনে যান। কমপ্লেইন করলেই বাতিল হবে তা না, অভিযোগের সত্যতা পেলে আমরা সে অনুযায়ী সিদ্ধান্ত নেই। বাংলাদেশ হাউস বিল্ডিং ফাইনান্স করপোরেশন হাউজিং সেক্টরে একটি স্পেশালাইজড অর্গানাইজেশন। আমাদের প্রায় ২৫ হাজার ঋণগ্রহীতা। কিন্তু ঋণগ্রহীতার মালিকানা স্বত্বজনিত সমস্যা নেই বললেই চলে । যথাযথ কর্তৃপক্ষের অনুমতি ছাড়া অথবা প্লানে বড় বিচ্যুতি ঘটিয়েও ঋণ নেবার সুযোগ নাই।

এখানে আরেকটা বিষয় আমরা দেখি। একজন গ্রাহক ২০ বছর মেয়াদি এক কোটি টাকা ঋণ নিলেন। মাস শেষে ক্ষেত্রভেদে ৮০ হতে ৯০ হাজার টাকা কিস্তি আসবে। এখন তিনি তিন বা চার তলা যে বাড়িটি বানাচ্ছেন তার প্রাক্কলিত মূল্য, সম্ভাব্য ভাড়া এবং তার নিজস্ব অন্য কোন আয় থাকলে সেটাও বিবেচনায় নিয়ে ঋণের পরিমাণ নির্ধারণ করা হয়।

তার মানে আপনাদের ব্যবস্থাটি যথেষ্ট পোক্ত?

আফজাল করিম : হ্যাঁ, স্পেশালাইজড সরকারি আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিধায় আমরা সরকারি সকল নিয়ম মেনে ঋণ প্রদান করে থাকি।

কিন্তু এই কড়াকড়ির ফলে অর্থ কি অলস পড়ে থাকে না?

আফজাল করিম : অলস পড়ে থাকে সেটা আমি বলব না। ঋণ প্রদানের ক্ষেত্রে আমরা দ্রুত সিদ্ধান্ত প্রদান করে থাকি। উদাহরণ হিসেবে দেখুন - এই যে ফাইলটা দেখছেন, এটা গত ৩০ ডিসেম্বর, ২০২০ তারিখে ঋণ আবেদন দাখিল করা হয়। ঋণ আবেদন দাখিলের পর প্রস্তাবিত জমির মালিকানাস্বত্ব পরীক্ষা করে আইনি প্রতিবেদন, প্রকৌশল প্রতিবেদন, সাইট ইন্সপেকশন তথা যাবতীয় কার্যাদি সম্পন্ন করে ১৪ জানুয়ারি, ২০২১ ঋণ মঞ্জুরি প্রদান করা হয়। অর্থাৎ মাঠ পর্যায়ের একটি ঋণ আবেদন গ্রহণের ১৫ দিনের মধ্যে ঋণ আবেদনকারী ঋণ মঞ্জুরিপত্র পেয়েছেন। এই রকম অনেক উদাহরণ আছে। পেপার সব ঠিক থাকলে দ্রুততম সময়ের মধ্যে হয়ে যায়। সাত দিনের মধ্যেও ঋণ মঞ্জুরের নজির আছে।

সাধারণ মানুষ বলছেন ঋণের এই প্রক্রিয়া যদি আরেকটু সহজ করা যেতো...

আফজাল করিম : আমরা চেষ্টা করছি। শুরুতেই দুই পাতার একটি ফরমে সাময়িক আবেদন করার সুযোগ দিচ্ছি নিখরচায়। আবেদনপত্রে মৌলিক কিছু তথ্য আমরা নেই, যেমন কোথায় বাড়ি বানাচ্ছেন, নির্মাণ কাজ এখন কোন পর্যায়ে, তিনি মালিকানা কীভাবে পেলেন। সাথে শুধু মালিকানা দলিল ও প্লানের ফটোকপি। ভবন নির্মাণাধীন থাকলে আমাদের লোক ভিজিট করে দেখেন মোটামুটি প্লান মোতাবেক কাজ হচ্ছে কিনা। ঠিক থাকলে বলি, আপনার সাময়িক আবেদন মঞ্জুর করলাম, নাউ সাবমিট ইউর ফরমাল এপ্লিকেশন। তখন তিনি ফি-সহ আবেদন করেন। আমাদের চেকলিস্ট আছে। তিনি সব সমেত যদি আবেদন করেন, তবে সর্বোচ্চ ৩০ কর্ম দিবসের মধ্যে ঋণ মঞ্জুর হয়ে যায়।

সুদ তো সরল.. চক্রবৃদ্ধি না, তাই না?

আফজাল করিম : চক্রবৃদ্ধি - উই নেভার ডু দ্যাট। এছাড়া ঋণগ্রহীতার সামর্থ্য তৈরি হলে তিনি যেকোন সময় ঋণের টাকা ফেরতও দিতে পারেন - তার সামর্থ্য অনুযায়ী। জমা দিলে ঋণের ব্যালেন্স থেকে অতিরিক্ত জমা আসলের ব্যালেন্স হতে কমে যায়। আমরা ‘ফোর ক্লোজার ফি’ এক টাকাও নেই না। উদাহরণ হিসেবে একজন ৫০ লাখ টাকা ঋণ নিয়েছেন। তিনি ঋণের কিস্তি হালনাগাদ রেখে যেই মুহূর্তে ১০ লাখ টাকা অতিরিক্ত জমা দিলেন, সেই মুহূর্তে তার ঋণের ব্যালেন্সের আসল থেকে ১০ লাখ টাকা বাদ দিয়ে অবশিষ্ট আসলের ওপর ইন্টারেস্ট চার্জ হবে। ফলে, এক্ষেত্রে তার ঋণের ইন্টারেস্ট চার্জ হ্রাসকৃত আসলের ব্যালেন্সের ওপর হবে, যা স্বাভাবিকভাবেই কম হবে।

চাহিদার পুরো টাকাটাই ঋণ হিসেবে একজন নিতে পারেন?

আফজাল করিম : সাধারণত প্রাক্কলিত ব্যয়ের ৩০ শতাংশ বিনিয়োগ ঋণগ্রহীতাকে করতে হয়, ৭০ শতাংশ ঋণ হিসেবে আমরা দেই। হাউস বিল্ডিং কোন জমি বা ফ্ল্যাট বরাদ্দ দেয় না। আমরা ফ্ল্যাট ক্রয়, বাড়ি নির্মাণ, আবাসন উন্নয়ন, আবাসন মেরামত, হাউজিং ইকুইপমেন্ট, প্রবাসীদের জন্য ঋণ, কৃষক ভাইদের জন্য ঋণ ইত্যাদি বিভিন্ন ধরনের ১১টি প্রডাক্টের মাধ্যমে ঋণ প্রদান করে থাকি। আবাসন উন্নয়ন ঋণের আওতায় একজন ঋণগ্রহীতা তিন তলা বাড়ি করে রেখেছেন, প্লান পাশ করা ৫ বা ৬ তলার। তিনি তার বাড়ির অসম্পূর্ণ কাজ সম্পূর্ণ করতে সেক্ষেত্রেও আমাদের ঋণ নিতে পারেন। বাড়ি সংস্কারের জন্যও আমরা ঋণ দেই। হাউজিং ইকুইপমেন্টের জন্য ঋণ দেই। প্লানে লিফট আছে, লিফট নিতে চান। সেক্ষেত্রেও বিএইচবিএফসি কর্তৃক প্রদান করা হয়ে থাকে।

ঋণের মোট টাকার সিলিং তো বাড়িয়েছেন। সাড়া কেমন পাচ্ছেন?

আফজাল করিম : বেশি পরিমাণে দিচ্ছি এর অর্থ এই নয় যে সবাই বেশি পরিমাণে নিচ্ছে। যার প্রয়োজনীয়তা/সক্ষমতা আছে তিনি পাচ্ছেন। ধরুন, বাড়ি বানানোর জন্য ঢাকায় সর্বোচ্চ দুই কোটি টাকা ঋণ প্রাপ্যতা। এটা তো সবাই পাচ্ছে না। একজনকে সবগুলো ক্রাইটেরিয়া পূরণ করে এই পরিমাণ ঋণ পেতে পারেন। টাকা অলস পড়ে থাকলে তা থেকে কোন রিটার্ন আসে না। ঋণের ভালো ব্যবহার হলে ব্যক্তির জন্য ভাল, দেশের জন্য ভাল।

ঋণের সব টাকা কি একসাথে দিয়ে থাকে হাউস বিল্ডিং?

আফজাল করিম : আমরা সব টাকা এক সাথে দেই না। ৪ বা ৫ কিস্তিতে দেই। প্রথম কিস্তির টাকা বিতরণের পর ইহার যথাযথ বিনিয়োগ আবশ্যক। এক্ষেত্রে, আমাদের প্রকৌশলী সরেজমিনে সাইট পরিদর্শন করে বিনিয়োগের বিষয়টি দেখেন। প্রদানকৃত কিস্তির টাকা বিনিয়োগ সম্পন্ন হবার পর পরবর্তী কিস্তির টাকা ছাড়করণ করা হয়। তবে, রেডিমেড ফ্ল্যাট যদি কেউ ক্রয় করতে চান, সেক্ষেত্রে আমরা ভিজিট করে নির্মাণ কাজ সম্পন্ন হলে ঋণের সম্পূর্ণ টাকা এক কিস্তিতে দেয়ার সুযোগ আছে।

ঋণের জন্য অনাকাঙ্খিত চাপ কি আসে?

আফজাল করিম : অনিয়ম থাকলে আমরা সেখানে যাই না। আমরা তাঁদেরকে বুঝিয়ে বলি যে সমস্যাটা কোথায় এবং আমরা সকল ক্ষেত্রে নিয়ম মেনে ঋণ প্রদান করে থাকি।

মন্দ ঋণ কি বাড়ছে?

আফজাল করিম : শ্রেণীকৃত মন্দ ঋণ যাতে কোন অবস্থাতেই না বাড়ে বরং হ্রাস পায় সে ব্যাপারে আমাদের সর্বাত্মক প্রচেষ্টা অব্যাহত আছে। লোন ক্লাসিফিক্যাশনের তিনটা ক্যাটাগরি আছে, যথাক্রমে সাবস্ট্যাডার্ড, ডাউটফুল ও ব্যাড অর্থাৎ নিম্নমান, সন্দেহজনক ও মন্দ। ২৪ কিস্তি হতে ৩৬ কিস্তির নিচে থাকলে নিম্নমান, ৩৬ হতে ৬০ কিস্তির কম বকেয়া হলে সন্দেহজনক আর ৬০ কিস্তি বা তদুর্ধ্ব কিস্তি বকেয়া হলে মন্দ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। প্রতিটি ক্ষেত্রে তালিকা হালনাগাদ করে কেইস টু কেইসভিত্তিক কার্যকর যোগাযোগ করা হয়। এক্ষেত্রে গ্রাহকের সামর্থ্য বিবেচনায় নিয়ে সম্পূর্ণ পাওনা এককালীন আদায়, সম্পূর্ণ বকেয়া আদায়, প্রযোজ্য ক্ষেত্রে রিশিডিউল প্রদানের মাধ্যমে ঋণ হিসাব নিয়মিতকরণ করা হয়। সকল প্রচেষ্টা ব্যর্থ হলে গ্রাহকের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করে পাওনা আদায় করা হয়। উল্লেখ্য, কর্পোরেশনের মোট ঋণ স্থিতির মাত্র ৭.৪৫% শ্রেণীকৃত ঋণ, আমরা আশা করছি এ বছর তা ৬% এর নিচে নেমে আসবে।

ডিজিটাইশনে আপনার অগ্রগতি কতখানি হলো?

আফজাল করিম : অটোমেশনের দিকেও আমরা এগোচ্ছি। গত এপ্রিল, ২০২১ হতে আমরা ই-হোম লোন ৯টি শাখায় পাইলটিং শুরু করেছি। ইলেকট্রনিক হোম সিস্টেমে মোট আটটা মডিউল নির্ধারণ করা হয়েছে। এর মধ্যে তিনটা মডিউল নিয়ে আমরা পাইলটিং করছি। এ বিষয়ে আজই এটুআই এবং আইসিটি মন্ত্রণালয়ের সাথে আলোচনা হয়েছে, বঙ্গবন্ধুর জন্মশতবার্ষিকীর বছরে আমরা এর শুভ উদ্বোধনের ব্যবস্থা গ্রহণ করেছি। পরিকল্পনা আছে অক্টোবরের মধ্যে উদ্বোধনে যাওয়ার। বর্তমান সরকারের একটা শ্লোগান হচ্ছে ডিজিটাল বাংলাদেশ। ডিজিটাল মানেই হচ্ছে ইজি একসেস টু ইনফরমেশন, ইজি কানেকটিভিটি। আমাদের ইলেকট্রনিক হোম লোনও তাই হবে। এক্ষেত্রে, সেবা প্রত্যাশীগণ ঘরে বসে ঋণ আবেদন করতে পারবেন এবং তিনি ঘরে বসেই দেখতে পাবেন তাঁর ই-নথি কোন পর্যায়ে আছে। এক্ষেত্রে, তিনি ঘরে বসে প্রয়োজনে ফিডব্যাকও দিতে পারবেন। এছাড়া আমরা একটি ওয়েব বেইজড একাউন্টিং সফট্ওয়্যার ইনহাউজ ডেভেলপ করেছি, যা অতি সম্প্রতি ব্যবহারও শুরু হয়েছে। আমাদের আইটির ছেলেরাই এটা করেছে। সফট্ওয়্যারটির ব্যবহার রপ্ত করার জন্য যারা হিসাবায়নের কাজ করছেন তাঁদের এর উপর গত মাসে প্রশিক্ষণ দিয়েছি।

আপনাকে ধন্যবাদ।

আফজাল করিম : কালের কণ্ঠকেও ধন্যবাদ।



সাতদিনের সেরা