kalerkantho

রবিবার । ১০ শ্রাবণ ১৪২৮। ২৫ জুলাই ২০২১। ১৪ জিলহজ ১৪৪২

আমে যুক্ত রাজশাহী অঞ্চলের ৯০% মানুষ

দেশের বিভিন্ন জেলায় যানবাহন বা কুরিয়ারযোগে ছড়িয়ে পড়ে রাজশাহীর আম। এ জন্য হাটে গিয়ে আম বিক্রিসহ নানা কাজে ব্যস্ত হয়ে পড়েন ব্যবসায়ী থেকে শুরু করে শ্রমিকরা। ছবি : সালাহ উদ্দিন

রফিকুল ইসলাম, রাজশাহী    

১৩ জুন, ২০২১ ১১:৪০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



আমে যুক্ত রাজশাহী অঞ্চলের ৯০% মানুষ

রাজশাহীতে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে আমের উপকারভোগী অন্তত ৯০ শতাংশ মানুষ। আমের মুকুলের সময় থেকে আম পাড়া পর্যন্ত প্রতিটি এক হেক্টর (৯ বিঘা) বাগানে অন্তত ১০০ জন শ্রমিকের প্রয়োজন। এরপর বাজারজাতের জন্য প্রয়োজন হয় যানবাহন। হাটে গিয়ে আম বিক্রিসহ নানা কাজে জড়িত থাকে ব্যবসায়ী থেকে শুরু করে শ্রমিকরা।

হাটে বা বাগানে আম কেনাবেচার পর সেই আম ছড়িয়ে দিতে প্রয়োজন হয় বাঁশের ঝুড়ি, প্লাস্টিকের ক্যারেট, প্লাস্টিকের বস্তা, খড়, দড়ি, কাগজের কার্টন এবং পুরনো পত্রিকা। তারপর দেশের বিভিন্ন জেলায় যানবাহন বা কুরিয়ারযোগে ছড়িয়ে পড়ে রাজশাহীর আম। আর এতসব কাজের জন্য আমের এই মৌসুমে প্রয়োজন হয় হাজার হাজার শ্রমিক। বলা যায়, পুরো মৌসুমে আমের কেনাবেচার জন্য দেখা দেয় শ্রমিকসংকট। এমনকি গ্রামের রিকশা-ভ্যানগুলোতেও সিরিয়াল দিতে হয় আম চাষিদের। আর সেই আম বিক্রি করে রাজশাহীতে প্রতিবছর অন্তত দেড় হাজার কোটি টাকা লেনদেন হয়ে থাকে, যা এখানকার অর্থনীতিতে বড় ধরনের প্রভাব ফেলে আসছে কয়েক যুগ ধরে।

রাজশাহী ফল গবেষণা কেন্দ্রের দেওয়া তথ্য মতে, এ জেলায় হেক্টরপ্রতি গড়ে ১৫.৫৮ মেট্রিক টন হারে আম উত্পাদিত হয়। কিন্তু এবার আবহাওয়া অনুকূলে থাকায় তার চেয়েও বেশি আম উত্পাদিত হবে। এবার জেলায় ১৭ হাজার ৯৪৩ হেক্টর জমিতে আম চাষ হয়েছে। সেই হিসাবে ধরা হচ্ছে এবার রাজশাহীতেই অন্তত দুই লাখ ৪৩ হাজার ৪৮৩ মেট্রিক টন আম উত্পাদিত হবে, যা মণ হিসাবে কষতে গেলে প্রায় ৬৩ লাখ ৩৩ হাজার ৫৫৮ মণ আম উত্পাদিত হবে রাজশাহীতে। তবে সব আমই বাজারজাতের উপযোগী হয় না। অনেক আম নষ্ট থাকে, আকারে ছোট হয়, পচে যায়। তার পরও বাজারজাত করার মতো অন্তত ৮০ থেকে ৮৫ শতাংশ আম উপযোগী থাকে প্রতিটি গাছেই। সেই হিসাব কষতে গেলেও রাজশাহীতে এবার অন্তত অর্ধকোটি মণ আম বাজারজাত করা যাবে। গড়ে দেড় হাজার টাকা মণ দরে বিক্রি করলেও এক হাজার কোটি টাকার আম বিক্রি হবে রাজশাহীতে। 

এদিকে রাজশাহীর সর্ববৃহৎ বানেশ্বর হাটে এখনো গড়ে প্রতিদিন অন্তত ২৫ ট্রাক আম বিক্রি হচ্ছে, যদিও করোনার প্রভাবের কারণে তেমন পাইকাররা না আসায় হাটে আমের কেনাবেচা অনেকটাই কম এবার। তার পরও প্রতিদিন গড়ে পাঁচ থেকে সাত কোটি টাকার আমের কেনাবেচা হচ্ছে এখানে। সেই হিসাবে মাসে এই হাটে অন্তত দেড় শ কোটি টাকার আমের কেনাবেচা হচ্ছে।

রাজশাহীর বানেশ্বর বাজারে আম বিক্রি করতে আসা চারঘাটের নজরুল ইসলাম বলেন, ‘এবারও আমার প্রায় পাঁচ বিঘা জমিতে আমের বাগান রয়েছে, যদিও এবার আমের দাম অনেকটা কম। তার পরও অন্তত তিন লাখ টাকার আম বিক্রি হবে। তবে পরিচর্যা খরচসহ অন্যান্য খরচ বাদ দিলে এবার আম চাষ করে তেমন লাভ হবে না। কিন্তু টাকাগুলো প্রায় একসঙ্গে পাওয়া যাবে বলে সেটি সংসারের বড় কোনো কাজে ব্যবহার করা যাবে।’

বাঘা উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা সাইফুল্লাহ খান জনি বলেন, ‘গ্রামের প্রতিটি বাড়িতেই প্রায় আমগাছ রয়েছে। সেই হিসেবে প্রতিটি বাড়ি থেকেই আম বিক্রি হয়। এরপর যারা মধ্যবিত্ত বা ও উচ্চবিত্ত তাদের অন্তত ২৫ শতাংশ মানুষের রয়েছে আমের বাগান। এই আমের পরিচর্যা থেকে শুরু করে সব কাজেই ব্যবহার করা হয় শ্রমিক। আবার শহরের অনেক মানুষও গ্রামে গিয়ে বাগান গড়ে তুলেছে। অনেকেই আড়ত দিয়ে বসে আছে। ফলে রাজশাহীর অন্তত ৯০ শতাংশ মানুষই আমের সঙ্গে সম্পৃক্ত।’  

এদিকে রাজশাহীর বিভিন্ন বাজার ঘুরে দেখা গেছে, এখন গুটি বা আঠিসহ লখনা জাতের আম বিক্রি হচ্ছে ৫৫০ থেকে ৮০০ টাকা দরে। গোপালভোগ দুই হাজার থেকে দুই হাজার ৫০০ টাকা, ক্ষীরশাপাতি বা হিমসাগর বিক্রি হচ্ছে এক হাজার ৫০০ থেকে দুই হাজার টাকা দরে। এ ছাড়া ল্যাংড়া এক হাজার ৫০০ থেকে এক হাজার ৮০০ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে।

এদিকে রাজশাহীর ফল গবেষণা কেন্দ্রের প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড. আব্দুল আলীম কালের কণ্ঠকে জানান, হেক্টরপ্রতি গড়ে ১৫.৫৮ মেট্রিক টন হারে আম উত্পাদিত হবে বলে আশা করা হচ্ছে। এবার আবহাওয়া অনুকূলে থাকায় আমের উত্পাদন ভালো হয়েছে। আম উত্পাদন করে মানুষ লাভবান হচ্ছে বলেই এই ফল চাষের আগ্রহ বেড়েছে। প্রতিবছর শত শত কোটি টাকার ব্যবসাও হচ্ছে এই রাজশাহীতে শুধু আমকে কেন্দ্র করেই।

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক ড. এ এন কে নোমান বলেন, রাজশাহী-চাঁপাইনবাবগঞ্জ অঞ্চলের মানুষের আয়ের বড় একটি অংশ আসে এই আম থেকে। আমের মৌসুমে কানসাট, বানেশ্বর, পোড়শা—এসব হাটে প্রতিদিন কোটি কোটি টাকার আম কেনাবেচা হয়। ফলে এ অঞ্চলের আম চাষিদের জীবন-জীবিকায় পরিবর্তন এসেছে। বর্তমানে এ অঞ্চলের অনেকেই আম চাষে ঝুঁকছে। একটু জায়গা হলেই সেখানে আমের বাগান করছে অনেকেই। আর এভাবে এ অঞ্চলে আমের উত্পাদন বাড়ছে, যা জাতীয় অর্থনীতিতেও অনেক বড় ভূমিকা রাখছে। মূলত এ অঞ্চলের আবহাওয়া ও পরিবেশ আমের জন্য অত্যন্ত উপযোগী। বর্তমানে অনলাইনেও আমের ব্যবসা করছে অনেকে। তারা ভালো সাড়াও পাচ্ছে। আবার স্পেশাল ম্যাঙ্গো ট্রেন চালু হয়েছে। আমকেন্দ্রিক এ সব কিছুর মধ্যে সমন্বয় করা গেলে অর্থনীতিতে এই আম আরো ভূমিকা রাখতে পারবে।

তিনি আরো বলেন, ভৌগোলিক কারণেই রাজশাহী-চাঁপাইনবাবগঞ্জ অঞ্চলের আম দেরিতে পাকে। এই সুযোগে অন্য জায়গার আম বাজার দখল করে নিচ্ছে। এতে রাজশাহীর আম বাজারে পিছিয়ে পড়ছে। এ ছাড়া কতিপয় অসাধু ব্যবসায়ী অতিরিক্ত মুনাফার আশায় বাগানে থাকতেই আমে মেডিসিন মেশাচ্ছে। এতে এ অঞ্চলের আমের সুনাম নষ্ট হচ্ছে।



সাতদিনের সেরা