kalerkantho

বুধবার । ৯ আষাঢ় ১৪২৮। ২৩ জুন ২০২১। ১১ জিলকদ ১৪৪২

এটিজেএফবির ওয়েবিনারে প্রতিমন্ত্রী

মহামারিতে টিকে থাকতে নীতি সহায়তা পাবে এভিয়েশন খাত

নিজস্ব প্রতিবেদক   

৮ মে, ২০২১ ২০:৫০ | পড়া যাবে ৭ মিনিটে



মহামারিতে টিকে থাকতে নীতি সহায়তা পাবে এভিয়েশন খাত

করোনায় বিপুল ক্ষতির মুখে পড়েছে দেশের এভিয়েশন খাত। মহামারির প্রথম ঢেউয়ের ক্ষতি কাটিয়ে ঘুরে দাঁড়াতে না দাঁড়াতেই ফের দ্বিতীয় ঢেউ এই খাতে ‘মরার ওপর খড়ার ঘা’ হিসেবে দেখা দিয়েছে। করোনায় সীমিত আকারে ফাইট চলায় সমতার চেয়ে অভ্যন্তরীণ গন্তব্যে ৫৪ শতাংশ ও আন্তর্জাতিক গন্তব্যে ৭০ শতাংশ কম যাত্রী পরিবহন করতে পারছে দেশীয় এয়ারলাইন্সগুলো। এতে বিপুল আর্থিক তির শিকার হচ্ছে বলে জানায় সংস্থাগুলোর কর্ণধাররা। এমন পরিস্থিতিতে এভিয়েশন খাতের ক্ষতি পুষিয়ে নিয়ে নতুন করে ঘুরে দাঁড়াতে সরকার প্রণোদনাসহ সব ধরনের সহযোগিতা দেবে বলে জানিয়েছেন বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন প্রতিমন্ত্রী মাহবুব আলী।

তিনি বলেছেন, এভিয়েশন খাতের ব্যাপারে সরকারপ্রধানও খুব আন্তরিক। দ্বিতীয় ঢেউ মোকাবিলায়ও সরকার এই খাতের উদ্যোক্তাদের পাশে থাকবে।

আজ শনিবার এভিয়েশন অ্যান্ড ট্যুরিজম জার্নালিস্ট ফোরম অব বাংলাদেশ (এটিজেএফবি) আয়োজিত ‘মহামারিতে বাংলাদেশের এভিয়েশন সেক্টর: চ্যালেঞ্জ ও উত্তরণের উপায়’ শীর্ষক ওয়েবিনারে প্রতিমন্ত্রী এসব কথা বলেন।

একইসঙ্গে বেসামরিক বিমান ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ের সচিব মোকাম্মেল হোসেন ও বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান এয়ার ভাইস মার্শাল মফিদুর রহমান এয়ারলাইন্স কর্তৃপক্ষের সঙ্গে সমস্যাগুলো নিয়ে আলোচনা ও সমাধানের আশ্বাস দেন। 

এটিজেএফবি সভাপতি নাদিরা কিরণের সঞ্চালনায় অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন প্রতিমন্ত্রী মাহবুব আলী, মন্ত্রণালয়ের সচিব মোকাম্মেল হোসেন এবং গেস্ট অফ অনার হিসেবে উপস্থিত ছিলেন বাংলাদেশ বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের (বেবিচক) চেয়ারম্যান এয়ার ভাইস মার্শাল মফিদুর রহমান।

প্যানেল আলোচনায় অংশ নেন বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) আবু সালেহ মোস্তফা কামাল, নভো এয়ারের এমডি মফিজুর রহমান, ইউএস-বাংলা এয়ারলাইনসের এমডি মোহাম্মদ আব্দুল্লাহ আল মামুন, ইউনাইটেড এয়ারওয়েজ পর্ষদের চেয়ারম্যান কাজী ওয়াহিদুল আলম, অ্যাসোসিয়েশন অব ট্রাভেল এজেন্টস অব বাংলাদেশ (আটাব) সভাপতি মনসুর আহমেদ কালাম, ট্যুর অপারেটরস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (টোয়াব) সভাপতি মো. রাফিউজ্জামান।

ভার্চুয়াল আলোচনায় স্বাগত বক্তব্য দেন এটিজেএফবির সাধারণ সম্পাদক তানজিম আনোয়ার এবং ধন্যবদ ও সমাপনী বক্তব্য দেন এটিজেএফবি সহ-সভাপতি মাসুদ রুমী।

প্যানেল আলোচনায় অংশ নিয়ে এভিয়েশন অপারেটরস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (এওএবি) মহাসচিব ও নভোএয়ারের এমডি মফিজুর রহমান বলেন, বাংলাদেশে ৮টি বেসরকারি এয়ারলাইন্স ব্যবসা শুরু করেছিল। এরই মধ্যে ৫টি এয়ারলাইন্স বন্ধ হয়ে গেছে। টিকে থাকা তিনটির মধ্যে রিজেন্ট এয়ারলাইন্স ফ্লাইট স্থগিত করেছে, দুইটি চলছে। যেসব কারণে এয়ারলাইন্সগুলো বন্ধ হয়েছে সেই কারণগুলো এখনো বিরাজমান।

তিনি বলেন, আমাদের দেশে সিভিল এভিয়েশনের চার্জ অনেক বেশি। আমরা এ কথাগুলো বার বার অনেক জায়গায় বলেছি। তবে কোনো কাজ হয়নি। আমাদের এভিয়েশন ফাইন্যান্স ইন্টারেস্ট আন্তর্জাতিক স্ট্যান্ডার্ড থেকে বেশি। প্লেনের কোনো যন্ত্রাংশ নষ্ট হলে সেগুলো অর্ডার দেওয়ার পর দেশে আসতে সময় বেশি লাগে। অনেক ক্ষেত্রে তিন মাস লেগে যায়। এই সমস্যাগুলো দীর্ঘদিন ধরে চলছে। ‘মরার ওপর খাঁড়ার ঘা’ হয়েছে করোনাভাইরাস। করোনার প্রথম ঢেউয়ে আমরা মন্ত্রণালয় এবং বেবিচক থেকে অনেক সাহায্য পেয়েছি। আশা করছি, এবারের সংকটে তারা প্রতিটি স্টেক হোল্ডারের সঙ্গে ‘ওয়ান টু ওয়ান’ বসে কার কী দরকার সে বিষয়ে আলোচনা করবে।

ইউএস-বাংলা এয়ারলাইন্সের এমডি মোহাম্মদ আব্দুল্লাহ আল মামুন বলেন, বাংলাদেশের অর্থনীতিকে বাঁচিয়ে রাখতে হলে এভিয়েশন খাতকে বাঁচিয়ে রাখার বিকল্প নেই। আমরা ২০১৯-২০ অর্থবছরে ৭টি নতুন এটিআর ৭২-৬০০ এয়ারক্রাফট আনি। ৮টি আন্তর্জাতিক রুটে ফ্লাইট চালু করি। এরপরই হানা দেয় করোনা। আমরা এমনিতেই ক্ষতিগ্রস্ত, এর মাঝে আমাদের জেট ফুয়েলের দাম অভ্যন্তরীণে ৪৬টাকা থেকে বাড়িয়ে ৬০ এবং আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে ৩৬ থেকে ৫০ টাকা করা হয়েছে। ডিলে ইনভয়েজের চার্জ, অ্যারোনটিক্যাল, নন-অ্যারোনটিক্যাল চার্জ সবই বেশি। অথচ ভারতে ৮০ সিটের নিচে অভ্যন্তরীণ ফ্লাইটের কোনো অ্যারোনেটিকাল চার্জ লাগে না। ইউএস-বাংলা এয়ারলাইন্স এবং বিমান ৬ হাজার কোটি টাকা ফরেন রেমিটেন্স রিটেইন করেছে। বাংলাদেশের আকাশপথের মার্কেট শেয়ারের ৭০ ভাগ বিদেশি ও ৩০ ভাগ দেশি এয়ারলাইন্সের কাছে। অথচ আমাদের মার্কেট শেয়ার ৭০ ভাগ হওয়ার কথা ছিল।

তিনি বলেন, এগুলো আমরা গত ৭ বছর ধরেই বলে যাচ্ছি। অথচ করোনাপরবর্তী সময় বাংলাদেশ থেকে শুধুমাত্র ডোমেস্টিকে ৫০ লাখ টাকার প্রণোদনা পেয়েছি। যদিও আমাদের অনেক সীমাবদ্ধতা রয়েছে, তবে আমি মনে করি আমাদের প্রতিমন্ত্রী ও চেয়ারম্যান তাদের সর্বোচ্চটা দিয়েছেন। আমাদের টিকিয়ে রাখতে হলে তাদের আরও সহযোগিতা দরকার। এখন আমাদের আন্তর্জাতিক ফ্লাইট পরিচালনার ক্ষেত্রে চার্জসহ অন্যান্য ফি মওকুফ করা অত্যান্ত জরুরি।

ইউনাইটেড এয়ারওয়েজের পর্ষদের চেয়ারম্যান ও এভিয়েশন বিশেষজ্ঞ কাজী ওয়াহিদুল আলম বলেন, আমরা করোনার প্রথম ধাক্কা সামলে নিয়েছিলাম। তবে আরেকটি ঢেউ এভিয়েশন খাতকে আঘাত করেছে। সারা পৃথিবীর এয়ারলাইন্সগুলো যখন বিপর্যস্ত, তখন বাংলাদেশের তিনটি এয়ারলাইন্স আমাদের আশা বাঁচিয়ে রেখেছে। নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলো যদি বেসরকারি এয়ারলাইন্সগুলোর বন্ধ হওয়ার কারণ বিশ্লেষণ করে তাহলে আগামীর সংকট কাটিয়ে ওঠা সম্ভব হবে। আর যদি সেসব সমস্যা ফিগারআউড না করা হয় সেক্ষেত্রে বর্তমানে ফ্লাইট চালানো এয়ারলাইন্সগুলোকে টিকিয়ে রাখা দুঃসাধ্য হবে।

এ সময় বেবিচক চেয়ারম্যান এয়ার ভাইস মার্শাল মফিদুর রহমান বলেন, আমরা করোনার প্রথম ঢেউকে আকস্মিকভাবে দেখিনি। আমরা আগে থেকেই প্রস্তুতি নিয়ে রেখেছিলাম। করোনার প্রাদুর্ভাব বেড়ে যাওয়ায় আমরা প্রথমে ফ্লাইট গুটিয়ে নিলেও পরে আবার ধাপে ধাপে খুলে দিয়েছিলাম। একমাত্র প্রধানমন্ত্রী, এয়ারলাইন্স এবং মন্ত্রণালয়ের সহযোগিতায় আমরা ঘুরে দাঁড়িয়েছিলাম। এয়ারলাইন্সগুলোকে বাড়াতে আমরা প্রণোদনা দিয়েছি, নানা চার্জ মওকুফ করেছি, বসে থাকা যাত্রীবাহী ফ্লাইটে কার্গো ফ্লাইট পরিচালনার অনুমতি দিয়েছি। পাশাপাশি বাংলাদেশি এয়ারলাইন্সকে বিশেষ ফ্লাইট পরিচালনার ক্ষেত্রে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে।

তিনি বলেন, আমরা অনেক চার্জ মওকুফ করেছি, তবে সিভিল এভিয়েশনকে চালাতেও অর্থের প্রয়োজন। সিভিল এভিয়েশনকে চালাতে ১৬০০ কোটি টাকা দরকার, অথচ করোনাকালে আমাদের রাজস্ব ৮০০ কোটিতে চলে এসেছে। সারচার্জ কমানোসহ অন্যান্য চার্জ মওকুফ করার বিষয়টি দেশের অর্থনীতির সঙ্গে জড়িত। এগুলো বিষয়ে আমরা সবার সঙ্গে বসে আলোচনা করব।

বিমান ও পর্যটন প্রতিমন্ত্রী মো. মাহবুব আলী বলেন, প্রধানমন্ত্রী প্রথম থেকেই চেয়েছিলেন এই সেক্টরটি ঘুরে দাঁড়াক। প্রাইভেট এয়ারলাইন্সগুলো যাতে তাদের সেবা চালু রাখতে পারে সেজন্য তাদের যে ধরনের সহযোগিতা প্রয়োজন তাই দেওয়া হবে।
ওয়েবিনারে বেসামরিক বিমান ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ের সচিব মোকাম্মেল হোসেন বলেন, ‘বৈশ্বিক পরিস্থিতির মতো বাংলাদেশের এভিয়েশন খাতেও করোনা মহামারি প্রবল আঘাত হেনেছে। স্বাস্থ্যবিধি মেনে আমরা আমরা এভিয়েশন খাতের ক্ষতি কাটিয়ে আবার ঘুরে দাঁড়াতে পারবো। দেশিয় এয়ারলাইন্সের টিকে থাকতে প্রণোদনাসহ যতো ধরনের সহায়তা দরকার সব দেওয়া হবে।

তিনি বলেন, মধ্যপ্রাচ্যের টিকেটের আকাশচুম্বী মূল্য মনিটরিং করা হচ্ছে। এই বিষয়ে আমি বিমানের এমডির সঙ্গেও কথা বলেছি। এ ছাড়া সৌদি এয়ারলাইনসের বিরুদ্ধে হয়রানিসহ যেকোনো লিখিত অভিযোগ পাওয়া গেলে ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে তিনি সাংবাদিকদের আশ্বস্ত করেন।

এদিকে ভারতীয় ভ্যারিয়েন্ট ঠেকাতে যশোর থেকে ফ্লাইট বন্ধ করা হবে কি না সাংবাদিকদের এমন প্রশ্নের জবাবে বেবিচক চেয়ারম্যান এয়ার ভাইস মার্শাল এম মফিদুর রহমান বলেন, যশোর বিমানবন্দরে বিশেষ সতর্কতা নেওয়া হয়েছে। সেখানে স্বাস্থ্যগত পরীক্ষার ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। কোনো যাত্রী অসুস্থ পাওয়া গেলে তাকে ফ্লাই করা থেকে বিরত রাখা হবে।

মফিদুর রহমান বলেন, ভারতীয় ভ্যারিয়েন্ট তো শুধু যশোরে না, দেশের যেকোনো স্থানেই এটি পাওয়া যেতে পারে। তবে যশোর বিমানবন্দরে যাতে এটি না ছড়ায়, সে সম্পর্কে সতর্ক আছে বেবিচক।



সাতদিনের সেরা