kalerkantho

মঙ্গলবার । ১ আষাঢ় ১৪২৮। ১৫ জুন ২০২১। ৩ জিলকদ ১৪৪২

আমদানি কমের অজুহাত

লাগাম নেই ভোগ্য পণ্যের বাজারে

রাশেদুল তুষার, চট্টগ্রাম    

১৮ মার্চ, ২০২১ ১০:৩৯ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



লাগাম নেই ভোগ্য পণ্যের বাজারে

রমজানকে সামনে রেখে এরই মধ্যে অস্থির হয়ে উঠেছে ভোগ্য পণ্যের বাজার। কম আমদানি কিংবা কৃত্রিম সংকটের অজুহাত তুলে প্রতিদিনই বাড়ানো হচ্ছে নিত্যপণ্যের বাজার। আমদানি স্বল্পতার সুযোগে ডিওকেন্দ্রিক অতিমুনাফার কারণে চাল, চিনি ও ভোজ্য তেলের দাম গত কয়েক দশকের মধ্যে সর্বোচ্চ অবস্থানে চলে গেছে। এবার অসাধু ব্যবসায়ীরা রমজানকেন্দ্রিক বাজার মনিটরিং শুরুর আগেই দাম বাড়ানোর ভিন্ন কৌশলে হাঁটছেন বলে মনে করেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা।

খাতুনগঞ্জের একাধিক ব্যবসায়ীর সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, অতীতে শবেবরাতের আগ মুহূর্ত থেকেই রমজানের ভোগ্য পণ্য বিকিকিনি শুরু হতো। কিন্তু এবারে প্রশাসনের নজরদারি এড়াতে রমজানের প্রায় দুই মাস আগেই ভোগ্য পণ্যের বিকিকিনি শুরু করেছেন আমদানিকারক ও পাইকারি ব্যবসায়ীরা। এতে গত এক মাস থেকে রমজানে প্রয়োজনীয় বেশির ভাগ ভোগ্য পণ্যের দাম আগের চেয়ে বেড়ে গেছে এবং এখনো সব পণ্যের দাম ঊর্ধ্বমুখী।

দুই দিনের ব্যবধানে খাতুনগঞ্জে পাইকারি পর্যায়ে ছোলার দাম মানভেদে ১৩০-২৫০ টাকা পর্যন্ত বড়েছে। অর্থাৎ কেজিতেই বেড়েছে প্রায় ছয় টাকা। গত সোমবার নিম্নমানের অস্ট্রেলিয়ার ছোলা বিক্রি হয়েছে দুই হাজার ২০ টাকায়, অথচ বুধবার দুই হাজার ১৫০ টাকা করে বিক্রি হতে দেখা গেছে। ভালো মানের ছোলা দুই হাজার ২৫০ টাকা থেকে বেড়ে দুই দিনের ব্যবধানে বুধবার বিক্রি হয়েছে দুই হাজার ৫০০ টাকায়। আর মিয়ানমারের ছোলা দুই হাজার ৬০০ টাকা থেকে বেড়ে দুই হাজার ৮০০ টাকায় বিক্রি হয়েছে গতকাল। এক মাস আগেও একই মানের ছোলা দুই হাজার টাকার (কেজি ৫০ টাকা) নিচে বিক্রি হয়েছে। চট্টগ্রাম কাস্টমস সূত্র জানায়, গত অর্থবছরের প্রথম সাত মাসে ছোলা আমদানি হয়েছিল এক লাখ ৫৮ হাজার ৫৩ টন। চলতি অর্থবছরের একই সময়ে ছোলা আমদানি হয়েছে মাত্র ৭৭ হাজার ৫২২ টন।

বাজারে পর্যাপ্ত ছোলা থাকায় দাম বাড়ার কোনো কারণ নেই বলে মনে করেন খাতুনগঞ্জের তৈয়বিয়া ট্রেডার্সের পরিচালক সোলায়মান বাদশা। কালের কণ্ঠকে তিনি বলেন, এসব ছোলা প্রতি মণ কেনা পড়েছে এক হাজার ৭৫০ টাকা। কিন্তু কিছু অসাধু ব্যবসায়ী প্রতি মণে ৬০০ kalerkanthoথেকে ৭০০ টাকা বাড়তি দামে বিক্রি করছেন। শবেবরাতের আগে চাহিদা বাড়লে ছোলার দাম চাহিদা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে আরো কিছুটা বাড়ার আশঙ্কা করেন তিনি। তবে রমজানের প্রথম সপ্তাহ পরেই ছোলার দাম কমে যাবে। এ ক্ষেত্রে ক্রেতাদের একসঙ্গে কিনে মজুদ না করার পরামর্শ দেন এই ব্যবসায়ী। দীর্ঘদিন ধরে ঊর্ধ্বমুখী থাকলেও আসন্ন রমজানকে ঘিরে আরো অস্থির হয়ে উঠেছে সব ধরনের ভোজ্য তেলের বাজার। এর মধ্যে দফায় দফায় বেড়ে গতকাল সোমবার খাতুনগঞ্জে পাইকারিতে প্রতি মণ (৪০.৯০ লিটার) পাম অয়েলের দাম ঠেকেছে তিন হাজার ৮৮০ টাকায়, যা এক মাস আগেও তিন হাজার ৪০০ টাকার নিচে বিক্রি হয়েছে।

একইভাবে দফায় দফায় বেড়ে বর্তমানে প্রতি মণ পাম সুপার অয়েল বিক্রি হচ্ছে চার হাজার ৭০ টাকায়, যা গত মাসেও তিন হাজার ৮০০ টাকার নিচে বিক্রি হয়েছে। তা ছাড়া গত মাসে প্রতি মণ সয়াবিন বিক্রি হয়েছে চার হাজার ১০০ টাকার মধ্যে। বর্তমানে একই সয়াবিন চার হাজার ৬০০ থেকে চার হাজার ৭২০ টাকার মধ্যে বিক্রি হচ্ছে। বাজারদর অনুযায়ী, গত এক মাসে প্রতি মণ ভোজ্য তেলের দাম ৫০০-৬২০ টাকা পর্যন্ত বৃদ্ধি পেয়েছে।

চট্টগ্রাম কাস্টমসের সর্বশেষ আমদানি চিত্রেও ভোজ্য তেলের সংকটের বিষয়টি উঠে এসেছে। ২০২০ সালের জুলাই থেকে ২০২১ সালের জানুয়ারি পর্যন্ত সাত মাসে দেশে পাম অয়েল আমদানি হয়েছে পাঁচ লাখ ২৫ হাজার ২০৮ টন। ২০১৯-২০ অর্থবছরের একই সময়ে আমদানি হয়েছিল আট লাখ ৭৬ হাজার ৪৩৫ টন। অর্থাৎ জানুয়ারি পর্যন্ত সাত মাসে দেশে পাম অয়েল আমদানি কমেছে তিন লাখ ৫১ হাজার ২২৭ টন। ভোজ্য তেলের মধ্যে সবচেয়ে বেশি বিক্রীত পাম অয়েলের আমদানি কমে যাওয়ায় অন্যান্য ভোজ্য তেলের বাজারে এটির প্রভাব পড়েছে। এ ছাড়া একই সময়ে মাত্র ২৫ হাজার ৬০০ টন বৃদ্ধি পেয়ে জানুয়ারি পর্যন্ত দেশে সয়াবিন আমদানি হয়েছে তিন লাখ ৬৭ হাজার ৯৩৬ টন, যা করোনা-পরবর্তী সময়ের মধ্যে রমজানের জন্য পর্যাপ্ত নয় বলে মনে করছেন ব্যবসায়ীরা। আমদানি কম হওয়ায় মিলগেট থেকে সরবরাহ কিছুটা শ্লথ হওয়ায় প্রায় প্রতিদিনই ভোজ্য তেলের দাম বেড়েই চলেছে। রমজানকে সামনে রেখে এসব ভোজ্য তেলের দাম আরো বাড়তে পারে বলে শঙ্কা প্রকাশ করেছেন খোদ ব্যবসায়ীরাও। আসন্ন রমজানের আগে আগে তেলের দাম আরো বাড়বে আশঙ্কা করে আর এন এন্টারপ্রাইজের স্বত্বাধিকারী আলমগীর পারভেজ কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘গত বছরের একই সময়ের তুলনায় এবার তেলের আমদানি এবং ঋণপত্র (এলসি) খোলার হার ৫০ থেকে ৬০ শতাংশ। চট্টগ্রামে এস আলম ছাড়া আর কোনো গ্রুপ তেল দিচ্ছে না। চট্টগ্রাম থেকে প্রতিদিন সয়াবিন, পাম অয়েল এবং সুপার পাম অয়েলের প্রায় ৩০০ গাড়ি বা দুই হাজার ৩০০ টন তেল দেশের বিভিন্ন জায়গায় যাচ্ছে, যা দেশের চাহিদার প্রায় ৬০ শতাংশ। এই তেলের পুরোটাই সরবরাহ করছে এস আলম গ্রুপ।’

তিনি বলেন, ‘বাণিজ্য মন্ত্রণালয় গতকাল খোলা তেল লিটারপ্রতি ১১৫ টাকা থেকে বাড়িয়ে ১১৭ টাকা করেছে। সেই হিসেবে মণপ্রতি খোলা তেল চার হাজার ৬৮০ টাকা, কিন্তু খাতুনগঞ্জে গতকাল খোলা সয়াবিন বিক্রি হয়েছে চার হাজার ৬০০ টাকা। এ ছাড়া পাম অয়েল তিন হাজার ৮৮০ টাকা এবং সুপার পাম অয়েল চার হাজার ৭০ টাকা মণপ্রতি বিক্রি হয়েছে, যা সোমবার বাণিজ্য মন্ত্রণালয় নির্ধারিত দরের চেয়ে কম। আগের কেনা বলে কম দামে বিক্রি করা সম্ভব হয়েছে। কিন্তু নতুন এলসিতে যেসব তেল আসবে আন্তর্জাতিক বাড়তি দরের কারণে তখন তেলের দাম আরো বাড়বে বলে আশঙ্কা করছি।’

দুই দিন কিছুটা স্বস্তি দিলেও কেজিতে আবারও তিন-চার টাকা বেড়েছে পেঁয়াজের দাম। খাতুনগঞ্জের হাজি অছিউদ্দিন ট্রেডার্সের মালিক রুহুল আমীন রিগ্যান কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘বাজারে দেশি পেঁয়াজের চালান কমে যাওয়ায় ভারতীয় পেঁয়াজের দাম কিছুটা বেড়েছে। বর্তমানে দেশি, ভারতের পেঁয়াজ রয়েছে খাতুনগঞ্জে। এর মধ্যে প্রতি কেজি ভারতীয় নাসিক জাতের পেঁয়াজ গতকাল বিক্রি হয়েছে ৩৫ থেকে ৩৬ টাকা। চিটাগাং চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির সভাপতি মাহবুবুল আলম বলেন, ‘প্রতিবছর রমজানের আগেই নিত্যপ্রয়োজনীয় ভোগ্য পণ্যের মূল্যবৃদ্ধির একটা প্রবণতা থাকে ব্যবসায়ীদের মধ্যে। তবে এক বছর ধরে আন্তর্জাতিক বাজারে প্রায় ভোগ্য পণ্যের দাম আগের চেয়ে কিছুটা বেশি।’



সাতদিনের সেরা