kalerkantho

শুক্রবার । ১৩ ফাল্গুন ১৪২৭। ২৬ ফেব্রুয়ারি ২০২১। ১৩ রজব ১৪৪২

করোনায় মধুর চাহিদা বেড়েছে ৬ গুণ

রোকন মাহমুদ    

২৪ জানুয়ারি, ২০২১ ১০:৪৫ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



করোনায় মধুর চাহিদা বেড়েছে ৬ গুণ

ধামরাইয়ে সরিষাক্ষেত থেকে মধু আহরণ করছেন এক চাষি ছবি : কালের কণ্ঠ

মধুকে বলা হয় পৃথিবীর সবচেয়ে উত্তম পানীয়, যা একই সঙ্গে সুস্বাদু, সুমিষ্ট এবং রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধিকারী। ফলে করোনায় শরীরে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়াতে সবচেয়ে বেশি চাহিদা বেড়েছে মধুর। এ সময় মধুর উৎপাদন যেমন বেড়েছে, তেমনি বিক্রিও বেড়েছে ছয় গুণ পর্যন্ত। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সারা বছরই মধুর চাহিদা থাকে। সংশ্লিষ্টরা আরো বলছেন, আগে দুই-এক শ্রেণির মানুষ নিয়মিত মধু খেত। এখন সব শ্রেণি-পেশার মানুষ মধুতে অভ্যস্ত হয়ে উঠেছে। এতে উৎপাদিত মধুর সবটুকুই দেশের চাহিদা পূরণ করতে লেগে যাচ্ছে।

বিসিকের উদ্যোগে ১৯৭৭ সালে দেশে প্রথম পরীক্ষামূলকভাবে বাক্সভিত্তিক মধুর বাণিজ্যিক চাষ শুরু হয়। সংস্থাটির হিসাবে, দেশে ব্যাপক হারে বাণিজ্যিক মধুর চাষ শুরু হয় ২০১২ সাল থেকে। ওই বছর দেশে মধু উৎপাদন হয়েছিল প্রায় দেড় হাজার টন। এরপর ধারাবাহিকভাবে বেড়ে ২০১৬ সালে মধু উৎপাদন হয়েছে চার হাজার টন।

বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউটের সাবেক পরিচালক ও মুখ্য বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা সৈয়দ নূরুল ইসলামের দেওয়া তথ্য অনুসারে, বর্তমানে বাংলাদেশে প্রাকৃতিকভাবে উৎপাদিত মধুর পরিমাণ ১২১ মেট্রিক টনের বেশি। এর ৭৫ শতাংশই সংগ্রহ করা হয়েছে সুন্দরবন থেকে। আর চাষের মাধ্যমে উৎপাদিত মধুর পরিমাণ ১০ হাজার মেট্রিক টনের মতো, যা মোট চাহিদার মাত্র ৩০ শতাংশ পূরণ করে। বাকি চাহিদা আমদানির মাধ্যমে পূরণ করা হয়।

দেশে প্রায় ২৫ হাজার মৌমাছি পালনকারী রয়েছে, যা লিচুবাগান এবং সুন্দরবন বাদে সরিষা, ধনে ও কালিজিরার ক্ষেত থেকে মধু সংগ্রহ করে। মধু সংগ্রহের প্রধান মৌসুম ডিসেম্বর-জানুয়ারিতে।

জানতে চাইলে আফজাল ব্র্যান্ডের মধু বাজারজাতকারী শিমু এন্টারপ্রাইজের মালিক মো. এবাদুল্লাহ আফজাল কালের কণ্ঠকে বলেন, করোনায় সরকারি-বেসরকারি নানাভাবে মধু খাওয়ার প্রতি উৎসাহ দেওয়া হয়েছে। ফলে এ সময় সব শ্রেণি-পেশার মানুষ মধু খাওয়ায় অভ্যস্ত হয়েছে। ফলে পণ্যটির উৎপাদন, প্রক্রিয়াজাতকরণ ও বিক্রি সবই বেড়েছে দ্বিগুণের বেশি। তিনি আরো বলেন, ‘আমি আগে প্রতি মাসে পাঁচ টন মধু প্রক্রিয়াজাত করতাম দেশের বাজার ও রপ্তানির জন্য। করোনার প্রভাব শুরু হওয়ার পর থেকে তা ৩০ টনে দাঁড়িয়েছে। অর্থাৎ আমার বিক্রি বেড়েছে ছয় গুণ। দামও বেড়েছে দ্বিগুণ। দেশি চাহিদা ও দাম বৃদ্ধির কারণে আমাদের আর রপ্তানি করতে হচ্ছে না। প্রক্রিয়ার সবটুকুই দেশের বাজারের চাহিদা মেটাতে লাগছে।’

শুধু পাইকারিতে নয়, খুচরায়ও বেড়েছে মধু বিক্রি। এ বিষয়ে ই-কমার্স প্রতিষ্ঠান মার্কেটবাংলার ব্যবস্থাপনা পরিচালক হাবিবুর রহমান জুয়েল কালের কণ্ঠকে বলেন, করোনার প্রাদুর্ভাব যখন বেশি ছিল তখন বেশ কয়েকটি পণ্যের বিক্রি ব্যাপক বেড়ে যায়। তার মধ্যে মধু অন্যতম। স্বাভাবিক সময়ে আমরা মাসে ২৫০ থেকে ৩০০ কেজি মধু বিক্রি করতাম। কিন্তু করোনার পর থেকে তা বেড়ে ৫০০ থেকে ৬০০ কেজিতে দাঁড়িয়েছে। অর্থাৎ বিক্রি বেড়ে দ্বিগুণ হয়েছে। এই ধারা এখনো রয়েছে।

তবে দেশে মধুর চাহিদা ও উৎপাদন যত বেড়েছে ততই নকল বা ভেজালের হারও বেড়েছে। তাই মধুর মতো খাঁটি খাবারের সঙ্গেও খাঁটি শব্দটি আলাদা করে বলতে বা লিখতে হচ্ছে। মধু বিএসটিআইয়ের বাধ্যতামূলক মান সনদ গ্রহণের ১৮১টি পণ্য তালিকার একটি। এ জন্য বিএসটিআই থেকে মান সনদ নিয়ে বাজারজাত করতে হয়। সম্প্রতি অনলাইনে বিক্রির ক্ষেত্রেও এর লাইসেন্স বাধ্যতামূলক করেছে বিএসটিআই।

দেশে উৎপাদিত এসব মধু প্রক্রিয়াজাত হয়ে ক্রেতার হাতে পৌঁছে দিতেও কাজ করছে অনেক প্রতিষ্ঠান। এদের বেশির ভাগই বিএসটিআই থেকে মান সনদ নিয়ে বাজারজাত করছে। অনেক প্রতিষ্ঠান মান সনদের জন্য আবেদন করে রেখেছে বলে জানা যায়।

২০১৬-১৭ সালের দিকে দেশের বড় চার থেকে পাঁচটি প্রতিষ্ঠান মধু প্রক্রিয়াজাত করতে কারখানা স্থাপান করে। এরপর পর্যায়ক্রমে আরো প্রতিষ্ঠান এ খাতে বিনিয়োগ করেছে। বর্তমানে দেশে এপি, ট্রপিকা হানি, হানি বাংলাদেশ, সুন্দরবন অ্যাগ্রো, সলিড হানিসহ আরো কয়েকটি প্রতিষ্ঠান মধু প্রক্রিয়াজাত করছে। এই কম্পানিগুলো বিভিন্ন ব্র্যান্ড নামে দেশের অভ্যন্তরীণ বাজারের পাশাপাশি দেশের বাইরেও বাজার তৈরি করেছে। তবে বিদেশি কিছু কম্পানির মধুও দেশের বাজারে পাওয়া যাচ্ছে।

এ ছাড়া আরো ৭০টির বেশি প্রতিষ্ঠান রয়েছে যারা প্রক্রিয়াজাত মধু মোড়কজাত ও বাজারজাত করছে। বিসিক ও বিএসটিআই সূত্রে এসব তথ্য জানা যায়। এগুলোর মধ্যে ৫০টির বেশি প্রতিষ্ঠান বিএসটিআই থেকে মান সনদ পেয়েছে। বাকিগুলোর আবেদন জমা হয়ে আছে। বাজারে অন্তত ১০ রকমের মধু পাওয়া যাচ্ছে। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি পাওয়া যায় সরিষা ফুলের মধু। এ ছাড়া লিচু, কালিজিরা, তিসি, মৌরি, খেসারি, বরই, ধনে, মিষ্টিকুমড়া, আমের মুকুলসহ বিভিন্ন ফুলের মধুও পাওয়া যাবে। প্রতি কেজি মধুর দাম ৩৫০ থেকে দুই হাজার টাকা।

সরাসরি সুন্দরবন থেকে সংগৃহীত মধুর ক্ষেত্রে প্রতি কেজি কেওড়া ফুলের মধু বিক্রি হচ্ছে ৫০০ থেকে ৫৫০ টাকা, গরান ফুলের মধু মিলছে ৬০০ টাকায়। আর খলিশা ফুলের মধু পাওয়া যাচ্ছে ৮০০ টাকা কেজি। স্বপ্ন স্বনামে মধু বাজারজাত করছে, আধাকেজির জারের দাম ৩৬৫ টাকা। আলবারাকা নামের একটি প্রতিষ্ঠান বাজারজাত করছে, ৫০০ গ্রাম মধুর খুচরা দাম ৪০০ টাকা। আমদানি করা মধুর দাম পড়ছে প্রায় হাজার টাকা কেজি।

নব্বইয়ের দশকে ভারতে মধু রপ্তানি শুরু করে বাংলাদেশ। সেটাই শুরু। ওই সময় ভারতের ডাবরসহ কয়েকটি কম্পানি বাংলাদেশের মধু কিনে নিয়ে যেত কাঁচামাল হিসেবে। মধ্যপ্রাচ্যে প্রবাসী বাংলাদেশিদের বাজারেও মধু যেত। মধু প্রক্রিয়াজাত কারখানা স্থাপনের পর রপ্তানি বাজার বড় হতে থাকে। এখন বিশ্বের অন্যতম বড় ও সংবেদনশীল মধুর বাজার জাপান, গ্রেট ব্রিটেন, যুক্তরাষ্ট্র, কুয়েতসহ বিভিন্ন দেশ রপ্তানি হচ্ছে। ২০১৬ সালে প্রায় ২০০ টন মধু জাপানে রপ্তানি হয়েছে। ২০১৯-২০ সালে জাপানে মধু রপ্তানি হয়েছে চার লাখ ৪০ হাজার ডলার বা তিন কোটি ৭৪ লাখ টাকা সমমূল্যের। এ সময় জাপান, কুয়েত, যুক্তরাষ্ট্র ও মালেশিয়া এই চার দেশে প্রায় চার কোটি টাকা সমমূল্যের মধু রপ্তানি হয়।

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা