kalerkantho

শুক্রবার । ১৩ ফাল্গুন ১৪২৭। ২৬ ফেব্রুয়ারি ২০২১। ১৩ রজব ১৪৪২

সীমিত সময়ের জন্য রাজস্ব ছাড় চায় ছোট ও মাঝারি প্রতিষ্ঠান

ফারজানা লাবনী   

২২ জানুয়ারি, ২০২১ ০২:১০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



সীমিত সময়ের জন্য রাজস্ব ছাড় চায় ছোট ও মাঝারি প্রতিষ্ঠান

বিশ্বের অন্যান্য দেশের মতো গত বছর মার্চ থেকে করোনা মহামারি বাংলাদেশেও আঘাত হানে। এই মহামারির প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ প্রভাবে দেশের ছোট-বড় সব প্রতিষ্ঠান আর্থিক সংকটে পড়ে। তবে গত জুন থেকে বড় প্রতিষ্ঠানগুলো আর্থিক সংকট কিছুটা কাটিয়ে উঠতে সক্ষম হয়। এসব প্রতিষ্ঠান কয়েক মাস ধরে নিয়মিত রাজস্বও পরিশোধ করছে। কিন্তু লোকসান গুনছে বেশির ভাগ ছোট ও মাঝারি প্রতিষ্ঠান। এসব প্রতিষ্ঠান রাজস্ব পরিশোধেও ব্যর্থ হচ্ছে। করোনাকালীন সংকটে এসব প্রতিষ্ঠানকে টিকিয়ে রাখতে সাময়িক রাজস্ব পরিশোধে ছাড় দাবি করেছেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা।

এফবিসিসিআইয়ের সাবেক সভাপতি ও নিটল নিলয় গ্রুপের চেয়ারম্যান আবদুল মাতলুব আহমাদ কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘করোনা মহামারির কারণে ছোট-বড় সব প্রতিষ্ঠানই লোকসানে পড়েছে। বড় প্রতিষ্ঠানগুলোকে এই সমস্যা মোকাবেলায় সহায়তা দিতে অনেকে এগিয়ে এসেছেন। ফলে এই প্রতিকূল পরিবেশেও নতুন অর্থবছরের শুরু থেকে এসব প্রতিষ্ঠানের অনেকে নিয়মিত রাজস্ব পরিশোধ করছেন। কিন্তু ছোট প্রতিষ্ঠানগুলো লোকসানে পড়ে করোনার এই ধকল সামলাতে রীতিমতো হিমশিম খাচ্ছে। তাদের পক্ষে রাজস্ব পরিশোধ করা কষ্টকর হয়ে পড়েছে। এসব প্রতিষ্ঠানকে টিকিয়ে রাখতে জরুরি ভিত্তিতে সীমিত সময়ের জন্য হলেও রাজস্ব ছাড় দেওয়া প্রয়োজন।’

সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা মির্জ্জা আজিজুল ইসলাম কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘সরকারের রাজস্ব প্রয়োজন; কিন্তু ব্যবসা করার সুযোগ না দিলে কিভাবে রাজস্ব পরিশোধ করবে? করোনার এই সংকট কাটিয়ে উঠতে দুই থেকে তিন মাসের জন্য হলেও এসব প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে অর্ধেক রাজস্ব আদায় করা উচিত।’   

প্রতিবছরই বাড়ছে জাতীয় বাজেটের আকার। জাতীয় বাজেটের অর্থায়নের প্রায় ৬০ শতাংশ দায়িত্ব দেওয়া হয় এনবিআরকে। রাজস্ব আদায়ের তিন খাত—আয়কর, ভ্যাট ও শুল্ক থাকলেও এনবিআর ভ্যাটনির্ভরতায় রাজস্ব আদায় করে। ভ্যাট খাতের প্রধান আয় দোকানপাটের বেচাকেনা থেকে। করোনার কারণে মার্চ-এপ্রিল থেকে জুন-জুলাই পর্যন্ত দেশের অনেক স্থানে লকডাউন ছিল। এর ফলে এক জেলা থেকে অন্য জেলায় পণ্য পৌঁছানো সম্ভব হয়নি। করোনার কারণে দোকানপাট খোলা রাখার সময়ও সীমিত করা হয়। ফলে অনেক উদ্যোক্তা পণ্য উৎপাদন করে গুদামে ফেলে রাখতে বাধ্য হন। এবার পহেলা বৈশাখ, ঈদ, পূজা, ২১শে ফেব্রুয়ারি, ২৬শে মার্চের মতো উৎসবকেন্দ্রিক বেচাকেনার বড় মৌসুমগুলোতে ব্যবসা করার সুযোগ ছিল না। এমন পরিস্থিতিতে ব্যবসায়ীদের পক্ষে নিয়মিত রাজস্ব পরিশোধ করা অসম্ভব হয়ে পড়েছে। গত অর্থবছরের শেষ হিসাবে রাজস্ব আদায়ে ছিল ইতিহাসের সবচেয়ে বড় ঘাটতি, ৮৫ হাজার কোটি টাকা। এই অবস্থায় চলতি অর্থবছরের বাজেট প্রণয়নকালে গত জুনে অতীতের যেকোনো সময়ের চেয়ে বড় রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা তিন লাখ ৩০ হাজার কোটি টাকা নির্ধারণ করা হয়। এর মধ্যে ভ্যাট খাতে আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয় এক লাখ ২৮ হাজার ৮৭৩ কোটি টাকা। করোনায় বিপর্যস্ত অর্থনীতিতে অর্থ মন্ত্রণালয়ের বেঁধে দেওয়া এই লক্ষ্যমাত্রা পূরণের দায়িত্ব নিতে আপত্তি জানায় এনবিআর। কিন্তু এনবিআরের এই আপত্তি আমলে নেওয়া হয়নি। নিরুপায় হয়ে এনবিআর আকাশছোঁয়া এই লক্ষ্যমাত্রা পূরণে ব্যবসায়ীদের ওপর চাপ তৈরি করেছে।

মিরপুর-১০-এর সোহানা ডিপার্টমেন্টাল স্টোরের মালিক রাজ্জাকুল ইসলাম কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘গত প্রায় এক বছর করোনার কারণে ব্যবসা করতে পারিনি। কিভাবে রাজস্ব পরিশোধ করব?’

বাংলাদেশ দোকান মালিক সমিতির সভাপতি হেলাল উদ্দিন কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘চলতি রাজস্ব আইনে বছরে ৫০ লাখ টাকা পর্যন্ত বেচাকেনায় ভ্যাট পরিশোধ না করার কথা থাকলেও তা মানা হচ্ছে না। দোকানে দোকানে এনবিআর কর্মকর্তারা হাজির হয়ে রাজস্ব পরিশোধে তাগাদা দিচ্ছেন। আমরা ৫০ লাখ টাকার বেশি বেচাকেনা করিনি বললেও কর্মকর্তারা তা মানছেন না। এভাবে চলতে থাকলে ভবিষ্যতে আমরা প্রতিবাদ করতে রাস্তায় নামব। রাজস্ব পরিশোধে সক্ষম হতে আমাদের সময় দিতে হবে। করোনাকালীন এই সংকট বিবেচনায় নিয়ে সাময়িক সময়ের জন্য হলেও রাজস্ব আদায়ে আমাদের ছাড় দিতে হবে।’     

করোনাকালীন সংকটের কথা তুলে ধরা হয়েছে এনবিআরের প্রতিবেদনেও। এতে উল্লেখ আছে, ২০১৯-২০ অর্থবছরে বিশ্বব্যাপী করোনা মহামারির কারণে সার্বিক অর্থনীতিতে নেতিবাচক প্রভাব পড়ায় স্থানীয় পর্যায়ের ভ্যাটের অবদান কিছুটা হ্রাস পেয়ে ৩৯ শতাংশের নিচে নেমে যায়। গত ডিসেম্বর পর্যন্ত ভ্যাট খাতে গড়ে ঘাটতি রয়েছে ৭০ শতাংশ।

এনবিআরের সদস্য আবদুল মান্নান শিকদার কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘রাজস্ব আদায় না করলে সরকারের আয় হবে না। আমরা চেষ্টা করছি প্রকৃত ভ্যাট দাতার কাছ থেকে আদায় করতে। কাউকে হয়রানি করা আমাদের উদ্দেশ্য নয়।’ 

ভ্যাট নিরীক্ষা গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদপ্তরের মহাপরিচালক ড. মইনুল খান কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘ভ্যাট আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা পূরণে আমরা কাজ করছি। অনেকে ভ্যাট দিতে সক্ষম হলেও দেয় না। এসব ব্যাবসায়ীকে খুঁজে বের করতেই আমরা অভিযান চালাই।’

বাংলাদেশ রপ্তানিকারক সমিতির সহসভাপতি মো. হাতিম কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘যারা ভ্যাট ফাঁকি দেয়, তাদের ওপর অভিযান পরিচালনা করতে হবে। তবে যারা লোকসানে আছে এবং রাজস্ব পরিশোধ করতে পারছে না, রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা পূরণ করতে তাদের কাছে রাজস্ব চাওয়ার অর্থ তাদের মানসিক যন্ত্রণা আরো বাড়িয়ে দেওয়া। এ ক্ষেত্রে আইন সংশোধন করে রাজস্বের হার কমিয়ে সময় বাড়াতে হবে।’      

জাতীয় ক্ষুদ্র ও কুঠির শিল্প সমিতির সভাপতি মির্জা নূরুল গণি শোভন কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘অনেক উদ্যোক্তা আগে দেশে-বিদেশে ভালো ব্যবসা করেছেন। নিয়মিত রাজস্ব পরিশোধও করেছেন। কিন্তু বর্তমানে করোনার কারণে ব্যবসা করতে না পারায় ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তারা রাজস্ব পরিশোধে হিমশিম খাচ্ছেন। করোনা সংকট কাটিয়ে না ওঠা পর্যন্ত এসব প্রতিষ্ঠানের রাজস্ব মাফ করা উচিত।’

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা