kalerkantho

বৃহস্পতিবার । ১২ ফাল্গুন ১৪২৭। ২৫ ফেব্রুয়ারি ২০২১। ১২ রজব ১৪৪২

পরিবেশবান্ধব এ পণ্যের রপ্তানি বেড়েছে ৪৯ শতাংশ

করোনায় বিশ্বে হস্তশিল্পের চাহিদা তুঙ্গে

এম সায়েম টিপু    

১৭ জানুয়ারি, ২০২১ ১০:২৮ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



করোনায় বিশ্বে হস্তশিল্পের চাহিদা তুঙ্গে

কভিড-১৯-এর প্রভাবে বিশ্ববাজারে অন্যান্য পণ্যের রপ্তানি আয় কমলেও পরিবেশবান্ধব হওয়ায় বাড়ছে দেশের হস্ত ও কুটির শিল্পের বাজার। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, মহামারিতে মানুষ ঘরমুখী, ফলে ঘর সজ্জার পণ্যের চাহিদা বাড়ছে ইউরোপ ও আমেরিকায়।

তবে উদ্যোক্তাদের দাবি, সরকার রপ্তানি পণ্য বহুমুখী করার ওপর জোর দিলেও এই খাতে অনেকটা বিমাতাসুলভ আচরণ করছে। পাটজাত পণ্যে রপ্তানিতে ২০ শতাংশ প্রণোদান দিলেও হস্তশিল্প রপ্তানিতে দেওয়া হয় মাত্র ১০ শতাংশ। এর ওপর কর কর্তনের পর উদ্যোক্তাদের থাকে মাত্র ৮ শতাংশ। তাই আমলাতান্ত্রিক জটিলতাসহ অন্য বাধা দূর করা গেলে এই শিল্পের আগামী দুই বছরের মধ্যে হাজার কোটি টাকার রপ্তানি আয় করা সম্ভব। এ ছাড়া সরকারি মালিকানাধীন বন্ধ পাটকলের অভ্যন্তরে যদি জমি ও অবকাঠামো ব্যবহারের সুযোগ দেওয়া হয় তবে এটি একটি সুযোগে পরিণত হতে পারে।

রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) প্রকাশিত পরিসংখ্যানে দেখা যায়, দেশের হস্ত ও কুটির শিল্প থেকে চলতি অর্থবছরের ছয় মাসে (জুলাই-ডিসেম্বরে) আয় হয়েছে এক কোটি ৬৫ লাখ ৮০ হাজার ডলার। এই আয় আগের বছরের একই সময়ের চেয়ে ৪৮.৭০ শতাংশ বেশি। আর লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে এই আয় ২৩.৩৬ শতাংশ বেশি। এ সময় লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয় এক কোটি ৩৪ লাখ ৪০ হাজার ডলার। গত অর্থবছরের এই সময়ের আয় ছিল এক কোটি ১১ লাখ ৫০ হাজার ডলার।

অন্যদিকে ২০১৯-২০ অর্থবছরে এই খাতের রপ্তানি আয় ছিল দুই কোটি ৫২ হাজার ডলার। চলতি অর্থবছরের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে দুই কোটি ৮০ লাখ ডলার।

বাংলাদেশ হস্ত ও কুটির শিল্প প্রস্তুত ও রপ্তানিকারক সমিতির (বিএইচএমইএ) সভাপতি গোলাম আহসান কালের কণ্ঠকে বলেন, কভিডের প্রভাবে স্থানীয় বাজারে হস্ত ও কুটির শিল্পের বাজার কমলেও বিশ্ববাজারে প্রায় ৫০ শতাংশ রপ্তানি আয় বেড়েছে গত কয়েক মাসে। তবে স্থানীয় বাজারে কমেছে ১৫ থেকে ২০ শতাংশ। একই সঙ্গে কাঁচামাল, মজুুরি এবং পরিবহন ব্যয় বেড়েছে।

তিনি জানান, বিশ্ববাজারে পণ্য চাহিদা বাড়লেও কভিডের আগের তুলনায় ক্রেতারা অনেক দাম কমিয়েছেন। করোনার আগে রপ্তানিকারকদের ১০ থেকে ১৫ শতাংশ লাভ হতো সেটা এখন ৩ থেকে ৫ শতাংশে এসে দাঁড়িয়েছে। তবে তিনি জানান, স্থানীয় বাজারে কয়েক বছর ধরে ১৫ থেকে ২০ শতাংশ হারে বাড়ছিল এই শিল্পের বাজার। কিন্তু করোনায় তা ব্যাহত হয়েছে। গোলাম আহসান বলেন, ‘মানুষ প্রকৃতির মধ্যে থাকতে চায়। তাই শার্ট-প্যান্ট না কিনে তারা ঘরে থাকছে তাই ঘর সাজাচ্ছে। এ ছাড়া যুক্তরাষ্ট্র চীনের ওপর ২৫ শতাংশ আমদানি শুল্ক আরোপ করায় বাংলাদেশ সেই সুবিধা পাচ্ছে।

হস্তশিল্প রপ্তানিকারকদের সংগঠন বাংলাক্রাফট সূত্রে জানা যায়, হুগলা পাতা, ছন, বেত ও পাট দিয়ে তৈরি ঝুড়ি, টেরাকোটা ও শতরঞ্চিসহ বিশেষ কিছু পণ্য হস্ত ও কুটির শিল্পের রপ্তানি আয় বাড়াতে ভূমিকা রাখছে। মাটির তৈরি টেরাকোটা ও রংপুরের তৈরি শতরঞ্চি হলো সম্পূর্ণ হাতের তৈরি কার্পেট।

এই খাতের নতুন উদ্যোক্তাদের এগিয়ে আসতে এসএমই ফাউন্ডেশন এক অঙ্ক সুদে ঋণ দিয়ে সহযোগিতা করছে। এর ফলে নতুন নতুন পণ্যের উদ্ভাবনসহ নতুন রপ্তানি বাজার খুঁজতে সহায়ক হচ্ছে। এ ছাড়া হস্তশিল্প উৎপদন করে এমন দেশগুলোর তুলনায় বাংলাদেশে মজুরি কম এবং দেশে কাঁচামালও সহজলভ্য।

সংগঠনের নেতারা বলেন, হস্তশিল্প তৈরি করে এমন বড় প্রতিযোগী দেশগুলোর মধ্যে রয়েছে চীন, ভিয়েতনাম এবং থাইল্যান্ড। এসব দেশ এখন উচ্চ প্রযুক্তির দিকে ঝুঁকছে। ফলে কয়েক হাজার কোটি ডলারের বিশ্ববাজারের বাংলাদেশের এগিয়ে যাওয়ার এখন সুবর্ণ সুযোগ। এ ছাড়া দেশে ১০ থেকে ১২ হাজার কোটি টাকার একটি অভ্যন্তরীণ বাজারও রয়েছে। ২০১৭ থেকে ২৩ সালের মধ্যে এর বিশ্ববাজার হবে ৫২৬ বিলিয়ন ডলার।

উদ্যোক্তারা জানান, বাংলাদেশ মূলত দুই ধরনের পণ্য রপ্তানি করে থাকে। বাঁশ, সুতা, পাট ও বেত থেকে তৈরি গৃহসজ্জার পণ্য এবং প্লাস্টিকের তৈরি পণ্য। বাংলাদেশ থেকে রপ্তানি হওয়া গৃহসজ্জার পণ্যগুলোর মধ্যে রয়েছে বালিশের কভার, পাটের ব্যাগ, এক্সিকিউটিভ ব্যাগ, ল্যাপটপ ব্যাগ,

সেভিং কিট ব্যাগ এবং নকশি কাঁথা। বাংলাদেশ থেকে আরো রপ্তানি হয়

মৃিশল্প, তাঁত, মসলিন, জামদানি বাঁশের কারুকাজ, শীতল পাটি এবং পাটের তৈরি পণ্য। বেত হস্তশিল্পের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাঁচামাল।

ইপিবির তথ্য অনুসারে, বাংলাদেশের হস্তশিল্পের প্রধান রপ্তানি বাজারের মধ্যে রয়েছে উত্তর আমেরিকা, ইউরোপ এবং মধ্যপ্রাচ্য। তবে সম্ভাবনাময় এই খাতের নানা চ্যালেঞ্জও রয়েছে। উৎপাদন ও রপ্তানি প্রক্রিয়ায় স্থানীয় এবং বৈশ্বিক চাহিদা মেটাতে উদ্ভাবনী নকশা তৈরির জন্য পর্যাপ্ত গবেষণাগার নেই। কারিগররা দেশের বিভিন্ন স্থানে হস্তশিল্পের পণ্য উৎপাদন করেন। উদ্যোক্তারা সেসব পণ্য আউটসোর্সিং বা সংগ্রহ করেন। সব ধরনের হস্তশিল্পের জন্য একটি কেন্দ্রীয় পয়েন্ট দরকার। স্থানীয়ভাবে উৎপাদিত এবং আংশিকভাবে হাতের তৈরির ফলে এই খাতে বিনিয়োগ প্রায় শূন্য। এ ছাড়া এই শিল্পের জন্য বড় বড় মেশিনও কিনতে হয় না। ফলে বিশাল তহবিলেরও প্রয়োজন হয় না।

সম্ভাবনার কথা তুলে ধরে গোলাম আহসান আরো বলেন, দেরি হলেও তরুণ উদ্ভাবনী উদ্যোক্তারা এখন এই শিল্পে আসছেন। বিশ্ববাজারেও ইতিবাচক প্রভাব দৃশ্যমান। বৈশ্বিক জায়ান্ট ওয়াল মার্ট বাংলাদেশ থেকে হস্তশিল্প পণ্য নেওয়ার পরিকল্পনা করছে। এ ছাড়া অনেক বড় বড় পোশাক ক্রেতা প্রতিষ্ঠান এই শিল্পের দিকে ঝুঁকছে।

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা