kalerkantho

বুধবার । ১০ অগ্রহায়ণ ১৪২৭। ২৫ নভেম্বর ২০২০। ৯ রবিউস সানি ১৪৪২

জামালপুর অর্থনৈতিক অঞ্চলকে ঘিরে বিশাল কর্মযজ্ঞ

আরিফুর রহমান, জামালপুর থেকে ফিরে   

১২ অক্টোবর, ২০২০ ০৯:৫৪ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



জামালপুর অর্থনৈতিক অঞ্চলকে ঘিরে বিশাল কর্মযজ্ঞ

সরকারের নেওয়া নানা ধরনের উন্নয়ন কর্মকাণ্ডের প্রভাবে দেশের গড় দারিদ্র্যের হার ২০ শতাংশের ঘরে নেমে এলেও জামালপুরের দারিদ্র্যের হার এখনো অর্ধেকেরও বেশি অর্থাৎ ৫২.৫ শতাংশে অবস্থান করছে। মধ্যাঞ্চলের জেলাটিতে ২৩ লাখ ২৪ হাজার জনগোষ্ঠীর মধ্যে ১২ লাখ ৫২ হাজার মানুষ এখনো দারিদ্র্যসীমার নিচে বসবাস করছে। জামালপুরে শিক্ষার সূচকটিও অত্যন্ত নাজুক। সেখানে শিক্ষার হার মাত্র ৩৯ শতাংশ। জেলার ৮০ শতাংশ মানুষের প্রধান পেশা কৃষি।

এখনো বড় কোনো শিল্প-কারখানা গড়ে ওঠেনি। ফলে অন্য জেলার চেয়ে আর্থ-সামাজিক অনেক সূচকে পিছিয়ে আছে জামালপুর। এমন বাস্তবতায় অপেক্ষাকৃত অনগ্রসর ও দারিদ্র্যপীড়িত জেলা জামালপুরে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড বাড়াতে একটি অর্থনৈতিক অঞ্চল প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নিয়েছে বাংলাদেশ অর্থনৈতিক অঞ্চল কর্তৃপক্ষ (বেজা)। সদর উপজেলার দিগপাইত ও তিতপল্লা ইউনিয়নে ৪৩৭ একর জায়গার ওপর তৈরি হচ্ছে অর্থনৈতিক অঞ্চলটি। অর্থনৈতিক অঞ্চলকে ঘিরে এখন চলছে বিশাল কর্মযজ্ঞ।

গত ২ অক্টোবর সরেজমিনে ঘুরে দেখা গেছে, বিনিয়োগকারীদের নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস দেওয়ার জন্য চলছে গ্যাসলাইনের কাজ। জেলার সরিষাবাড়ী উপজেলা থেকে প্রকল্প এলাকা পর্যন্ত গ্যাস পাইপলাইন স্থাপনের কাজ প্রায় শেষ পর্যায়ে। ৩৩/১১ কেভি বৈদ্যুতিক সাব-স্টেশন নির্মাণের কাজ এরই মধ্যে শেষ হয়েছে। ভূমি অধিগ্রহণ করে বিনিয়োগকারীদের জন্য ভূমি উন্নয়নের কাজও শেষ পর্যায়ে।

অর্থনৈতিক অঞ্চলে প্রশাসনিক কর্মকাণ্ড পরিচালনার জন্য ছয়তলা ভিতের ওপর তিনতলা প্রশাসনিক ভবন নির্মাণের কাজ এরই মধ্যে শেষ হয়েছে। এখন চলছে ছয়তলা ভিতের ওপর তিনতলা দুটি ডরমিটরি ভবন নির্মাণের কাজ। দুটি ডরমিটরির ৯০ শতাংশ কাজ শেষ হয়েছে বলে জানিয়েছে বেজা। এ ছাড়া পরীক্ষামূলকভাবে গভীর নলকূপ স্থাপন, পাম্প হাউস নির্মাণ এবং তিন হাজার ঘনমিটার ধারণক্ষমতার ভূগর্ভস্থ জলাধার নির্মাণের কাজও চলছে জোরেশোরে। প্রকল্প এলাকায় কথা হয় ভোলা থেকে আসা পঞ্চাষোর্ধ মোহাম্মদ মোহসীনের সঙ্গে; যিনি অর্থনৈতিক অঞ্চলে গ্যাস সংযোগের কাজ করছেন। গ্যাসলাইনের কাজ শেষ পর্যায়ে বলে জানান তিনি। প্রকল্প এলাকায় কথা হয় আরেক শ্রমিক মিজানুর রহমানের সঙ্গে; যিনি বগুড়া থেকে এসেছেন। বেজা বলছে, জামালপুর অর্থনৈতিক অঞ্চলে অন্তত ৫০ হাজার মানুষের কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হবে।

জামালপুর অর্থনৈতিক অঞ্চলে ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প সংস্থা বিসিককে এরই মধ্যে ৫০ একর জমি দেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া বাংলাদেশ শিল্প কারিগরি সহায়তা কেন্দ্রকে (বিটাক) পাঁচ একর জমি দেওয়া হয়েছে। জাপানের একটি কৃষি ও খাদ্য প্রক্রিয়াকরণ কম্পানি জামালপুরে বিনিয়োগ করবে বলে জানিয়েছে। এ ছাড়া বেজার গভর্নিং বোর্ডে কৃষিভিত্তিক প্রতিষ্ঠান রিলায়েন্স সলিউশন লিমিটেডসহ এখন পর্যন্ত ১২টি শিল্প প্লট বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। তবে অর্থনৈতিক অঞ্চলের সঙ্গে যোগাযোগব্যবস্থা এখনো উন্নত হয়নি জানিয়ে উদ্যোক্তারা বলছেন, যত দ্রুত সম্ভব অর্থনৈতিক অঞ্চলের সঙ্গে যোগাযোগব্যবস্থার উন্নতি ঘটাতে হবে।

বেজার নির্বাহী চেয়ারম্যান পবন চৌধুরী কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘জামালপুর একটি দারিদ্র্যপ্রবণ জেলা। জেলাটিতে কোনো শিল্প-কারখানা গড়ে না ওঠায় দারিদ্র্যসীমার নিচে বসবাস করা মানুষের সংখ্যা তুলনামূলক বেশি। সে জন্য আমরা জামালপুরে একটি অর্থনৈতিক অঞ্চল প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ গ্রহণ করি। যার মাধ্যমে সেখানে প্রচুর মানুষের কর্মসংস্থান হবে। এতে দারিদ্র্যের হারও কমে আসবে।’

পবন চৌধুরী বলেন, অর্থনৈতিক অঞ্চলটির কাজ শেষ হতে এখনো সময় লাগলেও এরই মধ্যে অনেক বিনিয়োগকারী সেখানে বিনিয়োগে আগ্রহ দেখিয়েছে। এরই মধ্যে ১২টি শিল্প প্লট বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে বলে জানান তিনি।

বেজার তথ্য বলছে, বিনিয়োগকারীদের সব ধরনের সুযোগ-সুবিধাই দেওয়া হবে জামালপুর অর্থনৈতিক অঞ্চলে। কৃষিসমৃদ্ধ জেলাটিতে কৃষি ও মসলাজাত পণ্য, পাট, চামড়া, সিরামিক, ফার্মাসিউটিক্যালসহ বিভিন্ন পণ্য উৎপাদনের উপযোগী করে গড়ে তোলা হবে। একক কোনো পণ্য নয়; বিভিন্ন ধরনের পণ্য উৎপাদনের জন্য ভিন্ন ভিন্ন প্রকৃতির শিল্প স্থাপন করা হবে সেখানে। সরেজমিন ঘুরে জানা গেছে, জেলা সদরটি বন্যাপ্রবণ এলাকা হওয়ায় সেখানে মহাসড়কের সমান উচ্চতায় মাটি ভরাট করা হবে। যাতে অর্থনৈতিক অঞ্চলে বন্যার পানি ঢুকতে না পারে। পুরো অর্থনৈতিক অঞ্চলের চারপাশে সীমানা দেয়াল নির্মাণের কাজ চলছে। এর ৮০ শতাংশ কাজই শেষ। ড্রেনেজ ব্যবস্থার কাজ শুরু হচ্ছে শিগগিরই। বিনিয়োগকারীদের জন্য রাস্তাঘাট, গ্যাস-বিদ্যুৎ, পানিসহ সব ধরনের পরিষেবা নিশ্চিত করা হবে বলে জানিয়েছে বেজা।

জামালপুর জেলা প্রশাসক এনামুল হক কালের কণ্ঠকে বলেন, জামালপুর অর্থনৈতিক অঞ্চল প্রতিষ্ঠিত হলে বদলে যাবে জেলার আর্থ-সামাজিক অবস্থা। অর্থনৈতিক অঞ্চলটির জন্য স্থানীয়রা সব ধরনের সহযোগিতা করছে। অর্থনৈতিক অঞ্চলের জন্য যারা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, তাদের সবাইকে প্রাপ্য ক্ষতিপূরণ দেওয়া হচ্ছে।

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা