kalerkantho

মঙ্গলবার । ৪ কার্তিক ১৪২৭। ২০ অক্টোবর ২০২০। ২ রবিউল আউয়াল ১৪৪২

বাণিজ্যের সঙ্গে তাল মেলানোই বড় চ্যালেঞ্জ

আসিফ সিদ্দিকী, চট্টগ্রাম    

২৭ সেপ্টেম্বর, ২০২০ ০৯:৪৫ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



বাণিজ্যের সঙ্গে তাল মেলানোই বড় চ্যালেঞ্জ

দেশের প্রধান চট্টগ্রাম সমুদ্রবন্দরের পণ্য ওঠানামার সক্ষমতা দুই বছর আগেই পূর্ণ হয়েছে। ২০১৮ সালের আগ পর্যন্ত কনটেইনার পণ্য ওঠানামা বাড়ত প্রতিবছর তিন লাখ একক; গত দুই অর্থবছরে সেটি বাড়ছে এক লাখ একক করে। আর সাধারণ পণ্য ওঠানামার প্রবৃদ্ধিও হচ্ছে সাড়ে ৩ শতাংশ। ২০১৮ সালের আগে যা ছিল সর্বোচ্চ ১৬ শতাংশ। ২০০৭ সালের পর বন্দরে নতুন কোনো জেটি যোগ হয়নি। যোগ হয়েছে কনটেইনার রাখার ইয়ার্ড, কিন্তু তা চাহিদার তুলনায় অপ্রতুল। এর পরও বন্দর কর্তৃপক্ষ আধুনিক কিছু যন্ত্রপাতি যোগ করে এবং নিজস্ব কিছু কৌশল প্রয়োগ করে বাড়তি প্রবৃদ্ধি সামাল দেওয়ার চেষ্টা করছে।

বন্দর ব্যবহারকারীরা বলেন, বাড়তি প্রবৃদ্ধি সামাল দিতে গিয়ে সবচেয়ে বেশি হিমশিম খেতে হয় বছরের নির্দিষ্ট কিছু সময়ে। বাজেট ঘোষণার আগে-পরে, রমজানের আগে, বৃষ্টিসহ প্রাকৃতিক দুর্যোগ এবং জেটি-চ্যানেলে কোনো জাহাজ দুর্ঘটনা ঘটলেই জাহাজ ও কনটেইনারজট লেগে যায় এই বন্দরে। এখন বন্দরে একটি কনটেইনার জাহাজ বহির্নোঙরে এসে দিনে দিনে জেটিতে ভিড়তে পারলেও করোনাকালীন লকডাউনের সময় জাহাজ ভিড়তে সময় লেগেছে ১৪ দিন পর্যন্ত। ব্যবসায়ীরা বলেন, দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ধরে রাখতে বন্দরের সক্ষমতা বাড়ানো জরুরি। সরকার প্রবৃদ্ধি ধরে রাখতে প্রচুর বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল তৈরি করছে; সেই বিনিয়োগ আনতে গেলে দ্রুত বন্দরগুলোর সক্ষমতা বাড়ানো ও নির্মাণ শেষ করতে হবে।

চট্টগ্রাম চেম্বার সভাপতি মাহবুবুল আলম বলেন, ‘অর্থনৈতিক অবকাঠামো উন্নয়নের কারণে দেশে ব্যবসা বাড়ার গতি ১৬০ মাইল, এর বিপরীতে চট্টগ্রাম বন্দরের সক্ষমতা ৬০ মাইল হলে তো চলবে না। সেই গতিতে আমাদের এগোতে হবে। এটা ঠিক বন্দর তার সর্বোচ্চ শক্তি দিচ্ছে। কিন্তু জেটি না বাড়লে এভাবে কত দিন টেনে নেওয়া যাবে? গত ৪০ বছরে জেটির দরকার ছিল ৬০টি। নির্মিত হয়েছে সাতটি।’

তিনি বলেন, ‘আর আশ্বাস নয় পতেঙ্গা কনটেইনার টার্মিনাল, বে টার্মিনাল এবং মাতারবাড়ী গভীর সমুদ্রবন্দর কবে চালু হবে তার নির্দিষ্ট সময়সীমা চাই। বন্দর সক্ষমতা প্রতিবছর কত বাড়বে তারও সুনির্দিষ্ট ঘোষণা চাই।’

চট্টগ্রাম বন্দরের মহাপরিকল্পনা প্রণয়নকারী জার্মানির হামবুর্গ পোর্ট কনসালটিং জিএমবিএইচ পণ্য ওঠানামার যে পূর্বাভাস দিয়েছিল; তা ২০১৮ সালেই পূর্ণ হয়ে গিয়েছে। প্রতিষ্ঠানটি বলেছিল, ২০১৮ সালের আগেই নতুন জেটি-টার্মিনাল কার্যক্রম শুরু না হলে বন্দরের প্রবৃদ্ধি ধরে রাখা কঠিন হবে আর এতে সংকটে পড়বে চট্টগ্রাম বন্দর।

গার্মেন্ট ব্যবসায়ীদের সংগঠন বিজিএমইএ প্রথম সহসভাপতি আবদুস সালাম বলেন, ‘এখন বন্দরের অবস্থা ভালো হয়েছে। কিন্তু বছরজুড়েই এমন অবস্থা রাখতে পারলে আমরা দেশের রপ্তানি লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করতে পারব। অন্য রপ্তানিকারক প্রতিযোগীর চেয়ে আমরা বন্দর সুবিধায় এগিয়ে থাকব। আর এর সুফল ভোগ করবে দেশ। বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চলে বিনিয়োগও দ্রুত আনতে পারব। কিন্তু প্রবৃদ্ধির সঙ্গে বন্দর সক্ষমতা বাড়াতে না পারলে পিছিয়ে পড়ব।’

কনটেইনার ওঠানামায় বিশ্বের ১০০ শীর্ষ সমুদ্রবন্দরের মধ্যে চট্টগ্রাম বন্দর এখন ৫৮তম অবস্থানে উঠে এসেছে। অথচ ২০০৯ সালে দেশের প্রধান এই সমুদ্রবন্দরের অবস্থান ছিল ৯৮তম; ধারাবাহিকভাবে এগিয়েছে চট্টগ্রাম বন্দর। করোনাকালীন সবাই যখন ঘর থেকে অফিস করেছিল সেই লকডাউনের সময় ২৪ ঘণ্টা সচল রেখে পণ্য ওঠানামা করেছিল বন্দর কর্তৃপক্ষ। করোনা-পরবর্তী বিশ্বের অর্থনীতিতে অচলাবস্থা চললেও ঘুরে দাঁড়িয়েছে বাংলাদেশ; আর এতে সহযোগিতা ছিল চট্টগ্রাম বন্দরের।

বিদেশি শিপিং লাইন জিবিক্স লজিস্টিকসের অ্যাসিস্ট্যান্ট ভাইস প্রেসিডেন্ট মুনতাসির রুবাইয়াত কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘বন্দরের বহির্নোঙরে তিন দিন অপেক্ষমাণ থাকতে হবে সেই হিসাব করেই আমরা একটি বিদেশি জাহাজ ভাড়া করি। এখন দিনে দিনেই বা অনেক ক্ষেত্রে অন অ্যারাইভাল জাহাজ বার্থিং পাচ্ছি এবং লয়েডস লিস্টে বন্দরের অবস্থান ৫৮তম তে উন্নীত হওয়ার কারণেও শিপিং বিশ্বে চট্টগ্রাম বন্দরের ভাবমূর্তি উজ্জ্বল হয়েছে। জাহাজের অপেক্ষমাণ সময় কমে গেলে জাহাজ ভাড়া বাবদ দিনে ৮ থেকে ১০ হাজার মার্কিন ডলার সাশ্রয় হবে। এর সুবিধাও পাবেন গ্রাহকরা।’

বন্দর ব্যবহারকারীরা বলেন, দেশের মোট আমদানি-রপ্তানির ৯২ শতাংশ হয় দেশের প্রধান সমুদ্রবন্দর দিয়ে। সক্ষমতার বেশি পণ্য ওঠানামা-পরিবহন হচ্ছে এই বন্দর দিয়ে। বিদেশি কনসালট্যান্সি প্রতিষ্ঠানের জরিপেও লক্ষ্যমাত্রা ছাড়িয়ে গেছে এই বন্দর। সক্ষমতা বাড়াতে প্রতিবছর নতুন আধুনিক যন্ত্রপাতি যোগ করে পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার চেষ্টা করছে বন্দর কর্তৃপক্ষ। এর পাশাপাশি নির্মাণ হচ্ছে পায়রা সমুদ্রবন্দর, মোংলা সমুদ্রবন্দরের সক্ষমতা বাড়ানো হচ্ছে।

চট্টগ্রামে নির্মাণের পরিকল্পনা নিয়েছে বে টার্মিনাল। বড় জাহাজ ভেড়ানোর জন্য নির্মাণ করছে মাতারবাড়ী গভীর সমুদ্রবন্দর। বন্দরের সহায়ক শক্তি হিসেবে নির্মাণ করছে পতেঙ্গা কনটেইনার টার্মিনাল।

যদিও বন্দর কর্তৃপক্ষ বলছে, ২০২১ সালের জুনে চারটি জেটি নিয়ে চালু হচ্ছে পতেঙ্গা কনটেইনার টার্মিনাল; এর মাধ্যমে বছরে চার লাখ একক কনটেইনার ওঠানামা করা যাবে। বে টার্মিনালে কনসালট্যান্ট নিয়োগ হচ্ছে, মাতারবাড়ী গভীর সমুদ্রবন্দর নির্মাণও ২০২১ সালের শেষে শুরু হবে।

এসব প্রকল্প যথাসময়ে সম্পন্ন হলে প্রবৃদ্ধি চাহিদা সামাল দেওয়া সহজ হবে।

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা