kalerkantho

সোমবার । ৩ কার্তিক ১৪২৭। ১৯ অক্টোবর ২০২০। ১ রবিউল আউয়াল ১৪৪২

করোনায় দরিদ্রের কাতারে দেশের কয়েক কোটি মানুষ

জিয়াদুল ইসলাম   

২০ সেপ্টেম্বর, ২০২০ ১১:৪৬ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



করোনায় দরিদ্রের কাতারে দেশের কয়েক কোটি মানুষ

ফাইল ফটো

মধ্যবিত্তের জন্য কোনো আর্থিক সহায়তার ঘোষণা না আসায় করোনাকালে টিকে থাকাই কঠিন হয়ে উঠেছে। ব্যবসা-বাণিজ্য ও অর্থনীতিতে স্বাভাবিক গতি না ফেরা পর্যন্ত এই শ্রেণির মানুষের জীবনমান আগের অবস্থায় আসবে না বলে মনে করেন অর্থনীতিবিদসহ সংশ্লিষ্টরা। তবে এরই মধ্যে বিভিন্ন প্রণোদনা প্যাকেজের আওতায় বাজারে টাকার প্রবাহ বাড়ানোর পদক্ষেপে ব্যবসা-বাণিজ্য ও অর্থনীতিতে প্রাণ ফিরতে শুরু করেছে। এতে ধীরে ধীরে সহজ হচ্ছে মধ্যবিত্তের জীবন।

বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ব্যাংক ম্যানেজমেন্টের (বিআইবিএম) সাবেক মহাপরিচালক ড. তৌফিক আহমেদ চৌধুরী কালের কণ্ঠকে বলেন, মধ্যবিত্তরা সব কিছু থেকেই বঞ্চিত। করোনাকালে বিষয়টি আরো স্পষ্ট হয়েছে। এই শ্রেণির মানুষকে নিয়ে একটা কবিতা ভাইরাল হয়েছে। কবিতাটি এ রকম—উচ্চবিত্তের জন্য ব্যাংকঋণ, নিম্নবিত্তের জন্য সরকারি ত্রাণ, আর মধ্যবিত্ত রুটিন করে হাত ধুয়ে যান। বাস্তবটাও তা-ই। মধ্যবিত্তের জন্য আলাদা কোনো প্যাকেজ হয়নি। অথচ করোনাকালে এই শ্রেণির অনেকেই নিম্নবিত্তের কাতারে চলে গেছেন। অর্থাৎ নতুন করে গরিব হয়েছেন। তাই যখন বাজেট দেওয়া হয়, তখনই বলা হয়েছিল এই শ্রেণির জন্য কিছু একটা রাখার জন্য। কিন্তু শেষ পর্যন্ত এ রকম কিছুই রাখা হয়নি। আবার ব্যবসার ধরন অনুযায়ী এসএমই খাতে যে প্রণোদনা প্যাকেজ ঘোষণা করা হয়েছে, সেটাও বিতরণে গতি নেই। সুতরাং সবাই মিলে যদি মধ্যবিত্তকে এড়িয়ে যায়, তাহলে অর্থনীতির জন্য সুফল বয়ে আনবে না। কারণ আমাদের অর্থনীতির প্রাণ এসএমই খাত। তাঁর মতে, অর্থনীতিতে কাঙ্ক্ষিত গতি এলেই মধ্যবিত্তরা আগের অবস্থায় ফিরে আসবে।

অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরিয়ে আনার লক্ষ্যে বাজারে টাকার প্রবাহ বাড়াতে কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে একের পর এক নীতি সহায়তা দেওয়া হচ্ছে। করোনা ইস্যুতে এখন পর্যন্ত বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে শতাধিক নির্দেশনা জারি করা হয়েছে। গঠন করা হয়েছে প্রায় ৫১ হাজার কোটি টাকার পুনরর্থায়ন তহবিল। কয়েক দফা কমানো হয়েছে নগদ জমা সংরক্ষণের হার (সিআরআর), নীতি সুদহার রেপো। প্রণোদনা প্যাকেজের ঋণসুবিধা নিয়ে যাতে ব্যবসা-বাণিজ্য যথাসময়ে শুরু করা যায়, সে জন্য সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়ে ব্যবসায়ী ও শিল্পোদোক্তাদের ঋণ বিতরণের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। যার ইতিবাচক প্রভাব পড়তে শুরুও করেছে অর্থনীতিতে। স্থবির আমদানি ও রপ্তানিতে গতি আসছে। মহামারিতেও রেমিট্যান্স বেড়েছে অস্বাভাবিক গতিতে। বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভেও হয়েছে একের পর এক রেকর্ড। আর এখন বেসরকারি খাতে বিনিয়োগ বাড়লেই অর্থনীতিতে কাঙ্ক্ষিত গতি ফিরবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা।

বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র মো. সিরাজুল ইসলাম কালের কণ্ঠকে বলেন, প্রাণহীন অর্থনীতিতে গতি ফেরাতে প্রণোদনা প্যাকেজ বাস্তবায়নে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়েছে সরকার ও বাংলাদেশ ব্যাংক। সরকার যখন প্যাকেজ ঘোষণা করেছে, তখনই সেটা বাস্তবায়নে নীতিমালা জারি করা হয়েছে। প্যাকেজ বাস্তবায়নে ব্যাংকগুলো যাতে কোনো ধরনের সংকটে না পড়ে, সে জন্য বাজারে তারল্য প্রবাহ নিশ্চিত করা হয়েছে।

জানা যায়, চলতি বছরের এপ্রিল থেকে জুন করোনা সংক্রমের ঝুঁকি ছিল বেশি। বেশির ভাগ সময়ই লকডাউন ছিল। ফলে মানুষের কোনো কাজকর্ম ছিল না। এতে অনেক অসচ্ছল পরিবার দারিদ্র্যসীমার নিচে নেমে গেছে। বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (বিআইডিএস) সম্প্রতি জরিপ অনুযায়ী, এই সংখ্যাটা দেড় থেকে আড়াই কোটির মতো হবে।

জরিপে বলা হয়, করোনায় ফর্মাল সেক্টরে কাজ করা ১৩ শতাংশ মানুষ চাকরি হারিয়েছে। যাদের আয় ১১ হাজার টাকার কম, তাদের ৫৬.৮৯ শতাংশ পরিবারের আয় বন্ধ হয়ে গেছে, ৩২.১২ শতাংশের আয় কমে গেছে। যাদের আয় ১৫ হাজার টাকার মধ্যে, তাঁদের ২৩.২ শতাংশের আয় পুরোপুরি বন্ধ হয়ে গেছে, ৪৭.২৬ শতাংশের আয় কমে গেছে। আর যাঁদের আয় ৩০ হাজার টাকার বেশি, তাঁদের ৩৯.৪ শতাংশের কমেছে এবং ৬.৪৬ শতাংশের আয় বন্ধ হয়ে গেছে। এই জরিপে মধ্যবিত্তের ওপর করোনার অভিঘাত স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।

পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউটের নির্বাহী পরিচালক ও অর্থনীতিবিদ আহসান এইচ মনসুর কালের কণ্ঠকে বলেন, করোনায় নতুন করে যাঁরা দরিদ্রের কাতারে গেছেন, তাঁদের মধ্যে নিম্ন-মধ্যবিত্ত ও মধ্যবিত্তরা রয়েছেন। তাঁদের কেউ চাকরি হারিয়েছেন, আবার কারো বেতন কমেছে। এই শ্রেণির মানুষকে আগের অবস্থায় ফিরিয়ে আনতে হলে অর্থনীতিকেও আগের অবস্থায় নিয়ে যেতে হবে। এরই মধ্যে প্রণোদনা প্যাকেজ বাস্তবায়নসহ বিভিন্ন কারণে বাজারে টাকার প্রবাহ বাড়তে শুরু করেছে। এতে প্রাণ পেতেও শুরু করেছে অর্থনীতি।

করোনার অর্থনৈতিক ক্ষতি মোকাবেলায় বিভিন্ন খাতে এক লাখ টাকার বেশি আর্থিক প্রণোদনা ঘোষণা করেছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। এই প্রণোদনা প্যাকেজ দেওয়া হয়েছে মূলত দরিদ্র ও নিম্নবিত্ত এবং উচ্চবিত্তের জন্য। কিন্তু পৃথকভাবে মধ্যবিত্তের জন্য কোনো প্রণোদনা প্যাকেজ নেই। ফলে করোনার সময় আয় কমে যাওয়া মধ্যবিত্তদের এখনো সঞ্চয় ভেঙেই চলতে হচ্ছে। তবে প্রণোদনা প্যাকেজের আওতায় যথাসময়ে বাজারে টাকার প্রবাহ বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়ার কারণে সাম্প্রতিক সময়ে অর্থনীতিতে প্রাণচাঞ্চল্য ফিরতে শুরু করেছে।

এদিকে চলতি অর্থবছরের জন্য সম্প্রসারণমুখী মুদ্রানীতি ঘোষণা করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। করোনাভাইরাস সংকটে অর্থের জোগান বাড়াতে নতুন মুদ্রানীতিতে রেপো সুদহার আরো এক দফা কমানো হয়েছে। ব্যাংকগুলো যখন কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে ধার করে, তখন তার সুদহার ঠিক হয় রেপোর মাধ্যমে। মুদ্রানীতিতে রেপোর হার ৫০ বেসিস পয়েন্ট কমিয়ে ৪.৭৫ শতাংশ করা হয়েছে। সেই সঙ্গে প্রায় ১৭ বছর পর নীতিনির্ধারণী সুদের হার ‘ব্যাংক রেট’ ১ শতাংশ কমিয়ে ৪ শতাংশ করা হয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংক বাণিজ্যিক ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে এই হারে ঋণ দিয়ে থাকে। এসব পদক্ষেপের কারণে বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর মাধ্যমে ব্যবসায়ী ও উদ্যোক্তারা আরো সস্তায় ঋণ পাচ্ছেন।

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা